অনন্ত-স্বদেশের জন্য জগৎ-প্রবাসেই উপার্জন করতে হবে

Print
Category: সম্পাদকীয়
Published Date Written by সম্পাদক

অনন্ত-স্বদেশের জন্য জগৎ-প্রবাসেই উপার্জন করতে হবে


সবুজ শ্যামল জন্মভূমি ছেড়ে একজন প্রবাসী যখন ঊষর মরুর উত্তপ্ত আবহাওয়ায় প্রবেশ করে, তখন সে উপলব্ধি করে যে, পেছনে কত প্রশান্তির দিনগুলো ফেলে এসেছে। তবুও দু'চোখে তার হাজারো স্বপ্ন ভর করে। অনেক অর্থ উপার্জন করবে। ব্যাংকে জমিয়ে রাখবে প্রচুর টাকা। শহরের প্রান্ত-সীমান্তে শান্ত পরিবেশে কিনবে এক খণ্ড জমি। ধীরে ধীরে গড়ে তুলবে তার শান্তির আলয়। পাশাপাশি আরো কিছু স্বপ্ন দেখে সে। তার মাথার ঘাম পায়ে ঝরানো অর্থ জমিয়ে স্বদেশের বুকে গড়ে তুলবে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তা থেকে অঢেল আয় হবে এবং তার বাকী জীবন আরাম-আয়েশে কেটে যাবে।

আসুন ভেবে নেই একটু ব্যাপক আকারে। জন্মভূমি হিসেবে দেহের জন্ম অবশ্যই পৃথিবীর কোন দেশে, কিন্তু আমাদের আত্মার শুরু তথা সৃজন কোথায় হয়েছে তা কি আমাদের জানা রয়েছে? আদমের (আ) আত্মাকে যে দেহে পুরে দিয়েছিলেন একদা সর্বশক্তিমান স্রষ্টা, তারপর তাঁকে থাকতে দিয়েছিলেন জান্নাতে, সেদিক থেকে মানবজাতির শুরুটা তথা স্বদেশটা আসলে জান্নাত। স্বদেশ থেকে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সুনির্দিষ্ট সময়ে সময়ে ভিসার ব্যবস্থা করে আমাদেরকে পৃথিবী নামক এ প্রবাসে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য কিছু উপার্জন করে স্বদেশে ফিরে সুখে শান্তিতে অনন্ত জীবন যাপন করা। এক্ষেত্রে তিনি দু'টো বিষয় নিজের হাতে রেখেছেন- এক) পৃথিবীতে আমাদের কি কাজ করতে হবে এবং কি কি কাজের উপার্জন স্বদেশে চলবে আর কি কি কাজের উপার্জন স্বদেশে অচল; এ বিষয়টি আমাদের সাথে না দিয়ে বা স্মৃতিতে না দিয়ে আলাদাভাবে প্রেরিত পুরুষদের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন, দুই) এ প্রবাসের ভিসার মেয়াদ ঠিক কতদিন তা তিনি সম্পূর্ণরূপে নিজের কাছেই রেখেছেন। মূলতঃ এভাবেই তিনি আমাদেরকে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।

প্রবাসের এ দিনগুলো কাটানোটা মানবজাতির জন্য পরীক্ষার সময়কাল মাত্র। যেহেতু পরীক্ষা, সেহেতু পাস-ফেল এর ব্যাপার অবশ্যই রয়েছে। যে পাস করবে সে সুফল পাবে আর যে ফেল করবে তার জন্য থাকবে দুঃখ -এ সহজ হিসাবেই আবর্তিত রেখেছেন আল্লাহ্ আমাদের জীবন ধারাকে। সেজন্য তিনি সৃজন করেছেন জান্নাত ও জাহান্নাম। যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসূল, বহু আসমানী গ্রন্থাবলী। পাঠিয়েছেন বহু জাগতিক সাহায্য এবং বহু শাস্তিও। এতসব উপকরণ পাওয়ার পরও কি জাগতিক প্রবাসের এ দিনগুলোকে আমাদের বোধোদয় হবে না?

যেমন ভাবি যে, উপার্জন করে অর্থ সংগ্রহ করতে না পারলে স্বদেশের দিনগুলো কষ্টেই যাবে। তেমনি কেন ভাবি না যে, জগৎ-প্রবাসের দিনগুলোতে যদি ভালো উপার্জন করতে না পারি তো আখেরাত-স্বদেশের দিনগুলোতে কি কষ্টই না হবে? স্বদেশের ব্যাংকে জমানো অর্থের পরিমাণ কম হলে পেরেশানীর শেষ থাকে না, তেমনি স্বয়ং আল্লাহর ম্যানেজমেন্টে পরিচালিত আখেরাতে ব্যাংকে নিজের হিসাবে কি পরিমাণ অর্থ জমা হলো সে বিষয়ে কেন আমাদের কোন অস্থিরতা জাগে না?  অথচ দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে যেমন বাড়ী-গাড়ী করতে প্রয়োজন হয়- অর্থ এবং শ্রম-যোগ্যতা-মেধার, ঠিক তেমনি আখেরাতের অনন্ত জান্নাতের বাড়ী-আরাম-আয়েশের জন্যেও প্রয়োজন এ দু'টো জিনিষেরই। এর বাইরে আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। কুরআনুল কারীমের বহু জায়গায় আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীন আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, ঈমান ও ইখলাছের সাথে মাল তথা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় এবং জান তথা শ্রম-যোগ্যতা-মেধা লাগাও, বিনিময়ে আল্লাহ্ আমাদের জন্য আখেরাতের আরাম আয়েশ, জান্নাতে বাড়ীর ব্যবস্থা করে রাখবেন। পার্থক্য এতটুকু যে, পৃথিবীতে আমরা স্বদেশে গিয়েও বাড়ী-গাড়ীর চেষ্টা চালাতে পারি, কিন্তু আখেরাতের ক্ষেত্রে জান্নাতের বাড়ী-আরাম-আয়েশের জন্য অর্থ-শ্রম-মেধা-যোগ্যতা কাজে লাগাতে হবে দুনিয়াতেই। এক্ষেত্রে আখেরাতে আর এসব অর্জনের প্রচেষ্টা চালানোর কোনই সুযোগ দেয়া হবে না।

আমাদেরকে আত্মসমালোচনায় লেগে পড়া উচিত আজ হতেই। এই তো, পৃথিবীর জীবনে রমাদ্বানের শেষ দশকের মত এত পবিত্র আর আনন্দঘন দিনগুলো বিদায় নিলো মাত্র কিছুদিন হলো। ইফতারীর সাথে মাগরিবের সালাত। তারপর একটু বিরতির পরপরই এশার সালাত। এশার পর বার বা বিশ রাকা'আত তারাওয়ীহ্। তারপর শেষ দশকে শুরু হয় তাহাজ্জুদ। অত্যন্ত ধীর স্থির ভাবে... কোন ব্যস্ততা নেই। তারপর তাহাজ্জুদ শেষ হতে ফিরে এসেই সাহরী খাওয়া হতে হতে ফজরের আযান শোনা যায়...। চলে গেল কল্যাণের সে মহিমাময় দিনগুলো। জানিনা আবারো ফিরে আসবে কি না জীবনের সময়ে। ফিরে তো আসবেই, তবে আমরা থাকবো কিনা, জীবনকালে আর কে কে পাবো আর কে কে বঞ্চিত হবো, তা কেউ জানি না। আবেদন রাখবো সবার কাছে-যদি আবারো ফিরে পাই দুনিয়ার জীবনের শ্রেষ্ঠ এ সময়গুলো-তবে শুধুমাত্র ২৭ তারিখের একটি মাত্র রাতে বাপদাদার উত্তরাধিকারের মত ইবাদাত না করে রমাদ্বানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে ইবাদাত নিয়মিত করুন এবং লাইলাতুল কাদ্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করুন। আপনি হিসেব করে দেখেছেন? ৩০,০০০ দিন-রাতের চেয়েও উত্তম(কত উত্তম তার উল্লেখ করা হয়নি) কল্যাণ অর্জনের জন্য মাত্র দশটি রাতের ঘন্টা-দু'ঘন্টা ব্যয় কি খুব কষ্টকর? অবশ্যই নয়। আসুন, আবারো যদি আমাদের ভাগ্যে এ শেষ দশক পড়ে তবে যেন কোমর বেঁধে লেগে পড়ি ইবাদাতে।

মুসলিম উম্মার সম্মুখে এদিয়ে আসছে বাৎসরিক ইবাদাত- হজ্জের দিনগুলো। যেখানে প্রশিক্ষণের মত সাজানো ইবাদাতগুলো যেন কোন সেনাদলের ট্রেনিং। আফসোস হয় সেসব বৃদ্ধের জন্য যারা সেনাট্রেনিং নেয়ার জন্য বার্ধক্যের যুবুথুবু সময়টাকে বেছে নিয়েছেন। কেউ কেউ এ ট্রেনিংয়ের ভার সইতে না পেরে পৃথিবীর দিনগুলোর ইতি টেনে বসেন তার রবের ইচ্ছায়। আবার কেউ কেউ ট্রনিং শেষ করে এসে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন এই ভেবে যে, আমি সফল। হাঁ, তিনি হয়ত সফল। কিন্তু যে মহান উদ্দেশ্যে এ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা, তার কি হবে? মূলতঃ হজ্জের প্রকৃত বয়স শর্তগুলো পূর্ণ হলে তা যৌবনে। কারণ, ট্রেনিং নেয়ার পর জীবনের টগবগে দিনগুলোতে যেন এ প্রশিক্ষণকে কাজে লাগানো যেতে পারে সেজন্য সদা প্রস্তুত থাকা যায়। আর এভাবেই পূর্ণ হতে পারে হজ্জের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং আমাদের প্রাপ্তি। তাই যারা এখনো ধারনা করে বসে আছেন যে, সারা জীবন যা পারি যাচ্ছে তাই করে যাই, তারপর বৃদ্ধ হলে মক্কা গিয়ে হজ্জ করে, জমজমের পানি পান করে নিজেকে শিশুর মত নিষ্পাপ করে কবরে চলে যাবো আর আমি সফল হয়ে যাবো...। তাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, আমরা এমন এক সত্তার ইবাদাত করি, যিনি আমাদের কারিগর, যিনি আমাদের চেয়েও আমাদের খবর বেশী রাখেন, যিনি আমাদের মনের গোপন কোণায় লুক্কায়িত সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম ভাবনাগুলোরও হিসাব রাখেন। সুতরাং তাঁর রহমতের আশা যেমন করা উচিত তেমনি তাঁর শাস্তির ভয়ও থাকা আমাদের সবার উচিত। আল্লাহ্ আমাদেরকে তৌফিক দিন সত্যকে সূক্ষ্ম ও পূর্ণভাবে চেনার-জানার এবং মেনে চলার। আমীন।


এ বিভাগের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: সম্পাদকীয়

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes