Friday,13 April,2012

বাংলা বর্ষপঞ্জির জন্ম

বাংলা বর্ষপঞ্জির জন্ম

লেখক: মো. সফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশ ও ভারতে বিজ্ঞানভিত্তিক বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের সূচনা ঘটে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান-ভিত্তিক সন ও তারিখ গণনার লক্ষে ভারতের বিখ্যাত জ্যোতি-পদার্থ বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা প্রচলিত প্রাচীন জ্যোতির্বিদা-ভিত্তিক প্রণীত বিভিন্ন বর্ষপঞ্জির আমূল সংস্কার করেন ১৯৫২ সালে।

তাঁর সুপারিশের ভিত্তিতে ভারতে শকাব্দভিত্তিক বর্ষপঞ্জি-সহ কিছু কিছু বর্ষপঞ্জির সংস্কার সাধিত হয়। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫৭ সালে ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বাধীন বর্ষপঞ্জির সংস্কার কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করেন। তখন পশ্চিম বঙ্গের সরকারও বাংলা বর্ষপঞ্জির কিছু সংস্কার করেন। তবে, এই ক্ষেত্রে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেন ভারতের সনাতনপন্থী পঞ্জিকাকারগণ। তাঁরা ড. সাহার সংস্কার গ্রহণ করেননি এবং প্রাচীন পদ্ধতিতেই পঞ্জিকা প্রণয়ন অব্যাহত রাখেন। ড. মেঘনাদ সাহা কর্তৃক বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের পণ্ডিত ও সুধী মহলেও।


বলা যায়, ড. সাহার সুপারিশকে সামনে রেখেই বাংলাদেশে ১৯৬২-১৯৬৩ সালে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলা একাডেমী। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমী ‘ বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার ’ নামে একটি কমিটি করে দেয়। এই কমিটির সভাপতি করা হয় বিশিষ্ট ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে। এই কমিটি ১৯৬৩ সালের ১৩ জুন প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৩৭১ বাংলা সন থেকে (১৯৬৪, ১৮ এপ্রিল) তাঁদের সুপারিশ কার্যকর করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কমিটির সুপারিশগুলো ছিল —‘ (১) বর্তমান বাংলা মাসের তারিখ গণনা অত্যন্ত দুষ্কর বিধায় ১৩৭১ সনের বৈশাখ হইতে প্রতিবছর ভাদ্রমাস পর্যন্ত ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিন গণনা করা হউক। (২) যেহেতু ১৩৬৯ অধিবর্ষ (লিপ ইয়ার) গণনা করা হইয়াছে ওই বর্ষ হইতে প্রতি ৪র্থ বত্সরে ১ দিন বৃদ্ধি পাইয়া চৈত্রমাস ৩১ দিনে গণনা করা হউক। ’ এর পরে শহীদুল্লাহর কমিটির গৃহীত ১৩৬৯ সনকে অধিবর্ষ গণনার সিদ্ধান্ত নিয়ে পণ্ডিত মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।


কারণ, ১৯৬২ বা ১৯৬৩ কোনো সালে-ই লিপ ইয়ার নয়, বাংলা ১৩৬৯ সনও ৪ দ্বারা বিভাজ্য নয়। উল্লেখ্য যে, ১৩৬৯ বাংলা সনের প্রাতিষঙ্গিক ইংরেজি বর্ষ হবে নিম্নরূপ : ১ বৈশাখ — ১৭ পৌষ (১৩৬৯) : ১৩৬৯ + ৫৯৩ = ১৯৬২ (১৪ এপ্রিল — ৩১ ডিসেম্বর) এবং ১৮ পৌষ — ৩০ চৈত্র (১৩৬৯) : ১৩৬৯ + ৫৯৪ = ১৯৬৩। এই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ সরকারি নথিতে বাংলা ভাষায় নোট লেখা চালু করেন। একই সাথে তিনি বাংলায় স্বাক্ষর করা এবং বাংলা সন অনুযায়ী তারিখ প্রথা চালু করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করেন। ১৯৭৪ সালে ২৮ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধিবেশন বাংলায় ভাষণ দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে মহিমান্বিত করেন এবং গৌরবময় বাঙ্গালি সভ্যতা-সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন।


অবশেষে, সরকারি সকল কাজ-কর্মে ও নথি-পত্রে খ্রিস্টীয় সন-তারিখের পাশাপাশি বাংলা সন-তারিখ লেখার সুস্পষ্ট সরকারি আদেশ জারি করা হয় ১৯৮৭ সালে। তখন বাংলাদেশ সরকার শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে এবং সরকারিভাবে বাংলা পঞ্জিকা (ক্যালেন্ডার) তৈরি ও প্রকাশের নির্দেশ জারি করে। এর কয়েক বছর পর লিপ ইয়ার সংক্রান্ত শহীদুল্লাহ কমিটির কিছু অস্পষ্টতা ও সংশ্লিষ্ট অন্য জটিলতা নিরসনের জন্য বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে গঠন করা হয় ‘বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কার কমিটি’। এই কমিটির বাস্তবায়নযোগ্য কিছু সুপারিশ করে, যা বাংলা একাডেমীর ১৪০১ সনের ২৮ ভাদ্র (১৯৯৪, ১২ সেপ্টেস্বর) তারিখে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিষদে অনুমোদন লাভ করে। কার্যনির্বাহী পরিষদের সিদ্ধান্তগুলো ছিল—“আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বাংলা মাস ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রাম বাংলার মানুষের সম্পৃক্ততার কথা স্মরণে রেখে এবং বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের জন্য শহীদুল্লাহ কমিটির কাছ থেকে বাংলা একাডেমী কর্তৃকপ্রাপ্ত প্রস্তাবসমূহ পর্যালোচনা করে কমিটি বর্তমানে প্রচলিত বর্ষপঞ্জির নিন্মরূপ সংস্কার সুপারিশ করছে। প্রথম ধাপে বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ :(১) সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিন গণনা করা হবে; (২) গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষ গণ্য করা হবে; এবং (৩) অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করা হবে।” এছাড়া কমিটি অতি গুরুত্ববহ আরেকটি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—১ বৈশাখকে প্রতিষঙ্গিক গ্রেগরীয় বছরে ১৪ এপ্রিলকে বাংলা সনের ১ম দিন হিসেবে ধার্য করে। এই গণনা পদ্ধতির কারণে বাংলা ও খ্রিস্ট্রিয় সন-তারিখের মধ্যে প্রাতিষঙ্গিকতা স্থাপিত হয়েছে। তবে, বাংলা মাসের ১ম দিন এবং গ্রেগরীয় মাসের ১ম দিনের মধ্যে দু সপ্তাহের ব্যবধান থাকায় ফাল্গুন মাসের ১৭ তারিখ থেকে ফাল্গুন মাসের শেষ তারিখ পর্যন্ত বাংলা ও খ্রিস্ট্রিয় তারিখের মধ্যে স্থায়ী প্রতিরূপ সম্পর্ক থাকবে না। যে বছর অধিবর্ষ নয়, সে বছরের ১৬ ফাল্গুনের প্রাতিষঙ্গিক তারিখ হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং ১৭ ফাল্গুনের প্রতিষঙ্গ খ্রিস্ট্রিয় তারিখ হবে ১ মার্চ। কিন্তু অধিবর্ষে ১৭ ফাল্গুন হবে খ্রিস্ট্রিয় ২৯ ফেব্রুয়ারি।


১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে তত্কালীন সরকার বাংলাদেশে নতুন এই রীতিতে পঞ্জিকা (ক্যালেন্ডার) প্রকাশ করতে শুরু করে। তবে, ওই সময়েই খোদ শহীদুল্লাহ’র কমিটির দু’একজন সদস্য লিপ ইয়ার গণনা পদ্ধতি নিয়ে একমত হতে পারেন নি। তাঁরা ৮ ফাল্গুকে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রাতিষঙ্গ এবং ১ বৈশাখকে ১৫ এপ্রিল ধরার পক্ষে মত দেন। ধারণা করা সঙ্গত যে, ভিন্নমত পোষণকারী সদস্যদের মধ্যে হয়তো বায়ান্ন’র মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রবলভাবে কাজ করছিল, কারণ মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দেয়ার বায়ান্ন’র সেই ২১ ফেব্রুয়ারির অগ্নিঝরা দিনটি ছিল বাংলা মাসের ৮ ফাল্গুন। তাঁরা হয়তো চেয়েছিলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ ও ‘৮ ফাল্গুন’—এই স্মারক দিনটি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে প্রতি বছর একসত্তায় হাজির হোক। পরবতীতে বাংলা পঞ্জিকা নিয়ে আরও কিছু জটিলতা দৃশ্যমান হয়। বিদ্যমান সমস্য দূরীকরণের জন্য ১৪০২ বঙ্গাব্দের ২১ শ্রাবণ (১৯৯৫, ২৬ জুলাই) বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে আহবায়ক করে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়। এরপর একই বছরের ২৯ শ্রাবণ ও ৪ ভাদ্র তারিখে দুইটি সভায় মিলিত হয়ে টাস্কফোর্সের সদস্যরা নিন্মবর্ণিত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে— (১)বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের বর্ষপঞ্জিকা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে এটি কার্যকর করা। (২) তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে রাত ১২টায়। (৩) পূর্বে গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী (বাংলা একাডেমীর ১৯৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের সভায় গৃহিত) প্রতি বছর নববর্ষারম্ভ অর্থাত্ পহেলা বৈশাখ হবে ১৪ এপ্রিল। এরপর টার্সফোর্স পঞ্জিকা সংস্কার বিষয়ে পূর্বের গৃহিত সিদ্ধান্তসহ কয়েকটি সুপারিশ করছে :“(ক) সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাসে ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিনে গণনা করা হবে (এই সুপারিশ শহীদুল্লাহ কমিটির ১নং সুপারিশের সাথে অভিন্ন); গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষ যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষ রূপে গণ্য করা হবে; ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে এটি কার্যকর হবে এবং তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী রাত ১২.০০টায়।”


মনে রাখতে হবে যে, বিশেষত আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদমিনার বা শহীদবেদীতে শহীদদের স্মরণে রাত ১২.০১ মিনিটে দিবসের সূচনা সময়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টিয় নববর্ষ বরণের সূচনাও ঘটে রাত ১২.০১ মিনিটে। মোটামুটিভাবে উল্লেখিত সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলা একাডেমী প্রণীত বাংলা পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার বর্তমানে সারা বাংলাদেশে অনুসৃত হয়ে আসছে।

রঙিন ঘুড়ি এর অন্যান্য খবর

সম্পাদকীয়

editor

‘ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/রসের আবেশ রাশি শুষ্ক করি দাও আসি,আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ/ মায়ার ... বিস্তারিত »