শিরোনাম : সাত মার্চের আগেও বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কথা বলেছেন চট্টগ্রামে এবার ১৪৮ ইউপিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি ।। চলছে প্রাথী মনোনয়ন প্রক্রিয়া ফিরিঙ্গিবাজারের ডবল মার্ডার ।। পরকীয়া, নাকি অন্যকিছু? চকরিয়া-লামায় দুই খুন ।। কলেজ ছাত্রকে কুপিয়ে ও বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা Stop button Start button

 

  ফেইসবুকে ভক্ত হোন টুইটারে ভক্ত হোন গুগল প্লাস এ ভক্ত হোন। সাহায্য বিজ্ঞাপন শুল্ক পাঠক প্রতিক্রিয়া রেজিস্ট্রেশন

 

১৭ আগস্ট রোববার ২০১৪ খ্রিঃ ২ ভাদ্র ১৪২১ সাল ২০ শাওয়াল ১৪৩৫ হিজরি
চট্রগ্রাম
তাপমাত্রা : ২৬� সে. | আর্দ্রতা : ৮৬%

আজকে অনলাইন জরিপের জন্য কোন প্রশ্ন সংরক্ষিত নেই।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা : এখনো আগের মতোই

কাশেম শাহ

সাত বছরের রাফসানের শখ ঘুরে বেড়ানো। দাদা বাড়ি-নানা বাড়ি দুটো চট্টগ্রামের বাইরে হওয়াতে তার যাওয়ার জায়গা সীমিত। তবে চাকুরিজীবী বাবা-মা সুযোগ পেলেই রাফসানকে নিয়ে ঘুরতে চলে যান দূরে অথবা কাছে কোথাও। চট্টগ্রাম শহরে খুব বেশি ঘুরতে যাওয়ার মত জায়গা নেই বললেই চলে। যে কয়টি আছে তার সবকটির অবস্থাও খুব ভালো নয়। আবার কোন কোনটি এত বেশি কমার্শিয়াল আর এক্সপেনসিভ যে, সেখানে সবসময় সবার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না।

রাফসানের বাবা ইপিজেডের একটি পোশাক তৈরি কারখানার কর্মকর্তা মাজিদুল ইসলামের অন্যতম পছন্দের জায়গা চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। তিনি মনে করেন, এখানে শুধু বেড়ানোই হয় না, ছেলে-মেয়েরা কিছু জানতে ও শিখতে পারে। আর একবার চিড়িয়াখানায় আনলে সেখানে থাকা বিভিন্ন পশু পাখির গল্প শুনিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় আরো অনেকদিন। তবে বাঘসহ অনেক প্রাণী না থাকায় তার ক্ষোভও আছে যথেষ্ট। মাজিদুলের চেয়েও বেশি ক্ষোভ অবশ্য তার স্ত্রী তামান্নার। তিনি বলেন, বাচ্চারা টেলিভিশনে নানা জীব-জন্তু দেখে সেগুলো দেখতে চায়। তার অধিকাংশই অবশ্য আমাদের দেশের প্রাণী নয়। তবু দেশেও অনেক রকমের প্রাণী আছে যেগুলোর সাথে বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় সেরকমও কিছু নেই। যে কয়টি আছে তা গত কয়েকবছর ধরে দেখে আসছি।

বিভিন্ন সামাজিক উৎসব ও ছুটির দিনে বন্দরনগরীর শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম স্থান চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। কিন্তু আকর্ষণের অভাবে দর্শনার্থীর সংখ্যাও দিন দিন কমছে। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, শিশুদের নিয়ে চিড়িয়াখানায় আসার পর বাঘ দেখতে না পেলে মন খারাপ করে তারা। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধানে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

নগরীর উত্তর-পূর্বদিকে মূল শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে পাহাড়তলী ইউএসটিসি হাসপাতাল। এর বিপরীতে পাহাড়ের পাদদেশে ছয় একর ভূমির ওপর এ চিড়িয়াখানার অবস্থান। এর পাশাপাশি রয়েছে নয়নাভিরাম বিনোদনকেন্দ্র ফয়’স লেক। শুরুতে এক টিকিটেই চিড়িয়াখানা ও ফয়’স লেকে প্রবেশ করা যেত। তবে ১৯৯৫ সালে দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও বাড়তি লাভের বিষয়টি বিবেচনা করে দুটি আলাদা গেটে পৃথক টিকিটে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৮৯ সালে চিড়িয়াখানা উদ্বোধনের পর টিকিটের মূল্য ছিল ১ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে করা হয় ২ টাকা। পরে পশু-পাখির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে টিকিটের দামও। এখন প্রতি টিকিটের দাম ২০ টাকা।

জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় ৬৭ প্রজাতির ৩৭০টি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ প্রজাতির পাখি ও ৩৩ প্রজাতির প্রাণী। চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখা যায়, দুটি সিংহী, একটি ভালুক, ১৮টি বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, ছোট বড় ৩৪টি কুমির, ১১টি অজগর, তিনটি চিতা বিড়াল, মেছো বিড়াল, কাছিম, বানর ও বাঘডাস রয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। এছাড়া ধনেশ, টিয়া, ময়না, বক, হাঁস, চিলসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি রয়েছে।

১৮টি হরিণের মধ্যে রয়েছে একটি প্যারা, চারটি মায়া, চারটি সম্বর ও নয়টি চিত্রা হরিণ। বানর প্রজাতির মধ্যে রয়েছে হনুমান, রেসাস ও ঊল্টা লেজি। অনেকদিন ধরে চিড়িয়াখানায় বাঘ নেই। বাঘের খাঁচায় এখন রাখা হয়েছে হাঁস। ক্যান্সারে ভুগে ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর মারা যায় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার শেষ বাঘ ‘পূর্ণিমা’। তার সঙ্গী ‘চন্দ্র’ মারা যায় ২০০৬ সালে। চিড়িয়াখানায় থাকা সিংহী দুটির একটির নাম বর্ষা, অন্যটির নাম নোভা। ২০০৫ সালের ১৬ জুন এ চিড়িয়াখানাতেই তাদের জন্ম। তাদের জন্মের কিছু দিন পর তাদের মা ‘লক্ষী’ এবং ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তাদের বাবা ‘রাজ’ মারা যায়। চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখা যায় ৩৭টি খাঁচার মধ্যে অনেকগুলোই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। হনুমানগুলোও অনেক সময় খাঁচা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থীদের অনাবিল আনন্দের জন্য এখানে ৬৭ প্রজাতির মোট ৩৬৫টি প্রাণী রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বহু বিচিত্র প্রাণীর আবাসস্থল চট্টগ্রাম। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে ছিল হরেক প্রজাতির প্রাণী। কিন্তু এরপরও চট্টগ্রামের এ চিড়িয়াখানায় নেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হাতি, জিরাফ, গণ্ডার, কাকাতুয়া কিংবা জলহস্তী। দুটি সিংহী থাকলেও নেই কোনো সিংহ। প্যারাহরিণ থাকলেও নেই হরিণী, ভল্লুক থাকলেও নেই ভল্লুকী। থাকার মধ্যে শুধু আছে অজগর, গেছোবাঘ, মেছোবাঘ, চিত্রল হরিণ, সংকর হরিণ, হনুমান, বানর, কাঠবিড়ালী, খরগোশ, কুমির, শিয়াল, ধনেশ পাখি।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার অন্যতম সমস্যা স্থান সংকট। পশু-পাখি সুরক্ষায় যেখানে এক শেড থেকে অন্য শেডের দূরত্ব ৫০ ফুট রাখা প্রয়োজন, সেখানে কোনো কোনো শেডের দূরত্ব মাত্র ৪/৫ হাত! স্থানাভাবে একই শেডে রাখা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। এতে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে সংক্রমিত হচ্ছে। আবার খাবার দেওয়ার সময় এক প্রাণীর খাদ্য নষ্ট করে ফেলছে অন্য প্রাণী।

চিড়িয়াখানায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন, যাদের অনেকেই জানেন না কোনটি কোন প্রাণী। এজন্য প্রতিটি প্রাণীর খাঁচার সামনে বোর্ডে তুলে ধরা হয় এর পরিচিতি। অথচ চিড়িয়াখানায় কয়েকটি খাঁচার সামনে কোনো বোর্ড নেই। এ কারণে দর্শনার্থীরা প্রাণীর পরিচিতি না পেয়ে ছুটে যান উপস্থিত কেয়ারটেকারের কাছে।

চিড়িয়াখানার পশু-পাখির চিকিৎসার জন্য অসংখ্য যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হলেও অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতিই এখানে নেই। অসুস্থ প্রাণীকে চেকআপ করতে তাকে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করতে হয়। এজন্য প্রয়োজন ট্রাঙ্কুলাইজিং গান। এটি না থাকায় পুরনো পদ্ধতিতে ব্লু পাইপ দিয়ে এ কাজ কোনোভাবে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

শব্দদূষণ, প্রতিকূল পরিবেশসহ নানা কারণে চিড়িয়াখানার অসংখ্য প্রাণী মারা গেছে। ইতিমধ্যে বাঘ, হরিণ, বানর, হাঁস, সিংহ, ভল্লুুকসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী মারা গেলেও সেগুলো আর সংগ্রহ করা হয়নি। এ কারণে দর্শনার্থীরাও দিন দিন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চিড়িয়াখানা থেকে। প্রবেশ কাউন্টারে কর্মরত বুকিং ক্লার্ক জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় সবচেয়ে কম টিকিট বিক্রি হয় বর্ষাকালে। আর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় শীতকালে। এছাড়া ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন সরকারি ছুটিতে লোকসমাগম বেশি থাকে।

নতুন কোনো প্রাণী না আনায় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় টিকিট বিক্রি বাড়ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, গত কয়েক বছরে এখানে বিরল প্রজাতির নতুন কোনো প্রাণীই যুক্ত হয়নি। এমনকি প্রতিকূল পরিবেশের কারণে যেসব প্রাণী মারা গেছে, সেই শূন্যস্থানও পূরণ করা হয়নি। বিরল প্রজাতির প্রাণী দূরে থাক জিরাফ, হাতি কিংবা জলহস্তীর মতো প্রাণীও যুক্ত করা যায়নি এখানে। অথচ এসব প্রাণী আনা হলে এখানে দর্শক সমাগম যেমন বাড়ত, তেমনি বাড়ত আয়ও।

তারা আরও জানান, দর্শনার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে একই প্রজাতির প্রাণী দেখতে দেখতে চিড়িয়াখানার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছেন। অনেক খাঁচায় পুরুষ পশু থাকলেও নেই স্ত্রী পশু। আবার কয়েকটি খাঁচায় স্ত্রী পশু থাকলেও নেই পুরুষ পশু। এতে দর্শকবঞ্চনা ছাড়াও ব্যাহত হচ্ছে প্রজনন।

চিড়িয়াখান দেখতে আসা মানবাধিকার কর্মী আবদুর রাজ্জাক বললেন, জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ জোগানদার চট্টগ্রাম হলেও এর উন্নয়নে কোনো সরকারেরই যথাযথ উদ্যোগ ছিল না। চিড়িয়াখানার ক্ষেত্রেও এমন মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে। পশুপাখির খাদ্য সংরক্ষণে এখানে সুব্যবস্থা নেই। স্টোররুম নামে একটি কক্ষ থাকলেও সেটি বিভিন্ন ভাঙা, বাতিল জিনিসপত্র ও ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ। এ অবস্থায় বড় বড় খাঁচার পাশে খাবার রাখা হয়। এতে ঝড়-বৃষ্টিতে খাবার ভিজে গেলে তা আর পশুকে খাওয়ানো সম্ভব হয় না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাবমতে, প্রতিদিন গড়ে ১২শ’ থেকে ১৫শ’ দর্শক চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসেন। অথচ তাদের জন্য তেমন কোনো বিশ্রামাগার নেই। এজন্য ঝড়-বৃষ্টি ও তীব্র রোদে দর্শনার্থীদের ভীষণ সমস্যায় পড়তে হয়। বসার জন্য স্বল্প পরিসরে যে ব্যবস্থা আছে তা অপ্রতুল। চিড়িয়াখানার আয়তন কম হওয়ায় আড়াআড়িভাবে নির্মিত শেডগুলোর প্রতি শেডের মাঝখানে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই দর্শনার্থীরা একটু দূরে গিয়ে বসে দেখার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন না। খাঁচার পাশে দুর্গন্ধের মধ্যেই তাদের বিশ্রাম নিতে হয়।

পাঠকের মন্তব্য [০]   |    [৩৭৭] বার পঠিত

মন্তব্য প্রদানের জন্য( সাইনইন) করুন । নতুন ইউজার হলে (নিবন্ধন ) করুন ।