উপমহাদেশের অতীত রাজনীতির খণ্ড চিত্র//৩

Print
Category: ইতিহাস ঐতিহ্য
Published Date Written by এ.কে.এম. নাজির আহমদ

উপমহাদেশের অতীত রাজনীতির খণ্ড চিত্র

-এ.কে.এম. নাজির আহমদ


(সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭তম সংখ্যার পর...)

দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের স্বাধীনতা অর্জন

  • দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠন

১৮৮৫ সনে গঠিত হয় দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। 
ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার অ্যালেন অকটেভিয়ান হিউম বৃটিশ সরকার ও ভারতীয়দের মধ্যে মত আদান-প্রদানের জন্য একটি প্ল্যাটফরমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
এই লক্ষ্যে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রসহ অনেকের সাথে মত বিনিময় করেন। ভাইসরয় লর্ড ডাফেরিনের সম্মতি হাছিল করে তিনি ‘দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন’ গঠনের উদ্যোগ নেন। স্থির হয়, প্রতিষ্ঠা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে পুনাতে। কিন্তু পুনাতে কলেরা দেখা দেওয়ায় সম্মেলন স্থল হিসেবে বোম্বাইকে বেছে নেওয়া হয়। বোম্বাইতে অবস্থিত এড়শঁষফধং ঞবলঢ়ধষ ঝধহংশৎরঃ ঈড়ষষবমব- এ ২৮ থেকে ৩১শে ডিসেম্বর, ১৮৮৫ তারিখে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বাহাত্তর জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সম্মেলনে যোগদান করেন।
এঁদের মধ্যে ছিলেন বোম্বাই থেকে ৩৭ জন এবং মাদ্রাজ থেকে ২২ জন প্রতিনিধি। বাংলা থেকে যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জি ও সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। তিনজন বৃটিশ ছিলেন এই ৭২ জনের মধ্যে। এঁরা হচ্ছেন অ্যালেন অকটেভিয়ান হিউম, উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন ও জন জারডাইন। এই সম্মেলনে দুই জন মুসলিম প্রতিনিধিও ছিলেন।
আলোচনান্তে এই সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জি।
জেনারেল সেক্রেটারি হন অ্যালেন অকটেভিয়ান হিউম।
দাদাভাই নওরোজি, দীন শ ওয়াচা, মনমোহন ঘোষ, মহাদেব গোবিন্দ রানাদে প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সম্মেলন অলংকৃত করেন।
স্যার সাইয়েদ আহমাদ খান মুসলিমদেরকে সযত্নে কংগ্রেসের সংশ্রব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কংগ্রেস দ্বারা মুসলিমদের কোন উপকার হবে না।

  • পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠন

১৯০৫ সন।
প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উন্নয়ন, আইনশৃংখলা সংরক্ষণ ও দ্রুততার সাথে প্রশাসনিক কার্যক্রম নিষ্পন্ন করার প্রয়োজনে তদানিন্তন ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৫ সনের ২০শে জুলাই ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ’ গঠনের ঘোষণা দেন।
বর্তমান বাংলাদেশ ও আসাম ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জিলা ও জলপাইগুড়ি জিলা এই প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
ঘোষণার পরপরই শুরু হয় প্রতিক্রিয়া।
১৯০৫ সনের ৭ই অগাস্ট।
কলকাতা টাউন হলে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতি কাসিমবাজারের জমিদার মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী বলেন, ‘নতুন প্রদেশে মুসলমানরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর হিন্দুরা হবে সংখ্যালঘু। হিন্দুরা স্বদেশেই আগন্তুক হবে। এর সম্ভাবনা নিয়ে শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায় ভীত এবং স্বজাতীয়দের ভবিষ্যতের চিন্তায় মুহ্যমান।’
১৯০৫ সনের ২২শে সেপ্টেম্বর কলকাতা টাউন হলে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরের সন্তান লালমোহন ঘোষ। সভাপতির ভাষণে তিনি বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।
১৯০৫ সনের ২৩শে সেপ্টেম্বর কলকাতার বাগবাজারে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব বাংলার বিবাড়িয়া জিলার কংগ্রেসী নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রসূল। সভাপতির ভাষণে তিনি নতুন প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।
১৯০৫ সনের ১৬ই অকটোবর পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ কার্যকর হওয়ার দিন।
ঐ দিন প্রত্যুষে কলকাতায় ‘রাখি’ বা ‘রক্ষা বন্ধন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবাদীরা দিনের কার্যক্রম শুরু করেন। দিনটিকে তারা শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জি দিনটিকে ‘মহা দুর্যোগের দিন’ বলে অভিহিত করেন। রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর পরামর্শে ঐদিন রান্না করা বা উনুন জ্বালানো নিষিদ্ধ হয়।
ঐদিন কলকাতার বিডন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় সভাপতিত্ব করেন দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা আনন্দ মোহন বসু। রোগাক্রান্ত ছিলেন বিধায় তাঁকে হুইল চেয়ারে করে সভায় আনা হয়। সেই সভায় বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগের শপথ গ্রহণ করা হয়।
সেই সভায় কবি রবীন্দ্রনাথ গাইলেন, ‘এবার তোর মরা গাঙ্গে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাসা তরী।’
১৯০৬ সনের ১৬ই এপ্রিল পূর্ব বাংলার বরিশালে বেঙল ন্যাশনাল কংগ্রেসের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা। অশ্মিনী কুমার দত্ত ছিলেন সভার ব্যবস্থাপক। সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার আবদুর রসূল। এই সভায় অংশ গ্রহণ করেন সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জি, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, শ্যামসুন্দর, কৃষ্ণ কুমার মিত্র, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী, নিশিকান্ত বসু, তারিনী কুমার গুপ্ত, মুকুন্দ দাস, লালমোহন ঘোষ প্রমুখ।
(১৮৭৫ সনে বংকিমচন্দ্র চ্যাটার্জি ‘বন্দে মাতরম’ গানটি রচনা করেন।
দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো কলকাতায়। এই সম্মেলনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বন্দে মাতরম’ গানটির প্রথম আট লাইন সুর দিয়ে গেয়েছিলেন।)
বংগভংগ রদ আন্দোলনের সকল মিছিলের শ্লোগান ছিলো ‘বন্দে মাতরম’।
সভার শুরুতে গাওয়া হতো ‘বন্দে মাতরম’। সভা শেষ করা হতো ‘বন্দে মাতরম’ গান গেয়ে।
উল্লেখ্য, বংকিমচন্দ্র চ্যাটাজি বাংলায় ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদে’র স্থপতি।
তাঁর লেখা উপন্যাস ‘আনন্দ মঠ’ মুসলিমবিদ্বেষে পূর্ণ।
পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের সময়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন, ‘ও আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি।
(উল্লেখ্য, রাখি বা রক্ষা বন্ধন একটি প্রাচীন হিন্দু প্রথা। সাধারণত শ্রাবন পূর্ণিমায় এই উৎসব পালন করা হয়। ভাইবোন এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়গণ একে অপরের হাতের কবজিতে রঙিন সূতা বেঁধে দিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ ও সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রথা নিয়ে আসেন বৃহত্তর অংগনে। ১৯০৫ সনের ১৬ই অকটোবর নব গঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের যাত্রা শুরুর দিনে কলকাতার উচ্চবর্ণ প্রতিবাদী হিন্দুগণ যেইসব কার্যক্রম পরিচালনা করেন তার একটি ছিলো রাখি বা রক্ষা বন্ধন। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ বিলুপ্ত না করা পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয় রাখি বা রক্ষা বন্ধনের মাধ্যমে।)
কিছুসংখ্যক মুসলিম নেতাও নতুন প্রদেশ গঠনের বিরোধিতা করেন।
এঁদের মধ্যে ছিলেন সিরাজগঞ্জের ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, চট্টগ্রামের মাও. মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী, কুমিল্লার কাজী রিয়াজউদ্দীন, ফরিদপুরের রাজা আনোয়ারউদ্দীন খান, টাংগাইলের ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, টাংগাইলের আবদুল হালিম গজনবী, খাজা সলিমুল্লাহর বৈমাত্রেয় ভাই খাজা আতিকুল্লাহ, বি বাড়িয়ার ব্যারিস্টার আবদুর রসূল প্রমুখ।
এঁদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক নতুন প্রদেশ গঠনের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে সরে আসেন। যেমন, খাজা আতিকুল্লাহ, ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, কুমিল্লার সিরাজুল ইসলাম, জমিদার হুসসাম হায়দার চৌধুরী, বলিয়াদির জমিদার রাজিউদ্দিন, সিরাজগঞ্জের মাও. নজিবুর রহমান প্রমুখ।
হিন্দুদের মধ্য থেকেও পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের সমর্থনে এগিয়ে আসেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি। বংগভংগ বিরোধী আন্দোলনের মুকাবিলা করার জন্য ১৯০৯ সনের ২১শে মার্চ গড়ে তোলা হয় ইমপেরিয়াল লীগ। প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন প্রদ্যোৎ কুমার ঠাকুর, প্রমথ নাথ রায় এবং যোগেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আলকুরআনের বাংলা অনুবাদকারী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন নতুন প্রদেশের পক্ষে ছিলেন। তিনি সিলেটের বিপিন চন্দ্র পালের বংগভংগ রদ আন্দোলনে যোগদানকে দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেন।
(উল্লেখ্য, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ১৮৩৫ সনে নারায়নগঞ্জ জিলার পাঁচদোনা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি একজন একেশ্বরবাদী ব্যক্তি ছিলেন। ১৯১০ সনে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।)
হরিজন সম্প্রদায়ের নেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর বলেন, ‘সারা বাংলা, উড়িশা, আসাম, এমনকি যুক্ত প্রদেশ পর্যন্ত ছিলো বাংলার হিন্দুদের চারণভূমি। এ সবগুলো প্রদেশের সিভিল সার্ভিসই তারা দখল করে নিয়েছিলো। বাংলা বিভাগের অর্থ ছিলো এ চারণভূমি হ্রাসকরণ। বাংলাবিভাগের বিরুদ্ধে হিন্দুদের এই বিরোধিতার মুখ্য কারণ হচ্ছে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানদেরকে তাদের ন্যায্য অংশ গ্রহণে বাধা দেওয়া।’ 
১৯০৫ সনের ১৬ই অকটোবর নতুন প্রদেশের কাজ শুরু হয়। প্রদেশের প্রথম গভর্ণর নিযুক্ত হন স্যার যোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার। তিনি কর্তব্য পালনের জন্য ঢাকায় এলে মুসলিমরা তাঁকে খোশআমদেদ জানায়।
ঐদিন ঢাকার নর্থব্র“ক হলে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি সমাবেশে খাজা সলিমুল্লাহ নতুন প্রদেশের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন।
‘বংগভংগ’ অর্থাৎ নতুন প্রদেশ গঠনকে প্রতিবাদী হিন্দুগণ “মুসলমানদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতিত্ব”, “মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা” ইত্যাদি নামে অভিহিত করতে থাকে।
‘দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’- এর অন্যতম বিশিষ্ট নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি নতুন প্রদেশ গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং বৃটিশদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কটের দাবি তোলেন।
দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এই নতুন প্রদেশ গঠনের বিরোধিতা করে।
 

  • সিমলা ডেপুটেশন

১৯০৫ সনের ১৬ই অকটোবর পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ অস্তিত্ব লাভ করে।
১৯০৫ সনের ১৮ই নবেম্বর লর্ড কার্জনের স্থলে ভাইসরয় হয়ে আসেন লর্ড মিন্টো।
১৯০৬ সনের ২০ই জুলাই সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া লর্ড জন মর্লি বৃটিশ পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন যে শিগগিরই ভারতের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে।
১৮৯২ সনে প্রবর্তিত ‘ঞযব ওহফরধহ ঈড়ঁহপরষং অপঃ ১৮৯২’ মুসলিমদের স্বার্থবিরোধী ছিলো।
(উল্লেখ্য, দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের দাবির প্রেক্ষিতে ঞযব ওহফরধহ ঈড়ঁহপরষং অপঃ ১৮৯২- তে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে ননঅফিসিয়াল সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়।
প্রাদেশিক পরিষদ এবং চেম্বার অব কমার্সকে কেন্দ্রীয় পরিষদে প্রতিনিধি মনোনীত করার অধিকার দেওয়া হয়।
জমিদারগণ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিউনিসিপ্যালিটি, জিলাবোর্ড এবং চেম্বার অব কমার্সগুলোকে প্রাদেশিক পরিষদে প্রতিনিধি মনোনীত করার অধিকার দেওয়া হয়।
এই সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় মুসলিমদের উপস্থিতি ছিলো একেবারেই নগণ্য। ফলে এই অ্যাকট মুসলিমদেরকে একেবারেই কোনঠাসা করে ফেলে।)  
এইদিকে দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ বিলুপ্ত করার জন্য আন্দোলন চলছিলো। নতুন সংস্কার আবার মুসলিমদের জন্য নতুন কোন্ সমস্যা সৃষ্টি করে, তা নিয়ে মুসলিমগণ
চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
নওয়াব মুহসিনুল মুল্ক তখন আলীগড় ‘মোহামেডান এ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’-এর সেক্রেটারি রূপে কর্তব্য পালন করছিলেন। তিনি চিঠিপত্র লেখালেখি করে লর্ড মিন্টোর সাথে মুসলিমদের একটি প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। দিল্লী, উত্তরপ্রদেশ, বোম্বাই, সিন্ধ, মাদ্রাজ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব এবং বাংলা থেকে মোট ৩৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় একটি প্রতিনিধি দল। দলের প্রধান নির্বাচিত হন তৃতীয় আগাখান (প্রকৃত নাম স্যার সুলতান মুহাম্মাদ শাহ)। হাকিম মুহাম্মাদ আজমল খানও এই প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পশ্চিম বাংলা থেকে পাঁচজন মুসলিম নেতা এই ডেলিগেশনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পূর্ব বাংলা থেকে এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কেবল বগুড়ার নওয়াব খান বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী।
১৯০৬ সনের ১লা অকটোবর মুসলিম নেতৃবৃন্দ সিমলাতে গিয়ে ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাত করেন।
এটিকেই বলা হয় সিমলা ডেপুটেশন।
তৃতীয় আগাখান একটি দীর্ঘ বক্তব্য পাঠ করেন।
এই বক্তব্যের খসড়া তৈরি করেছিলেন সাইয়েদ আলী বিলগ্রামী।
দাবিনামায় প্রশাসন, বিচার সংস্থা ও সেনাবাহিনীতে বর্ধিতহারে মুসলিমদেরকে নেওয়া, মিউনিসিপ্যাল বোর্ড ও ডিস্ট্রিকট বোর্ডে মুসলিমদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখা, প্রাদেশিক পরিষদগুলোতে মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে যথেষ্ট সংখ্যক মুসলিম সদস্য নেওয়া এবং মুসলিমদের জন্য একটি আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
হিন্দুভারত মুসলিমদের এই ডেপুটেশন ভালো চোখে দেখেনি।
অমৃত বাজার পত্রিকা জোরেসোরে এই ডেপুটেশনের বিরোধিতা করে।
১৯০৯ সনে ঘোষিত ঞযব ওহফরধহ ঈড়ঁহপরষং অপঃ ১৯০৯ (‘মর্লি-মিন্টো রিফর্মস এ্যাক্ট’) থেকে প্রতীয়মান হয় যে ভাইসরয় লর্ড মিন্টো মুসলিমদের দাবিগুলোর যৌক্তিকতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
এই সংস্কার আইনের অধীনে মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
শুধু তাই নয়, সংখ্যানুপাতের ভিত্তি ছাড়াও মুসলিমদের রাজনৈতিক গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদেরকে অধিক আসন তথা বিরমযঃধমব দেওয়া হয়।
দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস- এর সদস্যগণ মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি।
তাঁরা পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থারও কড়া সমালোচনা করতে থাকেন।

  • অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ গঠন 

এই উপমহাদেশে ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদে’র স্থপতি ছিলেন স্যার সাইয়েদ আহমাদ খান।
তিনি বলতেন, ইংরেজ জাতি জ্ঞানবিজ্ঞান ও যুদ্ধবিদ্যায় শ্রেষ্ঠ। তাদেরকে এই দেশ থেকে তাড়ানো সহজ নয়। মুসলিমদের উচিত আগে জ্ঞানবিজ্ঞানে ইংরেজদের সমকক্ষ হওয়া।
এই চিন্তা নিয়েই তিনি ১৮৭৫ সনে উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে ‘মোহামেডান এ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’ স্থাপন করেন।
(উল্লেখ্য, এই কলেজটিই ১৯২০ সনে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে উন্নীত হয়।)
১৮৮৬ সনে স্যার সাইয়েদ আহমাদ খানের উদ্যোগে গঠিত হয়  অষষ ওহফরধ গঁযধসসবফধহ ঊফঁপধঃরড়হধষ ঈড়হভবৎবহপব. এক এক বছর এক এক শহরে এই সংস্থার একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। প্রধানত মুসলিমদের শিক্ষাসমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা হতো এই সম্মেলনে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ’ গঠনের বিরোধিতা করায় দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস সম্পর্কে নেতৃস্থানীয় মুসলিমদের চোখ খুলে যায়।
ঢাকার নওয়াব খাজা আহসানউল্লাহর বড়ো ছেলে ছিলেন খাজা সলিমুল্লাহ।
তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরি করতেন। পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে মোমেনশাহীতে ব্যবসা কাজে নিয়োজিত হন।
১৯০১ সনে আব্বার মৃত্যুর পর তিনি হন ঢাকার নওয়াব।
১৯০৬ সনের ২৭ থেকে ৩০শে ডিসেম্বর ঢাকাতে অনুষ্ঠিত হয় অষষ ওহফরধ গঁযধসসবফধহ ঊফঁপধঃরড়হধষ ঈড়হভবৎবহপব -এর ২০ তম অধিবেশন।
তখনও হিন্দুদের বৃহত্তর অংশ ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ’ এর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিলো।
এজুকেশনাল কনফারেন্স-এর ২০তম অধিবেশনের মেজবান হলেন খাজা সলিমুল্লাহ।
শাহবাগ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় এই সম্মেলন।
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কলা ভবন, চারুকলা ইনস্টিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, শাহবাগ চত্বর এবং সংলগ্ন এলাকাজুড়ে বি¯তৃত ছিলো শাহবাগ গার্ডেন।)
দুই হাজার প্রতিনিধি এসেছিলেন গোটা উপমহাদেশ থেকে।
প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তৃতীয় আগা খান, নওয়াব ওয়াকারুল মুল্ক বা ভিকারুল মুল্ক (প্রকৃত নাম মুশতাক হুসাইন জুবেরী, মিরাট, উত্তর প্রদেশ), নওয়াব মুহসিনুল মুল্ক (প্রকৃত নাম সাইয়েদ মেহদী আলী, ইটাওয়া, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ), সাইয়েদ মুহাম্মাদ হুসাইন (পাতিয়ালা), হাকিম মুহাম্মাদ আজমল খান (দিল্লী), মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার (রামপুর), খান বাহাদুর আলী মুহাম্মাদ খান (মাহমুদাবাদ), খান বাহাদুর আহমাদ মুহীউদ্দীন (মাদ্রাজ), খান বাহাদুর শেখ গোলাম ছাদিক (অমৃতসর), রাজা নওশাদ আলী খান (অযোধ্যা), ব্যারিস্টার নবীউল্লাহ (লাখনৌ), খান বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী (বগুড়া), খান বাহাদুর আলী নওয়াব চৌধুরী (কুমিল্লা), এইচ.এম. মালেক (নাগপুর), জাফর আলী খান (হায়দারাবাদ) প্রমুখ।
উল্লেখ্য, খাজা সলিমুল্লাহ যুবক ব্যারিস্টার মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহকে সম্মেলনের দাওয়াতপত্র পৌঁছাবার জন্য শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হককে বোম্বাই (বর্তমান নাম মুম্বাই) পাঠান।
মি. মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ তখন বোম্বাই হাইকোটে প্র্যাকটিস করতেন।
১৯০৬ সনেই তিনি দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগদান করেন। এমতাবস্থায় এই সম্মেলনে যোগদান করা নীতিবিরুদ্ধ হবে বিবেচনা করে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
১৯০৬ সনের ২৭, ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় শিক্ষা সম্মেলন।
প্রথম দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলকাতা হাইকোর্টে নবনিযুক্ত বিচারপতি নওয়াব শরফুদ্দীন।
৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক অধিবেশন।
এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নওয়াব ওয়াকারুল মুল্ক (বা ভিকারুল মুল্ক)।
‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনফেডারেসি’ গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ।
প্রস্তাব সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন হাকিম মুহাম্মাদ আজমল খান, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার, জাফর আলী খান প্রমুখ।
আলোচনান্তে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ নামটি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।
প্রেসিডেন্ট হন তৃতীয় আগা খান।
ভাইস প্রেসিডেন্ট হন খাজা সলিমুল্লাহ।
সেক্রেটারি হন নওয়াব মুহসিনুল মুল্ক ও নওয়াব ওয়াকারুল মুল্ক।
মুসলিমদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই শুরু হয় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের পথ চলা। পরবর্তীতে এই লক্ষ্য আরো সম্প্রসারিত হয় এবং নিন্মোক্ত বিষয়গুলোর ওপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়ঃ
১.    মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকরি এবং পেশাগত সুযোগসুবিধা আদায়।
২.    মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার স্বীকৃতি আদায়।
৩.    মুসলিমদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
৪.    নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ভারতের উপযোগী একটি স্বায়ত্বশাসন পদ্ধতি অর্জন।
৫.    ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতা।

  • পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে উন্নয়ন

পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের জনসংখ্যা ছিলো ৩ কোটি ১০ লাখ।
এর মধ্যে মুসলিম ছিলো ১ কোটি ৮০ লাখ, হিন্দু ১ কোটি ২০ লাখ। অবশিষ্টরা খৃস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোক।
নতুন প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হয় শিলং।
ঢাকার নওয়াব খাজা আবদুল গনী ঢাকা শহরের উত্তরপূর্বাংশে তাঁর পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন। নাম দেন দিলখুশা।
নতুন প্রদেশ গঠনের সময় ঢাকার নওয়াব ছিলেন খাজা আহসানউল্লাহর ছেলে খাজা সলিমুল্লাহ।
সুবি¯তৃত বাগানবাড়িটি দুইভাগ করে উত্তরভাগ নওয়াব নিজে রাখেন। দক্ষিণভাগ নামমাত্র মূল্যে সরকারকে ইজারা দেন। দিলখুশার এই দক্ষিণভাগেই লে. গভর্ণরের জন্য একটি ছিমছাম বাংলো তৈরি করা হয়। এটিই ছিলো পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের প্রথম গভর্ণর হাউস। অতপর এক লাখ টাকা ব্যয় করে একটি ভবন নির্মান করা হয়।
এটিই বর্তমান বংগভবন।
১৯০৬ সনের ১৪ই ফেব্র“য়ারি লে. গভর্ণর স্যার যোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার নব নির্মিত গভর্ণর হাউসে প্রবেশ করেন।
এই গভর্ণর হাউসে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের লে. গভর্ণরের নির্বাহী পরিষদ বা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হতো।
উল্লেখ্য, নবগঠিত প্রদেশে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন ১৫ জন।
রমনা তখন বনবাদাড়ে পূর্ণ। এখানে গভর্ণর হাউস নির্মাণের উদ্যোগ নেন প্রথম লে. গভর্ণর স্যার যোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার।
রমনাতে নির্মিত হয় একটি সুন্দর ভবন।
উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এটি লে. গভর্ণরের বসবাসের উপযুক্ত স্থান নয় বলে মত দিলে ভবনটি ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজকে দিয়ে দেওয়া হয়।
পুরাতন হাইকোর্ট বিল্ডিংটিই সেই ঐতিহাসিক ভবন।
রমনাতেই নির্মিত হয় নতুন প্রদেশের সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরাতন ভবনটিই সেই সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং।
মিন্টোরোড ও সন্নিকটস্থ স্থানগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত হয় অনেকগুলো বাসভবন।
১৯০৬ সনের ২০শে অগাস্ট স্যার ল্যান্সলট হেয়ার পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের লে. গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
গভর্ণর হাউস রূপে আরেকটি ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
১৯১১ সনে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের নতুন লে. গভর্ণর হয়ে আসেন স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট বেইলি। নব নির্মিত ভবনটির ফারনিশিং তখনো শেষ হয়নি। এই দিকে নতুন প্রদেশ আদৌও টিকবে কিনা, সংশয় দেখা দেয়। এমতাবস্থায় লে. গভর্ণর বেইলি নতুন ভবনে না ওঠে দিলখুশায় অবস্থিত গভর্ণর হাউসেই অবস্থান করতে থাকেন। রমনায় নির্মিত সেই নতুন ভবনটিই বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলারের বাসভবন।
পূর্ব বাংলা ও আসাম ছিলো শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া একটি অঞ্চল। সেই সময় কেবল কলকাতা শহরেই মানসম্মত কলেজ ছিলো ১৩টি। আর সমগ্র পূর্ব বাংলায় মানসম্মত কলেজ ছিলো মাত্র ৩টি। আসামে ১টি।
এই সময় পূর্ব বাংলায় সরকারি হাইস্কুল ছিলো ২৫টি, আর বেসরকারি হাইস্কুল ছিলো ১৮৬টি। পূর্ব বাংলায় মোট ৩টি গার্লস হাইস্কুল ছিলো। ঢাকায় ১টি, মোমেনশাহীতে ১টি ও কুমিল্লায় ১টি। সরকারি সাহায্যে পরিচালিত মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ছিলো ৩২০টি, আর বেসরকারি অনুদানে পরিচালিত মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ছিলো ১৩৮টি। শিক্ষার মান আশানুরূপ ছিলো না।
নতুন প্রদেশে কোন টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ছিলো না।
নতুন প্রদেশ গঠনের পর বিভিন্ন স্থানে নতুন কলেজ গড়ে ওঠে। নতুন হাইস্কুল স্থাপিত হয়। টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠে।
নতুন প্রদেশের সরকার ঢাকা কলেজ, রাজশাহী কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের উন্নয়নে মনোযোগ দেয়। নতুন নতুন ভবন নির্মিত হয়। শিক্ষকদের আবাসন সুবিধা দেওয়া হয়। ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস নির্মিত হয়।
১৯০৪ সনের ১৪ই ফেব্র“য়ারি ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকা কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে কার্জন হলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
১৯০৮ সনে এই ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। পুরাতন ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল থেকে কার্জন হলে স্থানান্তরিত হয় ঢাকা কলেজ। ঢাকা কলেজের ছাত্রদের জন্য নির্মিত হয় ঢাকা হল। কলেজের চারজন অধ্যাপকের জন্য ৪টি বাংলোও তৈরি করা হয়।
ঢাকা কলেজ ও রাজশাহী কলেজে অধিক সংখ্যক বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়।
আসামের গৌয়াহাটি কটন কলেজকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত করা হয়।
মুসলিম ছাত্রদের জন্য বৃত্তির পরিমান বাড়ানো হয়। স্কুল-কলেজে বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়। মুসলিম শিক্ষক ও মুসলিম স্কুল পরিদর্শকদের সংখ্যা বাড়ানো হয়।
নতুন প্রদেশ মুসলিমদের জন্য শিক্ষা ও চাকরির দ্বার খুলে দেয়। মুসলিমগণ ক্রমেই এগিয়ে আসতে থাকে।
ইতোপূর্বে স্কুল-কলেজের প্রায় সকল শিক্ষকই ছিলো হিন্দু। লে. গভর্ণর ব্যামফিল্ড ফুলার মুসলিম শিক্ষকদের সংখ্যা ৩৩% বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। ব্যামফিল্ড ফুলারের পর লে. গভর্ণর হেয়ারও মুসলিমদের জন্য চাকরি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বহাল রাখেন। এর ফলে ১৯১২ সনে এসে মুসলিম শিক্ষকদের সংখ্যা ১৪৬৫৬ জনে দাঁড়ায়। শিক্ষা বিভাগে মুসলিম শিক্ষা অফিসারের সংখ্যা ছিলো প্রায় শূন্য। মুসলিম শিক্ষা অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ১৯১২ সনে এসে মুসলিম শিক্ষা অফিসারের সংখ্যা ১১৪ জনে উন্নীত হয়।
নব গঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে কলেজিয়েট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিলো ১৬৯৮ জন যা ছয় বছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৫৬০ জনে।
সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ছিলো ৬,৯৯,০৫১ জন। ছয় বছরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯,৩৬,৬৫৩ জনে দাঁড়ায়। ছয় বছরে ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৩১,১৩৯ জনে উন্নীত হয়।
প্রদেশের শুরুতে পূর্ব বাংলায় মাক্তাব সংখ্যা ছিলো ১২৯৯ টি। ছয় বছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৫৪৮টিতে দাঁড়ায়। মাক্তাবের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪০,১৮৮ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪,৭০৩ জনে উন্নীত হয়।
১৯১১-১২ সনে এসে মুসলিম ছাত্রদের হোস্টেল সংখ্যা ৮২টিতে পৌঁছে।
পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে সরকারি উচ্চ পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১২৩৫ জন ছিলো হিন্দু, আর ৪১ জন ছিলো মুসলিম।
সামগ্রিকভাবে সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের সংখ্যা ছয়ভাগের একভাগেরও কম ছিলো।
নতুন প্রদেশে চাকরিতে হিন্দু মুসলিম বৈষম্য দ্রুত কমে আসতে থাকে।
নতুন প্রদেশে নিজস্ব বাজার ও বিপণন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পাটের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পায়।
রাজধানী ঢাকার আশেপাশে শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে থাকে।
সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ নৌপথ উন্নয়ন ও সড়ক উন্নয়নের বিরাট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।
বাণিজ্য পণ্যের আনা-নেওয়া নিরাপদ করার জন্য নৌপুলিশের শক্তি বৃদ্ধি করা হয়।
শহরের সাথে গ্রামের যোগাযোগের জন্য পুরাতন রাস্তাগুলো সংস্কার এবং নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠনের পর এই অঞ্চলে উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হয়।
এই উন্নয়নের গতি ও ব্যাপ্তি ছিলো বিস্ময়কর। (ক্রমশ...)


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: এ.কে.এম. নাজির আহমদ

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes