ইসলাম ও সৎকাজ পর্ব ৭

Print
Category: প্রবন্ধ নিবন্ধ
Published Date Written by মোঃ ইকবাল হোসেন

ইসলাম ও সৎকাজ

-মোঃ ইকবাল হোসেন


(জুন ২০১৩, ১৬তম সংখ্যার পর...)

গ. ত্যাগ স্বীকার ও সহমর্মি আচরণ
সৎকর্মশীল হবার ক্ষেত্রে ত্যাগী ও সহমর্মি আচরণের কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর সর্বশেষ্ঠ মানুষ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন ত্যাগ ও সহমর্মিতার অসংখ্য উদাহরণে সজ্জিত।
মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে এসেছে-
“হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন: একদা আমরা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক সফরে ছিলাম। এ সময় একটি লোক তাঁর সওয়ারীতে চেপে বসে ডানে ও বামে তাকাতে লাগল। এ সময় রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যার কাছে একটির বেশি সওয়ারী রয়েছে, সে যেন তা এমন লোককে দিয়ে দেয়, যার কোন সওয়ারী নেই। আর যার কাছে বাড়তি রসদ বা খাদ্য সামগ্রী আছে, সে যেন তা এমন লোককে দিয়ে দেয়, যার নিকট আদৌ কোন রসদ নেই। এরপর তিনি নানা প্রকার দ্রব্য সামগ্রীর নাম উল্লেখ করলেন। তাতে আমাদের মনে এইরূপ ধারণার উদ্রেক হলো, যেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কোন সামগ্রী কারো রাখার অধিকার নেই।” (মুসলিম)
পবিত্র কুরআনে ত্যাগের ব্যাপারে অনেক বার তাগিত দেয়া হয়েছে-
“তোমরা কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণের অধিকারী হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর পথে সে সব জিনিস ব্যয় কর, যে গুলো তোমাদের নিকট অধিক প্রিয়, আল্লাহ্ সে সব বিষয়ে অবগত।” (সূরা আলে ইমরান: ১২)

ঘ. ভদ্র, নম্র ও বিনয়ী আচরণ
মুসলিম মানেই আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনকারী বান্দা। আল্লাহর গোলাম হওয়া মানেই হতে হবে বিনয়ী, নম্র, ভদ্র ও অহংকারহীন। এ গুণ গুলোই একজন মুসলিমকে আলাদা করবে সমাজের অন্যান্য মানুষ থেকে এবং এ গুণ গুলোর কারণেই মুসলিম অন্যের কাছে হয়ে উঠবে আকর্ষণীয়, অনুসরনীয়।
আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামিন বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যকার কোন ব্যক্তি যদি দ্বীন থেকে ফিরে যায়, (তবে) আল্লাহ্ এমন জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করবেন, যারা হবে আল্লাহর নিকট প্রিয় এবং আল্লাহ্ হবেন তাদের নিকট প্রিয়। তারা মুমিনদের প্রতি বিনম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর।” (সূরা মায়েদাহ: ৪৫)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মাঝে উপদেশ দেবার সময় বিনয়ী হতে, গর্ব ও অহংকার থেকে বেঁচে থাকার উপর জোর দিতেন।
“হযরত ইয়াদ ইবনে হিমার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ আমার কাছে এই ওহী পাঠিয়েছেন: তোমরা পরস্পর পরস্পরের সাথে ভদ্র-নম্র আচরণ করো, যাতে কেউ কারো ওপর গৌরব ও অহংকার না করে এবং একজন অপরজনের সাথে বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন না করে।” (মুসলিম)
এ হাদীসে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে নম্র-ভদ্র আচরণের অভাবেই গর্ব, অহংকার ও সীমা-লংঘনের ঘটনা ঘটে যা কিনা ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি।
এ সম্পর্কে হাদীসে আরো বলা হয়েছে-
“হযরত হারিসা বিন ওয়াহব রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন: আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে অবহিত করবো না? তারা হলো: অহংকারী, সীমালংঘনকারী বদবখ্ত ও উদ্ধত লোক।” (মুসলিম ও বুখারী)

ঙ. কোমলতা, ধীর-স্থীরতা ও সহিষ্ণু আচরণ
সামগ্রিক আচরণের পরিবর্তন নামক সৎকর্মের অধীনে আমরা এমন সব ব্যক্তিগত গুণাবলীর কথা উল্লেখ করার চেষ্টা করছি যে গুলো ছাড়া মুসলিম বলে দাবী করা যায় না। কোমলতা, ধীর-স্থিরতা, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাশীলতা ঠিক সেই সব গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম।
পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনে এসেছে-
“তবে যে ব্যক্তি ধৈর্য্য অবলম্বন করবে এবং মার্জনা করে দেবে, নিঃসন্দেহে এটা (হবে) খুব উঁচু মানের সাহসিকতা পূর্ণ কাজ।” (সূরা শুরা: ৪৩)
“হে নবী! নম্রতা ও মার্জনার নীতি অনুসরণ করেণ। পূন্যময় কাজের উপদেশ দিতে থাকো এবং মূর্খ লোকদের এড়িয়ে চলো। (আ’রাফ: ১৯৯)
উল্লেখিত আচরণগুলোকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের উৎস বলে উল্লেখ করেছেন-
“হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যাকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাকে সব ধরণের কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত করা হয়েছে।” (মুসলিম)
তাড়াহুড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, অধৈর্য্য হওয়াও নয় বরং হতে হবে ধীর-স্থির, হতে হবে সহনশীল আর এমন আচরণ যা আমাদের মধ্যে ফুটিয়ে তুলবে ইসলামের সৌন্দর্য্য।
হাদীসে এসেছে-
“হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, একদা এক ব্যক্তি এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আছে; আমি তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধব রক্ষা করে চলি আর তারা তা ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে সদাচরণ করি, কিন্তু তারা আমার সঙ্গে মূর্খতাসূলভ ব্যবহার করে। (এ কথা শুনে) রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যদি এ রকমই হয়ে থাকো যেমন তুমি বললে, তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম বালু ছুঁড়ে মারছো। তুমি যতোক্ষণ এই নীতির উপর দাড়িয়ে থাকবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সাহায্যকারী (ফেরেশ্তা) উপরিউক্ত লোকদের মোকাবেলায় তোমাকে সাহায্য করে যেতে থাকবে।” (মুসলিম)
চ. লজ্জাশীল হওয়া ও গোপন বিষয় গোপন রাখা
লজ্জালীলতা একটি উন্নত আচরণ। এটি মানুষকে অশ্লীল কথা ও কাজে বাধা দেয় এবং পাপ কাজকে দুসাধ্য করে তোলে। আমাদের নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম লজ্জাকে ঈমানের অংগ বলে উল্লেখ করেছেন।
“হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের ষাট কিংবা সত্তর শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলা। আর সবচেয়ে মামুলী বা ছোট হলো রাস্তা থেকে সষ্টকর বস্তু সরিয়ে ফেরা। আর লজ্জাশীলতা মেনে চলাও ঈমানের একটা সম্পদ।” (বুখারী ও মুসলিম)
“হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, লজ্জা-শরমের পরিণাম উত্তম হয়ে থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)
ইসলামে নিষিদ্ধ নয় এমন কিন্তু গোপন বিষয় অবশ্যই গোপন রাখতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। কারণ তা গীবত ও পরনিন্দার চর্চা সৃষ্টি করবে এবং সামাজিক সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করবে।
হাদীসে এসেছে-
“হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করছেন, রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান হবে সেই ব্যক্তির, যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এবং তারপর ঐ গোপনীয়তা প্রচার করে বেড়ায়।” (মুসলিম)
ছ. অন্যের সাথে ভালো কথাবার্তা বলা, হাসি মুখে বলা
মু’মিনদের জন্য খারাপ কথা ও অর্থহীন বা বেহুদা কথা কোনটাই বলা জায়েজ নয়। হয় আমাদেরকে ভাল কথা বলতে হবে নয়ত চুপ করে থাকতে হবে। আল্লাহ্ রব্বুল আলামিন নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“আর (হে নবী!) তুমি যদি কটুভাষী ও কঠিন হৃদয় হতে, তাহলে এই লোকেরা তোমার নিকট থেকে পালিয়ে চলে যেত।” (আলে ইমরান-১৫৯)
হাদীসেও ভাল কথা বলার উপর জোর দেয়া হয়েছে-
“হযরত আদী বিন হাতেম রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নাম থেকে বাঁচ, যদি তা খেজুরের একটা টুকরার বিনিময়েও হয়। যদি কোন ব্যক্তি তাও না পারে তবে সে নে ভালো কথা বলে (জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্ঠা করে)।” (বুখারী ও মুসলিম)
আল্লাহ্ সুবহানা ওয়া তালা সূরা লুকমানে মানুষের আচরণের ব্যাপারে লুকমানের উপদেশ উল্লেখ করেছেন-
“মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলোনা আর পৃথিবী বুকে চলো না উদ্ধত ভঙ্গিতে, আল্লাহ্ পছন্দ করেন না আত্মম্ভরী ও অহংকারীকে। নিজের চলনে ভারসাম্য আনো, নিজের আওয়াজ নিচু করো আর সব আওয়াজের মধ্যে খারাপ হলো গাধার আওয়াজ।” (সূরা লুকমান- )
কথা বলার সময় হাসী মুখে থাকার কথা অনেক হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-
“হযরত আবু যার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ভাল কাজকেই তুচ্ছ মনে করো না, যদি ও তা আপন ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে সাক্ষাতের মতো কাজও হয়।”
জ. অঙ্গীকার বা ওয়াদা পালন
অঙ্গীকার বা ওয়াদার ব্যাপারে ইসলামে অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কেননা অঙ্গীকার রক্ষার উপর সামাজিক সুসম্পর্ক ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বির্ভর করে। আল্লাহ্ অঙ্গীকারের ব্যাপারে জবাবদীহি করবেন বলে আমাদের সর্তক করেছেন।
“আর (তোমরা) অঙ্গীকার পূর্ণ করো; কেননা অঙ্গীকার সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (বনী ইসরাঈল-৩৪)
সূরা সফ্ এ এভাবে বলা হয়েছে-
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা কার্যত পালন করো না।” (সূরা সফ্-২,৩)
হাদীসে ওয়াদা ভঙ্গকারীকে মুনাফিকের আচরণসম বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে-
“হযরত আবু হুরাইয়া রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি: এক.সে কথা বললে মিথ্যা বলে, দুই. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তিন. তার কাছে আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে।” (বুখারী ও মুসলিম)
আচরণের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়াদা রক্ষাকারী হওয়া, আমানতদার হওয়া বড় ভূমিকা পালনকরবে। সুতরাং এসব ব্যাপারে ইসলাম অধিক গুরুত্ব দিয়েছে এবং মুসলিম হওয়ার সাথে সম্পর্কিত ববেছে।
ঝ. ক্ষমাশীল হওয়া ও অন্ধ-মূর্খদের এড়িয়ে চলা
আচরণের পরিবর্তনের এ পর্যায়ে আমরা ক্ষমাশীল হওয়ার মত মহৎ ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার কারী আচরণ সম্পর্কে আলোচনা করব।
ক্ষমা এমন একটি আচরণ যা ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য্য ফুটিয়ৈ তোলে এবং ইসলামের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করে, আগ্রহী করে তোলে।
আল্লাহ্ বলেন-
“যে ব্যক্তি ধৈর্য্য অবলম্বন করে ও মার্জনা করে দেয় (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে এটা উচ্চ মানের সাহাসিকতা পূর্ণকাজ।” (সূরা শূরা-৪৩)
আল্লাহ্ সুবহানা ওয়া তা’লা আরো বলেন-
“তারা যেন ওদের মার্জনা করে এবং ওদের দোষত্র”টি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ্ তোমাদের মার্জনা করুক। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, অতীব দয়াবান।” (সূরা নূর-২২)
বুখারী ও মুসলিম শরীফের উল্লেখিত একটি হাদীস এরকম-
“হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন, আমি যেন রাসূলে আকরামসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি সম্মানিত নবীদের (আ) কোন একজনের অবস্থা বর্ণনা করছিলেন। তাঁকে (অর্থাৎ সেই নবীকে) তাঁর জাতির লোকেরা উপর্যপরি আঘাত করে আহত করে দিয়েছিল। তিনি নিজের মুখমন্ডল থেকে রক্ত মুছে ফেলছিলেন আর দো’আ করছিলেন: হে আল্লাহ! তুমি আমার জাতিকে মার্জনা করো: কারণ এরাতো অবুঝ। সূরা আরাফে সূর্খদের এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে-
“হে নবী! মার্জনার নীতি অনুসরণ করো, সৎকাজের আদেশ দিতে থাকো এবং মুর্খদের এড়িয়ে চলো। (সূরা আ’রাফ-১৯৯)
 
৭। পর্দা বা হিযাব
ঈমানদারদের জন্য আরো একটি ফরজ কাজ হলো পর্দার বিধানগুলো মেনে চলা। পর্দা (হিযাব) শব্দের অভিধানিক অর্থ হচ্ছে আবরণ বা অন্তরাল যাকে ইংরেজীতে বলে ঈঁৎঃধরহ. আর শরীয়তের পরিভাষায় ইসলামের বিধান অনুযায়ী নারী-পুরুষ প্রত্যেকের জন্য বির্ধারিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ ঢেকে রাখার নামই হিযাব বা পর্দা।
পর্দা সম্পর্কে সূরা নূরে পুরুষদের বলা হয়েছে “হে নবী! মু’মিন পুরুষদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে চলে এবং নিজিদের লজ্জস্থান সমূহের হেফাজত করে। এটা তাদের জন্যে উত্তম। যা তারা করে আল্লাহ্ সে বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত।” (সূরা নূর-৩০)
আয়াতটিতে নির্ধারিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমুহকে ঢেকে রাখাকেই পর্দার অন্তর্ভূক্ত করা হয় নি বরং চোখকে বাঁচিয়ে চলা তথা আচরণের পরিবর্তন ও পর্দার অন্তর্ভূক্ত। হাদীস শরীফে চোখের পর্দার ব্যাপারে বলা হয়েছে-
“হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ্রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এই মর্মে প্রশ্ন করেছিলাম যে, হঠাৎ যদি কোন মহিলার উপর দৃষ্টি নিপতিত হয় তাহলে কি করতে হবে? হুযুরসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, তুমি তোমার দৃষ্টিকে কালবিলম্ব না করে ফিরিয়ে নিবে।” (মুসলিম)
আবু দাউদ শরীফের একটি হাদীসে আরো বলা হয়েছে যে, “বুরাইদা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু কে লক্ষ্য করে বলেন- ‘হে আলী! কোন অপরিচিতা মহিলার উপর হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে গেলে তা ফিরিয়ে নেবে এবং দ্বিতীয়বার তার প্রতি আর দৃষ্টিপাত করবে না। কেননা প্রথম দৃষ্টি তোমার আর দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার নয় (বরং তা শয়তানের)।” (আবু দাউদ)
উপরে উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস থেকে পুরুষদের পর্দার দুটো বিষয় আমরা পেলাম তা হলো লজ্জা স্থানের হেফাজত এবং দৃষ্টির হেফাজত। লজ্জাস্থানের হেফাজত মূলত দুই প্রকার।
এক. যৌনাঙ্গের হেফাজত। যে কথাটি সরাসরি বলা হয়েছে সূরা মু’মিনের ৫নং আয়াতে “যারা নিজেদের যৌনাঙ্গ হেফাজত রাখে।” এখানে যারা বলতে ঈমানদারদের বোঝানো হয়েছে। যৌনাঙ্গ হেফাজত বলতে এখানে মূলত যৌনাঙ্গের মাধ্যমে যৌন ক্রিয়া সম্পাদনকে বোঝানো হয়েছে। এই সূরার পরবর্তি আয়াতে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে, “কিন্তু তাদের বিবাহিত স্ত্রী ও অধিকার ভূক্ত ক্রীনদাসীগণ ব্যতীত, এতে তাদের কোন দোষ হবে না।” (সূরা মু’মিনুন-৭)
অর্থাৎ যৌন কর্মের ব্যাপারে কেবল মাত্র স্ত্রী এবং অধিকার ভূক্ত কৃতদাসী (যদি থাকে) কে ব্যবহার করা যাবে। অন্য কথায় কেবল এই দুই ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গ হেফাজতের প্রয়োজন নেই বাকী সকল ক্ষেত্রে অবশ্যই যৌনাঙ্গের হেফাজত করতে হবে।
দুই. লজ্জাস্থানসমূহ টেকে রাখা। এটি বলা হয়েছে সূরা আরাফ-এর ২৬নং আয়াতে পোশাকের বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে-
“হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোষাক নাজিল করেছি যেন তোমাদের দেহের লজ্জাস্থানসমূহকে ঢাকতে পারো।” (সূরা আরাফ-২৬)
পুরুষদের জন্য লজ্জাস্থান ও চক্ষুর হেফাজতের সাথে সাথে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে যা হলো নিজ গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশের সময় অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা এবং বিবাহ নিষিদ্ধ নয় এমন সব মহিলার সাথে ইসলাম সম্মত দূরত্ব বজায় রাখা।
যেমনটি সূরা নূরের ২৭নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“হে ঈমানদারগণ! নিজেদের গৃহ ব্যতীত অনুমতি ছাড়া কারো গৃহে প্রবেশ করো না। যতক্ষণ পর্যন্ত ঘরের লোকদের নিকট থেকে অনুমতি না পাবে এবং যখন ঢুকবে তখন ঘরের অধীবাসীদেরকে সালাম বলবে। এ নিয়ম তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আশা করা যায় তোমরা এর প্রতি খেয়াল রাখবে।” (সূরা নূর-২৭)
অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে-
“তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছ থেকে যখন কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমদের এবং তাদের মনের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়।” (আহযাব-৫৩)
হাদীসেও দূরত্ব বজায়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে-
“আজ থেকে যেন কেউ স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোন নারীর নিকট না যায় যতক্ষণ তার কাছে এক অথবা দুইজন লোক না থাকে।” (মুসলিম)
পুরুষদের মত নারীদেরও পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে যা বিস্তারিত ভাবে আল্ কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা নূরের ৩১নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“হে নবী! মু’মিন স্ত্রী লোকদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সমূহের হেফাজত করে ও নিজেদের সাজসজ্জা না দেখায়। কেবল সেই স্থান ছাড়া যা আপনা থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়ে।” (সূরা নূর-৩১)
পুরুষদের মত মেয়েদেরও লজ্জাস্থানের এবং দৃষ্টি হেফাজত জরুরী। এখানে অতিরিক্ত একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে নিজের স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে সাজসজ্জা না দেখানো। এ ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে-
“ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহিলারা হলো পর্দায় থাকার বস্তু। যখন তারা (পর্দা উপেক্ষা করে) বাহিরে আসে, তখন শয়তান তাদেরকে অন্য পুরুষের চোখে সুসজ্জিত করে দেখায়।” (তিরমিযী)
নারীদের কতটুকু অংশ ঢেকে রাখতে হবে সে ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে-
“নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শ্যালিকা হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু একবার মিহি কাপড় পড়ে তার সামনে আসলেন। কাপড়ের ভিতর দিয়ে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিযে নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হে আসমা। সাবালিকা হবার পর ইহা এবং ইহাছাড়া শরীরের কোন অংশ স্ত্রীলোকের পক্ষে জায়েজ নেই। এই বলে নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখমন্ডল এবং হাতের কব্জির দিকে ইঙ্গিত করলেন।” (ফাতহুল কাদীর)
অন্য একটি হাদীসে শক্ত ভাবে বলেছেন- “নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর অভিশাপ ঐ সকল নারীদের উপর যারা কাপড় পড়েও উলঙ্গ থাকে।”
কাপড় পড়ার ব্যাপারে অন্য একটি হাদীসে “হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নারীদের এমন আঠসাঠ কাপড় পড়তে দিওনা যাতে শরীরের গঠন পরিস্ফুটিত হয়ে পড়ে।”
নারীদেরকে উপরিউক্ত বিষয়ের সাথে আরো বলা হয়েছে যে, আচরণের এমন পরিবর্তন সাধন করতে হবে যা কিনা নারী ও পুরুষদের মধ্যে ইসলাম সম্মত দূরত্ব বজায় রাখতে সহায়তা করবে। কারণ এ দূরত্বই সকল নির্লজ্জতা ও পর্দার লঙ্ঘন থেকে মানুষদের হেফাজত করবে। সূরা আহযাবে বলা হয়েছে-
“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা সাধারণ স্ত্রী লোকদের মত নও। তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে বিনিয়ে বিনিয়ে কথা বলো না। যাতে দুষ্ট মনের কোন ব্যক্তি খারাপ আশা পোষণ করতে পারে বরং সোজা স্পষ্ট কথা বল।” (সূরা আহযাব-৩২,৩৩)
কয়েকটি আয়াত ও হাদীস থেকে আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে পর্দা পম্পর্কে যা জানতে পারলাম তার সারমর্ম নিম্নে দেয়া হলো।
 পর্দা পুরুষ ও মহিলা সবার জন্যই ফরজ।
 পুরুষকে যৌনাঙ্গের হেফাজত করতে হবে কেবল স্ত্রী ও অধিকার ভূক্ত দাষী ব্যাতীত।
 নারীকেও যৌনাঙ্গের হেফাজত করতে হবে কেবল স্বামী ব্যাতীত।
 পুরুষকে লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে হবে অর্থাৎ সতর ঢেকে রাখতে হবে। পুরুষের সতর হলো নাভীর উপর থেকে হাটুর নিচ পর্যন্ত।
 নারীকেও লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে হবে অর্থাৎ সতর ঢেকে রাখতে হবে। নারীর সতর হলো হাত, পা ও মুখ ব্যতীত সবই ঢেকে রাখতে হবে।
 পুরুষ ও নারী উভয়কেই দৃষ্টি অবনত রাখতে হবে অর্থাৎ চোখের পর্দার নিয়ম মানতে হবে।
 নিজ বাড়ি ছাড়া অন্য কারো বাড়িতে প্রবেশের সময় অবশ্যই প্রথমে অনুমতি নিতে হবে এবং ঢোকার সময় সালাম দিতে হবে।
 নারী ও পুরুষ এর মধ্যে সব সময় ইসলাম সম্মত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কোন পুরুষ কোন নারীর কাছে একাকী যেতে পারবে না যতক্ষণ না নারীর স্বামী অথবা অন্য কোন অভিভাবক উপস্থিত থাকে।
 নারীদের জন্য সাজসজ্জা করে প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ হারাম কেবল তার স্বামীর জন্য ব্যাতীত। আর পোশাক ব্যবহারের সময় শালীন পোশাক ব্যবহার করতে হবে।
 নারীদের জন্য বিনিয়ে বিনিয়ে কথা না বলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে করে দুষ্ট লোকের মনে খারাপ চিন্তার উদয় না হয়।

সর্বপরি পুরুষ ও নারী উভয়কেই পর্দার প্রয়োজনীয়তা এবং উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে বুঝতে হবে এবং আন্তরিকতার সাথে নির্দিষ্ট বিধানগুলো মেনে চলতে হবে।







সংঘবদ্ধ জীবন যাপন
আমরা ৭টি শিরনামে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে ব্যক্তিগত সৎকাজ নিয়ে আলোচনা করেছি। তাবে এটা ভাবার কোন অবকাশ নেই যে, উল্লেখিত সবকটি কাজই সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ের। বরং উল্লেখিত কাজগুলোর জন্য ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা বেশি বলেই এ শির নামে আলোচনার প্রয়াস পেয়েছি। আবার এ কথা ভেবে নেওয়াও ঠিক হবে না যে এ কটি কাজ ছাড়া আর কোন ব্যক্তিগত সৎকাজ নেই। আমরা বরং কিছু ধারণা দেবার চেষ্টা করেছি মাত্র। আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা সামষ্টিক সৎকাজ নিয়ে কথা বলব যে গুলোর ব্যাপারে সামষ্টিক দায়বদ্ধতা বেশি, যে গুলোর জন্য সামষ্টিক প্রচেষ্ঠার প্রয়োজন বেশি।
মূলত ইসলামী জীবন হলো সংঘবদ্ধ জীবন, আল্লাহর গোলামী পুরোপুরি করতে হলে সব মুসলিমকে একত্রিত হয়েই জীবন যাপন করতে হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ বলেছেন-
“তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (দ্বীনকে) দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আল্লাহর সে অনুগ্রহকে স্মরণ কর যা তিঁনি তোমাদের প্রতি করেছেন, তোমরা পরস্পর দুশমন ছিলে, ফলে তোমরা তাঁরই অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা আগুনভরা এক গভীর গর্তের কিনারায় দাড়িয়ে ছিলে, আল্লাহ্ তোমাদের তা হতে রক্ষা করলেন। আল্লাহ্ এইভাবে তাঁর নিদর্শনগুলো তোমাদের সম্মুখে উজ্জ্বল করে ধরেন এই উদ্দেশ্যে যে, হয়তবা এই নিদর্শনগুলো হতে তোমরা তোমাদের কল্যাণের সঠিক পথ লাভ করতে পারবে।” (সূরা আলে ইমরান-১০৩)
আয়াতটিতে সংঘবদ্ধ মুসলিম জীবনের গুরুত্ব বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আরবে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যে চরম শত্র”তা ও বৈরিতা ছিল যার ফলে তারা নিজেদের ধ্বংশ করছিল তা থেকে ইসলাম তাদেরকে মুক্তি দিয়েছিল এবং সংঘবদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে সূরা আলে ইমরানের অন্য একটি আয়াতে নিজেদের মধ্যে মতবিরোধে লিপ্ত হওয়াকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এ অপরাধকে কঠোর শাস্তি যোগ্য বলে ঘোষনা করা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেছেন-
“তোমরা সেই সব লোকদের মত হয়ে যেওনা যারা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হযে গেছে এবং স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নির্দেশ পাওয়ার পর ও মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে রয়েছে, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান-১০৫)
এই সংঘবদ্ধ জীবনের কথা আল্ কোরআনে অনেক ভাবেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূরা আশ শূরাতে এভাবে বলা হয়েছে-
“আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সেই দ্বীনকে নির্ধারিত করেছেন যা তিনি নূহ (আঃ) এর প্রতি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। আর আপনার প্রতি যে অহী নাযিল করেছি এবং আমি ইব্রাহীম, মুছা ও ঈসা (আঃ) কে নির্দেশ দিয়েছিলাম তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আশ শূরা-১৩)
প্রকৃতপক্ষে ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় সংঘবদ্ধ থাকার কোন বিকল্প নেই বলেই এটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রথম কারণ হলো সমাজ থেকে অশান্তি, বৈরিতা, শত্র”তা দূর করে শান্তি ও সহাবস্থানের জন্য সংঘবদ্ধ থাকা জরুরী। কেননা ইসলামের লক্ষ্যই হলো সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। ইসলামী জীবন ব্যবস্থার এটা মৌলিক দাবি যে, মুসলিমরা এরূপ ভাবে সংঘবদ্ধ থাকবে যাতে করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক ভালবাসা বিদ্যমান থাকে। কেননা সকল মুসলিমের লক্ষ্যই এক ও অভিন্ন।
দ্বিতীয় কারণ হলো মতবিরোধে লিপ্ত হওয়ার কারণে একটি দলের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। এ মতবিরোধ চরম পর্যায়ে উন্নিত হলে দলটি আর একটি দল থাক না, বরং ক্ষুদ্র ক্ষৃদ্র দলে ভাগ হয়ে যায়। ইসলামে এ রকম মতবিরোধের কোন সুযোগ নেই। কেননা ইসরামে রয়েছে অবিকৃত উৎস আল্ কুরআন ও সহীহ হাদীস সমূহ। যে উৎস থেকে আমরা আমাদের সঠিক করণীয় পেতে পারি। এ কারণে মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হওয়া নিষিদ্ধ এবং শাস্তি যোগ্য অপরাধ। তাই মুসলিম জীবনে সংঘবদ্ধ থাকার কোন বিকল্প নেই।
তৃতীয় কারণ হলো ইসলাম একটি সম্প্রসারণশীল মতবাদ। একজন মুসলিম যেমনি ভাবে নিজেকে অন্যায় অপকর্ম থেকে সরিয়ে আল্লাহর গোলামীর দিকে ধাবিত হয় তেমনি ভাবে সে তার আশে-পাশের লোকদেরকে আহবান করে ইসলামের দিকে এবং অন্যায় অপকর্মের প্রতিবাদে সে হয় প্রতিবাদ মুখর। ফলে সাধারণ মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য্য দেখে আকৃষ্ট হয় এবং ইসলাম সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু সমাজের তাগূতী শক্তি (ইতিপূর্বে আমরা তাগূত নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি) নিজেদের অন্যায় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইসলামের সম্প্রসারণে বাঁধা হয়ে নির্মূল করে দিতে চায়। তখন কল্যাণের স্বার্থে তাগূতী শক্তিকে রূখে দেয়া বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। যা কিনা কোন একজন মুসলিমের একার কাজ নয় বরং সকল মুসলিমের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্ঠার ফল। এ ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ থাকা না থাকার উপর মুসলিমদের অস্তিত্ব নির্ভরশীল।
সংঘবদ্ধ জবিন যাপনের আরো একটি সুফল হলো, শয়তানের প্ররোচনায়, দুনিয়াবী মোহ অথবা অন্য কোন কারণে কোন ব্যক্তি অথবা কতিপয় ব্যক্তির মান অবনতি (ইসলাম থেকে বিচ্যুতি) হলে অন্য ব্যক্তিরা প্রচেষ্ঠা চালাতে পারে উক্ত ব্যক্তিদের সংশোধনের জন্য এবং এতে করে আবার মান উন্নত হতে পারে। কিন্তু সংঘবদ্ধ না থাকলে সংশোধনের সুযোগ পাওয়া কঠিন।
সামষ্টিক সৎকাজ শিরনামে আমরা যে সব কাজ নিয়ে আলোচনা করব তার একটি সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করে ফেলেছি তা হলো মুসলিম হিসেবে সংঘবদ্ধ জীবন যাপন করা।
দ্বীন প্রতিষ্ঠা
আল্লাহ্ তা’আলার মনোনিত দ্বীনকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের সাথে সাথে এই দ্বীনকে সমাজে প্রতিষ্ঠার কাজ করা মুসলিমদের জন্য জরুরী। ইসলামের বৈশিষ্ট আলোচনায় আমরা দেখেছি দ্বীন ইসলাম একটি সম্প্রসারণশীল মতবাদ।
এ বৈশিষ্টের কারণে ঈমানদারদের জন্য এটি অপরিহার্য দায়িত্ব যে কল্যাণের এই বিধানকে ছড়িয়ে দেয়া এবং বাঁধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে একে প্রতিষ্ঠা দান করার সর্বাত্মক চেষ্ঠা চালানো। কেননা কল্যাণের বিধান দ্বীন ইসলাম সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হলে ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য আল্লাহর গোলামী ভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না।
আল্লাহ্ রব্বুল আলামিন দ্বীন প্রতিষ্ঠার দ্বায়িত্ব আল্ কোরআনে তিন তিনটি সূরায় পরিষ্কার করে ঘোষনা করেছেন-
“তিনিই সে সত্তা যিনি রাসূলকে হেদায়াত ও একমাত্র হক দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন (সে দ্বীনকে) আর সব দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন।” (সুরা আত তাওবা-৩৩, সূরা ফাতহ-২৮, সূরা আস সফ-৯)
ইতিহাস ও কুরআন,হাদীস এ কথার সাক্ষী যে, প্রত্যেক ঈমানদারকেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে জান ও মাল দ্বারা পূর্ণরুপে শরীক হতে হতো। কেনন দ্বীন ইসলাম শুধু নবীর একার জন্য আসেনি, আর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ নিশন্দেহে একটি বড় সামষ্টিক কাজ।
সূরা আস্ শুরার ১৩নং আয়াতেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ এসেছে-
“আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সেই দ্বীনকে নির্ধারিত করেছেন যা তিনি নূহ (আঃ) প্রতি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। আর আপনার প্রতি যে অহী নাযিল করেছি এবং আমি ইব্রাহীম, মূছা ও ঈসা (আঃ) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো বিচ্ছিন্ন হয়ো না।।
এ আয়াতটিতে কয়েকটি বিষয়ে বলা হয়েছে। আমরা দেখার চেষ্ঠা করব ইকামাতে দ্বীন সম্পর্কে কি বলা হয়েছে।
প্রথমেই বলা হয়েছে “তোমাদের জন্য বির্ধারিত করেছেন।” এখানে যে মূল আরবি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার আভিধানিক অর্থ রাস্তা তৈরি করা এবং এর পারিভাষিক অর্থ পদ্ধতি বিধি ও নিয়ম-কানুন রচনা করা। এই পারিভাষিক অর্থ অনুসারে আল্লাহর একটি বৈশিষ্ট ধরা হয় আইন প্রনেতা। আল্লাহই বিশ্ব জাহানের সবকিছুর মালিক, তিনিই মানুষের প্রকৃত অভিভবক এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়েই মতভেদ হোক না কেন তার ফয়সালা করা তাঁরই কাজ। কুরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের যে সব মৌলিক সত্য বর্ণিত হয়েছে তারই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে এই আইন ও বিধান দেয়ার অনিবার্য অধিকার তাঁরই। আর এভাবে তিনি তাঁর দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।
আয়াতটিতে যে ‘দ্বীন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার আরবী ভায়ায় তিনটি অর্থ রয়েছে-
১। অধিপত্য ও ক্ষমতা, মালিকানা ও প্রভূত্ব, ব্যবস্থাপনা ও সার্বভৌম ক্ষমতা এবং অন্যদের উপর সিদ্ধান্ত কার্যকারী করা।
২। আনুগত্য, আদেশ পালন ও দাসত্ব।
৩। অভ্যাস ও পন্থা-পদ্ধতি যা মানুষ অনুসরণ করে।
এ তিনটি অর্থের প্রতি খেয়াল ‘দ্বীন’ শব্দটি এমন পদ্ধতি ও আচরণকে বুঝায় যা মানুষ কারো শেষ্ঠত্ব স্বীকার এবং কারো আনুগত্য গ্রহণ করার মাধ্যমে অবলম্বন করে। এ শব্দটি যখন পন্থা বা পদ্ধতি অর্থে ব্যবহার করা হয় তখন তার অর্থ হয় এমন পদ্ধতি যা ব্যক্তির জন্য অবশ্য অনুসরণীয়। এ কারণে সম্পন্ন আইন বলার পরিষ্কার অর্থ হলো এটা শুধু সুপারিশ ও ওয়াজ-নসীহতের মর্যাদা সম্পন্ন নয়। বরং তা বান্দার জন্য মালিকের অবশ্য অনুসরণীয় আইন, যার অনুসরণ না করার অর্থ বিদ্রোহ করা। যে ব্যক্তি তা অনুসরণ করে না সে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর অধিপত্য, সার্বভৌমত্ব এবং দাষত্ব অস্বীকার করে।
আয়াতটির শেষাংশে দ্বীনকে কায়েম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী এ আয়াতাংশের অনুবাদ করেছেন “দ্বীন কায়েম করো।” শাহ রফিউদ্দিন ও শাহ আব্দুল কাদের অনুবাদ করেছেন “দ্বীন কায়েম রাখো।”
নবী-রাসূলগণ (আঃ) এ দুটি কাজ করতেই আদিষ্ঠত ছিলেন। তাঁদের প্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, যেখানে এ দ্বীন কায়েম নেই সেখানে তা কায়েম করা আর দ্বিতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল যেখানে তা কায়েম হবে কিংবা পূর্ব থেকেই কায়েম আছে সেখানে তা কায়েম রাখা। এ কথা সুস্পষ্ট যে কোন জিনিসকে কায়েম রাখার প্রশ্ন তখনই আসে যথন তা কায়েম থাকে। অন্যথায় প্রথমে তা কায়েম করতে হবে, তারপর তা যাতে কায়েম থাকে সে জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্ঠা চালাতে হবে।


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -মোঃ ইকবাল হোসেন

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes