ইসলামী সংস্কৃতিতে ঘুমানোর পদ্ধতি

Print
Category: সংস্কৃতি রীতিনীতি
Published Date Written by সম্পাদক

ইসলামী সংস্কৃতিতে ঘুমানোর পদ্ধতি


কোন ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে যদি দাবী করা হয় যে, তা পরিপূর্ণ, তবে তাতে জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা থাকা জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। অন্যথা তার পূর্ণতার দাবী অসার হয়ে পড়ে। সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহ্ তা'আলার যিনি আমাদেরকে এমন এক পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা দান করেছেন যা বিগত প‌্রায় চৌদ্দ-সাড়ে চৌদ্দশ' বছর যাবৎ মানবজাতিকে পথের দিশা দিয়ে যাচ্ছে অথচ আজো তার বিধিবিধান সর্ব যুগের সর্বাধুনিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে চিন্তাশীল মহলে। সামান্য নখ কাটা, খাওয়ার, ঘুমানোর রীতি পদ্ধতি থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি নির্ধারণ ইত্যাদি সকল বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও যুগের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ বিধিবিধান সমগ্র পৃথিবী খুঁজে একমাত্র ইসলামেই পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে নির্দ্বিধায় প্রতিজন মুসলমান এ বিশ্বের কাছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুঁড়ে দিতে পারে। মুসলমানদের জন্য পৃথিবীর জীবনে এর চেয়ে বড় গৌরবের বিষয় আর কিছু নেই।

শুধু কি বিধান? না; বরং ইসলামের নবী স্বয়ং নিজে কাজে পরিণত করে দেখিয়ে দিয়েছেন বিশ্ব মানবতাকে যে, বিধানগুলো এভাবে এভাবে মেনে চলতে হয়। আর তাই স্রষ্টার সৃষ্ট জগৎসমূহের জন্য বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর(আল্লাহর) পক্ষ হতে এক পরিপূর্ণ রহমত। এবং তাঁর অনুসারীদের জন্য একমাত্র পরিপূর্ণ আদর্শ। যাঁর জীবনের প্রতিটি কথা, কাজ ও সমর্থনকে দু'চোখ বুঁঝে গ্রহণ করা যায়। জগৎ অনুসন্ধান করে এমন চরিত্র দ্বিতীয়টি আর পাওয়া যায় না। আসুন আমরা তাঁর ঘুমানোর পদ্ধতি জেনে নেয়ার চেষ্টা করি যাতে আমাদের জীবনেও এর সঠিক ব্যবহার করার মাধ্যমে পার্থিব ও পারলৌকিক সমূহ কল্যাণ অর্জন করতে পারি।

ঘুমানোর আগে অযূ করা এবং পবিত্রাবস্থায় শোয়া ছিল নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিরাচরিত অভ্যাস। তাই তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে পবিত্রতার ব্যাপারে এবং ঠিক কিভাবে শয়ন করা উচিত এ বিষয়ে বলেছেন। হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারা ইবনে আ'যেব রাদ্বিআল্লাহু 'আনহুকে বলেন: "যখন তুমি তোমার শয্যা গ্রহণের ইচ্ছা করবে, তখন নামাযের ন্যায় অযূ করে ডান কাত হয়ে শয়ন করবে।" [বুখারী: ৬৩১১ ও মুসলিম: ৬৮৮২]

শুধু কি তাই? এ সৃষ্টি জগতে মানুষের ক্ষতি করার মত বহু কিছু রয়েছে। তাই তিনি(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে ঘুমের পূর্বে সূরা ইখলাস, নাস ও ফালাক পড়তেন। পবিত্র কুরআন জীবন চলার বিধিবিধানের পাশাপাশি একদিকে যেমন আত্মার আহার, তেমনি শরীরেরও নানা চিকিৎসার দিক নির্দেশনা রয়েছে নবীজীবনের কুরআনের ব্যবহারে। হাদীসে এসেছে, আয়েশা রাদ্বিআল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রাত্রে শয্যা গ্রহণের সময় তালুদ্বয় একত্রিত করে তাতে 'ক্বুল হুআল্লাহু আহাদ' এবং 'ক্বুল আ'উযুবি রব্বিল ফালাক্ব' এবং 'ক্বুল আ'উযুবি রাব্বিন্ না-স' পড়ে ফুঁ দিতেন। অতঃপর হস্তদ্বয় দ্বারা শরীরের যতদূর পর্যন্ত বুলানো সম্ভব হতো, ততদূর পর্যন্ত বুলিয়ে নিতেন। স্বীয় মাথা, চেহারা এবং শরীরের সামনের দিক থেকে আরম্ভ করতেন। এইভাবে তিনি তিনবার করতেন।" [বুখারী: ৫০১৭]

যে দয়াময় প্রতিপালক সকাল থেকে খাবার দিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের বায়ু থেকে শুরু করে যাবতীয় কিছুই আমার জন্য সরবরাহ করেছেন, কিভাবে তাঁর প্রশংসা-স্তুতি না করে তাঁরই প্রিয় বান্দারা নিদ্রায় মগ্ন হবেন? তাই তো শোয়ার সময় তাকবীর ও তাসবীহ্ পাঠ করা ছিল আল্লাহর প্রিয় রাসূল(সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাত। এ ব্যাপারে আলী রাদ্বিআল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, ফাতেমা রাদ্বিআল্লাহু 'আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একটি চাকর চাইলে তিনি বললেন, "আমি কি তোমাদেরক দু'জনকে এমনজিনিস বলে দেবো না, যা তোমাদের জন্য চাকরের চেয়েও উত্তম? তোমরা যখন বিছানায় শুতে যাবে, তখন ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার সুবহানআল্লাহ্ এবং ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ্ পড়বে। এটা তোমাদের জন্য চাকরের চেয়েও উত্তম।" [বুখারী: ৬৩১৮ এবং মুসলিম: ৬৯১৫]

খুব স্বাভাবিক যে, রাতে ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। মুমিনের জন্য তাতেও রয়েছে অফুরন্ত কল্যাণ এবং প্রভুর নৈকট্য লাভের সুযোগ। যদি রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় তাহলে সেক্ষেত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হলো-
উবাদা ইবনে সামিত রাদ্বিআল্লাহু 'আনহু নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "যে ব্যক্তি রাত্রে নিদ্রা ভঙ্গ হলে বলে, (লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু-লা-শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর, আলহামদুলিল্লা-হ্ ওয়াসুবহানাল্লা-হ্ আল্লাহু আকবার ওয়ালা হাওলা ওয়ালা ক্কুওয়্যাতা ইল্লা- বিল্লা-হ্। অর্থ,) 'আল্লাহ্ ছাড়া সত্যিকার কোন উপাস্য নেই। তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব ও সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাশীল। আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা। তিনি পবিত্র ও মহান। তাঁর সাহায্য ব্যতীত কারো ভালো কাজ করার ও মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি নেই।' তারপর সে যদি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা করে দাও, অথবা অন্য কোন দো'আ করে, তাহলে তার দো'আ কবূল করা হয়। এরপর সে অযূ করে নামায আদায় করলে তার নামায গৃহীত হয়।" [বুখারী: ১১৫৪]

নিদ্রা আমাদের জন্য মরণস্বরূপ। আল্লাহ্ দয়া করে আমাদেরকে পৃথিবীতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবিত রাখবে বলেই আমরা জেগে উঠতে সক্ষম হই। ইসলামের সুমহান বিধান থেকে এ বিষয়টিও বাদ পড়েনি। আল্লাহর রাসূল@  নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলে এ ব্যাপারে প্রমাণিত দো'আ পড়া:
(আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী- আহইয়া-না বা'দা মা- আমা-তানা- ওয়াইলাইহিন্ নুশূর, অর্থাৎ) সেই আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাকে মৃত্যুর পর আবার জীবিত করলেন। আর তাঁরই নিকটে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। [বুখারী: ৬৩১২, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাদ্বিআল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত।]

ইসলাম এভাবেই বড় বড় সমস্ত কাজ কর্ম থেকে শুরু করে ছোটখাটো প্রতিটি নড়াচড়ায় আমাদের সাথে সাথে থাকে। তাই তো ইসলাম এত মহান, এত আধুনিক এবং এতটাই মানবতার কাছাকাছি যে, ইসলাম ছাড়া মানবতার পূর্ণতা কখনোই সম্ভব হয় না। ঠিক তেমনি ইসলাম ছাড়া পারলৌকিক জগতেও আমাদের আর কোন কিছুই কাজে আসবে না। হাঁ, প্রতিটি পদক্ষেপই কাজে আসবে দুনিয়া ও আখেরাতে যদি আমরা তা ইসলামের সীমানার মধ্যে দিতে পারি। আসুন জীবনকে সুন্দরভাবে রাঙ্গিয়ে নেই ইসলামের কল্যাণময় রঙ্গে। আল্লাহই একমাত্র তৌফিক দাতা।


এ বিভাগের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: সংস্কৃতি-রীতিনীতি

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes