আদব (জ্ঞান চর্চাকারীর আদব-কায়দা)//৬

Print
Category: অনুবাদ সাহিত্য
Published Date Written by জাবীন হামিদ

আদব
(জ্ঞান চর্চাকারীর আদব-কায়দা)

মূল(আরবী): শেখ আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মাদ সাঈদ রাসলিন, সৌদি আরব।
ইংরেজী অনুবাদ: আল-বুকাউ মিন খাসইয়াতিল্লাহ্ শেখ হুসাইন।
ইংরেজী থেকে অনুবাদ: জাবীন হামিদ, বাংলাদেশ।

"আমি ত্রিশ বছর ধরে আদব শিখেছি আর জ্ঞান চর্চায় সময় দিয়েছি বিশ বছর।"–আবদুল্লাহ বিন আল মুবারক।


(নভেম্বর ২০১২, ১৪তম সংখ্যার পর...)

তোমার বন্ধু যে হবে তার মধ্যে অবশ্যই নীচের পাঁচটি গুণ থাকবে: -

১. বুদ্ধিমান হবে। বোকার সাথে বন্ধুত্বে কোন কল্যাণ নেই, কেননা সে উপকার করতে চাইলেও তোমার কেবল ক্ষতিই করবে। বুদ্ধিমান বলতে বোঝাচ্ছি সে কোন কিছুর প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারে বা কিছু বোঝালে বোঝে।

২. তার আদব–কায়দা ভাল হবে ও এটা অপরিহার্য গুণ। যে শুধুই বুদ্ধিমান, সে রাগ বা ইচ্ছার বশ হয়। ফলে তার বন্ধুত্ব কল্যাণকর নয়।

৩. সে মুনাফিক হবে না। এমন মানুষ আল্লাহকে ভয় পায় না ও যে আল্লাহকে ভয় করে না, তাকে বিশ্বাস করা যায় না।

৪. সে নতুন কিছু চালু করবে না। কেননা, তার চালু করা রীতি তোমার উপর খারাপ প্রভাব ফেলার ভয় থাকবে।

৫. দুনিয়াদারির দিকে তার মোহ থাকবে না।

উমর বিন আল খাত্তাব رضي الله عنه বলেন, তোমার সত্য পথের ভাইদের সাথে লেগে থাকো। তুমি তাদের সাথে শান্তিতে থাকতে পারবে, কেননা যখন কোন কষ্ট নেই, তখন তাদের সাথে থাকাটা আনন্দময় আর কঠিন সময়ে তুমি তাদের উপর ভরসা করতে পারবে। তোমার ভাই সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল ধারণা রাখবে যতক্ষণ না সে এমন কিছু নিয়ে আসে, যা তোমাকে সাবধান করবে তার বিষয়ে।

তোমার শত্রুকে এড়িয়ে চলো। যাকে বিশ্বাস করা যায় না, তার সাথে বন্ধুত্ব করা থেকে সাবধান থাকবে। যে আল্লাহকে ভয় পায় না, তাকে বিশ্বাস করা যায় না।

যে নীতিহীন, তার সাথে বন্ধুত্ব করবে না। কেননা, সে তোমাকে নীতিহীনতা শেখাবে; আর এমন লোকের কাছে তোমার গোপন কথা বলবে না।

গোপন কথা নিয়ে আলোচনা শুধু তার সাথেই করতে পারো, যে আল্লাহকে ভয় পায়। ইয়াহিয়া বিন মুরাদ বলেন: বন্ধু হচ্ছে সে, যাকে তোমার জন্য দুআ করার কথা মনে করিয়ে দিতে হবে না। তাকে তোষামোদ করা বা মন জয় করার চেষ্টা করতে হবে না। এবং তার কাছে কোন কিছু নিয়ে মাফ চাওয়ার দরকার নেই।

ভাইয়ের দাবী:

তোমাদের সবারই ভাইয়ের উপর নির্দিষ্ট কিছু দাবী আছে। তার কোন দরকার থাকলে তা সাধ্যমত পূরণ করবে।

কমপক্ষে যা অবশ্যই করতে হবে তা হলো- যখন সে কিছু চাইবে, তখন সাধ্যের মধ্যে হলে হাসিমুখে তার প্রয়োজন মেটাবে। ভাই চাওয়ার আগেই যদি খেয়াল করে তার প্রয়োজন মেটাও, তবে তা আরো ভাল। তোমার নিজের যা দরকার, তার উপর যদি ভাইয়ের দরকারকে প্রাধান্য দাও, তাহলে তা সবচেয়ে ভাল।

তার দোষ সম্পর্কে তার সামনে বা আড়ালে কিছু বলবে না- এ নিয়ে নীরব থাকো। তার সাথে মতভেদ করবে না, ঝগড়া করবে না। তার গোপন কথা যা সে প্রকাশ হোক চায় না, তা জানতে চাইবে না। যদি তুমি দেখো সে কোথাও যাচ্ছে, জানতে চাইবে না সে কোথায় যাচ্ছে। কেননা সে হয়তো তা অন্যকে জানাতে চায় না। তার গোপন কথা কাউকে বলবে না; যদিও পরে তার সাথে কখনো ঝগড়া হয়। তার বন্ধু ও পরিবারের লোকদের অপমান করবে না। যদি অন্য কেউ তার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলে, সেটা তার কাছে বলবে না।

সে বিরক্ত হবে এমন কিছু তাকে বলবে না, ব্যতিক্রম হলো যদি এমন কিছু হয় যা অবশ্যই বলা উচিত যেমন ভাল কাজের নির্দেশ দেয়া, খারাপ কাজ করতে নিষেধ করা। এতে তার উপকারই করা হলো। জেনে রাখো এমন বন্ধু কখনোই পাবে না, যার কোন দোষ নেই। তাই এমন বন্ধু খুঁজবে যার দোষের থেকে গুণ বেশী। যদি তুমি নিজের দোষ–গুণ বিচার করার চেয়ে অন্যের সমালোচনা বেশী করো, তাহলে আল্লাহর এই বাণী তোমার জন্য প্রযোজ্য হবে:

যারা লোকের কাছ থেকে ওজনকালে পুরো মেপে নেয়, কিন্তু যখন তাদের জন্য ওজন করে তখন মাপে কম দেয় (সূরা মুতাফফিফিন; ৮৩: ২-৩)।

বিনা দরকারে তর্ক–বিতর্ক করা দুই ভাইয়ের মধ্যে ঘৃণা ও হিংসা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। তখন দুই পক্ষই নিজেকে অন্যের থেকে সেরা ও বেশী বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে চায়, অন্যের সম্মান নষ্ট করতে চায়।

যে ঝগড়া করা বেছে নেয়, সে তার ভাইকে বোকা ও অযোগ্য প্রমাণ করতে চায়- আর এসবই হলো অন্যের সম্পর্কে মিথ্যা বলা। এতে মন উত্তেজিত হয় ও একে অন্যকে ঘৃণা করে। এসব হলো ভ্রাতৃত্ববোধের বিপরীত।

ভ্রাতৃত্ববোধের দাবী হলো যা বলা উচিত না, তা যেমন বলবে না তেমনি, যা বলা উচিত তা বলবে। এটাই হলো ভ্রাতৃত্ববোধের অধিকার, কেননা যে বোবার বন্ধু হতে চায়, সে কবরস্থানে যাবে।

ভ্রাতৃত্ববোধের দৃষ্টিভঙ্গী হলো তুমি তোমার ভাইয়ের থেকে কল্যাণ লাভ করবে। তাই ভ্রাতৃত্ববোধকে শক্তিশালী করবে তার খোঁজখবর নিয়ে, তাকে বুঝতে দিবে যে তুমি তাকে নিয়ে ভাবো, তার সুখবরে খুশী হও। তুমি তার সম্পর্কে ভাল যা জানো, তা অন্যদের কাছে বলবে। তার পরিবার, সন্তান, কাজ, স্বভাব, বুদ্ধি, চেহারা, ব্যক্তিত্ব – ইত্যাদি যা নিয়ে বললে সে খুশী হয় তা বলবে, তবে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাবে না ও মিথ্যা বলবে না।

একইভাবে কেউ যদি তার সম্পর্কে ভাল কথা বলে, সেটা তাকে জানাবে ও তাকে বুঝতে দিবে তার প্রশংসা শুনে তুমি খুশী হয়েছো। তা না হলে এটা হিংসা করার মতো হবে। তোমার জন্য সে যা বলবে, তার জন্য তাকে ধন্যবাদ দেবে। যদি কেউ তার সম্পর্কে খারাপ কথা বলে, তবে তার প্রতিবাদ করে ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করবে। ভাইদের একে অন্যের উপর এই অধিকার আছে যে তারা একে অন্যকে বাঁচাবে ও সাহায্য করবে।

তুমি তাকে শেখাবে ও উপদেশ দেবে। কেননা, তার যেমন অর্থের দরকার আছে, তেমনি জ্ঞানেরও দরকার আছে। তাই তুমি যদি জ্ঞান সম্পদ পাওয়ার মতো সৌভাগ্যবান হয়ে থাকো, তাহলে তা থেকে তাকে কিছু দাও ও তাকে পথ দেখাও।

তাকে তুমি গোপনে উপদেশ দিবে। তুমি তাকে উপদেশ দিচ্ছো, না কি তাকে দোষ দিচ্ছো, তা নির্ভর করে সেটা গোপনে বলছো না সবার সামনে বলছো। একইভাবে তুমি তার দোষ উপেক্ষা করছো, না তার সাথে আপোস করছো তা নির্ভর করে, কিভাবে বা কোন উদ্দেশ্যে তা করছো? যদি ধর্মীয় কল্যাণের কথা ভেবে বা এতে পরে তার কোন দীর্ঘমেয়াদী উপকার আছে এই ভেবে উপেক্ষা করো, তবে তুমি আপোস করছো না। যদি তুমি নিজের স্বার্থে তার দোষ এড়িয়ে যাও, তাহলে তুমি আপোস করছো।

ভাই বেঁচে থাকতে ও তার মৃত্যুর পরে তুমি ভাইয়ের জন্য সেই দুআ করবে যা নিজের জন্য চাও।। রাসূল صلى الله عليه وسلم বলেন, ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য তার মুসলিম ভাই যে দুআ করে, তা কবুল হয়। ভাইয়ের জন্য কেউ যখন দুআ করে, একজন ফেরেশতা তা লিখে রাখে, ও বলে: হে আল্লাহ, এই দুআ কবুল করুন ও একে একই জিনিষ দান করুন। যা সে তার ভাইয়ের জন্য চেয়েছে (বর্ণনায় আবু আদ দারদা رضي الله عنه)।

আবু দারদা رضي الله عنه নাম ধরে ধরে বলে অনেকের জন্য দুআ চাইতেন। একইভাবে আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) ভোরে নির্দিষ্ট ছয়জনের জন্য দুআ করতেন। তুমি একটি চুক্তি করবে যে, অবশ্যই তোমার ভাইকে তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ভালবেসে যাবে ও সে মারা যাবার পরে তার পরিবার ও বন্ধুদের ভালবাসবে। তুমি যদি তার থেকে টাকা–পয়সা ও মর্যাদায় অনেক উঁচুতে থাকো তবুও তার সাথে বিনীত ব্যবহার করবে। এই চুক্তির মধ্যে এটাও থাকবে যে তুমি তার গীবত শুনবে না ও তার শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব করবে না। তুমি তাকে এমন কঠিন কাজ দেবে না, যা সে করতে পারবে না। বরং তুমি তাকে তার দায়িত্ব ও বোঝা থেকে মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করবে। তার বন্ধুত্বকে ব্যবহার করে তার কোন সম্পদ অধিকারে নেবে না। তোমাকে কোন সাহায্য করার জন্য তাকে চাপ দেবে না। বরং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে ভালবাসবে। তার সাথে সহজ–সরল এমন সম্পর্ক রাখবে যেন তুমি তার কাছে যা চাইতে পারো, সেও তেমনি তার দরকারে চাইতে পারে।

জাফর বিন মুহাম্মদ বলেন: তারাই সবচেয়ে কঠিন প্রকৃতির বন্ধু, যারা আমার উপর ভারী বোঝা হয়ে আছে ও আমি তাদেরকে এড়িয়ে চলতে চাই। সবচেয়ে সহজ বন্ধু তারাই যাদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কোনটাই ভারী বোঝা হয়ে দাড়ায় না।

সময় ও মনকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞানের পথের ছাত্ররা তাই সাবধান হবে। ধর্মীয় জ্ঞান ও পরকালের জন্য কল্যাণকর হবে, এমন কাউকে সে বন্ধু হিসাবে বেছে নিবে।

আল খাওয়ারিযমী رحمه الله বলেন: যে অলস তার সাথে বন্ধুত্ব করবে না; যারা দৃঢ় তাদেরকেও অলস মানুষেরা প্রভাবিত করে ফেলে। কতজন সঠিক পথের মানুষ নীতিহীনদের সাথে বন্ধুত্বের কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছে? জ্বলন্ত কয়লা ঠান্ডা হয়ে যায় যখন ছাইতে ফেলা হয়।

কী শিখবে? কার কাছে শিখবে?

ইবনে আল কাইয়্যুম رحمه الله বলেন, জ্ঞানের মর্যাদা নির্ভর করে সেটা কার কাছ থেকে শেখা হলো, শেখা বিষয়টির পক্ষে দলীল শক্তিশালী কি না, বিষয়টি শেখা কতটুকু জরুরী ছিল ও এর উপকারীতা কতটুকু– সেসবের উপর।

কোন সন্দেহ নেই যে সবচেয়ে মহান ও চমৎকার জ্ঞান হলো আল্লাহ সম্পর্কে জানা– যিনি একমাত্র প্রভু, জগতসমূহের মালিক, এই দুনিয়া ও বেহেশতের অধিবাসীদের রিযিকদাতা, যিনি সত্য, নিখুঁত, তাঁর মতো বা তাঁর মতো গুণের অধিকারী কেউ না। আল্লাহ, তাঁর নাম, গুণ, বৈশিষ্ট্য, কাজ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান নিঃসন্দেহে সব জ্ঞানের থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান যেমন সবচেয়ে মহান জ্ঞান, তেমনি তিনি হলেন সব জ্ঞানের ভিত।

সব কিছুর অস্তিত্ব যেমন আল্লাহর উপর নির্ভরশীল, তেমনি সব জ্ঞান তাঁর উপর নির্ভরশীল।

কোন কিছু সম্পর্কে পুরোটা জানতে হলে, এই জ্ঞান বা বিষয়কে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর সম্পর্কেও জানা দরকার। আল্লাহর উপর সৃষ্ট সব কিছুই অস্তিত্বের জন্য নির্ভরশীল। তাই আল্লাহর গুণাবলী ও কাজ সম্পর্কে জানলে একজন বুঝবে, আল্লাহ ছাড়া আর কী কী অস্তিত্বশীল। কেননা, আল্লাহ হলেন সবকিছুর রব ও মালিক। আল্লাহ সম্পর্কে জানা হচ্ছে সব জ্ঞানের ভিত ও উৎস। তাই যে আল্লাহকে জানে, সে আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরও জানবে। যে আল্লাহ সম্পর্কে জানে না, সে অন্যদের সম্পর্কে জানবে না যেমনটি আল্লাহ বলেছেন: এবং তাদের মতো হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে; ফলে আল্লাহ ওদের (নিজ নিজ অবস্থা) ভুলিয়ে দিয়েছেন (সূরা হাশর; ৫৯: ১৯)।

যে আল্লাহকে ভুলে যায়, সে নিজেকেও ভুলে যাবে। তার কল্যাণ কিসে আছে তা সে বুঝতে পারবে না, পথভ্রষ্ট হয়ে সে বন্য প্রাণীর মতো হয়ে যাবে। বরং বলা যায়, বন্য প্রাণীও এমন মানুষ থেকে ভাল, কেননা তারা তাদের স্রষ্টার কাছ থেকে যা শিখেছে তাতে বেশী দৃঢ় থাকে এই পথহারা মানুষদের চেয়ে। এই পথহারা মানুষেরা ফিতরা বা স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, নিজেদের রবকে ভুলে গিয়েছে। পরিণামে নিজেকে, নিজের আত্মাকে, নিজের বৈশিষ্ট্য, কিভাবে তা পরিপূর্ণতা লাভ করবে ও পবিত্র থাকবে– এসব কিছু সে ভুলে গিয়েছে।

আল্লাহ বলেন, তুমি তার আনুগত্য করো না যার মনকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ও যার কাজ সীমা ছাড়িয়ে যায় (সূরা কাহফ; ১৮: ২৮)।

সে রবকে ভুলেছে, তাই নিজের আত্মাকে ভুলেছে। তাই নিজের জন্য যা ভাল, নিজের মন ও আত্মাকে শুদ্ধ করবে যা, তা সে গ্রহণ করতে পারে না। তার মনে সন্দেহ থাকে, সে পথ হারিয়ে ফেলেছে ও ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে।

মূল কথা হলো: আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান হলো সব জ্ঞানের ভিত। দাসকে জানতে হবে কিভাবে সে এই দুনিয়া ও পরের দুনিয়ায় সফল হবে। আল্লাহ সম্পর্কে না জানলে সে নিজের কল্যাণ কোথায়, তার পূর্ণতা কোথায়, কিভাবে সে সফল হবে? সে সবও জানতে পারবে না। তাই আল্লাহ সম্পর্কে জানা তার জন্য সুখের, আল্লাহ সম্পর্কে না জানার পরিণাম হলো খুব কষ্ট ও বেদনার।

আল্লাহকে ভালবাসা, সবসময় তাঁর যিকির করা ও তাঁকে সন্তুষ্ট করার চেয়ে আর কোন কিছুই দাসের জন্য উত্তম ও পছন্দনীয় হতে পারে না, এছাড়া দাস সম্পূর্ণ হয় না। এজন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, ওহী নাযিল হয়েছে, নবী–রাসূলদের পাঠানো হয়েছে, আসমান ও দুনিয়া বানানো হয়েছে, বেহেশত ও দোযখ সৃষ্টি হয়েছে, হারাম–হালালের নিয়ম হয়েছে, পবিত্র ঘর বানানো হয়েছে ও হজ্জের জন্য জায়গা ঠিক করা হয়েছে - যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে।

জ্ঞান ছাড়া এসব বিষয়ের ভিতরে ঢোকা যায় না। যারা আল্লাহ সম্পর্কে বেশী জানে, তারাই তাঁকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে। তাই যে আল্লাহকে জানবে, সে তাঁকে ভালবাসবে। যে দুনিয়া ও এর মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, সে এসবের প্রতি আগ্রহ হারাবে। তাই জ্ঞান সেই দরজা খুলে দেয় যাতে রয়েছে সৃষ্টির রহস্য।

তাই জ্ঞানের ছাত্ররা সেটা দিয়ে জ্ঞান চর্চা শুরু করবে, যা তাদের এখন ও সবসময়ই দরকার লাগবে - আল্লাহ বিষয়ে জ্ঞান, তাঁর নাম, বৈশিষ্ট্য ও কাজ। সে যদি আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তাহলে সে কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান সেই নিয়মে চর্চা করবে, যা উম্মাহর প্রথম যুগের মুসলমানরা করেছেন। তাহলে সে রাসূল صلى الله عليه وسلم যেভাবে শিখিয়েছেন, সেভাবে শিখতে পারবে।
ইবনে আল কাইয়্যুম رحمه الله বলেন, রাসূল صلى الله عليه وسلم এর পক্ষ থেকে কিছু বর্ণনা করা দুই ভাবে হয়:-

১. কারো মাধ্যমে বা মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায়।
২. কারো মাধ্যম ছাড়া।

সাহাবীরা কোন মাধ্যম ছাড়া সরাসরি রাসূল صلى الله عليه وسلم থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন, তারা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। উম্মাহর অন্য কারো পক্ষে এদের সমান মর্যাদায় আসা সম্ভব না। তবে সেই সফল হবে, যে তাদের দেখানো পথে চলবে। যা কিছু এই পথ থেকে তাদের সরিয়ে নিতে পারে, সে সব থেকে সে দূরে থাকবে। নইলে তার অবস্থা হবে এমন- যে মরুভূমিতে মৃত্যুর ফাঁদ ছড়িয়ে আছে, সেখানে যেন সে পথ হারিয়ে উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আল্লাহর শপথ, এই সাহাবীরা যেন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও সেরা পানীয় পান করেছে ও তারা ইসলামের মূল ভিতকে সমর্থন করেছে। তারা যা শিখেছেন, তার কোনকিছু তারা পরের যুগের মানুষদের জন্য ব্যাখ্যা না করে যান নি। তারা মানুষের মনকে খুলে দিয়েছেন কুরআনের ন্যায়বিচার ও ঈমান দিয়ে; তারা দেশ জয় করেছেন তরবারী ও জিহাদ দিয়ে; তারা যে জ্ঞান অর্জন করেছেন

রাসূল صلى الله عليه وسلم থেকে, তার সবকিছুই তাবেয়ীদের দিয়ে গিয়েছেন। তাদের ইসনাদ ছিল রাসূল صلى الله عليه وسلم, জিবরাইল আলাইহিস সালাম ও জগতসমূহের রব আল্লাহ থেকে, আর এটাই সর্বোচ্চ মানের ও বিশ্বাসযোগ্য ইসনাদ।

তারা বলেন, এটা রাসূল صلى الله عليه وسلم এর আমনত যা আমাদের কাছে আছে, আমরা তোমাদের কাছে এই আমানত দিয়ে গেলাম। এটা আল্লাহ তাঁর রাসূল صلى الله عليه وسلم ও আমাদের উপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমরা এই দায়িত্ব তোমাদের দিয়ে গেলাম। তাবেয়ীনরা দৃঢ়ভাবে নিয়ম মেনে জ্ঞানের পথে চলেছেন ও সঠিকভাবে রাসূল صلى الله عليه وسلم ও সাহাবীদের দেখানো পথ অনুসরণ করেছেন। এরপর তাদের অনুসারীরা একই পথে আবর্তিত হয়েছেন, সেরা কথা ও প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্যগুলির দিকে পরিচালিত হয়েছেন।

যারা তাদের আগে এসেছিলেন, তাদের সাথে তুলনা করলে তাবেয়ী ও তার পরে যারা এসেছেন তাদের অবস্থান এমন, যা আল্লাহ যিনি সবচেয়ে সত্যবাদী তিনি বলেছেন: বেশীরভাগ হবে পুর্ববর্তীদের মাঝ থেকে ও অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে (সূরা ওয়াকিয়াহ; ৫৬: ১২-১৩)।

রাসূল صلى الله عليه وسلم কোন কিছু করতে বললে, সাহাবীরা সেদিকে পুরো মনোযোগ দিতেন কোন প্রশ্ন না করেই। রাসূল صلى الله عليه وسلم এর কথা তাদের এত প্রিয় ছিল যে, তার কথার উপর তারা কোন কথা বলতেন না বা তার বিরোধীতা করতেন না।

তাই জ্ঞানের সন্ধানীরা, তোমরা অবশ্যই তোমাদের মনোযোগ দেবে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে। কেননা, এসবের জ্ঞানই হলো প্রকৃত জ্ঞান। অন্যকিছু সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলেও তা সত্যিকারের অর্থে তোমার ক্ষতি করবে না।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, কুরআনের বাইরে হাদীস বা ফিকাহর জ্ঞান ছাড়া আর সবকিছু মনোযোগ নষ্টকারী। যা কিছু শুরু হয় এভাবে- এটা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অমুক .........এছাড়া অন্যকিছু শয়তানের কূ – মন্ত্রণা।

ইবনে আল কাইয়্যুম رحمه الله বলেন, জ্ঞান হচ্ছে তাই যা আল্লাহ, তাঁর রাসূল صلى الله عليه وسلم ও সাহাবীরা বলেছেন। কেননা, এরাই সবচেয়ে জ্ঞানী।

তাই যে কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া অন্যকিছুর জ্ঞান পেতে চায়, সে অসম্ভবকে চায়। যে অন্যকিছু থেকে জ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট, সে সঠিক পথ থেকে দূরে চলে গিয়েছে।

কুরআন ও সুন্নাহ তোমাকে অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দেবে। এ নিয়ে ইবনে আল কাইয়্যুম رحمه الله বলেন, অজ্ঞতা হলো মরণ রোগ। এর সুস্থতা আছে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে। জ্ঞান হলো রবের বৈশিষ্ট্য ও কাজ, তাঁর নাম, আদেশ-নিষেধ, কিয়ামতের দিনে তিনি কী পুরষ্কার দেবেন ইত্যাদি সম্পর্কে জানা। এসবই আছে কুরআন ও সুন্নাহতে।

সব জ্ঞান হলো আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহর মধ্যে। তাই তোমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, তুমি এই দুইয়ের সাথে দৃঢ়ভাবে থাকবে। এই দুইয়ের জ্ঞান হলো নিরাপত্তা, শান্তির পথ যা কিয়ামতের দিনে ছায়া ও সেরা পুরষ্কার দেবে।

(ক্রমশ...)


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখিকার আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -জাবীন হামিদ

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes