(এটি একটি মনে উদয় হওয়া প্রশ্ন এবং মনে মনে আসা উত্তরগুলো তুলে ধরলাম।)
বাংলাদেশ, আমার প্রিয় জন্মভূমি, প্রিয় স্বদেশ। কখনো কখনো এর মাটির গন্ধে বিভোর হয়ে উঠি আবার কখনো মনে হয় এর সীমানা জুড়ে এরা কারা কিলবিল করছে। শিউরে উঠি নিজের জন্য, পরিজনের জন্য, দেশবাসীর জন্য। সবমিলিয়ে আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

আজকাল খুব শংকা অনুভব করছি। মার্কিনীরা চায় সারা বিশ্বে নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। সে ধারাবাহিকতায় তারা আলকায়দা নামক একটি কাল্পনিক সংগঠন সৃষ্টি করে অথবা সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সত্যিকারের একটি ‘আল-কায়দা’ সোভিয়েত আমল থেকেই তারা গঠন করে কিছুসংখ্যক বিক্রিত কিংবা নির্মম বাস্তবতা সম্পর্কে বেখবর মুসলমানদের মাধ্যমে। তারপর সেটাকে সামনে রেখে তারা একের পর এক মুসলিম দেশগুলো কব্জা করতে শুরু করে। আফগানিস্তান, ইরাক তার সাক্ষী এবং পূর্ব তিমুর নামে ইন্দোনেশিয়ার সীমানায় একটি জীবন্ত বিষফোঁড়া তারই নমুনা। পাকিস্তানকে নানাভাবে কব্জা করার পাঁয়তারাকে রুখে দিয়েছে দালালীর মাধ্যমে হোক আর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় হোক সাবেক সেনা শাসক মোশাররফ। কিন্তু হালের আফগান সীমান্ত থেকে পাকিস্তান লক্ষ্য করে মার্কিন সেনাদের আক্রমণগুলো শংকিত করে তুলছে পাকিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্য প্রতিরোধে নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টিতে।

আমাদের বাংলাদেশ, যেখানে যখনি কোন হামলা পরিচালিত হয়, সেটার দায়ভার তাৎক্ষণিকভাবে চাপিয়ে দেয়া হয় ইসলামী দলগুলোর উপর এবং বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর উপর। যদিও পরবর্তীতে তল্লাসী প্রক্রিয়ার ফলাফলে তাদের টিকিটিও খুঁজে পায় না পুলিশ-গোয়েন্দারা। তারপরও পরবর্তীতে ঘটা কোন ঘটনাকে একই ধারায় প্রবাহিত করা হয়, একই কায়দায় দোষারোপ করা হয় জামায়াত-শিবিরকে। প্রশ্ন হলো কেন এমন দোষারোপের ধারাবাহিকতা। বার বার প্রমাণ হয় যে, জামায়াত-শিবির নির্দোষ, তারপরও কেন এমনটি হচ্ছে। জবাব দু’রকমের হতে পারে-

এক) এ নীতির অনুসরণ যে, ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা প্রচারণা যদি সারা দেশে প্রচার করা যায়, তবে প্রথমেই সেটা সবাই গিলে খাবে। তারপর কেউ তা সাথে সাথেই হজম করে ফেলবে, কেউ গলা পর্যন্ত নিয়ে ইতস্ততঃ করতে থাকবে, কেউ বা চিবোতে চিবোতে পরবর্তীতে কি হয় তা দেখার অপেক্ষা করবে আবার কেউ কেউ সত্যোপলব্দি করে তা প্রত্যাখ্যান করবে। বলা বাহুল্য যে, আমাদের দেশে সাথে সাথে হজম করার লোকের সংখ্যা প্রায় আশি থেকে নব্বুই ভাগ। তার উপর এ বিরাট অংশের মধ্যে এমন অংশও তদনুরূপ যে, খবরটির সর্বশেষ ফলাফল সম্পর্কে আর কখনোই খোঁজ খবর করবে না। পরিণামে যে লাভালাভ দাঁড়ালো এই যে, দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রথম প্রচারের মিথ্যাটাকেই ধারন করে রয়েছেন।

দুই) এভাবে অন্ধকারে ঢিল মেরে দেখা যে, যদি কোন একটি ঢিল লেগে যায়। তাছাড়া তল্লাশী প্রক্রিয়াগুলো তো মাশাআল্লাহ্ বছরে পর বছর চলতে থাকে। ততদিন পর অন্ধকার ফিকে হয়ে যায়, ঢিল ক্ষয় হতে হতে বালিতে মিশে যায়। আর সে সুযোগে যতটুকু পারা যায় ঘায়েল করা হয় ইসলামী দলগুলোকে, বিনিময়ে কি ফসল উঠছে তাদের ঘরে তা না হয় নাইবা দেখলো (যদিও জাতি দেখে আসছে তাদের ফসল হিসেবে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া)।

আমাদের দেশীয় দালালচক্র এসব প্রক্রিয়া শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা লাভের জন্য করছে বলে মনে করলে ভুল করা হবে। বরং বাংলাদেশ নামক এ বদ্বীপের গুরুত্ব এতদ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার (দুঃ)স্বপ্ন বিলাসীদের নিকট অনেক গুরুত্ব পূর্ণ। সেখানেও দু’টি দিক থাকতে পারে- এক) ভৌগলিক অবস্থান ও দুই) বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমিকভাবে ইসলামের অগ্রগতি।

সুতরাং দেশে বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহকে এক সারিতে নিয়ে আসলে যে কারো পক্ষে বুঝা খুব সহজ হবে যে, আসলে দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া কোন বিকল্প নেই। কেননা, আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের রূপ পাল্টেছে। এখন দেশ জয় করে নিজস্ব শাসক বসিয়ে দেয়ার সেকেলে পদ্ধতির ব্যবহার হচ্ছে না; বরং দেশের মধ্য থেকে একটা তাবেদার গোষ্ঠী তৈরী করা হবে এবং তারা পুরো দেশের মানুষকে তাবেদার বানানোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে এই আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের নিকট একটি দেশের পরাজয়। তাই দেশের মানুষকে প্ররোচিত করার জন্য হেন পন্থা নাই যা তারা গ্রহণ করেনি। সেবা, চিকিৎসা, ঋণদান থেকে নিয়ে শুরু করে মীমাংসিত যুদ্ধাপরাধী ইস্যূ, তারপর সেটার হালে পানি না পেয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবী, সেটাতেও সুবিধা না পেয়ে অবশেষে নির্বাচনে ইসলাম পন্থীদেরকে প্রতিরোধের জন্য নানা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হচ্ছে।

সিদ্ধান্ত নিতে হবে এদেশের মানুষদেরকেই। তারা কি নিজেদেরকে স্বাধীন বাংলাদেশের মুসলিম বা নিজ নিজ ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করতে চায় না কি বিলীন হয়ে যেতে চায় নৈতিকতায় ধ্বস নামা পাশ্চাত্য সভ্যতার মোড়ল আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদে।

সবশেষে বলতে চাই যে, আমাদের এবারে নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে শুধুমাত্র দেশীয় প্রভাবই থাকবে না; বরং অন্তরালের সত্য যে, এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও অগ্রগতি-অবনতির বিষয়টি। সজীব ওয়াজেদ জয় যেন সাম্প্রতিক Harvard International Review এ প্রকাশিত তার আর্টিকেলের মাধ্যমে আমাদেরকে সে ইঙ্গিতই প্রদান করেছেন।
২৩ নভেম্বর ২০০৮, মদীনা মুনাওয়ারা, সউদী আরব।.