স্বজন-পরিজন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের ধারাবাহিকতা নির্ভর করছে পরিবার-পরিজনের সম্পর্কের মাঝে। একটা সময় ছিল যখন কেউ কল্পনাতেও আমাদেরকে আনতে পারেনি। তারপর পিতামাতার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে আমরা এখন। ঠিত তেমনিভাবে আমাদের মাধ্যমে আমাদের সন্তানগণ। এছাড়াও রক্তের সম্পর্কের বাইরে কিছু প্রিয়জন এসে নিজেদের সম্পর্ককে জুড়ে নেয় আমাদের সাথে। সব মিলিয়ে একটা ভালবাসার সুপরিকল্পিত বন্ধনের মাঝে আমাদের বেঁচে থাকা এবং ধারাবিহকতা চলে আসছে এই পৃথিবীতে।

পার্থিব নানা প্রয়োজনে যেমন পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য আমরা ক্ষুদ্র থেকে জীবন পর্যন্ত বাজি রাখতে দ্বিধা করি না। ঠিক তেমনি আমাদের আখেরাতের জন্যেও তদ্রূপ প্রচেষ্টা থাকা উচিত। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

।[سورة التحريم: ৬]

“মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।”

[সূরা আত্-তাহরীম: ৬]

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথা আখেরাতের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে হাজারো-লাখো বাধা ডিঙ্গিয়ে চলা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনটা এরূপ যে, ধরুন আপনি প্রবাসে আছেন, আয়-রোযগার করছেন, দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কিন্তু প্রবাস এবং দেশকে আপনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন না। উভয়টাকে একই অবস্থা মনে করছেন। পার্থক্য শুধু স্থান এবং কালের।

এবার আসুন যদি আমরা দুনিয়া এবং আখেরাতকে একই অবস্থার দু’টো ভিন্ন স্থান মনে করি এভাবে যে, এখন দুনিয়ায় আছি, অর্থাৎ প্রবাসে আছি। কিছুদিন পর ফাইনাল এক্সিটে দেশে ফিরবো। ঠিক যেমন ‘ইন্তেকাল’-এর পর আখেরাতে ফিরবো। ‘ইন্তেকাল’ শব্দটির সরল অর্থ হচ্ছে স্থান পরিবর্তন। আরব দেশগুলোতে যদি কেউ তার দোকান এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়, তাহলে পুরোনো জায়গায় একটা বোর্ড বা কাগজ লাগিয়ে দেয় যাতে লেখা থাকে ”এ দোকানটি বা অমুক নামের দোকান ইন্তেকাল হয়েছে অমুক জায়গায়’। বুঝাতে চাচ্ছি আখেরাতকে যদি একেবারেই নিকটে, চোখের সামনে নিয়ে আসতে পারি এবং নিজেই ক্যালকুলেটরের নিজের বিশ্বাসের, সৎকর্মের, অসৎকর্মের হিসাব-নিকাষ করে দেখতে থাকি, তাহলে হয়ত আমাদের জীবনধারাকে আরো গুছিয়ে নিতে পারবো। এ গোছানো আমাদের স্বদেশ আখেরাতে কাজে লাগবে।

প্রসঙ্গ ছিল নিজের সাথে সাথে স্বজনদেরকেও আগুন থেকে রক্ষার প্রচেষ্টা বিষয়ক। কিন্তু কিভাবে তা সহজে সম্ভব করতে পারি?

এ প্রশ্ন হয়ত অনেকেই নিজের কাছে নিজে বহুবার করেছেন। এ প্রসঙ্গে বলবো যে, যদি আপনি মনে করেন যে, ইসলামের যে মূল দু’টি উৎস- কুরআন এবং সহীহ্ সুন্নাহ্; এ থেকে প্রতিদিন কিছু কিছু জ্ঞান আরোহন করা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। তাহলে আজই বাসায় গিয়ে পরিবার পরিজনকে ডাকুন। একত্র করে বলুন যে, আমরা তো প্রতিদিনই অবসর পাই আর এ অবসরের একটা সময় মোটামুটি এমন ভাবে পাই যখন সবাই কিংবা পরিবারের অধিকাংশ সদস্য একত্র হওয়ার সুযোগ পাই। আসুন এই একত্রিত আড্ডা থেকে মাত্র দশ/পনর মিনিট সময় ব্যয় করি নিজেদের মুসলমানিত্ব রক্ষার জন্য, নিজেদের দুনিয়ার জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানোর জন্য এবং নিজেদের আখেরাতের অনন্ত জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য।

হাঁ, আপনার কথা শুনে হয়ত সাত জন সদস্যের মধ্যে তিনজনই আপনাকে তিরস্কার করবে, হয়ত দু’জন নিরব থাকবে; অন্ততঃ দু’একজন তো অবশ্যই পাবেন যারা আপনার সাথে হাঁ বলবে। অথবা যদি একজনও পান, তাকে নিয়ে বসে পড়ুন। তাছাড়া আপনার অধীনস্থ যারা তাদেরকে আপনিই পরিচালিত করেন, ভয়ে হোক, লজ্জায় হোক কিংবা আনুগত্যের কারণে হোক; তারা আপনার সঙ্গ দিবে।

এমন কোন তাফসীর খুঁজে নিন; যার পড়ার পর সমকালীন সমস্যাগুলোর সমাধান দিবালোকের মত দেখতে পাবে কুরআনের পাতায় পাতায়। তারপর মহাগ্রন্থ আলকুরআন থেকে মাত্র দু’তিন আয়াত তিলাওয়াত করুন, অর্থ পড়ুন, ব্যাখ্যা পড়ুন। ছ’টি হাদীস গ্রন্থ থেকে যেকোন একটি চয়ন করুন অথবা রিয়াদ্বুস্ সালেহীনের মত বাছাইকৃত কোন হাদীস গ্রন্থ নিন এবং প্রতিদিন একটি বা দু’টি হাদীস পড়ুন। কুরআন-হাদীসের আলোকে লেখা একটি ইসলামী বই নির্বাচন করে প্রতিদিন দু’তিন পৃষ্ঠা পড়ুন। কিছু অংশ আপনি পড়ুন, কিছু অংশ উপস্থিত যাদের পাবেন তাদেরকে দিয়ে পড়িয়ে সবাই শুনুন। উচ্চস্বরে পড়ুন যাতে যারা অংশ নেয়নি, তারাও শুনতে পায়। হয়ত এর মাধ্যমে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ হেদায়াতের আলো জ্বালিয়ে দিবেন। কুরআনের তাফসীরের একটি টীকা পড়ে, একটি হাদীস পড়ার পর এবং ইসলামী বইটির একটি অংশ পড়ার পর প্রশ্ন করুন কে তা থেকে কি বুঝলো। প্রাণখুলে নিঃসঙ্কোচে আলোচনা করুন। আড্ডার প্রাণবন্ততা নিয়ে আসুন। সুযোগ বুঝে হাসুন, ভীতিকর স্থানে ভীত হোন, আনন্দের সংবাদে আনন্দিত হোন। এভাবেই টিভি দেখার আড্ডা কিংবা অন্যান্য সাধারণ আড্ডার চেয়ে আরো বেশী আকর্ষণীয় করে তুলুন পারিবারিক পাঠ-আড্ডার এ অনুষ্ঠানকে।

আশা করতে পারি, যদি আমরা আমাদের প্রতিটি পরিবারে প্রতিদিন খুব সামান্য হলেও যদি আল্লাহর দ্বীনের দুই মহান উৎস কুরআন ও সহীহ্ সুন্নাহ থেকে কিছু কিছু আলো নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারি, তবে একদিন একটি পরিবারের আলোয় পুরো গ্রাম, সমস্ত মহল্লা আলোকিত হয়ে উঠবে। আসুন কাজে লেগে যাই। নিজে আগুন থেকে বাঁচার সাধনা করি এবং পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চালাই।