সূরা ‘আবাসা ১৭ থেকে ৪২ আয়াত

Print
Category: ওহীর আলো
Published Date Written by আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

সূরা ‘আবাসা ১৭ থেকে ৪২ আয়াত
মক্কায় অবতীর্ণ- পবিত্র কুরআনের সূরার ক্রমিক নং- ৮০।

মুফাস্সিরঃ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী


শানে নযুল ও সংক্ষিপ্ত আলোচ্য বিষয়ঃ এই সূরার ১৭ আয়াত থেকে শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঐসব লোকদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তোমরা অস্তিত্বহীন ছিলে, সেখান থেকে তোমাদেরকে আমি অস্তিত্ব দান করেছি। এই পৃথিবীতে তোমাদের জন্য আমি অসংখ্য নেয়ামত দিয়েছি। তোমাদের পশু সম্পদকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা আমিই করেছি। অথচ তোমরা আমার দেয়া বিধানের মোকাবেলায় বিদ্রোহ করে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে অবৈধ পথে সুখের উপকরণ যোগাড়ে ব্যস্ত রয়েছো। যাদের জন্য এসব করছো, কিয়ামতের দিনে মহাবিপদ অবলোকন করে সেই আপনজনদের কাছ থেকে ছুটে পালাতে থাকবে। সেদিন তোমার নিজের কথা ব্যতীত আর কারো কথা মনেও থাকবে না। পৃথিবীতে যারা আমার বিধান অনুসারে জীবন পরিচালিত করেছে, সেদিন তাদের চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল থাকবে। আর তোমরা যারা আমার বিধানের বিপরীত জীবন পরিচালিত করেছো, তোমাদের চেহারা থাকবে অন্ধকারে আবৃত। সেদিন তোমাদের চেহারাই তোমাদের আল্লাহর বিধান বিরোধী হওয়ার পরিচিতি তুলে ধরবে।


سورة عبس
أَعُوذُ باللَّهِ مِنَ الشَّيْطانِ الرَّجِيمِ


 قُتِلَ الْإِنسَانُ مَا أَكْفَرَ‌هُ ﴿١٧﴾ مِنْ أَيِّ شَيْءٍ خَلَقَهُ ﴿١٨﴾ مِن نُّطْفَةٍ خَلَقَهُ فَقَدَّرَ‌هُ ﴿١٩﴾ ثُمَّ السَّبِيلَ يَسَّرَ‌هُ ﴿٢٠﴾ ثُمَّ أَمَاتَهُ فَأَقْبَرَ‌هُ ﴿٢١﴾ ثُمَّ إِذَا شَاءَ أَنشَرَ‌هُ ﴿٢٢﴾ كَلَّا لَمَّا يَقْضِ مَا أَمَرَ‌هُ ﴿٢٣﴾ فَلْيَنظُرِ‌ الْإِنسَانُ إِلَىٰ طَعَامِهِ ﴿٢٤﴾ أَنَّا صَبَبْنَا الْمَاءَ صَبًّا ﴿٢٥﴾ ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْ‌ضَ شَقًّا ﴿٢٦﴾ فَأَنبَتْنَا فِيهَا حَبًّا ﴿٢٧﴾ وَعِنَبًا وَقَضْبًا ﴿٢٨﴾ وَزَيْتُونًا وَنَخْلًا ﴿٢٩﴾ وَحَدَائِقَ غُلْبًا ﴿٣٠﴾ وَفَاكِهَةً وَأَبًّا ﴿٣١﴾ مَّتَاعًا لَّكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ ﴿٣٢﴾ فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَّةُ ﴿٣٣﴾ يَوْمَ يَفِرُّ‌ الْمَرْ‌ءُ مِنْ أَخِيهِ ﴿٣٤﴾ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ﴿٣٥﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ﴿٣٦﴾ لِكُلِّ امْرِ‌ئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ﴿٣٧﴾ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَ‌ةٌ ﴿٣٨﴾ ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَ‌ةٌ ﴿٣٩﴾ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَ‌ةٌ ﴿٤٠﴾ تَرْ‌هَقُهَا قَتَرَ‌ةٌ ﴿٤١﴾ أُولَـٰئِكَ هُمُ الْكَفَرَ‌ةُ الْفَجَرَ‌ةُ ﴿٤٢﴾

বাংলা অনুবাদঃ
বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি
(১৭) মানুষের প্রতি অভিসম্পাত! সে তাকেই অস্বীকার করলো। (১৮) (সে কি চেয়ে দেখে না?) আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ বস্তু থেকে তাকে পয়দা করেছেন-(১৯) তিনি তাকে একবিন্দু শুক্র থেকে পয়দা করেছেন, অতপর তিনি তার (দেহে সব কিছুর) পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। (২০) তার জন্যে (এখানে) চলার পথসমূহকে আসান করে দিয়েছেন। (২১) (এক পর্যায়ে) তিনি তাকে মৃত্যু দিলেন, তার দেহকে (দীর্ঘকাল ধরে) কবরে রাখার ব্যবস্থা করলেন। (২২) অতপর তিনি যখন চাইবেন তাকে কবর থেকে পুনরায় উঠিয়ে আনবেন।

(২৩) হ্যাঁ, তাকে যা বলা হয়েছে তা সে (কোনদিনই) পালন করেনি, (২৪) মানুষকে তার আহারের দিকেও একবার তাকিয়ে দেখা দরকার। (২৫) আমি (শুকনো ভূমিতে এক সময়) প্রচুর পরিমাণ পানি ঢেলেছি, (২৬) এরপর (সে) যমীনকে বিদীর্ণ করেছি, (২৭) (অতপর) তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যদানা, (২৮) আঙ্গুরের থোকা ও রকমারী শাকসবজি, (২৯) (আরো উৎপাদন করেছি) যয়তুন ও খেজুর (সহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল,) (৩০) শ্যামল ঘন বাগান, (৩১) (রয়েছে) ফলমূল ও ঘাস। (৩২) (এ সবই করা হয়েছে) তোমাদের ও তোমাদের গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারের (জীবিকা নির্বাহের) জন্যে, (৩৩) অতপর যখন (একদিন) বিকট আওয়াজ আসবে,

(৩৪) সেদিন মানুষ তার নিজ ভাইদের কাছ থকে পালাতে থাকবে, (৩৫) (পালাতে থাকবে) তার নিজের মা থেকে নিজের বাপ থেকে, (৩৬) সহধর্মী সহধর্মীনী থেকে-এমন কি তার ছেলেমেয়েদের থেকেও (সেদিন সে পালাতে থাকবে)। (৩৭) তারা (সেদিন) তাদের নিজেদের ছাড়া অন্য কারো কথাই ভাববে না। (৩৮) কিছু সংখ্যক মানুষের চেহারা সেদিন উজ্জ্বল হয়ে যাবে। (৩৯) মুখগুলো (তাদের) খুশীতে ভরে উঠবে। (৪০) (অপরদিকে) কিছু সংখ্যক চেহারা হবে (কুৎসিত), তার ওপর (যেন) ধূলাবালি পড়ে থাকবে, (৪১) মলিনতায় তা (সম্পূর্ণ) ছেয়ে যাবে। (৪২) এই লোকগুলোই হচ্ছে (কিতাবের) অস্বীকারকারী এবং এরাই হচ্ছে পাপীষ্ঠ।

আয়াতসমূহের ব্যাখ্যাঃ
এই সূরার ১৭ আয়াত থেকে ৩২ আয়াত পর্যন্ত সত্য অস্বীকারকারী লোকদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করে তাদের প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমে অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে তাদের প্রতি যারা অহঙ্কারে মদমত্ত হয়ে সত্য অস্বীকার করে। ইসলামী জীবন বিধানের পরিবর্তে মানুষের বানানো ভোগবাদী আদর্শ অনুসরণ করতে ইচ্ছুক-তাদের প্রতি অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে ঐ আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি তাদেরকেই শুধু সৃষ্টি করেননি, সৃষ্টি করেছেন গোটা জাহানের দৃশ্যমান অদৃশ্যমান সমস্ত কিছু। কারণ এই লোকগুলো মহাসত্যের বাহকদেরকে ঘৃনার চোখে দেখে থাকে, তারা ধারণা করে ইসলামী আদর্শের অনুসারী লোকগুলো পশ্চাৎপদ এবং এরা দেশ ও জাতিকে পেছনের দিকে পরিচালিত করতে চায়। দেশের উন্নতি আর প্রগতির চাকাকে এরা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চায়। এসব অমূলক চিন্তা ধারায় প্রভাবিত হয়ে এরা আল্লাহর সৈনিকদের তুলনায় নিজেদেরকে মর্যাদাবান মনে করে। কিন্তু স্বয়ং আল্লাহর দৃষ্টিতে এরা অভিশাপের পাত্র।

১৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহর বিধানের প্রতি অবহেলাকারী লোকগুলোর প্রতি অভিশাপ দিতে গিয়ে ‘ইনসান' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এই ‘ইনসান' শব্দ দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত মানুষদেরকে বুঝানো হয়নি। বলা হয়েছে সেইসব মানুষদের কথা, যারা মহান আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ, আল্লাহর দেয়া যাবতীয় নেয়ামত ভোগ করার পরেও যারা তাঁর দাসত্ব করতে অনাগ্রহী, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠাকামী লোকদেরকে যারা ঘৃণার দৃষ্টিতে, অবহেলার দৃষ্টিতে দেখে থাকে। যেমন সূরা হামীম সাজ্দার ৪৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘লা ইয়াছ্আমুল ইনছানু মিন দুআ'য়িল খাইরি' অর্থাৎ কল্যাণ চেয়ে দোয়া করতে মানুষ কখনো ক্লান্ত হয় না'-এই আয়াতেও যে ‘মানুষ' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তাও নিঃসন্দেহে সমস্ত মানুষের কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে ঐসব লোকদের কথা, যারা কোন অকল্যাণের মুখোমুখী হলেই হতাশ হয়ে পড়ে বারবার কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকে। আর যখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ লাভ করে, তখন ক্ষণপূর্বে যে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিল, সে আল্লাহর প্রশংসা করতে ভুলে যায়। বলে, আমি এসব নিজের যোগ্যতার কারণে লাভ করেছি।

সূরা আশ শূরার ৪৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষের অবস্থা হলো এমন যে, তারা যখন আল্লাহর রহমতে অনেক কিছু লাভ করে তখন সে অহঙ্কারী হয়ে ওঠে। আল্লাহকে ভুলে যায়। আর নিজের কৃতকর্মের কারণে যখন ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তখনও সে আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে বলতে থাকে, আল্লাহ আমার ওপর এই বিপদ চাপিয়ে দিয়েছে।' এসব আয়াতে যে ‘মানুষ' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে বুঝানো হয়নি। বুঝানো হয়েছে ঐসব মানুষদেরকে, যারা আল্লাহর বিধানের অনুসরণ করে না। সুতরাং আয়াতে বর্ণিত, ‘মানুষের প্রতি অভিসম্পাত!' কথাগুলো প্রাসঙ্গিক লোকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সমস্ত মানুষ এখানে বুঝাবে না। যারা মহান আল্লাহর নে'মাত ভোগ করছে অথচ আল্লাহর বিধান অস্বীকার করছে, আল্লাহর বিধানের প্রতি অমনোযোগিতা প্রদর্শন করছে, আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার কোনই চেষ্টা করছে না, এসব লোক আল্লাহর দরবারে অকৃতজ্ঞ হিসাবে বিবেচিত এবং তারাই আল্লাহর অভিশাপের উপযুক্ত।

এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহর অগণিত নে'মাত ভোগ করার পরও যারা আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান অনুসরণ করতে চায় না, মানুষের এই অবস্থাকে আল্লাহর কোরআন স্পষ্ট কুফ্রী হিসাবে চিহ্নিত করেছে। আল্লাহর বিধানের মোকাবেলায় নানা ধরনের আদর্শ, মতবাদ, মতাদর্শ তুলে ধরছে-ধর্মনিরপেক্ষতা আমদানী করে আল্লাহর বিধান মসজিদের চার দেয়ালে আবদ্ধ করার লক্ষ্যে আন্দোলন করছে। আল্লাহর বিধানের সাথে এমন আচরণ করার পূর্বে সেসব মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, তার অস্তিত্ব কোথায় ছিল। সে কি অবস্থায় পৃথিবীতে আগমন করেছে। যখন সে পৃথিবীতে আগমন করলো, তখন সে কতই না অসহায় ছিল। আল্লাহ বলেন, সে ছিল এমন শুক্রবিন্দু যার মধ্যে শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক জীবন বা কীট। আমি আমার অধিকাংশ সৃষ্টিকে তার সেবায় নিযুক্ত করে তাকে ক্রমশঃ উন্নতি দান করেছি। তাকে চলাফেরার ও পানাহার করার যোগ্যতা দান করেছি। জ্ঞান-বিবেক বুদ্ধি-চেতনা দান করেছি। তাকে আলাপ-আলোচনা, তর্কবিতর্ক ও যুক্তি প্রদর্শন করার ক্ষমতা দিয়েছি। তার ভেতরে এমন সব ক্ষমতা দিয়েছি, যা অন্য কোন প্রাণীর মধ্যে নেই।

সে আমার পক্ষ থেকে এতকিছু লাভ করার পরও আমার প্রতি কৃতজ্ঞ নয়। আমার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পায়, আমার বিধানকে হেয়-প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে আমার দেয়া লেখনী শক্তি ব্যবহার করে, আমার বিধানকে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেয়ার জন্য আমারই দেয়া, জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি ব্যবহার করে, আমার বিধান প্রতিষ্ঠাকামী দ্বীনি আন্দোলনকে আমার যমীন থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করে। মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন লাভ করে আমার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে, এ কথাকে অস্বীকার করে। আল্লাহর কোরআন বলছে-

 أَوَلَمْ يَرَ‌ الْإِنسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ ﴿٧٧﴾ وَضَرَ‌بَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ ۖ قَالَ مَن يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَ‌مِيمٌ ﴿٧٨﴾ [سورة يس]

মানুষ কি দেখে না, তাকে আমি সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে এবং তারপর সে দাঁড়িয়ে গেছে স্পষ্ট ঝগড়াটে হয়ে? এখন সে আমার ওপর উপমা প্রয়োগ করে এবং নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। বলে, এ হাড়গুলো যখন পচে গলে গেছে এতে আবার প্রাণ সঞ্চার করবে কে? (সূরা ইয়াছিন-৭৭-৭৮)

এ সূরার ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি তাকে একবিন্দু শুক্র থেকে পয়দা করেছেন, অতপর তিনি তার দেহে সব কিছুর পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।' মাতৃগর্ভে ভ্রুণ স্থাপিত হবার পরে যখন তা মানব শিশুর মতো গড়ে উঠতে থাকে, তখনই মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন তার নিয়তি নির্ধারণ করে দেন। পৃথিবীতে আগমন করে সে এই নিয়তির বাইরে যেতে পারে না। পৃথিবীতে কোন ভূ-খন্ডে সে আগমন করবে, কোথায় কোন পরিবেশে সে ভূমিষ্ঠ হবে, কে তাকে লালিত-পালিত করবে, কোন বংশে আগমন করবে, ধনীর ঘরে বিলাস বৈভবের মধ্যে না গরীবের ঘরে দরিদ্রতার মধ্যে লালিত-পালিত হবে।

সে পুরুষ হিসাবে পৃথিবীতে দায়িত্ব পালন করবে না নারী হিসাবে, তার চেহারা কুৎসিত হবে না সুন্দর হবে, তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সামঞ্জস্যশীল হবে না সামঞ্জস্যহীন হবে, পৃথিবীতে স্বাস্থ্যবান হবে না স্বাস্থ্যহীন রোগা হবে, কন্ঠস্বর মিষ্টি মধুর হবে না কর্কশ শ্রুতিকটু হবে, সে কতটা মেধাশক্তির অধিকারী হবে, তার মানসিক যোগ্যতা কতটা প্রখর হবে, তার ব্যক্তিত্ব কেমন হবে, তার দেহের অভ্যন্তরের রক্তবাহী নালী, হার্ট, কিডনী, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র, অস্থি, স্নায়ূসমূহ, মগজ ইত্যাদি কতদিন সচল থাকবে, পৃথিবীর আলো-বাতাসে সে আসবে না গর্ভেই মৃত্যুবরণ করবে, অথবা পৃথিবীর আলো-বাতাসের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করবে, পৃথিবীতে আসার পরে সে কি ধরনের ভূমিকা পালন করবে, কতদিন সে পৃথিবীতে অবস্থান করবে এসব কিছুই মাতৃগর্ভেই মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন।

এটাই হলো মানুষের প্রকৃত অবস্থা আর এই মানুষ পৃথিবীতে আসার পরে তার জীবন ধারণের জন্যে যেসব উপকরণ প্রয়োজন, সেগুলোও মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন তাকে জুটিয়ে দিয়েছেন। তার দেহে ও মস্তিষ্কে যত যোগ্যতা দেয়া হয়েছে, পৃথিবীর বস্তু নিচয়কে তার নিয়ন্ত্রণাধীন না করলে মানুষ যাবতীয় যোগ্যতা কোথায় ব্যবহার করতো? কি করে সে নিজেকে পশুর তুলনায় বুদ্ধিমান বলে প্রমাণ করতো? এরপর এই মানুষকে আল্লাহ তা'য়ালা এই অবকাশও দিয়েছেন যে, সে স্বয়ং তার সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করলে, তার বিধানের সাথে বিদ্রোহ করলে স্রষ্টার দেয়া উপকরণগুলো তার সাথে বিদ্রোহ করছে না। পৃথিবীর ভেতরের ও বাইরের জিনিসসমূহও যেন এই মানুষ ব্যবাহর করতে সক্ষম হয়, এ যোগ্যতাও তাকে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে তার জীবন পরিচালিত করার পথ অত্যন্ত সহজ করা হয়েছে। আবার পরকালের মুক্তির পথও প্রদর্শন করা হয়েছে। এখন আল্লাহর সাথে নাফরমানী করার সাথে সাথে বা তাঁর বিধান অমান্য করার পরিণতিতে স্বয়ং আল্লাহ যদি তাঁরই দেয়া যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতাসমূহের লাগাম টেনে ধরতেন, তাহলে এই অসহায় মানুষের পক্ষে কোন কিছুই করা সম্ভব হতো না।

এই অসহায় মানুষ সম্পর্কে স্বয়ং তার স্রষ্টা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। পৃথিবীতে এমন কোন শক্তির অস্তিত্ব নেই যে, তা সামান্যতম পরিবর্তন করতে পারে। এই মানুষ তার জীবন-মৃত্যুর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অক্ষম। সে যেমন তার নিজের ইচ্ছানুযায়ী উন্নত দেশে, ধনীর দুলাল হিসাবে, সুন্দর চেহারা আর দেহের বলিষ্ঠ গঠন নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে না, তেমনি পারে না নিজের ইচ্ছানুসারে মৃত্যুকে বরণ করতে। কোথায় কখন কি অবস্থায়, দুর্ঘটনার মাধ্যমে, রোগভোগ করে, অথবা কোন ঘাতকের হাতে, অথবা হিংস্র পশুর আক্রমণে মৃত্যুবরণ করবে, এটাও নিয়ন্ত্রণ করছেন ঐ মহাশক্তিশালী আল্লাহ রাববুল আলামীন। এভাবে স্বয়ং আল্লাহর ইচ্ছাতেই তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। এ ব্যাপারে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার সামান্যতম মূল্য নেই। যেমন পৃথিবীতে আসার ব্যাপারে তার কোন স্বাধীনতা ছিল না। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাও করা হয়নি যে, ‘বান্দা বলো, তুমি কোথাও কোন পরিবেশে যেতে চাও।' সে পৃথিবীতে আসবে কি আসবে না, এ ব্যাপারেও তার স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির কোন মূল্য ছিল না। সে যদি পৃথিবীতে আসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করতো, তবুও তাকে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে পৃথিবীতে আসতেই হতো। মৃত্যুর ব্যাপারেও তার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই। সবকিছুই সংঘটিত হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে।

ঠিক তেমনি মৃত্যুর পরে তার আত্মাকে কোথায় রাখা হবে, সেটাও নির্ভর করবে আল্লাহ রাববুল আলামীনের ইচ্ছার ওপরে। আবার কিয়ামতের ময়দানে তাকে পুনর্জীবন দান করে উঠানো হবে ঐ আল্লাহরই ইচ্ছাতেই। এখানেও তার স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির কোন মূল্য দেয়া হবে না এবং হাশরের ময়দানে উঠার ব্যাপারে তাকে কোন প্রশ্নই করা হবে না। তাকে এ প্রশ্ন করা হবে না, তুমি হাশরের ময়দানে উঠবে না যে কবরে অবস্থান করছো, সেখানেই থাকবে? অর্থাৎ মানুষের জীবনে তার জন্মের পূর্ব থেকে শুরু করে মৃত্যুর পরে সর্বত্র সে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছারই মুখাপেক্ষী। সে যখন দেখছে তার জীবন চক্রাকারে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছারই ওপর নির্ভরশীল, তাহলে সে কেমন করে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে অহঙ্কার করে সেই আল্লাহরই দেয়া বিধানের প্রতি অবহেলা করতে পারে? কি করে সে ঐ করুণাময় মহাশক্তিশালী আল্লাহর বিধানের সাথে বিদ্রোহ করতে পারে? কি করে সে মহাসত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে?

২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে, তাকে যা বলা হয়েছে তা সে কোনদিনই পালন করেনি।' এই আয়াতে বিশেষভাবে ঐসব লোকদের কথা বলা হয়েছে, যারা মহান আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। আবার সমষ্টিগতভাবে নবী ও রাসূল ব্যতীত সমস্ত মানুষের কথাও বলা হয়েছে যে, এরা কেউ-ই তাদের মহান রব-আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি। অবশ্যই তারা তারা কোন না কোন ভুল করেছে এবং করছে। আল্লাহর আদেশ পুক্মখানুপুক্মখভাবে পালন করেনি। অকৃতজ্ঞ বান্দাদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, এ কথা তারা স্মরণেই স্থান দেয়না, কিভাবে তার সৃষ্টির সূচনা করা হয়েছে, কিভাবে সে মায়ের গর্ভে কোন মহাশক্তির ছত্রছায়ায় বর্ধিত হয়েছে, কার অনুগ্রহে সে পৃথিবীতে আগমন করেছে, কে তাকে যাবতীয় যোগ্যতা দিয়ে এই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে।

সে তার সৃষ্টিকর্তার আদেশ অনুসরণ করে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। যিনি তাকে একবিন্দু পানির ফোটা থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের আকৃতি দান করেছেন, তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেছেন। এখন সে পরকালের জন্য কোন পূঁজিও যোগাড় করেনি এবং এ চিন্তাও মনে স্থান দিচ্ছে না যে, তাকে আল্লাহর দরবারে হিসাব দেয়ার জন্য দন্ডায়মান হতে হবে। মানুষ তাঁর রবব-মহান আল্লাহর দাসত্ব করবে, এই প্রবণতা সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের মধ্যে দেয়া হয়েছে, অথচ সে এই প্রবণতার অনুগামী না হয়ে তার বিপরীত প্রবণতারই বিকাশ ঘটিয়েছে। তার জন্মগত প্রবণতাকে সঠিক পথে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে কিতাব অবর্তণ করা হয়েছে, কিন্তু তারা সে কিতাবের অনুসরণ করে তাদের জন্মগত প্রবণতাকে সঠিক পথে প্রবাহিত না করে সেই কিতাবের বিরোধিতা করছে। তার স্বাভাবিক কর্তব্য ছিল, জন্মগতভাবে তার ভেতরে যে প্রবণতা প্রবিষ্ট করে দেয়া হয়েছে এবং সেই প্রবণতাকে নির্ভুল পথে পরিচালিত করার জন্য যে কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা আঁকড়ে ধরে থাকা, সেই বিধান অনুসারে পৃথিবীতে জীবন পরিচালিত করা। সেই কর্তব্য তারা পালন না করে আমার নিদের্শের বিরোধিতা করছে, আমার নির্দেশ দেশের বুকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে যে দ্বীনি আন্দোলন চলছে, সেই আন্দোলনের সাথেও শত্রুতা পোষণ করছে।

আমি তাদের জন্য এই পৃথিবীতে যে খাদ্য দান করেছি, সে খাদ্য সম্পর্কে তারা চিন্তা করলেও দেখতে পাবে, প্রতিটি খাদ্যকণার পেছনে আমার বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর রয়েছে। আমার ব্যবস্থাপনা কার্যকর না থাকলে কোন মানুষের এ ক্ষমতা হতো না যে, তারা খাদ্য সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করে। সঠিক পরিমাপে পানি বর্ষণ করে তাদেরই কল্যাণে এই পৃথিবীকে সজিব রেখেছি। সঠিক মাপে পানি বর্ষণ না করলে এই পৃথিবী তাদের জন্য বসবাসের উপযোগী হতো না। তাদের জন্য মাটিতে পরিচালনযোগ্য করেছি, এটা না করলে তাদের পক্ষে এই মাটিকে ব্যবহার করে কোন খাদ্য উৎপন্ন করা সম্ভব হতো না। এই মাটির বুক দীর্ণ করে তাদের ও তাদের পশুসম্পদের জন্য উদ্ভিদ উৎপন্ন করি। তাদেরকে যে পশুসম্পদ দান করেছি, তা থেকে তারা নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে। খাদ্য হিসাবে গোস্ত, চর্বি, দুধ, মাখন পাচ্ছে। চামড়া ও হাড় নানা কাজে ব্যবহার করছে। পশুর মাধ্যমে বোঝা বহন করাচ্ছে। এসব ব্যবস্থা আমি করেছি, এখন সে আমার যাবতীয় নেয়ামত ভোগ করে আমাকে অস্বীকার করছে। আমার পাঠানো নবী-রাসূলদের সাথে বিরোধিতা করছে। আমার বিধান অমান্য করছে এবং আমার বিধান প্রতিষ্ঠাকামী লোকগুলোকে আমার যমীন থেকেই উৎখাত করার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্র করছে।

তারা নিজেদের কার্যাবলীর মাধ্যমে নিজেরাই আমার অভিশাপ ও আযাবের উপযুক্ত হয়ে পড়েছে। আযাব আর অভিশাপের পথেই এরা পা বাড়িয়ে দেয়। এদের প্রতিটি পদক্ষেপ অকৃতজ্ঞতামূলক। এদের আচরণ, কথা-বার্তা, সামাজিকতা, লেন-দেন সবই আমার বিধানের বিপরীত পদ্ধতিতে করে নাফরমান হিসাবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছে। সুতরাং এরা অভিশাপ আর আযাব ব্যতীত অন্য কিছু আমার কাছ থেকে লাভ করতে পারে না।

(এ সূরার ১৭ থেকে ৩২ আয়াতগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফসীরে সাঈদী-সূরা ফাতিহার ‘সমস্ত প্রশংসা ঐ রব-এর' শিরোণাম থেকে তিনিই প্রাণীসমূহকে জীবন ধারণের শিক্ষা দিয়েছেন' শিরোণাম পর্যন্ত পড়ুন।)

(এ সূরার ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন বিকট আওয়াজ আসবে।' এই আয়াতে কিয়ামতের সর্বশেষ সাইরেন ধ্বনির কথা বলা হয়েছে। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমরা সূরা নাযিয়াত ও সূরা নাবায় করে এসেছি।  ৩৩ থেকে ৪২ নম্বর আয়াতসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য তাফসীরে সাঈদী-সূরা ফাতিহার ‘যিনি বিচার দিবসের মালিক' শিরোণাম থেকে বিচার দিবসে কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হবে না' শিরোণাম পর্যন্ত পড়ুন।)

এখানে আমরা ৩৪ থেকে ৩৭ আয়াত পর্যন্ত সামান্য আলোকপাত করবো। এসব আয়াতে কিয়ামতের দিনের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সেদিন মানুষরা তার নিজ ভাইদের কাছ থকে পালাতে থাকবে, পালাতে থাকবে তার নিজের মা থেকে নিজের বাপ থেকে, সহধর্মী সহধর্মীনী থেকে-এমন কি তার ছেলেমেয়েদের থেকেও সেদিন সে পালাতে থাকবে। তারা তাদের নিজেদের ছাড়া অন্য কারো কথাই ভাববে না।

এই পৃথিবীতে আমরা দেখতে পাই, পরম আপনজন যখন কোন মারাত্মক অপরাধ করে গ্রেফতার হয় তখন তাকে শাস্তি থেকে মুক্ত রাখার জন্য মানুষ সাম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা-তদবীর করে। আপন সন্তানকে কেউ হত্যা করতে উদ্যত হলে মাতা-পিতা করুণ স্বরে কাকুতী-মিনতি করে বলতে থাকে, ‘আমাকে হত্যা করো, তবুও আমার সন্তানকে জীবিত থাকতে দাও।' অর্থাৎ নিজের যাবতীয় ধন-সম্পদ এমনকি প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে হলেও পরম আপনজনকে হেফাজত করার চেষ্টা করে থাকে। অসীম মায়া-মমতার কারণেই মানুষ এ ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ অবস্থা মানুষের এই মমতাভরা প্রকৃতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেবে। শাস্তির ভয়াবহতা আর বিভিষীকাময় অবস্থা দেখে, মানুষ নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা ব্যতীত অন্য কারো কথা চেতনায় আনবে না বা আনার মতো পরিস্থিতি থাকবে না।

বিপদের গুরুত্ব উপলব্ধি করে মাতা-পিতা তার সন্তানের কাছ থেকে, সন্তান তার মাতা-পিতার কাছ থেকে, ভাই তার আপন ভাইয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। এই ভয়ে তারা দূরে সরে যেতে থাকবে, পৃথিবীতে এরা সামান্য কোন অসুবিধায় নিপতিত হলে সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে, সে নিজেই নিজেকে উপস্থিত বিপদ থেকে মুক্ত করতে সক্ষম নয়, অন্যকে সে কিভাবে সাহায্য করবে? তারপর এ ভয়েও সেদিন দূরে সরে যেতে থাকবে, পৃথিবীতে সে ব্যক্তি তার অধিনস্থদেরকে ঐ পথে পরিচালিত করেনি, যে পথে চললে আজকের এই মহাবিপদ থেকে তারা মুক্ত থাকতে সক্ষম হতো। এ জন্য তার অধীনস্থরা আজকের এই মহাবিপদ দেখে তাকেই অভিযুক্ত করতে পারে, ‘তুমি ছিলে আমার পরিচালক, আমাদের অভিভাবক, আমাদের নেতা, আল্লাহর বিধান অনুসারে তুমি আমাদেরকে পরিচালিত করোনি, নিজের মনগড়া বিধান বা মানুষের বানানো আদর্শ অনুসারে আমাদেরকে পরিচালিত করেছো আর সে কারণেই আজ আমরা চরম বিপদে নিপতিত হয়েছি, আমাদের আজকের এই অবস্থার জন্য একমাত্র তুমিই দায়ী।'

এই অভিযোগে অভিযুক্ত হবার ভয়েও মানুষ তার আপনজন, সন্তান-সন্ততি, অধীনস্থদের কাছ থেকে সেদিন দূরে পালাতে থাকবে। পৃথিবীতে যারা আমলে সালেহ্ ও দ্বীনি আন্দোলন করেছে, অথচ সে তার আপন আত্মীয়দেরকে, সন্তান-সন্তুতিকে, অধীনস্থদেরকে দ্বীনি আন্দোলনের দাওয়াত পর্যন্ত দেয়নি, এসব লোকদেরকেও সেদিন দাওয়াত বঞ্চিত লোকজন অভিযুক্ত করবে, ‘তুমি একাই দ্বীনি আন্দোলন করে নিজের মুক্তির ব্যবস্থা করেছো, অথচ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন না করলে কিয়ামতের ময়দানে এই অবস্থায় আমরা নিপতিত হবো, এ সম্পর্কে তুমি আমাদেরকে সতর্ক করোনি। আজকের এই বিপদের জন্য তুমিও কম দায়ী নও।' এই অভিযোগ যেন শুনতে না হয়, এ ভয়েও মানুষ আপনজন ও পরিচিত মহল থেকে পালাতে থাকবে।

সেদিনের ভয়াবহ অবস্থার কারণে মানুষ ভীত-শঙ্কিত, বিস্মিত, হতভম্ভ হয়ে দিশাহারা হয়ে কাতর-উদ্বিগ্ন হয়ে যাবে। ভয়ানক দৃশ্যাবলী অবলোকন করে তাদের চক্ষুস্থির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

 فَإِذَا بَرِ‌قَ الْبَصَرُ‌ ﴿٧﴾ وَخَسَفَ الْقَمَرُ‌ ﴿٨﴾ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ‌ ﴿٩﴾ يَقُولُ الْإِنسَانُ يَوْمَئِذٍ أَيْنَ الْمَفَرُّ‌ ﴿١٠﴾ [سورة القيامة]

মানুষের দৃষ্টিশক্তি যখন প্রস্তুরীভূত হয়ে যাবে এবং চাঁদ আলোহীন হয়ে যাবে এবং চাঁদ ও সূর্যকে মিলিয়ে একাকার করে দেয়া হবে। তখন এই মানুষই বলবে, কোথায় পালাবো?(সূরা কিয়ামাহ্-৭-১০)

কিয়ামতের দিনের সেই চরম মহূর্তে মানুষ নিজেকে কিভাবে রক্ষা করবে, এই চেতনা ব্যতীত অন্য কোন অনুভূতি তার থাকবে না। আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন-

يَوْمَ تَأْتِي كُلُّ نَفْسٍ تُجَادِلُ عَن نَّفْسِهَا وَتُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ ﴿١١١﴾ [سورة النحل]

যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মরক্ষার চিন্তায় মগ্ন থাকবে। (সূরা আন্ নাহ্ল-১১১)

পৃথিবীতে মানুষের বানানো আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো কিয়ামতের ময়দানে প্রতিষ্ঠিত থাকবে না। সেখানে পারস্পরিক স্নেহ-মায়া, মমতা, প্রীতি-ভালোবাসা, সহযোগিতা, আত্মীয়তা এবং আকীদা-বিশ্বাস, কামনা-বাসনার শুধুমাত্র এমন ধরনের সম্পর্ক বজায় থাকতে পারে যা পৃথিবীতে এক আল্লাহর দাসত্ব ও সৎকর্মশীলতা এবং আল্লাহ ভীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর বিধানের বিপরীত পথ ও মতের সাথে জড়িত যাবতীয় সম্পর্ক সেখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সমস্ত ভালোবাসা সেখানে শত্রুতায় পরিণত হবে। সমস্ত শ্রদ্ধা-ভক্তি ঘৃণায় পর্যবসিত হবে, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, পীর-মুরীদ-যারা আল্লার অপছন্দনীয় পথে চলতো, তারা একে অন্যের ওপর অভিশাপ দিতে থাকবে এবং প্রত্যেকে নিজের ভ্রষ্টতার দায়-দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে বলতে থাকবে, ‘এই জালিমদের অনুসরণ করতে গিয়েই আজ আমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি।' আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

.....ثُمَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُ‌ بَعْضُكُم بِبَعْضٍ وَيَلْعَنُ بَعْضُكُم بَعْضًا ..... ﴿٢٥﴾ [سورة العنكبوت]

কিয়ামতের দিন তোমরা পরস্পরকে অস্বীকার এবং পরস্পরের প্রতি অভিসম্পাত করবে। (সূরা আনকাবুত-২৫)

পৃথিবীতে অবস্থানকালীন যাবতীয় আত্মীয়তার সম্পর্ক, যোগাযোগ কিয়ামতের ময়দানে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। দল, বাহিনী, বংশ, গোত্র, পরিবার ও গোষ্ঠী হিসাবে সেখানে মানুষদের কাছ থেকে হিসাব গ্রহণ করা হবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি একান্তই ব্যক্তিগতভাবে সেখানে উপস্থিত হবে এবং নিজের হিসাব নিজেকেই পেশ করতে হবে। এ কারণে পৃথিবীতে এমন করা উচিত নয় যে, কোন আপনজনের খাতিরে আল্লাহর অপছন্দনীয় কর্মে নিজেকে জড়িত করা। বিশেষ করে বর্তমান যুগে যে নির্বাচন পদ্ধতির প্রচলন করা হয়েছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমেই বিভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী দলসমূহ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহণ করে। তারপর তারা ক্ষমতা যন্ত্র ব্যবহার করে জাতির ওপরে তাদের দলীয় আদর্শ চাপিয়ে দেয়। নির্বাচনে এমন ব্যক্তি প্রার্থী হলেন, যার দলীয় আদর্শ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, সে দল ক্ষমতায় আরোহণ করলে ইসলামের বিপরীত আইন-কানুন দেশে চালু করবে। অথবা ক্ষমতায় গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করবে বা ইসলামকে মসজিদ, মাদ্রাসায় বন্দী করবে। নির্বাচনের সময় এই ধরনের দলের প্রার্থী যদি নিজের পিতা, ভাই, সন্তান বা যে কোন নিকটাত্মীয় হোক না কেন, তাকে কোনক্রমেই সমর্থন বা ভোট দেয়া যাবে না। যারা দেবে তাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা জালিম হিসাবে গণ্য করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ‌ عَلَى الْإِيمَانِ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿٢٣﴾ [سورة التوبة]

হে ঈমানদারগণ! নিজেদের পিতা ও ভাইকেও আপন বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে অধিক ভালোবাসে। তোমাদের যে ব্যক্তিই এই ধরনের লোকদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে-ই জালিম হবে। (সূরা তওবা-২৩)

পিতা বা সন্তান অথবা ভাই-বোন ধর্মনিরপেক্ষতা, পূঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র বা সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, ঐসব মতবাদে বিশ্বাসী দল করে, জাতীয় নির্বাচনে বা যে কোন প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনে তাদেরকে সমর্থন দেয়া, তাদেরকে ভোট দেয়ার স্পষ্ট অর্থ ইসলামের বিপরীত মতামতের প্রতি রায় দেয়ার শামিল। কিয়ামতের দিন এরা কোনই কাজে আসবে না। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

لَن تَنفَعَكُمْ أَرْ‌حَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ ۚ .... ﴿٣﴾ [سورة الممتحنة]

কিয়ামতের দিন না তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক তোমাদের কোন কাজে আসবে, না তোমাদের সন্তান-সন্ততি। (সূরা মুমতাহিনা-৩)

ইসলামের বিপরীত মতবাদ মতাদর্শে বিশ্বাসী আপন আত্মীয়-স্বজনকে যারা সমর্থন করবে, কিয়ামতের দিন তারা কেউ-ই পাশে থাকবে না। তারা কেউ আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হয়ে এ কথা বলার সাহস পাবে না যে, আমাদের পিতা, আমার সন্তান, আমার ভাই আমাদের জন্যই এই গুনাহ করেছিল, অতএব তার শাস্তি আমাদেরকেও দেয়া হোক। সেদিন তো প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে নিয়ে বিপন্ন ও ব্যস্ত হয়ে থাকবে। নিজের কর্মের পরিণতি থেকে বাঁচার চিন্তাই প্রত্যেকের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে থাকবে। অন্য কারো অপরাধের শাস্তি নিজের মাথায় তুলে নেয়া তো সুদূর পরাহত ব্যাপার, নিজের প্রাণাধিক সন্তান, স্ত্রী, ভাই-বোন, পিতা-মাতা তথা সমস্ত আপনজনদেরকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে, সবাইকে বিনিময় হিসাবে দিয়ে হলেও নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে। মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন-

 وَلَا يَسْأَلُ حَمِيمٌ حَمِيمًا ﴿١٠﴾ يُبَصَّرُ‌ونَهُمْ ۚ يَوَدُّ الْمُجْرِ‌مُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ ﴿١١﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ ﴿١٢﴾ وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ ﴿١٣﴾ وَمَن فِي الْأَرْ‌ضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُنجِيهِ ﴿١٤﴾ [سورة المعارج]

তখন কোন প্রাণের বন্ধু নিজের প্রাণের বন্ধুরও খবর নিতে চাইবে না। অথচ তারা একজন আরেকজনকে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবে। সেদিন অপরাধী ব্যক্তি আযাব থেকে নিজেকে বাঁচাতে মুক্তিগণ হিসাবে তার সন্তানদের দিতে পারলেও তা করতে চাইবে, দিতে চাইবে নিজের স্ত্রী ও নিজের ভাইকেও, নিজের পরিবারভুক্ত এমন আপনজনদেরকে, যারা তাকে জীবনভর আশ্রয় দিয়েছিলো। সম্ভব হলে ভূ-মন্ডলের সবকিছুই দিতে চাইবে তারপরও জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইবে। (সূরা মায়ারিজ-১০-১৪)

সেখানে এমন হবে না যে, কেউ কারো পরিণতি দেখতে পাচ্ছে না বলে তার অবস্থা কি, তা জিজ্ঞাসা করার কোন সুযোগ থাকবে না-বিষয়টি এমন নয়, বরং প্রত্যেকের পরিণতি কি হচ্ছে, তা সবাই প্রত্যক্ষ করতে থাকবে। কিন্তু প্রত্যেকেই তার নিজের সঙ্কটজনক অবস্থা নিয়ে কঠিনভাবে ব্যতিব্যস্ত থাকবে, যার ফলে পরম আপনজনদের কার কি অবস্থা, তা জানার মনোভাব থাকবে না। হাদীসের বর্ণনা অনুসারে কিয়ামতের ময়দানে মানুষ বস্ত্রহীন অবস্থায় উঠবে। কিন্তু কারো প্রতি দৃষ্টিপাত করার মতো চেতনা কারোই থাকবে না। এমন ভয়ানক অবস্থার অবতারণা ঘটবে সেদিন। এ জন্যই বলা হয়েছে, সেদিন পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান পরস্পর পরস্পরের কাছ থেকে পালাবে। এরা তো সেসব ব্যক্তি যাদের মধ্যে একজনের সাথে আরেকজনের রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, কিন্তু এসব সম্পর্ক সেদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

কিয়ামতের দৃশ্য অবলোকন করে মন এতই ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে, ভয়ে এতই বিহবল হয়ে যাবে যে, সে আশেপাশের সমস্ত কিছু থেকে অমনোযোগী হয়ে পড়বে। কিয়ামতের কঠিন দিনে লোমহর্ষক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মন ও আত্মার ওপরে ভয় ও শঙ্কার যে আবরণ পড়ে যাবে, ফলে পারিপার্শিবক সমস্ত কিছু থেকে সে উদাসীন থাকবে। পৃথিবীতে যারা আল্লাহর বিধান অনুসরণ করেছে, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছে তাদের চেহারা সেদিন আনন্দে উজ্জ্বল থাকবে। আর যারা আল্লাহর বিধান অনুসরণ করেনি, কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে শত্রুতা পোষণ করেছে, তাদের চেহারা আত্মগ্লানী, আফসোস ও দুঃখের কালিমায় আচ্ছন্ন থাকবে। সেদিন এদের চেহারাই বলে দিবে যে, এরা পৃথিবীতে আল্লাহর বিধানের সাথে বিদ্রোহ করছিল এবং দুষ্কৃতিতে নিমজ্জিত ছিল।

(সমাপ্ত)


লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes