ইসলাম ও সৎকাজ (পর্ব-৫)

Print
Category: প্রবন্ধ নিবন্ধ
Published Date Written by মোঃ ইকবাল হোসেন

ইসলাম ও সৎকাজ

লেখক: মোঃ ইকবাল হোসেন


(নভেম্বর ২০১২, ১৪তম সংখ্যার পর...)

আমরা ব্যক্তিগত সৎকাজের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি গুণ বা যোগ্যতা মোটামুটি ভাবে আলোচনা করার পর ধারাবাহিক ভাবে ব্যক্তিগত সৎকাজগুলো উল্লেখের চেষ্ঠা করব।

১. নামায
ইসলামী জীবন বিধানে ঈমান আনার পরেই যে কাজটি প্রথমেই শুরু করতে হয় তা হলো নামায নামায ইবাদতটির দুটি অংশ রয়েছে। কিছু নামায রয়েছে যেগুলো আদায় করা ঈমানদারের জন্য ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। এগুলো ছাড়াও কিছু অতিরিক্ত বা নফল নামায রয়েছে।
সূরা বাকারাহ্ এর ২নং আয়াতে আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন- “যারা বিশ্বাস রাখে অদেখা জিনিসের প্রতি এবং নামায কায়েম করে। আর তাদের প্রতি যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যায় করে।” (সূরা বাকারাহ্-২)
আবার একই সূরার ২৩৮নং আয়াতে এসেছে- “তোমরা পাবন্দী কর সমস্ত নামাযেরই এবং বিশেষত: মধ্যবর্তী নামাযের; আর দাঁড়াও আল্লাহর সম্মুখে বিনয়াবনত অবস্থায়।” (সূরা বাকারাহ্-২৩৮)
আবু দাউদ শরীফের এক হাদীসে এসেছে- “হযরত উবাদাতা ইবনে সামেত রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বণ্যিত, তিনি বলেন, নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের উপর পাঁচ ওযাক্তের নামায ফরজ করে দিয়েছেন সুতরাং যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযূ করে সময়মত নামায পড়বে এবং রুকু সিজদার খেয়াল রেখে মনোনিবেশ সহকারে নামায আদায় করবে, অবশ্যই আল্লাহ্ তাকে মাফ করে দিবেন। আর যে তা করবে না তার অপরাধসমূহ মাফ করে দেয়া সম্পর্কে আল্লাহর কোন দায়িত্ব নেই। ইচ্ছা করলে তিনি ক্ষমা করতে পারেন, নাও করতে পারেন।” (আবূ দাউদ)
নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। নামায পড়লে যেমনই বিভিন্ন পুরষ্কারের কথা বলা হয়েছে ঠিক তেমনই নামায না পড়লে ভয়ংকর পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, যার মধ্যে আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই, যার পবিত্রতা নেই তার নামায নেই, যার নামায নেই তার দ্বীন নেই। গোটা দেহে মাথার যে গুরুত্ব দ্বীন ইসলামে নামাজের তদ্রূপ গুরুত্ব।” (তাবারানীর আল-মু’জামুস সনীর)
নামায আদায়ের মাধ্যমে আমরা ইসলামের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারি। নামায দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আরো অনেক সুফল বয়ে আনে। যেমন নিয়মিত সঠিকভাবে নামায আদায় করলে ব্যক্তির গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। যেমনটি বুখারী শরীফের এক হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে।
“আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, তোমরা কি ধারণা করো, যদি তোমাদের কারো বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে এবং সে তাতে দৈনিক পাঁচ বার গোসল করে, তবে তার দেহে কি কোন ময়লা থাকতে পারে? সাহাবাগণ বললেন, তার দেহে কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি বলেন, এ হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উপমা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সাহায্যে আল্লাহ্ তায়ালা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।” (বুখারী)
এই নামায কিয়ামতের দিন ব্যক্তির জন্য প্রমাণও মুক্তির কারণ হয়ে দাড়াবে।
“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত একদিন নবী করীম (সা) নামায সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বললেন, যে ব্যক্তি নামাযের সঠিকভাবে হেফাজত করবে তার এই নামায কিয়ামতের দিন তার জন্য আলো, প্রমাণ ও মুক্তির কারণ হবে এবং যে তার সঠিক হেফাযত করবে না, তার জন্য নামায কিয়ামতের দিন রোশনী, প্রমাণ কিংবা মুক্তির কারণ হবে না। আর ঐ ব্যক্তি হাশরের দিন কারুন, ফেরাউন, হামান ও উবাহ বিন খালকের ন্যায় কাফেরদের সাথে উঠবে।” (আহমাদ, দারমী, বাযহাকী)
লক্ষ্য করি, আল্ কোরআনে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ‘আকিমুস্ সালাত’ তথা সামায কায়েম করার কথা বলেছেন। কায়েম শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠা কেমন সেটা বোঝার জন্য আমরা আমাদের চারপাশে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারব। যেমন আমাদের সমাজে পোশাক প্রতিষ্ঠিত আছে। সে কারণে ছেলে, যুবক, বৃদ্ধ, পুরুষ, মহিলা সকলেই পোশাক পরে। এখন কেউ যদি আমাদের সমাজে পোশাক ছাড়া জীবন যাপন করে তবে তাকে কি কেউ সুস্থ মানুষ বলবে অথবা কেউকি তার আচরণকে সমর্থন করবে? আবার খেয়াল করুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ জন্মলাভ করার আগেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল এবং বাংলাদেশ জন্মলাভ করার পরেও এটি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান রয়েছে। প্রতিষ্ঠার প্রকৃত অর্থ এরকম। একজন ঈমানদারে জন্য নামায প্রতিষ্ঠার দুটি পর্যায় অতিক্রম করতে হবে। এক. নিজের জীবনে সঠিকভাবে নামায প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং দই. নিজের পবিারসহ সমাজে নামায প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবার জানার চেষ্ঠা করি নামাযের উদ্দেশ্য কি, কেনই বা ইসলামে নামাযের এত গুরুত্ব?
“নিশ্চয় নামায মানুষকে অশ্লীলতা ও অসৎ কাজ হতে বিরত রাখে।” ( সূরা আনকাবূত-৪৫)
এই আয়াতটিতে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন নামাযের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে বর্ণনা করেছেন। আমরা ইসলামের বৈশিষ্ট্য আলোচনার সময় দেখেছি মানুষকে সকল অন্যায়, অপরাধ থেকে সরিয়ে ভালকাজ করার মধ্যে দিয়ে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ঈমানদারদের জন্য প্রথমেই নামায নামের এমন একটি ব্যক্তির জীবন থেকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কর্মকান্ড দূর করা সম্ভব।
এই কথাটি হাদীসে আরো পরিষ্কার করে এসেছে-
“যারা নামায তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখেনি তা নামাযই হয়নি।”(ইবনে আবী হাতেম ও তাবারানী)
ইবনে মাসইদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে নবী করীমের (সা) এ উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে,
“যে ব্যক্তি নামাযের আনুগত্য করেনি তার নামাযই হয়নি আর নামাযের আনুগত্য হচ্ছে, মানুষ অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে।” (ইবনে জারীর ও ইবনে আবী হাতেম)
নামাযের আলোচনায় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে কিভাবে নামযায মানুষকে অশ্লীলতা এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখে।
নামায পড়ার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন পবিত্রতা অর্জন করা। আপনাকে অবশ্যই নামাযের প্রধান নিয়ম-কানুন জানতে হবে এবং নামাযের ফরজ ও ওয়াজিব গুলো ভালভাবে বুঝতে হবে। নামায পড়ার জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় দোয়া, সূরা মুখস্থ রাখতে হবে এবং সঠিক ভাবে আরবীর উচ্চারণ শিখতে হবে। আমরা এখন ধারাবাহিক ভাবে সঠিক, পূর্ণাংগ এবং উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম হবে। এমন নামাযের বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলব।

ক. নামাযের প্রকৃত উদ্দেশ্যের প্রতি খেয়াল রেখে নামায আদায় করাঃ

আমরা আগেই দেখেছি ইসলামী জীবন বিধানের সকল কাজই সম্পাদিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অবশ্যই নামাযের ও উদ্দেশ্য ও এর বিপরীত হওয়া যাবে না। যেমনই আল্লাহর আদেশ পাললেন জন্য নামায পড়তে হবে তেমনই নামাযের প্রকৃত উধাহরণ এরকম-
“কয়েক জন ব্যক্তিকে তীর ও ধনুক দিয়ে বলা হলো, তাদের সামনের দেয়ালে যে বৃত্ত আঁকা আছে তাতে তীর বিধতে পারলে একটা পুরষ্কার দেযা হবে। এখন কেউ যদি তীর ছোড়ার উদ্দেশ্যের প্রতি উদাশীন হয়ে তীর ছোড়া এবং উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয় তবে কি তাকে পুরষ্কৃত করা হবে?”
নামাযের ব্যাপারটা ও ঠিক এরকম।
“ইমাম জাফর সাদেক বলেন, যে ব্যক্তি তার নামায কবুল হয়েছে কিনা এ কথা জানতে চায় তার দেখা উচিত তার নামায তাকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে কি পরিমাণ বিরত রেখেছে।” (রূহুল মা‘আনী)

খ. সঠিক নিয়ম-কানুন এবং যথাযথ গুরুত্বের সাথে নামায আদায় করাঃ
আমরা আগেই বলেছি নামাযের নিয়ম-কানুন সঠিক হওয়া চাই এবং দোয়া, সূরাসমূহ সঠিক ভাবে উচ্চারণ করতে হবে। সময় মতই নামায আদায় করতে হবে। কোন ভাবেই নামাযকে অবহেলা করা যাবে না।
আল্ কোরআনে ঘোষনাটি এমন-
“অতঃপর ঐ নামাযীর জন্য ধ্বংশ, যারা তাদের নামাযের ব্যাপারে অবহেলা করে, যারা লোক দেখানো কাজ করে।” (সূরা মাউন-৪,৫,৬)
আবার হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
“আবু কাতাদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন. সবচেয়ে জঘন্য চোর হলো সে ব্যক্তি, যে নামাযে চুরি করে। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো, হে রাসূলুল্লাহ! নামাযে চুরির অর্থ কি? তিনি বললেন, নামাযে চুরির অর্থ হলো, সে রুকু ও সিজদা ঠিকভাবে করে না।” (তাবারানী, ইবনে খোযায়মা)

গ. বিনয়রত হয়ে নামায আদায় করাঃ
আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বলেছেন-
“নিশ্চয়ত ভাবে সফলকাম হয়েছে মু’মিনরা, যারা নিজেদের নামাযে বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করা। এ অবস্থাটার সম্পর্ক মনের সাথে এবং দেহের বাহ্যিক অবস্থার সাথেও। মনের খুশূ হচ্ছে, মানুষ কারো ভীতি, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতাপ ও পরাক্রমের দরুন সন্তস্ত ও আড়ষ্ট থাকবে। আর দেহের খুশূ হচ্ছে, যখন সে তাঁর সামনে তখন মাথা নত হয়ে যাবে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢিলে হয়ে যাবে, দৃষ্টি নত হবে, কণ্ঠস্বর নিম্নগামী হবে এবং কোন জবরদস্ত প্রতাপশালী ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হলে মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক ভীতির সঞ্চার হয় তার যাবতীয় চিহ্ন তার মধ্যে ফুটে উঠবে। নামাযে খুশূ বলতে মন ও শরীরের এ অবস্থাটা বোঝায় এবং এটাই নামাযের আসল প্রাণ। হাদীসে বলা হয়েছে, একবার নবী করীম (সা) এক ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখলেন এবং সাথে সাথে এও দেখলেন যে, সে নিজের দাড়ি নিয়ে খেলা করছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, যদি তার মনে খুশূ থাকতো তাহলে তার দেহেও খুশূ’র সঞ্চার হতো।
হাদীসে বিনয়রত হয়ে নামাযের ব্যাপারে অনেক কথা এসেছে। নামাযে দাঁড়ানো অবশ্যই সেই মহান স্বত্ত্বা আল্লাহ্ তা’লার সামনে দাঁড়ানো এবং তাঁর আদেশ পালনের জন্যই দাঁড়ানো। এ অনুভূতি নামায আদায়কারীর অন্তরে থাকতে হবে। নামাযের মধ্যে দুনিয়াবী চিন্তা-ভাবনা ঢুকতে দেয়া যাবে না। আল্লাহ্ তা’আলার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্বাধীন হাতকে নিজেই শৃঙ্খলিত করে শুধু মাত্র কেবল মাত্র নির্ধারিত পদ্ধতিতে দোয়া ও সূরার মধ্য দিয়ে তাঁর আদেশ পালন করতে হবে। আর নামাযে দাঁড়াতে হবে এ ধারণা নিয়ে যে, আল্লাহ্ তা’আলা চাইলেই আমার মৃত্যু দিতে পারেন এবং এ নামাযই হতে পারে আমার জীবনের শেষ নামায। সুতরাং আমার আন্তরিকতা এবং ভয়-ভীতি এমন পর্যায়ের হতে হবে যাতে করে এই নামাযের বিনিময়েই মালিক আমার অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেন এবং মেশকাত শরীফের এক হাদীস বলছে-
“আবু আইউব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন লোক নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে নিবেদন করল, আমাকে সংক্ষেপে পূর্ণাঙ্গ উপদেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি যখন নামাযের জন্য দাঁড়াবে তখন এমন ব্যক্তির মত নামায পড়বে, যে ব্যক্তি দুনিয়া হতে বিদায় নিচ্ছে। এমন কথা উচ্চারণ করবে না কিয়ামতের দিন যার হিসাব দিলে জবাব দিতে পারবেনা। অন্য লোকের ধন-মালের আশা পোষণ করবে না।” (মিশকাত শরীফ)

ঘ. নামায আদায় হবে আল্লাহ্ তা’আলার অর্থ পূর্ণ স্মরণের মধ্য দিয়েঃ
লক্ষ্য করি, নামাযের মাঝে বিভিন্ন অবস্থায় (বসে, দাঁড়িয়ে রুকুতে এবং সিজদায়) বিভিন্ন ধরণের দোয়া সমূহ এবং সূরা সমূহ সঠিক ভাবে পড়তে হয়। এ দুয়া এবং সূরা সমূহ পড়ায় নিয়ম নির্ধারিত করার পেছনে গুরুত্ব পূর্ণ উদ্দেশ্য কাজ করছে। মানুষ দুনিয়ায় বিভিন্ন ধরণের কাজ এবং তৎপরতায় নিজেদেরকে জড়িত রাখে। যখন কোন ব্যক্তির খাবার ও পোশাক প্রয়োজন হয় তখন সে নিজেকে খাদ্য এবং পোশাক সংগ্রহ করা যায় এমন কোন কাজে নিজেকে নিয়জিত করে। এজন্য কেউ চাষাবাস করে অর্থ উপার্যন, কেও চাকুরী করে অর্থ উপার্যন ইত্যাদি ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং এর পরে বাজার থেকে খাদ্য পোশাক সংগ্রহ করে। আবার যখন কারো চিকিৎসা পাওয়া যায় এমন তৎপরতায় নিজেকে জড়ায়। এভাবে প্রতিটি দিন বেশির ভাগ সময় জুড়ে মানুষ বিভিন্ন মুখী কর্মকান্ডে জগিত থাকার কারণে এবং শয়তানী প্ররোচনা, লোভ-লালসা, প্রয়োজনের তাড়না, দুনিয়াবী আকর্ষণ সমূহ মানুষকে আল্লাহর এবং তাঁর বিধান স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর এই মানাযে একইদিনে অন্তত্ব পাঁচ বার ঈমানদাররা এমন সব দুয়া এবং সূরা পড়তে বাধ্য হয় যে গুলো তাদেরকে আল্লাহ্ এবং তাঁর বিধানের যথাযথ স্মরণ করিয়ে দেয়। এই অল্প সময়ের ব্যাবধানে অনবরত প্রভূর সামনে দাঁড়িয়ে দুনিয়াবী সকল কিছু থেকে নিজেকে মক্ত করে নিয়ে যথাযথ আল্লাহ্ ও তাঁর বিধানের স্মরণ মানুষকে সৎকর্মশীল এবং আল্লাহভীরু মানুষে পরিণত করে। সুতরাং এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নামাযে আল্লাহর গোলামীর অনুভূতির সাথে সাথে পঠিত দোয়া এবং সূরা গুলোর অর্থ অনুধাবন করা জরুরী। যারা আরবী ভাষায় কথা বলে তাদের জন্য বিষয়টি সহজ হলেও অন্যান্য ভাষা-ভাষী লোকদের জন্য এটি সামান্য হলেও সঠিন। কিন্তু সঠিক অর্থপূর্ণ স্মরণের জন্য অবশ্যই তা দরকার। নামাযে পঠিত দোয়া এবং সূরা গুলো শুধু মাত্র আল্লাহ্ ও তাঁর বিধানের স্মরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা, সাথে সাথে আল্লাহর সামনে অনেক ওয়াদাও করতে হয়। এখন নামাযের মধ্যে কৃত ওয়াদা এবং মেনে নেয়া (স্মরণ হওয়া) বিধানের পূর্ণ বাস্তবায়ন তো অবশ্যই সঠিক করার স্বার্থে হলেও নামাযের পরের অন্যান্য কর্মকান্ডে আল্লাহর বিধান মানতে হবে। আর এভাবেই নামায মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত রাখে।

ঙ. ফজর নামায সময়মত এবং জামায়াতের সাথে আদায় করাঃ
ফজর নামায পড়া মুসলমানদের জন্য অবশ্য কর্তব্য এবং ফরজ নামাযের ক্ষেত্রে সময় মেনে চলা এবং জামায়াতভূক্ত অবস্থায় পড়ার বিষয় দু’টি খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
বুখারী এবং মুসলীস শরীফের হাদীসে উল্লেখ করা হেয়ছে –
“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জামায়াতের সহিত নামায একাকী নামায হতে সাত’শ গুণ ফযীলতের অধিকারী।” (বুখারী ও মুসলিম শরীফ)
আহমদ শরীফের এক হাদীসে এসেছে-
“হযরত আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ মর্মে তাদীস বর্ণনা করেছেন যে, একদা হুযুরসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, গৃহে যদি শিশু সন্তান ও নারীরা না থাকতো তাহলে আমি ইশার নামায শুরু করে যবকদেরকে পাঠিয়ে দিতাম, তাদের ঘরে যেন (যারা নামাযে না আসে) আগুন দিয়ে আসে।” (আহমদ)
আবার অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
“আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে মসজিদে নিয়মিত জামায়াতে নামায পড়তে দেখবে, তখন তাকে মুসলমান বলে সাক্ষ্য প্রদান করবে।” (তিরমিযী, ইবন্ মাজাহ)
এভাবে ইসলামে ফরজ নামাযকে সময় মত এবং জামায়াতে পড়ার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছে।

২। রোযা
ব্যক্তিগত সৎকাজগুলোর আলোচনায় আমরা নামাযের পরেই রোযা বা সাওম এর কথা বলার চেষ্ঠা করব।
আল্ কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে-
“হে ঈমাদারগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতগণের উপর। আশা করা যায় তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ এবং বৈশিষ্ট্য জাগ্রত হবে।” (বাকারাহ-১৮৩)
সাওম শব্দের অর্থ হলো কোন কিছু থেকে বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় সাওমের অর্থ সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার এবং পাপা চার হতে বিরত থাকা।
এই এবাদতটি ইসলামে সর্বাধিক পবিত্র, বরকতপূর্ণ মাসে ফরজ করা হয়েছে।
“রমজান মাস, এতে কুরআন মাজীদ নাযিল হয়েছে, যা গোটা মানব জাতির জন্য জীবন যাপনের বিধান এবং এটি এমন সুস্পষ্ট উপদেশাবলিতে পরিপূর্ণ যা সঠিক ও সত্য পথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কাররূপে তুলে ধরে।” (বাকারাহ-১৮৫)
ফরজ সাওম পালন মুসলমানদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক সৎকাজ হলেও এ ইবাদতের অতিরিক্ত সুফলের সংখ্যা অনেক। আমরা রোযা সর্ম্পকিত কয়েকটি সুফলের কথা আলোচনার চেষ্ঠা করব।
ক. রোযা তাকওয়া অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আমরা ইতিমধ্যে তাকওয়া সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আল্লাহর সম্পর্কে যে সঠিক ধারণা আমাদের মধ্যে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া নিয়ে আসে সেটাকে চর্চার মাধ্যমে বৃদ্ধি করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো রোযা। আমরা যদি রোযার নিয়ম-কানুনের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে আমাদের সামনে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, রোযা পালনরত অবস্থায় স্বাভাবিক দিনের চেয়ে অধিক বাধা, নিষেধ মেনে চলতে হয়। আমরা যদি শুধু আল্লাহর ভয়ে এই সব অতিরিক্ত নিয়ম-কানুন (যেমন-রোযা অবস্থায় পানাহার, কামাচার ইত্যাদি নিষেধ) যথাযথ ভাবে পালন করতে পারি তাহলে স্বভাবতই আল্লাহর আদেশ, নিষেধ পালনের অভ্যাস বেড়ে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে আল্লাহর গোলামী করব সহজ হয়ে যাবে। এভাবে রোযা মানুষের জন্য তাকওয়া বৃদ্ধি কারক হিসেবে কাজ করে যা স্পষ্টভাবে উপরে উল্লেখিত সূরা বাকারাহর-১৮৩ নং আয়াতে কলা হয়েছে।
খ. রোযার মাস রমজান অত্যন্ত বরকতময় মাস রমজান মানে কুরআন শরীফ নাযিলের কারণে এটি একটি বরকতময় মাস। এ মাসে সৎকাজসমূহের সওয়াব স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে-
“হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত রাসূলের করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের নিকট রমাজন মাস সমুপস্থিত। উহা এক অত্যন্ত বরকতময় মাস। আল্লাহ্ তা’আলা এ মাসে তোমাদের প্রতি রোযা ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায়, এ মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং এ মাসে বড় বড় ও সেরা শয়তানগুলোকে আটক করে রাখা হয়। আল্লাহর জন্য এ মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও অনেক উত্তম। যে লোক এই রাত্রির মহা কল্যাণ লাভ হতে বঞ্চিত থাকলো, সে সত্যই বঞ্চিত ব্যক্তি।” (নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ, বাযহাকী)
এই মাসের মহা কল্যাণময় রাত্রীর কথা সূরা আল্ কদরে আল্লাহ্ তা’আলা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
গ. রোযা গুণাহসমুহ মাফের উত্তম মাধ্যম মানুষ তার চলার পথের করা গুণাহগুলোকে এই ইবাদতের মাধ্যমে প্রভুর কাছ থেকে মার্জনা করে নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বলা হয়েছে-
“হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে রমজানের রোযা রাখবে, তার পূর্বকৃত যাবতীয় (সগীরা) গুনাহ মাফ করা হবে এবং যে রমজানের রাতে ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে নামায আদায় করবে, তার অতীত গুণাহসমূহ মাফ করা হবে। আর যে কদরের রাতে ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে ইবাদাত করবে, তার পূর্বকৃত যাবতীয় (সগীরা) গুণাহ মাফ করা হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
ঘ. রোযা সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সাম্যতা ফিরিয়ে আনে। আমরা পূর্বেই ইসলামের বৈশিষ্ট্য না মূলনীতি সমূহ আলোচনার সময় জেনেছি যে, ইসলামের চুড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে মানুষগুলোকে আল্লাহ্ তা’আলার গোলাম বানানো এবং এর মাধ্যমে সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে সকল প্রকার অন্যায়, অপকর্ম, অসৎকাজ, দূর্নীতি ইত্যাদি নির্মূল করে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা তথা শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খল এবং ইনসাপময় সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে রোযা বা সাওমের ভূমিকা অপরিসীম। রোযা সমাজের মানুষগুলোর তাকওয়া বাড়িয়ে দেয যা ব্যাপক পরিবর্তন আনে তাদের আচরণে। আল্লাহভীতির প্রভাবে মানব জীবনের কর্মকান্ড পরিবর্তীত হয়ে যায় ফলে অন্যায়, অস্য কর্মকান্ড বিলিন হয়ে জন্মলাভ হয় সৎ ন্যায় ও শৃঙ্খল সমমর্মী কর্মকান্ডের। এই পরিবর্তীত কর্মকান্ডের দরুণ সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা ও সমতা ফিরে আসে।
(ক্রমশ...)


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -মোঃ ইকবাল হোসেন

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes