রক্ত না শুকালে পা ফেলার জায়গা খুঁজে পাওয়া যেত না

Print
Category: সম্পাদকীয়
Published Date Written by সম্পাদক

মানব সভ্যতার ইতিহাস সুদূর অতীত থেকেই রক্তে রঞ্জিত। অজানা সে কাল থেকে ছিল পার্থিব স্বার্থ এবং অনন্ত পূণ্যের দ্বন্ধ। কোথায় ছিল না, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, পরিবারে পরিবারে, পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায়, দেশে দেশে বিরাজিত ছিল এবং আছে এই সংঘাত। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন:

فَأَلْهَمَهَا فُجُورَ‌هَا وَتَقْوَاهَا ﴿٨؛

"তারপর তাতে আবেগ সঞ্চার করেছেন তার মন্দ কাজের ও তার ধর্মপরায়ণতার"। [সূরা আস্-শামচ্: ৮]

দু'টো ক্ষমতাই মানুষকে দেয়া হয়েছে সৃষ্টিগত ভাবে। কারণ পৃথিবী মানব জাতির জন্য এক পরীক্ষাগার। ভালো এবং মন্দ; দু'টো অংশই রাখা হয়েছে এবং সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মন্দের পরিণতি জাহান্নাম এবং ভালোর পরিণতি জান্নাত। এমনকি মন্দ পৃথিবীতেও নিন্দিত এবং ভালো পৃথিবীতেও নন্দিত হয়।

যখন ক্রমাগতভাবে কোন মানুষকে মন্দকর্ম সম্পাদন করতে দেখা যায় তখন এ ভাবনা চলে আসে যে, তার পরিণতি কোথায়? যদিও সেই মন্দকর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তি ইতিহাসে দেখেছে, এমনকি নিজের চোখেও দেখেছে যে, পৃথিবীতেই মন্দকর্ম সম্পাদনকারীদের পরিণতি কত ভয়াবহ হয়ে থাকে। তথাপি যখন তাকে সেই একই পথে চলতে দেখা যায়, তখন চিন্তাশীলদের চিন্তায় ধরা পড়ে যে, সে তো শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছাতেই চলে না। বরং নিজের ইচ্ছাকে নষ্ট করতে করতে এমন বিনষ্ট করে ফেলেছে যে, এখন স্বয়ং অন্য কোন শক্তি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তাকে ব্যবহার করছে।

এই অন্য শক্তির ব্যাখ্যায় দু'টো নামই নেয়া যায়- একটি স্বয়ং স্রষ্টা এবং অন্যটি স্রষ্টার অবাধ্য মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান। শয়তান তার দু'চোখে, অন্তরে সুশোভিত করে তোলে মন্দকর্মসমূহকে আর স্রষ্টা ঢিল দিতে থাকেন। মানব সৃষ্টির আদী থেকেই মানুষের কর্মসমূহে এ দু'টি শক্তির প্রভাব রয়েছে। শয়তানের নীতি হলো কুমন্ত্রণা দান, সন্দেহে ফেলা, বিভেদ সৃষ্টি করে দেয়া। শয়তান কখনো বড় কোন অপরাধ করতে পারে না, কারণ সে নিজেও খুব দুর্বল এবং তার পরিকল্পনাও হয়ে থাকে দুর্বল। শয়তান শুধু বীজ বপন করার কাজটুকু করে থাকে। বাকী কন্টকে-আবর্জনায় পূর্ণ করার কাজ মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও শক্তিতেই সম্পন্ন হয়ে থাকে।

অন্যদিকে আল্লাহর নীতি হলো- তিনি পৃথিবীতে পরীক্ষার আয়োজন করে রেখেছেন। নানা সরঞ্জামের সবগুলোই মানব জাতিকে পরীক্ষার আয়োজন মাত্র। যে তাঁকে যত বেশী ভয় করে, তাকে তিনি তত বড় ও তত বেশী পরীক্ষায় ফেলেন। কারণ, তিনি সর্বদা মানুষকে মর্যাদা দান করতে চান এবং উন্নত শিখরে দেখতে চান। কিন্তু তিনি তাঁর অবাধ্যদের ক্ষেত্রে ঢিল দেয়ার নীতি অবলম্বন করেন। ঢিল দিতে থাকেন তো দিতেই থাকেন; এমনকি মানুষ তখন নিজেকে স্বয়ং তাঁর(স্রষ্টার) চেয়েও বড় কিছু ভাবতে শুরু করে। তারপর যেদিন সুতোয় টান দেন, সেদিন চরম অবিশ্বাসী তাঁর প্রতি পরম বিশ্বাসের ঘোষণা দিলেও তিনি আর বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেন না।

অন্য দিকে যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা পরীক্ষা করতে চান তাদের জন্য কখনো কখনো ঐ সব অত্যাচারী যালেমদেরকেও মুমিনদের পরীক্ষার সরঞ্জামে পরিণত করে থাকেন। তখন মন্দকর্ম সম্পাদনকারী এসব অবাধ্য লোকেরা মুমিনদের প্রতি আঘাতের পর আঘাত হানে আর আল্লাহ্ দেখতে চান তাঁর মুমিন বান্দাগণ কিভাবে সেসবের মোকাবিলা করে। অনেক সময় দেখা যায় যে, মুমিনগণ হয়ত এই মোকাবিলা করতে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। পৃথিবী ভাবে যে, সে তো শেষ, ব্যর্থ। কিন্তু না, মূলতঃ তার পৃথিবী সফরের দিনগুলো এখানেই শেষ এবং এই সমাপ্তির দ্বারাই সার অনন্ত সাফল্যের শুরু। এখানে মুমিন দিয়েছে তার পার্থিব জীবনের চরম পরীক্ষা আর অত্যাচারী যালেম সেই পরীক্ষার একটি তুচ্ছ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে স্বয়ং স্রষ্টা কর্তৃক। পরিণামে এই অত্যাচারী যালেম নিজের ধ্বংসকে আরো ত্বরান্বিত করলো মাত্র।

এটাই আল্লাহর সুন্নাত অথবা কর্মপন্থা। এখন মানুষ হিসেবে আমাদের যার যা বুঝা দরকার, উচিত দ্রুত বুঝে নেয়া। কারণ, পার্থিব জীবনের পরীক্ষার সময় ৩ ঘন্টা নির্দিষ্ট নয়; বরং একটি অজানা সময়, যা আমাদের পক্ষে কোন ভাবেই জানা সম্ভব নয়। আজ আমরা পৃথিবীতে বেঁচে আছি, এখানের ইতিহাস আমরাই গড়ে যাচ্ছি। অতীতের মত আজো যেন পৃথিবী রক্তের পিপাসায় উন্মত্ত হয়ে আছে। যদি রক্তগুলো কোনদিন না শুকাতো, তাহলে পা ফেলার মত শুকনো জায়গা খুঁজে পাওয়া যেত না রক্তে ভেজা এই ভূ-পৃষ্ট জুড়ে।

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes