ইসলাম ও সৎকাজ (পর্ব-৩)

Print
Category: প্রবন্ধ নিবন্ধ
Published Date Written by মোঃ ইকবাল হোসেন
(আগষ্ট ২০১২ - ১২তম সংখ্যার পর...)
ঈমান
ঈমান আরবী শব্দ। এর অর্থ হলো বিশ্বাস বুখারী ও মুসলিম শরীফের কিতাবুল ঈমান অধ্যায়ে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের অংশ বিশেষে বলা হয়েছে-
“পুনরায় তিনি (আগুন্তক ব্যক্তি যিনি জিব্রাঈল (আ) ) বললেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসূল (স) বললেন, (ঈমান এই যে) আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, আখেরাতের দিনের প্রতি এবং তাকদীরের ভাল মন্দের প্রতি তোমার বিশ্বাস আনা”। (বুখারী ও মুসলিম)
আবার ঈমানে মুফাস্সাল তথা বিস্তারিত ঈমান ৭টি বিষয়ের দৃঢ় বিশ্বাসকে ঈমান বলে অভিহিত করা হয়-
“আমি ঈমান আনলাম আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, শেষদিন (পরকাল), তাকদীরের ভালমন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয় এবং মৃত্যুরপর পুনরুজ্জীবন এর প্রতি”।
পবিত্র কোআনে সূরা বাকারাহ ২৮৫ নং আয়াতে ঈমানের বিষয়ে বলা হচ্ছে-
“বিশ্বাস রাখেন রাসূল ও তার প্রতি নাযিল করা হয়েছে তার রবের পক্ষ থেকে আর মু’মিনগণ ও সকলেই বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেস্তার প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি”। (সূরা বাকারা-২৮৫)
উল্লেখিত হাদীস ও আয়াতসমূহ লক্ষ্য করলে দেখা যায় ঈমানের প্রধান বিষয় মূলত তিনটি।
এক. তাওহীদ যার মধ্যে শামিল রয়েছে আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও তাকদীর।
দুই. রিসালাত যার মধ্যে রয়েছে রাসূলগণ ও কিতাবসমূহ।
তিন. আখিরাত যার মধ্যে রয়েছে শেষদিন বা বিচার দিবস এবং মৃত্যুরপর পুনরুজ্জীবন।
মোট কথা ঈমান আনার বিষয়সমূহ হচ্ছে ইসলামের মূল তিনটি বৈশিষ্ট্য তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত। আমরা শুরুতেই এ তিনটি বিষয়ের ব্যাপারে আলোচনা করেছি। বিশ্বাসের প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিত তা দেখার চেষ্টা করব এবার।
“একজন ক্ষমতাধর রাষ্টের প্রধান তার দেশের একজন ক্ষুদ্র অঞ্চলের সরদারকে এ বার্তা পাঠালো যে, ‘আমি দেশের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। আমাকে রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে মেনে নাও নইলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে’।
এ ফরমান শোনার পর ঐ সরদার বার্তা পাঠাল যে, ‘আমি আপনাকে মেনে নিলাম’। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল সরদার রাষ্ট্র প্রধানের কোন আদেশ পালন করে না বরং সারাক্ষণ তার বিরোধী কাজেই লিপ্ত থাকে।
এ অবস্থা অবলোকন করার পর রাষ্ট্র প্রধান কি এ কথা মনে করতে পারে যে, ঐ সরদার সত্য বলেছিল? শুধু মাত্র মৌখিক স্বীকারোক্তি কি সরদারকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে?
সুতরাং বিশ্বাসের সাথে কর্মের সম্পর্ক নিবিড়। মানুষ যা বিশ্বাস করে কর্মে তারই প্রতিফল দেখা যায়। যেমন-
“আমি একদিন আমার ছোট বোনকে (সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে) প্রশ্ন করলাম, বলত দুই আর তিন যোগ করলে কত হয়?
সে বলল, পাঁচ হয়।
আমি বললাম, হয়নি, ভুল হয়েছে।
সে অবাক হলো এবং বলল, ভুল কোথায় পাঁচই তো হয়।
আমি বললাম, পাঁচ না ছয় হয়।
সে আমার কথা কিছুতেই মেনে নিবে না। আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া আমার বোনকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে দুই আর তিন যোগ করলে ছয় হয়। কেননা তার বিশ্বাস হয়ে গেছে যে দুই আর তিন যোগে পাঁচ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না”।
বিশ্বাসটা এরকম যা কোন ঠুনকো ধারনা বা শোনা কথা নয়। মানুষ তার কাজে কর্মে তার বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে পূর্ণ ভাবে।
অধ্যাপক গোলাম আযম লিখেছেন-
“যে রকম বিশ্বাস হয় সে অনুযায়ীই কর্ম হয়। কর্মের পেছনে অবশ্যই বিশ্বাস রয়েছে। বিশ্বাস ছাড়া কর্ম হতে পারে না। বিশ্বাসের বিপরীত ও কর্ম হয় না। বিশ্বাস ও কর্ম একেবারেই ঘনিষ্ঠ”।
সুতরাং একথা বলার আর কোন অবকাশ থাকে না যে, কেউ আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী কিন্তু কাজে কর্মে সে অসৎ হতে পারে। যদি এমনটি দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে তার বিশ্বাসেই সমস্যা রয়েছে।
আল কোরআনের সূরা হা-মীম-সেজদায় এরশাদ হচ্ছে-
“নিশ্চয় যারা বলে, আল্লাহই আমাদের রব! অতপর এর উপর অবিচল থাকে, তাদের প্রতি (রহমতের) ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হয় (বলে যে ) তোমরা ভয় করো না এবং দুঃখ ও করো না এবং সেই বেহেশতের সুসংবাদ গ্রহণ করো যার প্রতিশ্র“তি তোমাদের দেয়া হয়েছে”। (সূরা হা-মীম-সেজদাহ্-৩০)
এই আয়াতটিতে মহান রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট করে বলেছেন পুরষ্কার পাবার জন্য শুধু মাত্র ঘোষনাই (বিশ্বাস) যথেষ্ট নয় বরং ঘোষণা দেবার পর এর উপর অবিচল থাকতে হবে। এ ব্যাপারে একটা উদাহরণ এরকম হতে পারে।
“আল্লাহর ঘর মসজিদ ইবাদত করার জন্য পবিত্র স্থান। এ ঘরের পবিত্রতা রক্ষা করা জরুরী। এ ঘরের মধ্যে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। এখানে ব্যক্তি স্বাধীন মাত কাজ করতে পারে না। যেমন-
এ ঘরের মধ্যে উচ্চ স্বরে কথা বা চিৎকার করা যাবে না, এখানে দুনিয়াবী বিষয় নিয়ে আলোচনা বা কথা বলা যাবে না, কোন ব্যক্তিকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেয়া যাবে না, এ ঘরে ধনী-দরিদ্র, বাদশা-ফকির সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে, এ ঘরে বসে কোন পাপ কার্য করা যাবে না ইত্যাদি। কোন ব্যক্তি যদি এ ঘরে দরজা দিয়ে ঢোকে কিন্তু ভেতরের কোন নিয়ম কানুন না মানে তাহলে কি ঘটনা ঘটবে? নিশ্চয় মসজিদ কর্তৃপক্ষ অথবা মুসল্লিগণ তাকে নিয়ম মানার জন্য বলবে যদি সে না মানে তবে তাকে মসজিদ থেকে বের করে দেবে। ঠিক ঈমানের বিষয়টিও এ রকম। ঈমানের ঘোষণা দেবার পর ইসলামের নির্ধারিত নিয়ম-কানুন, জীবন ব্যবস্থা মেনে নিতে হবে। যদি কেউ এমনটি করে তবে এটাই হবে ঘোষণার উপর অবিচল থাকা। আর ঘোষণার পরেও আল্লাহর গোলামী, দাসত্ব না করলে বুঝতে হবে সে তার কথার উপর অবিচল নেই সুতরাং তার জন্য পুরষ্কার নির্ধারিত হতে পারে না।
এ কথাটিই হাদীসে নবী করিম (স) বলেছেন, “কোন ব্যক্তি বলবে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ বা ইলাহ নেই। অতঃপর এ উপর অবিচল অবস্থায় মৃত্যু হবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে”।(মুসলিম)
হাদীসটি হযরত আবু যর (জুনদুব ইবনে জুনাদ) (রাঃ) থেকে মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে। আমরা আরো কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব এখন।
ঈমানের একটা বৈশিষ্ট্য হলো এটার হ্রাস ও বৃদ্ধি ঘটে। ঈমানের নিম্ন এবং উচ্চ স্তর চয়েছে।
মুসলিম শরিফের একটা হাদীস এরকম- “হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, দৃঢ় চেতা ঈমানদার আল্লাহর কাছে দূর্বলচেতা ঈমানদারের তুলনায় উত্তম ও প্রিয়। অবশ্যই প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যে জিনিস তোমার উপকারে আসবে তা আকাঙক্ষা করো এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য পার্থনা করো, মনোবল হারিয়ে ফেলনা”। (মুসলিম শরীফ, মেশকাত শরীফ)
ঈমান বৃদ্ধির ব্যাপারে সূরা আনফালে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন-
“ঈমানদার তো হচ্ছে সেই সব লোক, যাদের হৃদয় আল্লাহ তা’য়ালাকে স্মরণ করার সময় কম্পিত হয়ে উঠে এবং যখন তাদের সামনে আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের মালিকের উপরেই নির্ভর করে”। (সূরা আনফাল-২)
কিছু কাজ আছে যে গুলো ঈমান কমিয়ে দেয় আবার এমন কিছু কাজ আছে যা ঈমান বৃদ্ধি করে থাকে। আল্ কোরআন অধ্যয়ন সেই রকম কাজ যা ঈমান বৃদ্ধি করে থাকে।
এই আয়াতটিতে ঈমানের আরো একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখিত হয়েছে তা হলো যাদের ঈমান রয়েছে তাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করার সময় কেঁপে উঠে। অসৎ কাজে লিপ্ত হয় এবং এই সময় তার বিবেক তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আর ভূমিকম্প যে ভাবে পৃথিবীর বুক কাঁপায় তাতে মাটির উপর গড়ে তোলা স্থাপনাগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়, সেভাবে ঈমানদারের অন্তর কেঁপে উঠে এবং শয়তান অন্তরে অন্যায়, অসৎকাজের যে খায়েশ (ইচ্ছা) তৈরি হয়ে ছিল তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ফলে ঈমানদার অন্যায় থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনে এবং লজ্জিত, অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করে।
ঈমানের আরো একটা বৈশিষ্ট্য হলো এটি বাধ্য হয়ে বা দুনিয়াবী শাস্তির ভয়ে অথবা সুযোগ-সুবিধা পাবার আশায় বিশ্বাস করা নয়। বরং সঠিক ঈমানের বৈশিষ্ট্য হলে স্বেচ্ছায় ব্যক্তি অকাট্য সত্য তথা ইসলামকে বুঝবে এবং জেনে বুঝে মিথ্যা তথা শয়তানী মতবাদ (তাগুত) অস্বীকার করে ঈমান আনবে সূরা বাকারার মধ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই কথাগুলো এভাবে ঘোষণা করেছেন-
“দ্বীনের মধ্যে জোর-জবরদস্তি নেই। যে ব্যক্তি অকাট্য সত্য এবং মিথ্যার (ভ্রান্তির) পার্থক্য বুঝবে এবং তগূতকে অস্বীকার করে আল্লাহর উপর ঈমান আনবে, সে যেন এর মাধ্যমে এমন এক শক্তিশালী রশি ধরলো যা কোন দিনই ছিড়ে যাবার নয়। আল্লাহ তা’য়ালা সবকিছুই শুনেন এবং জানেন”। (সূরা বাকারা-২৫৬)
ঈমানের বৈশিষ্ট্য এমন হবে যে ব্যক্তি ইসলামের বিধান শুনে এবং সাথে সাথেই তা মেনে নেবে এবং এ ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ জাগবে না, নিজের স্বার্থের ক্ষতি হতে পারে তা ভাববে না বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সবকিছু থেকে আল্লাহ ও তার রাসূলকে অধিক ভালবাসবে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রদর্শন করবে।
সূরা বাকারায় এরশাদ হচ্ছে-
“আর তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য স্বীকার করলাম এবং আপনার নিকট ক্ষমা চাই হে আমাদের রব! আর আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে”।(সূরা বাকারাহ-২৮৫)
মিশকাত শরীফের একটি হাদীস বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে দেয়।
“হযরত আবদুল্লাহ আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তার কামনা-বাসনাকে আমার উপস্থাপিত দ্বীনের অধিন করতে না পারবে সে ঈমানদার হতে পারবে না”। (মিশকাত)
আবার বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে-
“হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার পিতা, সন্তান ও যাবতীয় লোকজন থেকে আমাকে অধিক ভালবাসতে না পারবে সে পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না”। (বুখারী ও মুসলিম)
“হযরত আবু উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। হুযুর (স) বলেছেন, যে ব্যক্তির ভালবাসা ও শত্রুতা, দান করা ও না করা নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির বিধানের জন্যই হয়ে থাকে, সে ব্যক্তিই পূর্ণ ঈমানদার”। (বুখারী)
উপরের আলোচনা পেক্ষিতে ঈমানের বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে নিন্মে দেয়া হল-
  • ঈমান অর্থ তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস।
  • এ বিশ্বাস মুখে স্বীকৃতি, অন্তরে বিশ্বাস এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে কাজের মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটিয়ে পূর্ণতা পাবে।
  • ঈমান আনার পর মৃত্যু পর্যন্ত এর উপর অবিচল থাকতে হবে।
  • ঈমানের হ্রাস ও বৃদ্ধি ঘটে ফলে এর সর্বনিন্ম ও সর্বোচ্চ স্তর রয়েছে।
  • ভাল কাজ ঈমান বৃদ্ধি করে দেয় এবং মন্দ কাজ ঈমান কমিয়ে দেয়।
  • আল্লাহর স্মরণ ঈমানদারের হৃদয় ভূমিকম্পের মত কাঁপিয়ে দেয়।
  • ঈমান হলো স্বেচ্ছায় আনিত বিশ্বাসের নাম। এ বিশ্বাস আনার পূর্বে অবশ্যই অকাট্য সত্য (ইসলাম) ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে হবে এবং তগুতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করতে হবে।
  • ঈমানদারদের কাছে পার্থিব জীবনের সকল কিছু থেকে আল্লাহ ও তার রাসূল (স) অধিক প্রিয় হতে হবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স) নিরঙ্কুশ আনুগত্য, ইসলামী বিধানের পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে।

সৎকাজ
ঈমান আনার পরেই মুসলমানের জন্য কর্তব্য হচ্ছে সৎকাজ করা। সৎকাজের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা আগেই আলোচনা করেছি। তবুও আরো দু’টি আয়াত আল্ কোরআন থেকে পেশ করা হলো-
“এখন কে ইব্রাহীমের জীবন পন্থাকে ঘৃণা করবে? বস্তুত যে ব্যক্তি নিজেকে মুর্খতা ও নির্বুদ্ধিতায় নিমজ্জিত করেছে, সে ব্যাতিত আর কে এরূপ ধৃষ্টাতা দেখাতে পারে? ইব্রাহীম তো সেই ব্যক্তি যাকে আমি পৃথিবীতে আমার কাজ সম্পন্ন করা জন্য বাছাই করে নিয়েছিলাম এবং পরকালে যে সৎকর্মশীলদের মধ্যে গণ্য হবে”। (সূরা বাকারা-১৩০)
“নিশ্চয় জেনে রাখ শেষ নবীর প্রতি বিশ্বাসী হউক, কি ইহুদী, খৃস্টান কিংবা সাবীই (ধর্ম ত্যাগী) যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তার পুরষ্কার তা রবের নিকট রয়েছে এবং তা জন্য কোন প্রকার ভয় ও চিন্তার কারণ নেই”। (সূরা বাকারা-৬২)
প্রথমেই আমাদের বুঝে নিতে হবে এই সৎকর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যে। সৎকর্মের উদ্দেশ্য অবশ্যই ইসলামের উদ্দেশ্যের বিপরীত হওয়া যাবে না। সৎকাজ সম্পাদিত হবে আল্লাহকে রাজী-খুসি করার জন্য, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য। ইসলামের কোন কাজই লোক দেখানোর কাজ হওয়া যাবে না। লোক দেখানো কাজ পরকালে কোন কাজে আসবে না বরং এর জন্য শাস্তিই ভোগ করতে হবে। সুতরাং সৎকাজ করা পূর্বে এ কথা হৃদয়ে গেথে নিতে হবে যে মুসলমানের সৎকাজ গুলো হবে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, দুনিয়াবী কোন সার্থ বা লোক দেখানোর জন্য নয়।
“অতপর ঐ নামাযীর জন্য ধ্বংশ, যারা তাদের নামাযের ব্যাপারে অবহেলা করে, যারা লোক দেখানো কাজ করে”। (সূরা মাউন-৪,৫,৬)
যারা প্রকৃত পক্ষে ঈমান এনেছে তাদেরই বলা হয় ঈমানদার। ঈমানদার ছাড়াও আরো কিছু দলের নাম ও বৈশিষ্ট্য ইসলাম পরিষ্কার করে বর্ণনা করেছে এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো ঈমানদার তথা মুসলিম হতে হবে অন্যান্য সকল দল ত্যাগ করতে হবে। দরগুলো নিন্মরূপ:-
এক. মুশরিক।
দুই. কাফির।
তিন. ফাসিক।
চার. তাগুত।
পাঁচ. মুনাফিক।
ছয়. ঈমানদার।
ব্যক্তি যদি ঈমানদার হতে চায় তাহলে অবশ্যই প্রথম পাঁচ প্রকার লোকের কোন প্রকারের সাথে সদৃশ হওয়া চলবে না। ঈমানদারদের জন্য ইসলাম যে সৎকাজ গুলো নির্ধারণ করেছে সে গুলো বিস্তারিত আলোচনার পূর্বেই আমরা প্রথম পাঁচ প্রকার দল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার চেষ্টা করব।

মুশরিক
মুশরিক বলা হয় তাদেরকে যারা শিরক এর অপরাধে অপরাধী। মুশরিকরা আল্লাহকে অস্বীকার করে না বটে, কিন্তু আল্লাহর সাথে অন্যান্য সত্ত্বা বা শক্তিকে বিভিন্ন ভাবে শরীক করে। শিরক শব্দটির অর্থই হলো শরীক করা বা সমকক্ষ মনে করা।
শিরকের ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন-
“নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা শিরকের গুনাহ মাফ করবেন না। এতদ্ব্যাতীত অন্য ছোট গুনাহ যাকে ইচ্ছা হবে, মাফ করে দেবেন”। (সূরা আন্ নিসা-১১৬)
“তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহ তা’য়ালার সাথে কাউকে শরীক করো না”। (সূরা বাকারা-২২)
“যখন লুকমান তার ছেলেকে নসীহত করতে গিয়ে বলল, হে বৎস, আল্লাহ তা’য়ালার সাথে র্শিক করোনা, নিশ্চয় শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম”। (সূরা লোকমান-১৩)
মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
“হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (স) কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, সে তাঁহার সাথে শিরক করেনি, সে অবশ্যই বেহেশতে প্রবেশ করবে। আর যে তাঁর সাথে শরীক করা অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে যাবে”। (মুসলিম)
র্শিক মূলত চার ভাগে বিভক্ত-
ক) আল্লাহর সত্তার সাথে শরীক করা। যেমন- কাউকে আল্লাহর পুত্র, কন্যা বা স্ত্রী সাব্যস্ত করা।
খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা (আ) কে আল্লাহর পুত্র এবং তা মা হযরত মারইয়াম (আ) কে আল্লাহর স্ত্রী মনে কবে।
অনেক মানুষই ফেরেশতাগণকে আল্লাহর কন্যা মনে করত।
অনেক মূর্তী পূজকরা দেব-দেবীদেরকেও আল্লাহর বংশ বলে বিশ্বাস করে। কতক স্বৈরশাসক নিজেদেরকে স্রষ্টার বংশধর বলে দাবি করেছে বলে জানা গেছে। এগুলোই আল্লাহর সত্তার সাথে শরীক। আরবীতে বলা হয় ‘র্শিকুন ফিয্যাত’।
খ) আল্লাহর গুণাবলির সাথে শরীক করা। যেসব গুণ একান্তই আল্লাহর সেসব গুণ অন্য কারো বা কিছুর মধ্যে আছে বলে বিশ্বাস করা। যেমন- অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞান বা ভবিষ্যত সম্পর্কিত জ্ঞান, সকল দোষ-ত্রুটি মুক্ত সত্তা ইত্যাদি গুণাবলীর ব্যাপারে অন্য কাউকে গুণধর মনে করা।
অনেকেই কিছু পীরদের অদৃশ্য সম্পর্কিত জ্ঞানের অধিকারী বা ভবিষ্যত সম্পর্কিত তথ্য জানা সত্তা মনে করে।
আরবীতে আল্লাহর গুণাবলীর সাথে শিরকের বলা হয় ‘র্শিকুন ফিছ্ছিফাত্’।
গ) আল্লাহর ক্ষমতায় অন্য কোন সত্তাকে শরীক করা যেসব ক্ষমতা শুধু মাত্র আল্লাহর এখতিয়ারে রয়েছে সেসব ক্ষমতা আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো মধ্যে রয়েছে বলে মনে করা। যেমন- মানুষের জন্য আইন বা বিধান রচনার ক্ষমতা, হালাল-হারাম ও জায়েজ না জায়েজ নির্ধারণের ক্ষমতা, অলৌকিকভাবে কারো উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা, সৃষ্টি করার ক্ষমতা, রিযিক দেয়ার ক্ষমতা, রোগ দেয়া ও আরোগ্য দানের ক্ষমতা, তাাদির বা ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা, গুণাহ মাফের ক্ষমতা ইত্যাদি।
আরবীতে একে বলা হয় ‘র্শিকু ফিল এখতিয়ারাত’।
ঘ) আল্লাহর অধিকারে আর কাউকে শরীক করা। যেমন-আল্লাহ ভিন্ন অন্য কাউকে সিজদা করা, বিপদ থেকে বাঁচার জন্য পার্থনা করা, অনুগ্রহ পাবার আশায় দান করা, নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা, অন্য কারো নামে পশু কোরবানী করা ইত্যাদি।
আরবীতে একে বলা হয় ‘র্শিকুল ফিল হু-কমত’।

কাফির
দ্বিতীয় নম্বরে আমরা কাফির নামক দলের কথা বলেছি। কাফির শব্দের অর্থ হলো অস্বীকার করে, ইসলামে তাদেরকেই কাফির বলে। যারা আল্ কোরআন এবং এতে বর্ণিত বিধানবলী অস্বীকার করে তারাও কাফির।
পূর্বেই তাওহীদের আলোচনার কাফিরদের সম্পর্কে আল্ কোরানের বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। সূরা আল্ বায়্যিনাত থেকে আরো একটি আয়াত তুলে ধরা হলো-
“নিশ্চয় যারা আহলি কিতাবও মুশরিকদের মধ্য থেকে কুফরি করেছে, তারাই জাহান্নামে চিরদিনের জন্য প্রবেশ করবে, এরাই নিকৃষ্ট সৃষ্টি”। (সূরা আল বায়্যিনাত-৬)
ফাসিক
কাফির নামক দলের পরেই আমরা ফাসিকদের কথা উল্লেখ করেছি। ফাসিক তারাই, যারা আল্লাহর নির্দেশগুলো অবশ্য পালনীয় বিধানগুলো স্বীকার করে কিন্তু তা পালন করে না।
“যে তাঁর (আল্লাহর) নেয়ামতের নাফরমানী করবে তারাই ফাসিক”। (সূরা নূর-৫৫)
“আর আল্লাহ তো ফাসিক লোকদেরকে কখনই হেদায়েত করেন না”। (সূরা আত্ তাওবা-২৪)
“আর আহ্লি কিতাব বা যদি ঈমান আনত তবে তা তাদের জন্য উত্তম হতে। যদিও তাদের মধ্যে কিছু ঈমানদার আছে, তাদের অধিকাংশই ফাসিক হয়ে গেছে”। (সূরা আল্ ইমরান-১১০)

তাগুত
তাগুত শব্দের অর্থ সীমালংঘনকারী। আমরা ইতিপূর্বে ইসলামের বৈশিষ্ট্য আলোচনার সময় আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণ নামক বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। যারা এ সীমারেখা সংরক্ষণ করে তারাই মু’মিন, আর যারা লংঘনকরে তারাই তাগুত। আমরা ঈমানের বৈশিষ্ট্য আলোচনার সময়ও দেখেছি ঈমানদার হতে হলে অবশ্যই তগুতকে অস্বীকার করতে হবে। মাওলানা মওদূদী (র) তাগুত সম্পর্কে বলেছেন-
“আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হুকুম মেনে চলার জন্য মানুষকে যেমন বাধ্য করেননি, তেমনি অমান্য করতেও বাধ্য করেননি। মানা ও না মানার ইখ্তিয়ার মানুষের রয়েছে। আল্লাহর নাফরমানীর দুটো সীমা রয়েছে। একটি হচ্ছে ফাসিক এবং অপরটি হলো কাফির। যে নিজে ফাসিক এবং অন্য মানুষকেও ফাসিক বানানোর চেষ্ঠা করে সেই লংঘন করলো। যে নিজে কাফির এবং অন্যকেও কাফির বানানোর চেষ্ঠা করে সেই তাগুত। সে আল্লাহর নাফরমানীর শেষ সীমাও লংঘন করল”।
তাগুতকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়-
ক) নফ্স ও হাওয়া হচ্ছে তাগুত। নফ্স হলো প্রবৃত্তি আর, হাওয়া হলো কুপ্রবৃত্তি। দেহের যাবতীয় দাবিকে এক সাথে নফ্স বলে।
দেহের ভালও মন্দের কোন ধারণা নেই। ভাল ও মন্দ বুঝতে পারে বিবেক। সূরা শাম্ছ এ আল্লাহ বলেছেন-
“আর মানুষের নফ্স ও তার সৃষ্টিকর্তার কসম যিনি একে সঠিক ভাবে গড়েছেন। এরপর একে (নফ্সকে) ভাল ও মন্দ বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন”। (সূরা শাম্ছ-৭,৮)
এখানে নফ্সকে বিবেক বলেই অভিহিত করা হয়েছে। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নফ্সকে সাধারণত কুপ্রবৃত্তি এবং বিবেককে সুপ্রবৃত্তি মনে করা হয়। যেমন- কেউ বলল, ‘ নফ্সকে গোলাম হয়ে যেও না’। এর অর্থ হলো খারাপ হয়ো না তথা কুপ্রবৃত্তির আদেশ মেনে চলো না। আবার এ রকম বলা হয় যে, ‘লোকটা বিবেকবান’। এর অর্থ হলো লোকটা ভাল তথা সে সুপ্রবৃত্তির আদেশ মেনে চলে। সূরা ইউসূফের ৫৩নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“নিশ্চয় নফ্স মন্দেরই হুকুম দেয়”। (সূরা ইউসুফ-৫৩)
এ কারণেই নফ্সকে (কুপ্রবৃত্তিকে) তাগুত বলে অভিহিত করা হয়। শয়তানকেও তাগুত বলা হয় কেননা কুপ্রবৃত্তির মত শয়তানও আল্লাহর নাফরমানীকে উসকে দেয়, কুমন্ত্রনা দেয়।
খ) শরীয়াত বিরোধী কুপ্রথা ও কুসংস্কার ও তাগুত। কেননা তা আল্লাহর বিধানের বিরোধী ও বিধানের বিপরীত কর্মে মানুষকে নিয়জিত করে। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
“যখন তাদেরকে বলা হলো যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা মেনে চল, তখন তারা বলল, আমাদের বাপ-দাদাকে যা মেনে চলতে দেখেনি আমরা তাই মেনে চলব”। (সূরা বাকারা-১৭০)
গ) আল্লাহ বিরোধী শাসন শক্তি হলো তাগুত। কেননা আল্লাহ বিরোধী শাসন শক্তি তাদের অধীনস্থদের উপর আল্লাহ বিরোধী আইন-কানুন চাপিয়ে দেয়, আল্লাহর নাফরমানী করতে বাধ্য করে। এ শাসন শক্তি ব্যক্তির রিয্ক বন্ধকরার ভয় দেখায় এবং এর মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। এ শক্তি মানুষের কাছে অন্ধ আনুগত্য দাবি করে বসে এবং শক্তি প্রয়োগে তা আদায়ের চেষ্ঠা চালায়। সূরা বাকারায় বলা হয়েছে-
“আল্লাহই ঈমানদারদের অভিভাবক যিনি মানুষদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। আর যারা কাফির তাদের অভিভাবক হলো তাগুত যা মানুষদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়”। (সূরা বাকারা-২৫৭)

মুনাফিক
তাগুত এর পরেই মুনাফিক সম্পর্কে বলব আমরা। মুনাফিক তারাই, যারা দ্বিমুখী আচরণ করে। অর্থাৎ যারা মুখে ঈমান আনার কথা বলে কিন্তু অন্তরে এর বিশ্বাস নেই বরং গোপনে ঈমানদারদের ক্ষতি করার চেষ্ঠায় লিপ্ত থাকে। আল্লাহ নিজেই মুনাফিকদের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন-
“আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে যারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি এবং শেষ দিবসের প্রতি, অথচ তারা মোটেও ঈমানদার নয়। তারা ধোকাবাযী করে আল্লাহর সাথে এবং ঈমানদারদের সাথে বস্ততঃ তারা ধোকাবাযী করে না নিজেদের সাথে ছাড়া অন্য কারো সাথে। অথচ এ সম্বন্ধে তাদের অনুভূতি নেই”। (সূরা বাকারা-৮,৯)
আবার একই সূরায় বলা হচ্ছে-
“আর যখন সেই মুনাফেকগণ ঈমানদারদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আর যখন তারা নির্জনে মিলিত হয় তাদের দুষ্ট নেতাদের সাথে, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি, আমরা তো শুধু তামাশা করে থাকি। আল্লাহই তাদের সাখে তামাশা করে থাকেন এবং তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন, ফলে তারা নিজেদের অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে”। (সূরা বাকারা-১৪,১৫)
আবার সূরা নিসায় বলা হয়েছে-
“এরা (মুনাফিকরা) কুফুরী ও ঈমানের মাঝখানে দোদুল্যমান হয়ে রয়েছে, পূর্ণভাবে এদিকেও নয় ঐদিকেও নয়”। (সূরা আন্ নিসা-১৪৩)
মুনাফিকদের জন্য কঠিন শাস্তির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
“নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে। আর তোমরা কখনো তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না”। (সূরা আন্ নিসা-১৪৫)
বুখারী ও মুসলিম শরীফে মুনাফিকের চরিত্র এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-
“আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে কট্টর মোনাফিক। আর যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব আছে তার মধ্যে মোনাফিকীর একটি স্বভাব আছে, যতক্ষণ না সে তা ত্যাগ করে। এক. তার নিকট আমানত রাখলে খেয়ানত করে, দুই. সে কথা বললে মিথ্যা বলে, তিন. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং চার. ঝাগড়া-বিবাদে অশ্লীল ভাষা ব্যাবহার করে (গালাগালি করে)”। (বুখারী ও মুসলিম)
আবার তিরমিযী শরীফে এরকম হাদীস এসেছে-
“আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, দু’টি গুণ কোন মুনাফিকের মধ্যে একত্র হতে পারে না- এক. উত্তম চরিত্র ও দুই. দ্বীনের সঠিক জ্ঞান”। (তিরমিযী)
আবার মিশকাত শরীফে বলা হচ্ছে-
“উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (স) বলেন, এই উম্মাতের জন্য আমি এমন সব মুনাফিকের ভয় করি যারা কথা বলে বিজ্ঞের মত কিছু কাজ করে যালেমের মত”। (বায়হাকী থেকে মিশকাত)
আমরা আবারো ঈমানদারদের জন্য নির্ধারিত সৎকাজের আলোচনায় ফিরে যাব। মুসলমানদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, তাওহীদের দাবি অনুসারে মানুষের ভাল বা মন্দ করার ক্ষমতা কেবলই আল্লাহর, আল্লাহ ইচ্ছা করলে যে কাউকে হেদায়াত দিতে পারেন, আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনিই জানেন কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে, তাহলে আখেরাতে বিচার করার যৌক্তিকতা কোথায়, কেনই বা সৎকাজের দিকে মানুষকে ডাকা হয়? আবার আল্ কোরানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কাফিররা ঈমান আনবে না তাদের ভয় দেখানো হোক বা না হোক। কেননা আল্লাহ তাদের (কাফিরদের) হৃদয়, কর্ণ ও চক্ষুসমূহের উপর পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। তাহলে কাফিরদের শাস্তি দেয়া কিভাবে ন্যায় সংগত হবে? এরকম কথা আল্লাহ অনেক বার বলেছেন-
“যদি আমি চাইতাম তাহলে পূর্বাণেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে হেদায়াত দিয়ে দিতাম। কিন্তু আমার সে কথা পূর্ণ হয়ে গেছে যা আমি বলেছিলাম যে, আমি জাহান্নাম জিন ও মানুষ দিয়ে ভরে দেব”। (সূরা আস্ সাজদাহ-১৩)
এই অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে তাওহীদের সঠিক ধারণা না থাকার কারণে। তাওহীদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এ প্রশ্নের জবাব। আল্লাহই পৃথিবী এবং মহাবিশ্ব যা কিছু আছে সবই সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিনিয়ত সঠিক ভাবে পরিচালনা করেছেন। সকল ক্ষমতা, কতৃত্ব আল্লাহর হাতেই পুঞ্জিভূত। সৃষ্টির প্রকৃত পক্ষে কোন ক্ষমতা নেই। আল্লাহর সৃষ্টিগুলো প্রতিনিয়ত যে কার্যগুলো সম্পাদন করে থাকে তা সম্পাদনের ক্ষমতা প্রকৃত পক্ষে তাদের নেই। এই ক্ষমতা আল্লাহ সরবরাহ করেন বলেই তারা কার্যসম্পাদন করতে পারে। মানুষ সহ সকল সৃষ্টি নিজেদের জন্য যে খাদ্য সংগ্রহ করে সেই খাদ্যও সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ এবং খাদ্য সংগ্রহের ক্ষমতা ও দেন আল্লাহ। আল্লাহ যদি কোন মানুষকে খাদ্য সংগ্রহের ক্ষমতা না দেন তবে পৃথিবীতে অসংখ্য খাদ্য থাকা সত্বেও সে খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। অনুরূপ ভাবে আল্লাহর চাওয়া ছাড়া মানুষের মুখ কথা বলতে পারে না, মগজ চিন্তা করতে পারে না, চোখ দেখতে পারে না, পা ও হাত সঞ্চালনশীল হতে পারে না। প্রকৃত পক্ষে মানুষের কাজ-কর্ম আল্লাহই সম্পাদন করে দেন। মানুষ এবং অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। মানুষ ছাড়া সকল সৃষ্টিই আল্লাহর গোলামী বা দাসত্ব করার জন্য বাধ্য। তারা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক এটা তাদের করতেই হবে।
কিন্তু মানুষকে ভাল ও মন্দ যে কোনটি বেছে নেবার স্বাধীনতা দিয়েছে এবং ভাল ও মন্দ যাতে পার্থক্য করতে পারে সে জন্য বিবেক জন্মগত ভাবে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং ভাল এবং মন্দ বাছাই করা মানুষের ইচ্ছাধীন হয়ে গেল। এখন কেউ যদি ভাল কাজ করতে চায় তবে আল্লাহ তাকে ভাল কাজ করার ক্ষমতা দান করেন। যেহেতু ব্যক্তির কার্য সম্পাদনের কোন ক্ষমতা নেই তাই প্রভূ তো একথা বলতেই পারেন যে, আল্লাহই তাকে ভাল কাজ করে দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ এটি চাপিয়ে দেননি বরং ব্যক্তির চাওয়া পূরণ কনেছেন মাত্র। অনুরূপ ভাবে কেউ যদি খারাপ কাজ করতে চায়, ভাল কথা শুনতে না চায়, বুঝতে না চায় এবং ভাল হতে না চায় তাহলে আল্লাহ তাকে সেই খারাপ কাজ করার ক্ষমতা দান করেন, কানে পর্দা এটেদেন, হৃদয়ে মোহর মেরে দেন এবং খারাপ মানুষ বানিয়ে দেন। যেহেতু কাজ আল্লাহই সম্পাদন করেন সুতরাং তিনি তো বলতেই পারেন যে, আমিই তাকে খারাপ বানিয়েছি। কিন্তু এটি কি চাপিয়ে দেয়া? অবশ্যই এটি ব্যক্তিই অপরাধ এ জন্য আল্লাহকে দায়ী করা যায় না।
আল্লাহর জ্ঞানের সীমা অসীম। তার জ্ঞানের পরিধির মধ্যে তার সকল সৃষ্টির পূর্বের এবং পরের সকল কিছুই আছে। সুতরাং আল্লাহ তা বিশেষ জ্ঞানের কারণে জানেন কোন ব্যক্তি ভাল হবে, জান্নাত লাভ করবে এবং কোন ব্যক্তি মন্দ হবে, শাস্তি ভোগ করবেন। কিন্তু আল্লাহর এ বিশেষ জ্ঞান দিয়ে তিনি মানুষকে পুরষ্কার এবং শাস্তি দেবেন না এবং এটা সুবিচারের পন্থাও নয়। বরং আল্লাহ মানুষের কর্ম বিচার করে তার যথাযথ প্রতিদান দান করবেন। যেমনটি তিনি সূরা আনকাবূতে উপস্থাপন করেছেন-
“লোকেরা কি মনে করে নিয়েছে, আমরা ঈমান এনেছি, শুধু এটুকু বললেই ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না। যেখানে আল্লাহ তাদের পূর্ববর্তী সকলকে পরীক্ষা করে নিয়েছেন। আল্লাহ অবশ্যই দেখে নেবেন কে সত্যবাদী এবং কে মিথ্যুক”। (সূরা আনকাবূত-২,৩)
এ আয়াত থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যদিও আল্লাহ তার বিশেষ জ্ঞানের মাধ্যমে সবই জানেন, সবার মনের অবস্থাও জানেন এবং জানেন কে সত্য বলেছে, কে মিথ্যা বলেছে তথাপি এর ভিত্তিতে তিনি বিচার করবেন না। তিনি দেখে নেবেন অর্থাৎ বিচার কাজে-কর্মে কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যুক তার প্রমাণ নিয়েই ফয়সালা দেবেন।
সুতরাং এটা স্পষ্টই বোঝা যায় মানুষের কৃতকর্মই তার পরিণতির অবস্থা নির্ধারণ করবে। বিখ্যাত তাফসির কারক সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী তার ‘তাফহীমুল কুরআন’ নামক তাফসির গ্রন্থে সৎকাজ সম্পর্কে লিখেছেন-
“সৎকাজ বা নেক আমল বলতে বুঝায় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (স) পেশ করা বিধান অনুযায়ী আমল বা কাজ”।
সৎকাজ অনেক ভাবেই বিভক্ত করা যায়। আমরা আলোচনার সুবিধার্তে সৎকাজকে প্রথমত তিনটি ভাগে ভাগ করব।
এক. মন, মগজ বা আত্মার সৎকাজ।
দুই. অংগ-প্রত্যংগ ও ইন্দিয়ের সৎকাজ।
তিন. সমস্ত পৃথিবী থেকে অসৎ ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ নির্মূলেম সৎকাজ বা সমাজ বিনির্মানের সৎকাজ।
এই তিন প্রকার সৎকাজকে আবার দুই ভাবে বিভক্ত করে সামনে অগ্রসর হলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে। প্রথম দুই প্রকার সৎকাজ একত্রে বলা যেতে পারে ব্যক্তিগত সৎকাজ এবং শেষ প্রকার সৎকাজকে সামষ্টিক সৎকাজ আখ্যাদেয়া যায়। আমরা আগে ব্যক্তিগত সৎকাজ নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জানার চেষ্ঠা করাব এবং এর পরে শেষ সৎকাজ তথা সামষ্টিক সৎকাজ নিয়ে কথা বলবো।
মানুষের মন ও সগজ অত্যন্ত শক্তিশালী যন্ত্র। এগুলো কাজের পরিকল্পনা, পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকে। এগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তি যে সিদ্ধান্ত পায় তা তার অংগ-প্রতঙ্গ দিয়ে কাজে পরিণত করে এর বিপরীত কর্ম প্রায় অসম্ভব। যেমন- একজন ব্যক্তি বাজারে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কেন সে বাজারে যাচ্ছে। তখন সে তার মগজে যে তথ্য গুলা (তার প্রয়োজন ও সাধ্য) রয়েছে সেগুলো বিবেচনায় যে সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে তা ব্যক্ত করবে এবং বাজারে গিয়েও সে তাই করবে যা সে ভেবেছে। যা সে ভাবেনি এবং যে তথ্যগুলো তার কাছে নেই, সে সম্পর্কিত কিছু করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সুতরাং মানুষের মন ও মগজের পরিকল্পনা, পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপরই তার কাজ নির্ভরশীল। এটাই সত্য যে ব্যক্তি সারাক্ষণ ভাল চিন্তা ও ইচ্ছায় সময় কাটায় তার পক্ষে সৎকাজ করা খুবই স্বাভাবিক। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সারাক্ষণ এ ভাবনায় কাটায় যে কি ভাবে সহজেই নিজের কু-চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়, তার পক্ষে অন্যায়, অপরাধ ও দূর্নীতি সাধনই স্বাভাবিক। প্রথম প্রকার সৎকাজের সংজ্ঞা এরকম হতে পারে-
“মন ও মগজ ব্যবহার করে ইসলাম বিরোধী, অনৈতিক এবং অকল্যাণ জনক চিন্তা পর্যালোচনা বাদ দিয়ে ইসলাম সম্মত ও কল্যাণকর চিন্তা পর্যালোচনা এবং প্রভূর মন জয়ের সাধনাই মন ও মগজের সৎকাজ”।
আল্ কোরআনে এই সৎকাজটির ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন-
“আর মানুষের আত্মার (নফসের) ক্বসম এই সেই মহান সত্ত্বার ক্বসম যিনি একে সঠিকভাবে গড়েছেন। অতপর একে ভাল এবং মন্দের প্রতি ইলহাম করেছেন। যে একে পরিশুদ্ধ করেছে যে সফলকাম হয়েছে। আর যে একে কুলষিত করেছে সে বিফল হয়েছে”। (সূরা শাম্স-৭-১০)
হাদীসে এভাবে বলা হয়েছে যে-
“রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, দেহের মধ্যে এমন একটি মাংসপিন্ড রয়েছে, তা যখন সুস্থ ও রোগমুক্ত হবে, তা যখন রোগাক্রান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সমস্ত দেহ জগত চরমভাবে রোগাক্রান্ত ও বিষজর্জরিত হেব। তোমরা জেনেরাখ তা হলে কল্ব বা হৃদপিন্ড”।
আবার মুসলিম শরীফে এসেছে-
“আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, আল্লাহ তোমাদের শরীরের ও চেহারার প্রতি ভূক্ষেপ করেন না; বরং তোমাদের মন ও কর্মেম প্রতি দৃষ্টিপাত করেন”। (মুসলিম)
এই মন ও মগজের কাজকেই ‘নিয়াত’ পলে অভিহিত করা হয়। যেমন- অধ্যাপক আবুল মতিন লিখেছেন-
“মনের ইচ্ছা এবং অন্তরের সংকল্পই হচ্ছে নিয়াত”। যে কোন কাজের ক্ষেত্রে এ নিয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম।
বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস এরকম-
“হযরত উমর বিন্ খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, নিয়াতের উপরই সকল কাজের (ফলাফল) নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে; যা সে নিয়াত করেছে। সুতরাং সে ব্যক্তি হিজরত করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। প্রকৃতপক্ষে তার হিজরত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্যই হয়ে থাকে। আর যে হিজরত করে দুনিয়ার (সুযোগ-সুবিধা) আশায় অথবা কোন মেয়ে লোককে বিয়ে করার (গোপন) বাসনায়; তবে তার হিজরত সেদিকেই হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে”। (বুখারী ও মুসলিম)
বিশিষ্ট সাহাবী এবং বারী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন-
“কর্ম ছাড়া মৌখিক দাবী  বিফল। আর মৌখিক দাবী ও কর্ম উভয়ই বিনা নিয়াতে কার্যকরী নয় এবং মৌখিক দাবী, কর্ম ও নিয়াত আদৌ ফল প্রসূ হবে না যতক্ষণনা কুরআন-হাদীস অনুযায়ী না হয়”। (জামোউল উলুম আল হাকেম)
দ্বিতীয় সৎকাজকে অংগ-প্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়ের সৎকাজ বলা হয়েছে। আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন ধরণের কাজ করার জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং বিভিন্ন ধরণের বস্তু, সংকেত বোঝার জন্য (অনুধাবন করার জন্য) ইন্দ্রিয় দান করেছেন। একজন ব্যক্তির প্রতিটি মূহূর্ত কাটানোর জন্য, যে কোন প্রয়োজন মেটানোর জন্য এগুলো অতীব প্রয়োজনীয়।
দ্বিতীয় সৎকাজটির সংজ্ঞায় আমরা বলতে পারি-
“আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করে ইসলামের বিধান পালনের জন্য কাজ করা এবং ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করে ইসলাম সম্মত আচরণ করাই হচ্ছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং ইন্দ্রিয়ের সৎকাজ”।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কথাগুলো এভাবে বর্ণনা করেছেন-
“আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযোগের জন্য এমন অনেক জ্বিন ও মানবকে যাদের অন্তর আছে বটে কিন্তু তা দিয়ে উপলব্ধি করে না, কর্ণ আছে কিন্তু তা দিয়ে শোনেনা, এরা চতুষ্পদ জন্তুর মত বরং এরা অধিক এর চেয়েও নিকৃষ্ট কেননা এরা অমনোযোগী”।(সূরা আ’রাফ-  )
এই আয়াতটি এই সৎকাজের গুরুত্ব আমাদের সামনে পরিষ্কার করে দেয়। আমরা আগেই বলেছি প্রথম দুই প্রকার সৎকাজকে ব্যক্তিগত সৎকাজ বলতে আলোচনা করব। ব্যক্তিগত সৎকাজ বলতে আমরা বলতে চেয়েছি যে, যে সকল কাজ ব্যক্তি তার নিজের চেষ্ঠার করতে সক্ষম হবে। এ সকল কাজরে ব্যাপারে ব্যক্তির দায়বদ্ধতাই সবচেয়ে বেশি। দু’টি সৎকাজের সংজ্ঞা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে প্রথমে অসৎ কাজ বর্জনের জন্য বলা হয়েছে এবং এর পরে সৎকাজটি করার জন্য বলা হয়েছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকৃত পক্ষে সৎ এবং অসৎ এ দু’টি একত্রে চলতে পারে না।
কেউ যদি সৎকর্মশীল হতে চায় তবে প্রথমেই তাকে অসৎকর্ম ত্যাগ করতে হবে। এ ব্যাপারে মুসলিম শরীফের একটা হাদীস উল্লেখ করা হলো।
“হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, তোমরা কি জানো দেউলে, সর্বহারা ও দরিদ্র কে? লোকেরা বলল, আমাদের সমাজে দেউলে, দরিদ্র বা সর্বহারা বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যা কাছে নগদ অর্থ থাকেনা, কোন জিনিসপত্রও থাকেনা। রাসূল (স) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত সর্বহারা, দরিদ্র ও দেউলে হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত সাথে নিয়ে আসবে। কিন্তু তার পাশাপাশি সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়ে আসবে, কাউকে অপবাধ আরোপ করে আসবে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে আসবে। এই সব নির্যাতিত ব্যক্তির মধ্যে তার কৃত সৎকর্মগুলো বন্টন করে দেয়া হবে। দিতে দিতে যদি সকল সৎকাজ শেষ হয়ে যায় অথচ তখনও নির্যাতিতদের পাওনা বাঁকী থাকে, তাহলে নির্যাতিতদের গুনাহগুলো তার হিসেবে জমা করা হবে এবং তারপর তাকে জাহান্নামে পাঠানো হবে”। (মুসলিম শরীফ)
সৎকর্মের পাশাপাশি অসৎকর্ম করলে, অসৎকর্ম ব্যক্তির সৎকর্মগুলো ধ্বংশ করে দেয়, নষ্ট করে দেয়। সুতরাং অসৎকর্ম থেকে দূরে থাকা অতীব জরুরী।

ব্যক্তিগত সৎকাজগুলোর জন্য যোগ্যতা
ব্যক্তিগত সৎকাজগুলোর আলোচনার আগে ভেবে দেখি কাজগুলো করার জন্য কি কি প্রয়োজন বা কি কি যোগ্যতা থাকা দরকার। বাস্তবে আমরা দেখে থাকি নির্দিষ্ট কোন কাজের জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন লোক এবং নির্দিষ্ট কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন হয়। যেমন ধরুণ বহুতলা একটা ভবন নির্মাণের কাজ পড়েছে আপনার উপর। এতে কি কি বিষয় অন্তর্ভূক্ত?
এক. আপনার অবশ্যই কাজটি করার ইচ্ছা থাকতে হবে। অর্থাৎ কাজটি সম্পাদনের জন্য এমন কিছু বল ক্রিয়াশীল থাকতে হবে যার কারণে আপনি কাজটি করবেন। হতে পারে আপনি অর্থের বিনিময়ে কাজটি করে দেবেন অথবা অন্য কোন স্বার্থে। যাই হোক আপনার যাতে কাজ করার ইচ্ছা হয় এ রকম একটা অথবা একাধিক কারণ থাকা চাই।
দুই. কাজটি কেমন, কিভাবে করতে হবে এ সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। জ্ঞান ছাড়াই কাজটি করতে চাইলে আপনি বরং সময়, প্রশ্ন, অর্থ নষ্টই করবেন কোন লাভ শেষ পর্যন্ত হেব না।
তিন. কাজটি করার জন্য আপনার প্রয়োজনীয় অর্থ বা সম্পদ থাকতে হবে যাতে করে বাড়ি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছু আপনি সংগ্রহ করতে পারেন। যেমন- আপনার প্রয়োজন হবে জমি, ইট, বালি, সিমেন্ট, শ্রমিক ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনুরূপ ভাবে আমরা যদি সৎকাজ করতে চাই তাহলে বেশ কিছু যোগ্যতা তথা গুনাবলী অর্জন করতে হবে।
(ক্রমশ...)

লেখক: প্রভাষক, ই,ই,ই আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: মোঃ ইকবাল হোসেন

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes