অর্ণব বললেন, "ডুব' দিতে পারি খুব শিগগিরই"

ornob-1.jpgচিকন করে লম্ব চুলের ছেলেটা যেদিন গিটার কাঁধে নিয়ে গান করতে উঠেছিল বাংলা ব্যান্ডের সাথে, তারও আগে থেকে সঙ্গীতের সাথে সংসার শুরু করেছিলেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব। যাকে শ্রোতারা চেনেন অর্ণব নামে।

একাধারে সঙ্গীত নির্মাতা, গায়ক, গীতিকার, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত ভিডিওচিত্র নির্মাতা। এখানেই অর্ণবের পরিচিতি শেষ নয়, বেঙ্গল মিউজিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তিনি। অর্ণব ভালোবাসেন লালনের গান। ভালো, সুন্দর গান। আর যারা এসব গান নিয়ে থাকেন তাদের সামনের দিকে নিয়ে যেতেই তিনি যুক্ত আছেন বেঙ্গল মিউজিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে।

তিনটি অ্যালবাম বের হয়েছে এই গায়কের। ‘চাইনা ভাবিস’ (২০০৫), ‘হোক কলরব’ (২০০৬) এবং সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া ‘ডুব’। ‘বাংলা’ ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। সেই সাথে নিজের স্বাদের সঙ্গীত করার জন্য যুক্ত আছেন ব্যান্ড ‘প্রেয়ার হল’-এও। এছাড়াও ‘অর্ণব এন্ড ফ্রেন্ডস’ নামে আরেকটি প্রজেক্ট ব্যান্ড আছে তার, যেটা নিয়ে তিনি একক শো করতে ঘুরে বেড়ান শহর থেকে শহরে।

অনেক দূর

শৈশবটা অর্ণবের কাছে অনেক দূরের ব্যাপার। অথচ মনে হয় ‘একদিন’ পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনই ছিল তার নিবাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে বড় হওয়া, জীবন সঙ্গী খুঁজে পাওয়া, বা ‘স্বপ্নরোগী’ হয়ে গান নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখা সবই দিয়েছে এই শান্তিনিকেতন। আজ যে ছেলেটা সাহানার হাত ধরে সংসারের বেড়া ডিঙ্গোয়, সেতো ছোট্ট বয়সেই প্রেমের মূল্য দিয়েছিল স্যারের বকুনি খেয়ে।

তখন ক্লাস ফোর, হেড মাস্টারের জুতা চোর। কিন্তু অর্ণবের মনটা চুরি করেছে সাহানা বাজপাই। যদিও মেয়েটা সেটা জানে না। সাহানার এক বন্ধুকে অর্ণব বলেই বসলেন, ‘বড় হলে আমি সাহানাকে বিয়ে করব’। বন্ধুটি ভাল মনেই কথাটা জানিয়ে দেয় সাহানাকে। কিন্তু ওই পুঁচকি মেয়েটা কি তখন আর প্রেমের মর্ম বোঝে ! ভয় পেয়ে স্যারকে বলে দিল সাহানা। আর স্যার মহাশয় বেজায় বেরসিক, দিলেন অর্ণবকে অনেক বকুনি। তাতে কী! প্রেম রোগ তো আর বকুনিতে সারে না, ছোটবেলার বান্ধবী ক্লাস আট কী ন’য়ে উঠতে উঠতে হয়ে গেল হৃদয়ের মানুষ।

চিলতে রোদে

শান্তিনিকেতনে থাকতেই বাংলা ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন অর্ণব। তখন ব্যান্ডের সদস্যরা ছিল শান্তিনিকেতনের বন্ধুরা। বাংলার পল্লীর গান তুলে ধরাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। একসময় আনুশেহ যায় শান্তিনিকেতনে বেড়াতে। পারিবারিক ভাবে আগেই ঘনিষ্ঠ ছিল আনুশেহ ও অর্ণব। আনুশেহ লালনের গান করে। ফলে ওখানের বাংলা ব্যান্ডের সাথে গাইতে কোন অসুবিধা হলো না তার। এরপর ঘটনাচক্রে তাদের পরিচয় হয় বুনোর সাথে। শান্তিনিকেতনের বন্ধুদের দিয়েতো আর বাংলাদেশের ব্যান্ড করা সম্ভব না। তাই অর্ণব, আনুশেহ আর বুনোর সাথে কার্তিক ও শান্তনু মিলে ঢাকাতেই প্রতিষ্ঠিত করলেন ব্যান্ড ‘বাংলা’। ঘটনাটা ২০০১ সালের।

২০০২ সালে বেনসন এন্ড হেজেসের স্টার সার্চ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ‌'বাংলা'। আর সেখানে অর্ণব এসরাজ বাজিয়ে সেরা সঙ্গীতযন্ত্রী হিসেবে জয় করেন পুরস্কার। একই বছর বাংলা ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম ‘কিংকর্তব্যবিমুঢ়’ প্রকাশিত হয়। তাতে ছিল অর্ণবের দুটি গান। একটা হচ্ছে আনুশেহ’র সাথে পল্লী সঙ্গীত ‘মন তরে পারলাম না বুঝাইতে’ অন্যটি হল মৌলিক সঙ্গীত ‘তুই গান গা’। অ্যালবামটির সফলতার পাশাপাশি গান দুটিও তরুণ শ্রোতা সমাজে ব্যাপকভাগে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

চাইনা ভাবিস

অর্ণবের প্রথম অ্যালবাম ‘চাইনা ভাবিস’। ভূমিষ্ঠ হয় ২০০৫ সালে। এই অ্যালবামের একটি গান ‘সে যে বসে আছে একা একা’ অনেক আগেই জনপ্রিয় হয়ে ছিল। কারণ ‘অফ বিট’ নামের একটি নাটকের শীর্ষ সঙ্গীত হিসেবে গানটি ব্যবহার করা হয়। তখন অর্ণবের পড়াটা শেষ হয়নি। তাই শান্তিনিকেতন থেকে এসে গানটি গেয়ে আবার চলে যায় সেখানে। এই গানটি যখন শ্রোতা প্রিয়তা পায়, তখনও অর্ণব সেটার খবর জানতেন না। পরে ঢাকায় ফিরে খবরটা শুনে খুবই খুশি হয় সে। ]

ornob-2.jpgযাহোক বের হল অর্ণবের প্রথম অ্যালবাম। তবে এই অ্যালবামটিও তৈরি হয়েছে বলতে গেলে শান্তিনিকেতনে থাকতে। ১৭ বছর বয়স থেকেই গান কম্পোজ করা শুরু করেন অর্ণব। আর বন্ধুদের গান সুর করাটা ছিল তার শখ, নেশাটা ছিল গান রেকর্ডিং। যা গান বাঁধতো, পয়সা জমিয়ে স্টুডিও ভাড়া করে রেকর্ড করতে থাকলো গানগুলো। শেষে বন্ধুদের পরামর্শেই বের হয় ‘চাইনা ভাবিস’। আরেকটা তথ্য জানিয়ে দেয়া যাক, ১৭ বছর বয়সে যে গানটা অর্ণব প্রথম রেকর্ড করেছিল সেটা ছিল সাহানার লেখা ‘একটা ছেলে’। শান্তিনিকেতনেই গানটি ধারণ করা হয়েছিল। যারা গানটি শুনেছেন তারা এতক্ষণ যে সব তথ্য পেয়েছেন তা থেকে নিশ্চই বুঝেতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, ‘একটি ছেলে’ গানটির ছেলেটাই বা কে আর মেয়েটাই বা কে!

‘অফ বিট’ নাটকের আগে একুশে টেলিভিশনের মেগা ধারাবাহিক ‘বন্ধন’ নাটকের শীর্ষ সঙ্গীত দিয়ে নাটকের গান করা শুরু করেন অর্ণব। এছাড়া ‘ফ্ল্যাট নম্বর ফোরটি’ ও ‘স্পর্শের বাইরে’ নাটকের শীর্ষ সঙ্গীতও তৈরি করেছেন তিনি। ‘স্পর্শের বাইরে’ নাটকের গানটি লেখা ও গাওয়া ছিল সাহানার।

গায়ক তপন চৌধুরীরর ভাতিজা এই শহুরে বাউলের সঙ্গীত পরিচালনায় আরও দুটি অ্যালবামের মধ্যে আছে সাহানার রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম ‘নতুন করে পাবো বলে’ ও গায়িকা কৃষ্ণকলির মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘সূর্যে বাঁধি বাসা’।

অফ বিট

চারুকলায় স্নাতকোত্তর করা ছেলেটি যে শুধু সঙ্গীত আর ছবি আঁকা নিয়েই ব্যস্ত তা নয়, চলমান ছবি তৈরিতেও রয়েছে তার দক্ষতা। ব্যান্ড বাংলা ও হাবিবের বেশ কয়েকটি গানের ভিডিওচিত্র তৈরি করেছেন অর্ণব। এর মধ্যে হাবিবের ‘মায়া’ অ্যালবামের ‘হোয়্যার’স মাই বেবি গন’ গানটির ভিডিওচিত্রটি সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০০৪ এ ৩টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে সেরা ভিডিও অ্যালবাম ২০০৪ হিসেবে পুরস্কার জয় করে। এছাড়া বর্তমানে বাংলাভিশনে প্রচারিত হচ্ছে অর্ণব নির্মিত সঙ্গীতভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘বেঙ্গল মিউজিক আনপ্লাগ্‌ড’।

এবার ‘ডুব’

অর্ণবের তৃতীয় অ্যালবাম ‘ডুব’। সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া অ্যালবামটিতে যেমন আছে আগের অ্যালবামের ঘরানার গান, তেমনি আছে নতুন স্বাদের সঙ্গীত। অর্ণব বলেন, “দু’তিনটা গান রয়েছে ‘হোক কলরব’ এর মত। দুটো রয়েছে ‘চাইনা ভাবিস’ এর মত। এছাড়া কিছু আছে ভিন্ন ধাঁচের গান, যা আগে কখনও করিনি।

doob_cover.jpgআগের অ্যালবাম দুটি থেকে এই অ্যালবামের অন্যতম পার্থক্য হচ্ছে, এর গানগুলো গত ছয় মাসে তৈরি করা হয়েছে। আর আগের দুটো অ্যালবামে স্থান পেয়েছে অর্ণবের আগের কিছু গান।

আরেকটি ব্যাপার হল অর্ণব এই অ্যালবামে হার্ডরক ধর্মী গানও করেছেন। যা আগের অ্যালবাম দুটিতে ছিল না। এর কারণ কী? অর্ণবের সরল উত্তর “আসলে গানের কথাই ডিমান্ড করেছে সুরটি হবে হার্ডরক ধর্মী।’

অর্ণব বলেন, “মানুষের দেখা আশেপাশের পরিবেশই তার গানে ফুটে ওঠে। একসময় শান্তিনিকেতনে ছিলাম। এখন ঢাকায় থাকছি। গত কয়েক বছরে ঢাকার জীবনযাপন আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছে। শান্তিনিকেতনের যে কঠিন শৃঙ্খলা ছিল, তার ঠিক বিপরীত জীবন পেয়েছি আমি ঢাকায়। সেসব প্রভাব পাওয়া যাবে ‘ডুব’ অ্যালবামটিতে।”

অর্ণবের মতে, এখনকার সঙ্গীত অনেকটা প্লাস্টিকের মত হয়ে গেছে। ইচ্ছা করলেই কম্পিউটার ইফেক্ট দিয়ে নানান ধরণের সঙ্গীত যন্ত্রের টিউন ব্যবহার করে ‘অসাধারণ শিল্পী’ তৈরি করে ফেলা যায়। তবে সেই শিল্পী যখন মঞ্চে ওঠেন গান করতে তখন ধরা পড়ে তার গলার খুঁত।

অর্ণব বিশ্বাস করেন গানের জন্য শত সঙ্গীতযন্ত্রের টিউন আর কম্পিউটার ইফেক্টের প্রয়োজন নেই, শুধু গিটার বাজিয়েও গান করা যায়। ‘ডুব’ অ্যালবামে তিনি শুধু অ্যাকুয়েস্টিক গিটার বাজিয়েও গান করেছেন। অর্ণবের কথায়, “আমি কতটা সুরে গাইতে পারি সেটা বোঝার জন্যেই আসলে এটা করা।”

রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়েও গবেষণা করতেও ছাড়েননি অর্ণব। সমালোচকদের গরম চোখ উপেক্ষা করেই চার/পাঁচ মিনিটের একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাপ্তিকাল দাঁড় করিয়েছেন এগারো মিনিটে। অর্ণবের ভাষায়, “আমার বিশ্বাস রবীন্দ্র সঙ্গীত বোদ্ধারা ভালোভাবেই দেখবেন বিষয়টা। শান্তিনিকেতনে যারা শুনেছেন তারা ভালো বলেছেন।”

অর্ণবের গীতিকার সাহানা ছাড়াও এবার ‘ডুব’ অ্যালবামে গান লিখেছেন আনিসুল হক, টোকন ঠাকুর, শতরূপা, ফারিহা, রাজীব আশরাফ।

আমার হারিয়ে যাওয়া

ornob_vitorer_page.jpgঅর্ণবের হারিয়ে যেতে খুব ভালো লাগে। তাইতো সবসময় তক্কে তক্কে থাকেন কবে হারিয়ে যেতে পারবেন। প্রতিবার হারানো থেকে ফিরে আসার সময় নিজেকে নতুন ভাবে খুঁজে পান অর্ণব। তার কথায়, “আমি নিজেকে কোন টাইপে বাঁধতে চাইনা, যদি কোনদিন দেখেন অর্ণব কোন একটি নির্দিষ্ট ফর্মে আটকে পড়েছে সেদিন ভাববেন আমার জারিজুরি শেষ। তবে আমি চাইনা ছকের মাঝে পড়তে। নিজেকে ভেঙ্গে আবার গড়ে ফিরে আসি প্রতিবার। ডুব দিতে আমার তাই খুব ভালোলাগে। হয়তো এরই মধ্যে ডুব দেব।”

তাই নাকি! তো কোথায় ডুব দেবেন? অর্ণবের সরল উত্তর, “সেটা বলা যাবে না, তবে ফিরে আসবো অন্য রূপে।”
অন্যরূপ? সেটা আবার কী? মুচকি হেসে অর্ণব বলেন,“ছবি বানানোর ইচ্ছে আছে, এই বিষয়ে কোর্স করতে চলে যাব ভারতে। তাই বলছিলাম ‘ডুব’ দিতে পারি খুব শিগগিরই।”

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/ওমর শরীফ/এমআইআর/এপ্রিল ২৭
| More
Page: 1