আমাদের ঐক্য সময়ের দাবী

Print
Category: প্রবন্ধ নিবন্ধ
Published Date Written by মুহাম্মদ মোতাহের বিন সিদ্দিক

আমাদের ঐক্য সময়ের দাবী

মুহাম্মদ মোতাহের বিন সিদ্দিক


গোটা মুসলিম জাহান আজ ইসলাম বিরোধী শক্তির রোষানলে পতিত। তারা ইসলামকে তাদের বিরোধী শক্তি বিবেচনা করে মুসলমানদেরকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য আজ বড়ই প্রয়োজন ওদের সম্মিলিত কুফুরী শক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের ইস্পাত কঠিন ঐক্য। আর এই ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে দেশের আলেম সমাজের। আলেম সমাজ যদি ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করে এবং সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন করে তথা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে কুফুরী শক্তিগুলো পরাজিত হতে বাধ্য। কিন্তু আমরা তা না করে যে দোকানদারী মনোভাব নিয়ে দ্বীনদারী করছি। এবং ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দলাদলি করছি এবং ঐক্য বিনষ্ট করছি। তাতে আমরাতো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, জনগণকেও বিভ্রান্ত করছি। আমরা জনসাধরণকে বলছি এসো  ভাই আমার দলে আমার এ দ্বীনিখেদমতই একমাত্র খাঁটি। আমার উদ্ভবিত পন্থাই তোমাকে বেহেশতের দ্বারপ্রান্তে পোঁছিয়ে দিবে। এ যেন পাদ্রীদের বেহেশতের টিকেট বিক্রির প্রলোভন। ফলে জনসাধারণের আদালতে আমরা লা-জওয়াব হয়ে যাচ্ছি। তারা প্রশ্ন করছে আমরা কোন দলে ভিড়ব ? কাদের কথা মানব ? আপনারা সবাই তো ইসলামের কথা বলছেন। মানুষের আদালতেই যখন আমরা লা-জওয়াব হচ্ছি তখন আল্লাহর আদালতে আমাদের কী অবস্থা হবে ? আমরা একবার ও কি তা ভেবে দেখেছি ? মুসলিম জাতির এই চরম সংকটময় মুহুর্তে প্রয়োজন আমাদের পারস্পরিক দ্বিধা-দ্বন্ধ ভুলে গিয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ , মমত্ববোধ জাগ্রত করা এবং নিজের আমিত্বকে মিটিয়ে দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তা না হওয়ার পিছনে যে কারণগুলো কাজ করছে সেগুলো চিহ্নিত করে সে সম্পর্কে আমাদের খুবই সচেতন ও সাবধান থাকা।


প্রথমতঃ ইসলাম বিরোধীদের চক্রান্ত: তারা চায় আমরা মতবিরোধে লিপ্ত থাকি। আর এভাবে ঐক্য থেকে দূরে সরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পোঁছে যাই।


দ্বিতীয়তঃ প্রত্যেকেই নিজের কাজকে উত্তম ও যথেষ্ট মনে করি। এর ফলে সৃষ্টি হয় দ্বন্ধ আর দলাদলি। যার কারণে অন্যের সততা, যোগ্যতা, ইলম, তাকওয়া ও কাজকে খাট করে দেখার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। অন্য দলের কর্ম কান্ডকে তুচ্ছ মনে করা হয়।


আফসোস হয় দু:খ হয় তখন যখন দেখি কোন বিষয়ে ব্যক্তিগত রুচিবোধের ভিন্নতার কারনে মতবাদ কায়েম করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা হল আমরা অন্যের মতকে মেনে নিতে পারি না এবং ছাড় দেয়ার মত মনোভাবও রাখি না। যার দরুন ঐক্য এবং ইত্তেহাদ সৃষ্টি হয় না। এর দ্বারা শরীয়তের কোন বিষয়ে ছাড় দেয়ার কথা বলছি না। বুঝাতে চাচ্ছি আমরা আমাদের ব্যক্তিগত মতামতকে কখনো ছেড়ে দিতে পারি না। আজ রাসূল (সা:) এর ওয়ারিশদের মাঝে সুন্নতের অনুসরণের নামে বিভিন্ন পথ ও পন্থা তৈরী হয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। প্রত্যেকেই নিজ দল বা নিজ মতবাদকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এতে পরস্পরের মাঝে দ্বন্ধ ও হিংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একে অপরের থেকে বহু দূরত্বে অবস্থান করছে।


আজ ক্ষুদ্র থেকে অতি ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মতবেদ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে মতবেদ নামধারী মতবিরোধ পারস্পরিক বিদ্ধেষ, শত্রুতা ও সংঘাত সহিংসতার জন্ম দেয় তা কিছুতেই ইখলাস পূর্ণ, দ্বীনের জন্য এবং মুসলমানের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বরং তা হবে স্বার্থ হাসিল, ধনলিপ্সা, তথা চাকচিক্যময় দুনিয়া ও দুনিয়ার কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব লাভের উদ্দেশ্যে, যদিও তা দ্বীনি খেদমতের ছদ্মাবরণে হয়। কারণ ইখতেলাফ ও মতভেদের চূড়ান্ত সীমারেখা হল স্বীয় জ্ঞান ও যুক্তির মানদন্ডে যা অধিক যুক্তিযুক্ত তা গ্রহন করা এবং ভিন্নমত পোষণকারীর সাথে কিছুতেই সংঘাতে না যাওয়া। দ্বীন শরীয়তের যে কোন বিষয়েও এটাই হওয়া উচিৎ আমাদের প্রত্যেকের কর্মপন্থা। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সমাজের শ্রদ্ধেয় অনেক আলেম-উলামা, পীর মাশায়েখ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবি নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিপূর্ণ নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ইখলাসের সহিত ইসলামের দাওয়াত, তাবলীগ, তা’লীম-তারবিয়াত, তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি এবং সমাজ সংস্কারমূলক দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় নিয়োজিত আছেন। আর তাদের দ্বারা ইসলাম ও মুসলিম জাতির প্রভূত কল্যাণও সাধিত হচ্ছে। দ্বীনের উল্লেখিত বিভিন্নমূখী খিদমতে নিয়োজিত আলেম সমাজ যদি সমন্বিত প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বাতিলের মুকাবেলায় এবং নববী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হতো, তবে প্রতিটি দল আপন কর্মসূচীর আওতায় থেকেও খোদাদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে এক বিশাল অপ্রতিহত শক্তিতে পরিণত হতো। আর সবার সম্মেলিত প্রয়াস ও যৌথ কর্মসূচীর দ্বারা ইসলাম এবং মুসলিম জাতির অনেক জটিল ও কঠিন সমস্যার সহজে সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, আজ ইসলামের নামে প্রতিটি দল ও সংগঠন নিজেদের সকল চেষ্টা সাধনা দলীয় সংকীর্ণতায় সীমাবদ্ধ করে কার্যত ইসলামের সুবিশাল খেদমতকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। একদল অপরদলের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘাতে লিপ্ত না হলেও ঘৃণা ও অবজ্ঞা করা হচ্ছে। পরিণামে পরস্পরের মাঝে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ছে।


বস্তুত এধরনের বিভেদ ও অনৈক্যের প্রধান উৎস হলো কর্ম পদ্ধতির বিভিন্নতা। কারণ প্রতিটি দল ও সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য যদিও অভিন্ন, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পন্থা বিভিন্ন। কেউ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শিক্ষা দীক্ষার মহান দায়িত্ব আনজাম দিচ্ছেন। কেউ দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত আছেন। কেউ সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধ সৃষ্টিতে তৎপর রয়েছেন। আবার কেউ ফতোয়ার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সমস্যার শরয়ী সমাধান দিচ্ছেন। কেউ বক্তৃতা ও লিখনীর মাধ্যমে বাতিলের মুখোশ উন্মোচনে সদা তৎপর আছেন। দ্বীনি খেদমতের উল্লেখিত শাখাসমূহ বাহ্যত বিভিন্ন মনে হলেও বাস্তবতা ও লক্ষ উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তবে কাজের ধরন ও কর্মক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার ফলে স্বভাবতই সবার পালনের পদ্ধতি ও পন্থা বিভিন্ন। আর তাই প্রতিটি দলেরই রয়েছে নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত এক সুনির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র , যা দলের প্রত্যেক সদস্যকেই মেনে চলতে হয়। কিন্তু তাই বলে এ গঠনতন্ত্র ও সংবিধান কুরআন-হাদীস নয় যে, তা লঙ্ঘন বা পরিবর্তন করা যাবে না। বরং সময় ও সমাজের দাবী অনুযায়ী পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট তাতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা তা আংশিক বা সম্পূর্ণ বর্জন বা রহিত করে নতুন গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচী রচনা বিবেক ও যুক্তির দাবী এবং সর্বজন স্বীকৃত নীতি।


কিন্তু দু:খজনক সত্য এই যে, প্রতিটি দলই চরম সংকীর্ণ মনেবৃত্তির কারনে নিজেদের বিধিবদ্ধ নীতিমালা এবং কর্মসূচীকে ফরজ ওয়াজিবের ন্যায় অলঙ্ঘনীয় বিধান মনে করেন। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের একজন কোন কথা বললে তো অপরজন এর বিরোধীতা করে। একজন যদি কোন কর্মসূচী দেয় তাহলে অপরজন তাতে সমর্থন দেয় না। এবার সে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যত বড় মহৎ উদ্যেগই গ্রহন করুক কিংবা ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার করুক না কেন।  না দেয়ার পিছনে যুক্তি হচ্ছে, উনি আমাদের সাথে পরামর্শ করেন নি। তাই আমরাও আলাদা কর্ম সূচী দেব। আমাদের কি জনসমর্থন কম আছে ? এভাবে আলাদা কর্মসূচী দিতে গিয়ে দেখা যায় আমাদের করো কর্মসূচীই সফলতার পথ দেখে না। আমাদের এই ‘হাম বড়া’ মানুষিকতার কর্মসূচীর দ্বারা না কোন লাভ হয় ইসলামের না কোন উপকার হয় মুসলমানদের।  মাঝখানে আমাদের কর্মী সমর্থকদের বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। আর আমাদেরকে হতে হয় লাঞ্চিত ও অপমানিত। আমাদের কর্মসূচী দাতারা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে একসাথে মিলেমিশে কর্মসূচী দেন তাহলে কোন বাধার প্রাচীর আমাদেরকে রুখতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ আমাদের সামনে কেউ কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। পাহাড়সম বাধাও পারবে না আমাদের সামনে দাঁড়াতে। কোন অস্ত্র বা শক্তি পারবে না আমাদের সামনে টিকে থাকতে। কারণ আমাদের কাছে আছে ঈমানী শক্তির অপ্রতিরুদ্ধ অস্ত্র। সর্বোপরি পরাক্রমশালী মহা স¤্রাট আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আছেন আমাদের মদদগার। আমাদেরকেই তো বলা হয় নবী রাসূল গণের ‘উত্তরসূরী’। রাসূল সা: এর রেখে যাওয়া আলো (কোরআন হাদীসের বানী) জনগণের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব ও কর্তব্য তো আমাদের এবং এই আলো প্রজ্জ্বলিত রাখাও আমাদের কর্তব্য। আজ সেই আলো নিভিয়ে দেয়ার জন্য সমস্ত অপশক্তি একজোট হয়ে সর্বশক্তি ব্যয় করে ফুৎকার দিচ্ছে। তারপরও আমরা অচেতন হয়ে পড়ে আছি। আমরা সঠিক ও সমোপযোগী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা। এখনো আমরা অনৈক্যের পথে চলছি। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি না। আর এই সুযোগে আমাদের হক্কানী ওলামায়ে কেরামদেরকে সুন্নি নামধারী কিছু বিদআতিরা বলছে কাফির এবং ক্ষমতাসীনদের পা চাটা তাবেদার ও চাটুকার, জাহেলরা বলছে ধর্ম ব্যবসায়ী। (এ রকম চাটুকার সব যুগে ক্ষমতাসীনদের গোলাম সেজে ইসলামের ক্ষতি সাধনে লিপ্ত ছিল) এসব জাহেলদের ব্যাপারে সব সময় হক্কানী ওলামায়ে কেরাম সোচ্ছার ছিলেন, এবং জাতিকে সতর্ক করেছেন। আমাদেরকে ও এদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। আর এমন কিছু লোক আছে যারা নিজ স্বার্থে কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা দিচ্ছে যাদের কুরআন সম্পর্কে তেমন ধারনা ও নেই। তাদেরকে সূরা ফাতেহা বলতে বললে সঠিক উচ্চারণে বলতে পারবে না। অথচ তারাই হক্কানী আলেমদের বলছে ধর্মব্যবসায়ী, ফতোয়াবাজ, ধর্মান্ধ। তারা এই সাহস কোথায় পেল ? তা একমাত্র আমাদের অনৈক্যের কারণে পেয়েছে।


হে শ্রদ্ধেয়! আমি রাহিব ও পাদ্রীদের সঙ্গে আমাদের ইখতেলাফের কথা বলছিনা, শিয়া-সুন্নিদের সাথে অনৈক্যের কথা বলছিনা। আমি আপনাদেরকে রেজবী, কাদিয়ানী, দেওয়ানবাগীর সঙ্গে মতানৈক্যের কথা শুনাচ্ছি না, মওদূদী পন্থীদের সাথে আহলে হকের মতভেদের কথা বুঝাতে চাইনা। আমি যাদের ইখতিলাফ ও অনৈক্যের কথা বলছি তারা শুধু একই কালিমায়, একই কুরআন, একই মাজহাব হানাফীতে বিশ্বাসী তাই নয় বরং একই নিছবত দেওবন্দীতেও পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। এসব ইখতিলাফ এবং অনৈক্যের কথা তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে এসকল অনৈক্য এবং মতভেদের পেছনে যে কারণগুলো আছে তা স্পষ্ট করাই আমার মনের অভিপ্রায়। হে আমার শ্রদ্ধেয় উলামায়ে কেরাম, আপনারা আমাদের মাদানী, থানবী, আপনারাই হলেন আমাদের জন্য যুগের রশীদ আহমদ গঙ্গোহী, কাছেম নানুতুবী, শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী, আপনারা আমাদের জন্য এযুগের ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী, সৈয়দ আহমদ বেরেলভী। আপনারা আমাদের জন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন এই পৃথিবীতে একমাত্র আলোর দিশারী। ইলমী ও আমলী ময়দানে টিকে থাকার জন্য আপনারাই হলেন আমাদের প্রেরণার মূল শক্তি। আপনারা হলেন আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। আপনাদের রূহানী বয়ান শুনে আমাদের হৃদয় কূলে কান্নার ঢেউ আছড়ে পড়ে। যেন শুস্ক মরুভূমিতে শীতল পানির ঝাপটা। আপনাদের থেকেই আমরা শিক্ষা গ্রহন করি গীবত, শেকায়েত, হিংসা-বিদ্বেষ, উজব, অহংকার সহ সকল প্রকার পাপাচার থেকে মুক্ত হওয়ার। বাতিলের আস্ফালন দেখে আমরা যখন হিম্মত হারা হয়ে যাই, তখনো আপনারাই হলেন আমাদের মনোবল ও চেতনার উৎস। আমরা আকাবিরদের ইতিহাস পড়ে তাদের জন্য যেভাবে গৌরব বোধ করি, আপনাদের ইতিহাস পড়ে আগামী প্রজন্মও সেভাবে গর্ববোধ করবে। কিন্তু আজ নির্বাক হয়ে আমরা কি দেখছি? কি হচ্ছে এসব ? সবকিছু যেন এলোমেলো। গোটা মুসলিম কওমী অঙ্গন এখন বিভক্ত। আমরাই আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের অস্তিত্বের উপর আমরাই আঘাত করে চলছি। হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। নবীন আলেম সমাজ আজ পথহারা হয়ে যাচ্ছে। কাকে ধরবে আর কাকে ছাড়বে ? সকলেই তো আমাদের । এ যেন নতুন রূপে জঙ্গে জামাল আর জঙ্গে সিফফীন। মুখলিস তালাবাদের আহাজারী শুভাকাঙ্খীদের রোনাজারী কেউ শুনছেন না। শুনারও যেন কেউ নেই। শত্রু পক্ষ হাত তালি দিচ্ছে। মনের আনন্দে শিষ বাজাচ্ছে। বাতিলের অট্টহাসিতেও যেন আমাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগছে না। বাতিল শক্তি ও তাগুতি শক্তি আমাদের মতবিরোধ ও মতানৈক্যকেই আমাদের বিরুদ্ধে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি আমাদের আকাবির কাছেম নানুতুবী (রহ:), শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (রহ:) এর পবিত্র রুহ যেন আমাদের ডেকে ডেকে বলছেন, হে আমাদের সন্তানেরা! তোমরা এবার থাম, বিভেদ, মতবিরোধ, মতানৈক্য নিয়ে আর সামনে অগ্রসর হয়োনা। নিজেদের বিরোধ, ভেদাভেদ ভুলে যাও। এখন মতবিরোধ ও মতানৈক্যের সময় নয়। তাড়াতাড়ি ঐক্যবদ্ধ হয়ে একই প্লাটফর্মে চলে আস। সব বিষয়ে একে অন্যকে প্রাধান্য দাও। হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ:) , শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ:) এর পবিত্র আত্মা যেন আমাদের এ ইখতেলাফ ও পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে কষ্ট পাচ্ছে।


আমাদের আন্দোলন হওয়ার কথা ছিল তাগুতের বিরুদ্ধে, আমাদের সংগ্রাম তো চলবে ইলাহবাদ ও নাস্তিক্যবাদের মূলে আঘাত হানতে। আমাদের কর্মসূচী তো হবে মানব রচিত মতবাদ উৎখাতে। আমাদের প্রতিবাদতো হবে ফতোয়া বিরোধী রায়, বিতর্কিত শিক্ষানীতি, বিতর্কিত বিবাহ আইন ও পর্দা বিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে। আমাদের বিপ্লব তো হবে জিহাদের পক্ষে। আমাদের বিদ্রোহ হবে তো আল্লাহর আইনের বিরোধীতাকারী ও রাসূল (সা:) এর কটুক্তি কারীদের বিরুদ্ধে। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তুত হতে হবে। কিতাবী তালীমের পাশাপাশি শারিরীক তারবিয়তের মাধ্যমে। কিন্তু না, আমরা স্বীয় হস্তে নিজেদের অঙ্গকেই টুকরো টুকরো করার কাজে ব্যস্ত। ঘরোয়া যুদ্ধে লিপ্ত থাকার কারনে আমরা আমাদের বহু লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হতে পারছিনা। অনেক কর্মসূচীর সুফল আমরা হাতের কাছে পেয়েও হারিয়ে ফেলেছি একমাত্র আমাদের অনৈক্যের কারনে।


আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে না পারার পিছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে নেতৃত্বের মোহ। আমি মনে করি আমি বড় যোগ্যতা সম্পন্ন। আমি নিজেই নেতৃত্ব দিব। আমি কেন অন্যের নেতৃত্ব মানব ? এভাবে প্রত্যেকেই এসব ধারনা পোষণ করে থাকি। এসব কারনে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না। দ্বীনের জন্য, ইসলামের জন্য, মুসলমানদের জন্য আমাদরকে কাজ করতে হবে একান্ত নি:স্বার্থভাবে।ক্ষমতার মোহ ছেড়ে, নেতৃত্বের মোহ ছেড়ে এগিয়ে আসতে হবে। দেখতে হবে আমাদের আকাবিরদের জীবনী। চলতে হবে তাদের প্রদর্শিত পথে।


বালাকোট বিপর্য়য়ের পর ১৮৫৭ সালে ভারত বর্ষের বড় বড় আলেমদের অংশ গ্রহনে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল উলামা কনফারেন্স। এতে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন মাওলানা জাফর থানেশ্বরী (রহ:) মাওলানা বেলায়েত আলী (রহ:) হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ:) মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহ:) মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গুহী (রহ:) প্রমুখ। তারা একেকজন ছিলেন ইলমের জগতে একেকটা মহাসমুদ্র, আমলের জগতে ছিলেন উজ্জল নক্ষত্র, খোদভিতীতে ছিলেন অতুলনীয়। নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সবাই ছিলেন সুযোগ্য। কিন্তু তারপরও তারা আলাদা না থেকে একসাথে বসে একই প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্ব সম্মতিক্রমে একজনকে আমীর বানিয়ে তার নেতৃত্বে আন্দোলন করেছেন, ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে। অথচ আমরা তাদের উত্তরসূরী দাবী করি। কিন্তু তাদের প্রদর্শিত পথে চলি না।


আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে যত দেরী করব, আমাদের শক্তি তত নি:শেষ হয়ে যাবে। আমরা দুর্বল হয়ে পড়ব। আর আমাদের উপর জুলুম নির্যাতনের মাত্রাও তত বাড়তে থাকবে। কারণ তারা জানে আলেম এবং কুরআন মুসলমানদের মাঝে যতদিন থাকবে ততদিন মুসলমানদেরকে ধ্বংস করা যাবে না। তাই মুসলমান ধ্বংস করতে হলে, দুনিয়াকে পাপাচারে ডুবাতে হলে, হিন্দুইজম, কমিউনিজম, সেকুলারিজম প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে হক্কানী আলেমদের ধ্বংস করতে হবে। আজ সমস্ত বাদ-বিবাধ ভুলে গিয়ে একই প্লাটফর্মে অবস্থান করে কাজ করার জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সমস্ত শোষণ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতে হবে। না হয় সেই দিন বেশী দূরে নয়, ঢাকার রাজপথের খুঁটিগুলো হবে আলেমদের ফাঁসির কাষ্ঠ। আলেমদের ধরে ধরে নির্দিধায় খুন করা হবে। (যার কিছু নমুনা বর্তমানে ও দেখা যাচ্ছে) তখন প্রতিবাদ করার জন্য পাওয়া যাবেনা একজন হক্কানী আলেমকেও। জাতিকে পথ দেখানোর জন্য পাওয়া যাবে না আলোর মশালবাহী কাউকে। বৃটিশ বেনিয়াদের শাসনামলে যে হাজার হাজার আলেমকে আগুণে পুড়িয়ে শহীদ করা হয়েছিল তাও স্বরণ রাখতে হবে। ঐতিহাসিক টমসনের ভাষ্যমতে ১৮৬৪ ঈসায়ী থেকে ১৮৬৭ ঈসায়ী পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে ইংরেজরা ১৪ হাজার আলেম ওলামাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শহীদ করেছিল। দিল্লির চাঁদনী চক থেকে নিয়ে খায়বার পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এমন কোন গাছ ছিল না যে গাছে কোন না কোন আলেমকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া কুরআন মাজীদের লক্ষ লক্ষ কপিও জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিয়েছিল। এরকম মর্মান্তিক ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি যেন আবারও না ঘটতে পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এখনও সময় আছে আমাদের দল মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে এমন কোন অপশক্তি নেই ইসলামের বিরুদ্ধে আইন করে বা কটুক্তি করে পার পেয়ে যাবে। আর আমরা যদি এই আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত থাকি যে, আমরা লক্ষাধিক আলেম ওলামা ও অর্ধকোটি তালেবে ইলম থাকতে ও কি আমাদের শেষ করতে পারবে ? আবার কেউ যদি মনে করে আমি ইমাম বা খতীব সাহেব। আমি মসজিদে নামাজ পড়াই আমি কোন ঝামেলায় নেই। আমার উপর কেন বিপদ আসবে ? মুয়াজ্জিন সাহেব যদি মনে করেন আমি পাঁচ ওয়াক্ত আযান দেই, মসজিদের খেদমত করি, আমি নিরাপদ থাকবো। মাদ্রাসার শিক্ষক যদি মনে করেন আমি ওস্তাদ, ছাত্রদেরকে কুরআন হাদীস শিক্ষা দেই, আমিও বিপদ মুক্ত। পীর সাহেব যদি মনে করেন আমি পীর সাহেব মানুষকে মুরীদ বানানো আমার কাজ, আমি আছি খানকা নিয়ে দুনিয়ার কোন ঝামেলায় আমি নাই। আবার কেউ যদি মনে করেন আমি আছি দাওয়াত নিয়ে, আমিও হেফাজতে থাকব। এরকম মনোভাব আমাদের হলে সেটা হবে নিছক বোকামী ও আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র। এবং মারাত্মক ভূল মনোভাব। কারণ মুসীবত যখন আসবে তখন দেখবে না কে ইমাম, কে মুয়াজ্জিন, কে পীর, কে ওস্তাদ। মুসীবত সবার উপর একসাথে আসবে। তখন নিজের ঈমান বাঁচানো এবং অস্তিত্ব রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। যেমন বোখারী শরীফের প্রণেতা মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বোখারীর জন্ম স্থান বোখারা এবং সমরকন্দ এক সময় ছিল আলেম ওলামা এবং তালেবে ইলমদের তীর্থস্থান, সমরকন্দ, বোখারার জমিন আলেম ওলামার পদচারণায় থাকত মুখরিত। আজ সেই বোখারা, সমরকন্দে একজন বিশিষ্ট আলেম খুজে বের করতে বেগ পেতে হবে। সেখানে আজ শুধু কমিউনিষ্ট শাসনের জুলুম নির্যাতন চোখে পড়ে। চারদিকে কুফুরী শক্তির জয়জয়াকার আছে। হাতে গোনা কিছু মসজিদ-মাদ্রাসা বিদ্ধমান থাকলেও আগের মত ইসলামী সেই তাহ্জীব তামাদ্দুন নেই, নেই ওলামা, তালেবে ইলমদের পদচারনা। সমরকন্দ বোখারার জমিন আজ নীরবে কাঁদছে। সেই কান্না শোনার মতোও কেউ নেই। সেই কান্না দেখার মতোও কেউ নেই। সেই কান্না অনুভব করার মতোও কাউকে পাওয়া যায়না। যারা আছে তারা জুলুম সয়ে সয়ে অতীত ভুলের মাসূল দিচ্ছে। জোরালোভাবে তারা কোন কথা বলতে পারছে না। স্বাধীনভাবে ধর্ম কর্ম পালন করতে পারছে না। পারছেনা কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। আমাদের অবস্থাও এরকম হতে যাচ্ছে। আমাদের একজনকে যদি কেউ কটুক্তি বা বিদ্রুপ করে তবে অন্যজন তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। এই ভেবে যে আমাকে তো কিছু বলছে না। আমি নিরাপদে আছি। একজনকে অপমান করলে যে সবার অপমান এই আত্মমর্যাদাবোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছি আমরা। কিছুটা এই গল্পের মত। এক ডাকাত ডাকাতি করতে বের হয়ে পথিমধ্যে তিনজন লোক পেয়ে গেল। তখন সে চিন্তা করতে লাগল কিভাবে এদের সবকিছু লুটে নেওয়া যায়। এরপর সে মনে মনে একটা ফন্দি আঁটল। এবং সেই তিনজন পথিকের কাছে গিয়ে দুইজনকে উদ্দেশ্য করে বলল আমরা তিনজন বন্ধুত্ব করি।বন্ধুত্বের ফাঁদ বসিয়ে বলল আমাদের তিনজনের বাহিরে এই ব্যক্তি আগাছা। একে হত্যা করে এর মালামাল গুলো আমরা ভাগ করে নিয়ে যাবো। ডাকাতের কথা মতো সেই লোকটিকে হত্যা করা হল। এবার সেই ডাকাত দ্বিতীয় জনকে বলল: আমাদের দুইজনের মাঝে এই লোকটিও ঝঞ্ঝাল। একেও হত্যা করে এর মালগুলো ভাগ করে নিয়ে যাবো। একে একে দুইজনকে হত্যা করার পর এবার তৃতীয় জনকে বলল: এবার তোমার পালা, তুমি লোভে পড়ে আমার ধোকায় পড়ে নিজ সাথীদের হত্যা করেছ। আমার কথা না শুনে তিনজন মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাকে পরাজিত করতে পারতে। কিন্তু তোমরা তা করোনি। এবার তুমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। এই বলে তৃতীয় লোকটিকেও হত্যা করে ফেলল। পাঠক তিনজন আগন্তুক পথিক ডাকাতকে সহজেই কুপোকাত করতে পারতো। কিন্তু নিজেদের স্বার্থপরতা ও অনৈক্যের কারণে তাদের তিনজনকেই জীবন দিতে হলো। আমাদের অবস্থা যেন এরকম না হয়। (একজনকে গালি দিবে অন্যজনকে বাহবা দিবে। একজনকে খুন করবো অন্যজনকে পুরস্কৃত করবে) একজনকে মন্ত্রিত্ব দিবে অন্যজনকে কারাগারে নিয়ে নির্যাতন করবে। সেদিকে দৃষ্টি রেখে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বর্তমানে সকল মতবিরোধ ভুলে গিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প পথ নেই।


আমাদের দেশটা এখন আরেকটি তুরস্ক হওয়ার দিকে এগিয়ে চলছে। দেশকে ইসলাম শূণ্য ও কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র
বানানোর পাঁয়তারা চলছে। তুরস্কের সিংহ পুরুষ হিসেবে পরিচিত ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু, স্বধর্ম ত্যাগী মুরতাদ কামাল আতাতুর্ক যেমনি করে সালতানাতে ইসলামীয়া ধ্বংস করে ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ফতোয়া নিষিদ্ধ করেছিল, আযান, নামাজ, পর্দা, দাঁড়ি-টুপি নিষিদ্ধ ও কুরআন পড়া নিষিদ্ধ করেছিল। ধর্মীয় সকল সমাবেশ নিষিদ্ধ, ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। ঠিক তেমনিভাবে একইভাবে আমাদের দেশের কর্তা ব্যক্তিরাও ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে কামাল আতাতুর্কের ন্যায় দেশকে ইসলাম শূণ্য করতে চায়। এজন্য সু-কৌশলে একের পর এক ইসলামী বিধানগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করছে। নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার বিরুদ্ধে পরিপত্র জারি করেছে। মুসলমানদের সন্তানদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার জন্য বিতর্কিত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। সংবিধান সংশোধনের নামে আল্লাহর উপর আস্থা-বিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে। কুরআন বিরোধী নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ প্রণয়ন করেছে। আজ রাম, বাম, ইহুদী, খ্রিষ্টান ও তাদের চেলা চামুন্ডারা সব একজোট হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মুসলমান নামধারী কতিপয় দেশীয় মীর জাফর তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সহযোগীতা করছে। বিশ্বের মিডিয়া গুলোও তাদের দখলে রয়েছে। তারা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে প্রচার করছে। তারা যা বলছে মানুষ তাই বিশ্বাস করছে। তারা ইসলামকে বিকৃত রূপে উপস্থাপন করে ফিৎনা সৃষ্টি করছে। মানুষের মনে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করছে। হক্কানী আলেমদের ব্যাপারে কটূক্তি করছে। এই মুহুর্তে তাদের (রাম, বাম, ইহুদী, খ্রিষ্টান ও তাদের চেলা-চামুন্ডাদের) সকল ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করে জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য হক্কানী ওলামায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। পরিশেষে একটি গল্প বলে শেষ করছি। গল্পটি আমার মা-বাবা আমাদেরকে প্রায় সময় বলতেন। এক লোকের মৃত্যু যখন সন্নিকটে তখন তাঁর পাঁচ ছেলেকে ডেকে বলল: তোমরা একেকজন একটি করে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে এসো। কিছুক্ষণ পর ছেলেরা একটি করে কঞ্চি নিয়ে আসলো। লোকটি পাঁচটা কঞ্চিকে একসাথে আঁটি বেঁধে বড় ছেলের হাতে দিয়ে বললো: এটাকে ভাঙ্গো। বড় ছেলে অনেক চেষ্টা করেও ভাঙতে পারলোনা। এরপর মেজো ছেলেকে দিলো, সেও ভাঙতে পারলোনা। এভাবে একে একে পাঁচ ছেলেকে দিলো কিন্তু কেউই কঞ্চিগুলো ভাঙতে পারলো না। তারপর লোকটি কঞ্চিগুলো খুলে আলাদা করে প্রত্যেকের হাতে একটা করে কঞ্চি তুলে দিয়ে বললো এবার ভাঙ্গ। এবার খুব সহজেই ছেলেরা নিজ নিজ কঞ্চিটি ভেঙ্গে ফেললো। তখন লোকটি বলল: দেখ তোমরা পাঁচ ভাই যদি সবসময় এইভাবে ঐক্যবদ্ধ থাক তাহলে কেউ কোনদিন তোমাদেরকে ভাঙতে পারবে না। তথা তোমাদের কেউ কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি তোমরা পৃথক পৃথকভাবে ও বিক্ষিপ্তভাবে থাকো তাহলে শত্রুরা সহজেই তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে, এবং তোমাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করে দিতে পারবে।


হে আমার শ্রদ্ধেয় উলামায়ে কেরাম আপনাদের খিদমতে জাতির পক্ষ থেকে এই নালায়েক নাখান্দার করজোড় আরজ , আর ইখতেলাফ নয় এখন প্রয়োজন ইত্তেহাদের। চারদিকে থেকে একের পর এক ইসলাম এবং মুসলমানদের উপর আঘাত আসছে। যেন ধেয়ে আসছে কাল বৈশাখী ঝড়। আল্লাহ এবং আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসূল (সা:) কে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হচ্ছে । এসব যদি এখনই প্রতিহত করা না যায় তাহলে আর বন্ধ করা সম্ভব হবে না।


অতএব সময় থাকতে এখনই গর্জে উঠতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল বাতিলের বিরুদ্ধে। তাই নিজেদের ইলমী প্রজ্ঞা  ও আত্মশুদ্ধির দীক্ষা মতে অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুস্বরণীয় ইতিহাস রচনা করুন। আপনারা হলেন আমাদের রাহবার। আজ যুগের রাহবারদের দুর্বলতার কারনে ইসলামের আলো নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। এককালের বিশ্বজয়ী মুসলিম জাতি ঈমান-আমলের দূর্বলতা, কর্মবিমূখতা, জ্ঞানের স্বল্পতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক কলংকময় ইতিহাস রচনা করে চলছে। তারা ভুলে গেছে নিজেদের সোনালী ইতিহাস, হারিয়ে ফেলেছে গৌরবময় ঐতিহ্য, খুয়ে বসেছে আকাশ ছোঁয়া হিম্মত,, দৃঢ়চেতা মন ও দ্বীপ্ত ঈমান। হতাশা ও আত্মবিস্মৃতি পুরো জাতিকে অবশ করে রেখেছে। এক সময়ের সিংহ শার্দূলদের এখন আকৃতিই বাকি আছে প্রকৃতি নেই। দেহটাই আছে আত্মা নেই। দুনিয়া জুড়ে ইসলামের বিজয় কেতন ওড়ানোর মহৎ উদ্যোগ নেই। নেই তাদের হৃত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের কোন শুভচিন্তা। উপরন্ত সবাই বিভ্রান্ত হয়ে রয়েছে। এই দিক ভ্রান্ত সত্য মিথ্যার মোহনায় দন্ডায়মান মুসলিম উম্মাহকে মুক্তির দিশা দিতে হবে। সহীহ ঈমানের প্রশিক্ষণ দিয়ে পার্থিব ঘনিষ্ঠতা বর্জন করে পরকালমূখী করতে হবে এ জাতিকে। ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণোজ্জল ইতিহাসের প্রতি তাদের উৎসাহিত করতে হবে। যুব সমাজকে উন্নত চরিত্র ও বুলন্দ হিম্মতের দীক্ষা দিতে হবে। যুগের রাহবার উলামায়ে কেরামকে অবশ্যই এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। ত্যাগ করতে হবে তুচ্ছ দুনিয়ার মোহ আর দূর করতে হবে সকল প্রকার গাফলতি। উলামায়ে কেরামকে উম্মাহর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। হতে হবে কঠোর পরিশ্রমী ও বুলন্দ হিম্মতের অধিকারী।


সায়্যিদ আবুল হাসান নদভী (রহ:) বলেছেন: রাসূল (সা:) মাত্র তেইশ বছর নবুওতি জিন্দেগীতে সর্ব যুগের বর্বর জাহেলদের নিকট দ্বীন প্রচার করে একটি তাগুতী সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে চুরমার করে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হয়েছেন একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা, লোভলালসাহীন ব্যক্তিত্ব, সহানুভূতিশীল মানসিকতা, কঠোর পরিশ্রম এবং বুলন্দ হিম্মতের অধিকারী হওয়ার কারনে। আজ যদি ওয়ারিসে আম্বিয়ারা (উলামায়ে কেরাম) রাসূল (সা:) এর পরিপূর্ণ অনুসারী হতো সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের অনুগামী হতো, তাহলে জাতির এ বেহাল দশা হতো না। অতএব আর সময় ক্ষেপন নয় সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বজ্র কন্ঠে হুংকার দিয়ে, মনে সাহস ও হিম্মত নিয়ে দিকভ্রান্ত মুসলিম উম্মাহকে মুক্তির পথ দেখাতে জেগে উঠুন হে সিংহ শার্দূল শ্রদ্ধেয় উলামায়ে কেরাম।


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: মুহাম্মদ মোতাহের বিন সিদ্দিক

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes