আদব (জ্ঞান চর্চাকারীর আদব-কায়দা)//৮

Print
Category: অনুবাদ সাহিত্য
Published Date Written by জাবীন হামিদ

আদব
(জ্ঞান চর্চাকারীর আদব-কায়দা)

মূল(আরবী): শেখ আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মাদ সাঈদ রাসলিন, সৌদি আরব।
ইংরেজী অনুবাদ: আল-বুকাউ মিন খাসইয়াতিল্লাহ্ শেখ হুসাইন।
ইংরেজী থেকে অনুবাদ: জাবীন হামিদ, বাংলাদেশ।

"আমি ত্রিশ বছর ধরে আদব শিখেছি আর জ্ঞান চর্চায় সময় দিয়েছি বিশ বছর।"–আবদুল্লাহ বিন আল মুবারক।


(জুন ২০১৩, ১৬তম সংখ্যার পর...)

শেখের সাথে দেখা করার নিয়ম:

যদি জানতে পারো শেখ ঘুমাচ্ছেন, তবে তার সাথে দেখা করতে চাইবে না। বরং তার ঘুম থেকে উঠার জন্য বসে অপেক্ষা করো বা ইচ্ছা হলে ফিরে যাও।

ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু 'আনহুমা বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মারা যান, আমি একজন আনসারকে বললাম: চলো, সাহাবীদের কাছ থেকে কিছু জেনে আসি। সে বললো, আমি তোমার কথায় খুব অবাক হচ্ছি। সাহাবীদের মধ্যে এত বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকতে তুমি কি মনে করো কেউ আমাদের দিকে মনোযোগ দেবে?

আমি তখন তাকে ছেড়ে সাহাবীদের কাছে গিয়ে হাদীস নিয়ে জানতে শুরু করি। যদি আমি শুনতে পেতাম কেউ একটি হাদীস জানে, আমি তার বাসায় যেতাম। যদি শুনতাম সে ঘুমিয়ে আছে, তাহলে দরজার সামনে চাদর বিছিয়ে তার অপেক্ষায় বসে থাকতাম। বাতাস ধূলা উড়িয়ে আমার গায়ে ফেলতো। সে লোক ঘুম ভেঙ্গে যখন দেখতো আমি এভাবে বসে আছি, তখন বলতো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচাতো ভাই, আপনি কেন এসেছেন? আপনি আমাকে খবর পাঠালেন না কেন? আমি তাহলে আপনার কাছে যেতাম।

আমি বলতাম, আমারই আসা উচিত আপনার কাছে। তারপর আমি তাকে হাদীস বলতে অনুরোধ করতাম। সেই আনসার বেঁচে থাকতে দেখেছিল লোকজন আমাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন করছে। তখন সে বলেছিল, এই তরুণ আমার থেকে অনেক বেশী বুদ্ধিমান (বর্ণনায় আল খাতিব আল বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ্)।

ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আমি হাদীসের জ্ঞান আনসারদের কাছ থেকে বেশী পেয়েছি। আমি তাদের দরজার সামনে অপেক্ষা করতাম। ভিতরে ঢোকার অনুমতি চাইলে পেতাম কিন্তু আমি চাইতাম যে দেখা হওয়াটা যেন আনন্দের হয়।

ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহুমা সাহাবীদের বাসায় যেতেন হাদীস শুনতে। তখন তাকে যদি বলা হতো তিনি ঘুমাচ্ছেন, ডেকে দেব? আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহুমা তাতে রাজী হতেন না। তিনি দরজার সামনে বসে সাহাবীর ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় থাকতেন (বর্ণনায় সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ, সূত্র আবু আল হুসাইন)।

আয যুহরী বলেন, আমি যখন উরওয়ার বাসায় যেতাম, তখন চাইলে ঘরে ঢুকতে পারতাম। কিন্তু আমি বাইরে বসে অপেক্ষা করতাম তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে (বর্ণনায় মা’মার)।

ইবনে জামাহ বলেন: জ্ঞানের ছাত্র তার শেখের অনুমতি না নিয়ে তার কাছে যাবে না। যদি তিনি প্রকাশ্যে বসে মানুষের সাথে আলাপরত থাকেন, তবে যেতে পারবে।

ঘরের ভিতরে থেকে শেখ অনুমতি দিলে ছাত্র ঢুকবে। যদি অনুমতি না দেন, তবে ছাত্র আবারো অনুমতি চাইবে না বরং চলে যাবে। যদি ছাত্রের মনে সন্দেহ হয় যে শেখ জানেন না সে এসেছে, তাহলে আবারো অনুমতি চাইতে পারে- তবে তিনবারের বেশী নয়। যদি সে দরজায় ধাক্কা দেয়, তবে খুব ভদ্রভাবে ও আস্তে করে দেবে। প্রথম ও দ্বিতীয়বার আঙুল দিয়ে আস্তে করে দরজায় টোকা দেবে। তৃতীয়বার আঙুলের গাঁট দিয়ে দরজায় ধাক্কা দেবে। যদি শেখ দরজা থেকে দূরে থাকেন, তবে ছাত্র এতটুকু জোরে টোকা দিতে পারবে যাতে শেখ শব্দ শুনতে পান, তার চেয়ে বেশী জোরে না। যদি শেখ ঢোকার অনুমতি দেন ও সাক্ষাৎ করতে অনেকে একসাথে আসে, তবে যিনি সবচেয়ে বড় বা শ্রদ্ধেয় তিনি প্রথম ঘরে ঢুকে শেখকে সালাম জানাবেন। এরপর দ্বিতীয় সম্মানিত ব্যক্তি ঢুকবেন। এভাবে একের পর এক ঢুকবে। আনাস বিন মালিক রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরজায় আঙুলের নখ দিয়ে টোকা দিতাম (বর্ণনায় আল খাতিব রাহিমাহুল্লাহ্)।

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ্ তার ‘আল-আদাব আল-মুফরাদ’ বইতে বলেন, এটা অপছন্দীয় যে যদি জানতে চাওয়া হয়- কে ওখানে, তবে ছাত্র জবাবে নিজের পরিচয় না দিয়ে শুধু বলবে: আমি। যদি দরজা খোলা থাকে, তবে সে ঘরের দিকে মুখ করে থাকবে না বরং দরজার ডানে বা বামে থাকবে ও ঘরের ভিতরে যারা আছে, তাদেরকে সালাম দেবে।

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ্ তার সহীহ হাদীসে ঘরে ঢোকার অনুমতি বিষয়ের একটি পরিচ্ছদের শিরোনাম দিয়েছেন: ওখানে কে– এই প্রশ্নের জবাবে আমি বলা।

জাবির রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু এর সূত্রে একটি ঘটনা এতে উল্লেখ করা হয়। জাবির বলেন, আমি একদিন আমার পিতার দেনা নিয়ে কথা বলার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যাই। দরজায় টোকা দেয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চান, কে? বললাম, আমি। তিনি এমনভাবে বললেন, আমি, আমি- যেন তা অপছন্দ করেছেন।

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ্ তার সহীহ বইতে একটি অধ্যায় লিখেছেন এই শিরোনামে: ‘তাকানোর বদলে অনুমতি চাওয়া’। এতে শাহল বিন সাদকে উদ্বৃত করে বলা হয়েছে- এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখছিল। তখন তিনি একটি লোহার চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে নিচ্ছিলেন। তিনি যখন দেখলেন লোকটি অনুমতি ছাড়া তার ঘরের ভিতরে দেখেছে, তখন বললেন: যদি আমি জানতে পারতাম তুমি এভাবে তাকাচ্ছো, তাহলে আমি এই চিরুনি দিয়ে তোমার চোখে আঘাত করতাম। ঘরে ঢোকার অনুমতি চাওয়ার আদেশ এজন্য দেয়া হয়েছে যেন কেউ অবৈধভাবে মানুষের ঘরের ভিতরে না তাকায় (ইমাম মুসলিমও এই ঘটনা তার সহীহ হাদীস বইতে উল্লেখ করেছেন)।

ইবনে জামাহ রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু বলেন, একজন ছাত্র খুব ভালভাবে পোশাক পরে সুন্দরভাবে শেখের সাথে দেখা করতে যাবে। তার দেহ ও পোশাক পরিষ্কার থাকবে, চুল ও নখ ছাঁটা থাকবে ও সে সুগন্ধী মেখে যাবে- বিশেষতঃ সে যদি অনেকের মধ্যে এসে বসতে চায়। কেননা, এই সমাবেশ হলো যিকির ও ইবাদতের।

ছাত্র যদি শেখের কাছে গিয়ে দেখে তিনি কারো সাথে কথা বলছেন, যিকির বা কোন ইবাদত করছেন বা পড়াশোনা করছেন- আর তাকে দেখে তিনি সেই কাজ বন্ধ করেছেন; তাহলে সালাম জানিয়ে সে চলে আসবে।

যদি শেখ তাকে থাকতে বলেন, তাহলে সে থাকতে পারে। তবে বেশীক্ষণ থাকা ঠিক হবে না, যদি না শেখ তাকে নিজে থেকে বেশী সময় থাকতে বলেন। শেখের কাছে একজন তখনই যাবে, যখন তার মন পবিত্র ও শান্ত থাকে অর্থাৎ কোন কারণে মন অশান্ত বা অমনোযোগী না। পিপাসা বা ক্ষুধা পেয়েছে, ঘুম পাচ্ছে, ক্লান্ত বা রেগে থাকা অবস্থায় শেখের কাছে সে যাবে না, যাতে শেখ যা বলছেন তার প্রতি সে পুরো মনোযোগ দিতে পারে।

যদি শেখের সন্ধানে গিয়ে ছাত্র তাকে খুঁজে না পায়, তাহলে অপেক্ষা করবে যেন কোন ক্লাশ বাদ না যায়। কোন ক্লাশ বাদ যাওয়া মানে সেই ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। যদি শেখ ঘুমে থাকেন, তাহলে ছাত্র অপেক্ষা করবে বা পরে আসবে- ধৈর্য্য ধরা তার জন্য উত্তম।

ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহুমা জ্ঞান অর্জনের আশায় যায়াদ বিন সাবিতের বাসার সামনে বসে থাকতেন। যদি বলা হতো, তিনি ঘুমাচ্ছেন, তাকে কি ঘুম থেকে থেকে ডেকে দিব? ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহুমা তাতে না বলতেন। প্রখর রোদে বসে তিনি অপেক্ষা করতেন- সালাফরা এমনই ছিলেন।

একজন ছাত্র তার শেখকে বিশেষ কোন সময়ে বা আলাদাভাবে তাকে শেখাবার জন্য অনুরোধ করবে না, যদিও সে কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে থাকে। সাধারণতঃ শেখ যে সময়ে শেখান, সেই সময়ের বাইরে গিয়ে বা তার কোন অসুবিধা করে কোন অনুরোধ ছাত্র করবে না। সেটা হবে নিজেকে বড় করে দেখানো এবং শেখ এবং জ্ঞানের পথের অন্যান্য ছাত্রদের হেয় করা।

শেখ হয়তো লজ্জায় এমন অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। ফলে ঐ সময়ের অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে তাকে ছাত্রের অনুরোধ রক্ষা করতে হবে। তবে যদি সত্যিকারের কোন কারণ থাকে যাতে শেখের সাথে তার আলাদাভাবে সময় কাটানো দরকার, তবে সে এমন অনুরোধ করতে পারবে।

শেখের ক্লাশে গিয়ে তার থেকে কিছুটা দূরত্ব রক্ষা করে বসতে হবে। উমর বিন আল খাত্তাবকে ঘিরে বসে লোকজন তার কথা শুনছিল। কা‘ব সেখানে গিয়ে বেশ দূরত্ব রেখে বসলে উমর তাকে ধমক দিলেন। কা‘ব তখন বলেন, হে বিশ্বাসীদের নেতা, জ্ঞানী লোকমান রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু তার ছেলেদেরকে উপদেশ দেন: তোমরা যখন শাসকের পাশে বসবে, তখন দু’জনের মধ্যে এই পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখবে, যেন একজন এসে বসতে পারে। তা না হলে, তোমার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেউ যদি তার কাছে আসে, তখন তোমাকে জায়গা ছেড়ে উঠে পড়তে হবে, তা হবে তোমার জন্য অসম্মানের (বর্ণনায় সুফিয়ান বিন উমাইনাহ)।

শেখের সামনে বসার সময় ছাত্র অবশ্যই শান্ত, নম্র হয়ে শিক্ষকের দিকে মুখ করে বসবে। তার পুরো মনোযোগ থাকবে শিক্ষকের কথার দিকে। বিনা দরকারে সে শিক্ষকের দিক থেকে মুখ সরিয়ে নেবে না বা ডানে, বামে, উপরে, নীচে তাকাবে না; বিশেষ করে যখন সে শিক্ষকের কাছে পড়ছে বা তার সাথে কথা বলছে। আশেপাশে কী ঘটছে বা অন্য কেউ কিছু বললো কি না, এসব জানতে সে অন্যদিকে তাকাবে না। নিজের কাপড় থেকে ধূলা–ময়লা সরাবে না ও কোন কারণে বিরক্তিবোধ করলে হাত–পা নাড়বে না।
নাকের ভিতরে হাত ঢুকাবে না; হাত ছড়িয়ে রাখবে না ও মুখে–গালে-কপালে রাখবে না। হাই তুলবে না বা দাঁত খোঁচাবে না, কার্পেটের উপর আঙুল দিয়ে লাইন টানবে না, আঙুল মটকাবে না, কাপড় ধরে টানাটানি করবে না।

শেখের উপস্থিতিতে একজন ছাত্র দেয়াল ও বালিশে হেলান দেবে না বা সেখানে হাত রাখবে না। সে শেখের দিকে পিঠ ফেরাবে না বা একপাশ ফিরে বসবে না। হাতের উপর ভর দিয়ে বসবে না বা খামাখা কথা বলবে না।

শেখের সামনে বসে হাসি–তামাশা করা, বোকার মতো বা অভদ্রভাবে কথা বলা– এসব কিছু সে করবে না। বিনা কারণে হাসবে না ও শেখ না হাসা পর্যন্ত সে নিজে হাসবে না।

কোন কারণে হাসি পেলে আওয়াজ না করে হাসবে। শেখ উপস্থিত থাকলে সে বারবার গলা সাফ করবে না; সম্ভব হলে নাক ঝাড়বে না বা থুথু ফেলবে না। যদি নাক সাফ করতেই হয়, তাহলে সবার সামনে সর্দি ফেলবে না; বরং রুমাল বা টিস্যু কাগজ ব্যবহার করবে বা কাপড়ের এক কোনা দিয়ে নাক সাফ করবে।
সে পা ঢেকে বসবে; তার কাপড় লম্বা, ঢিলা হবে ও সে পড়ার সময় হাত স্থির রাখবে। হাই উঠলে মুখ ঢেকে রাখবে।

আলী রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু বলেন, এটা জ্ঞানীদের অধিকারের মধ্যে যে তুমি সমবেত মানুষকে সালাম দেয়ার পাশাপাশি আলাদাভাবে শেখকেও সালাম জানাবে। তুমি তার সামনে এসে বসবে, এদিক–সেদিক তাকাবে না বা কাউকে চোখের ইশারা করবে না। তার কাছে এসে বলবে না অমুক অমুক আপনার সাথে ঐ বিষয়ে একমত না।

শেখের উপস্থিতিতে কারো নামে গীবত করবে না। তাকে জটিল প্রশ্ন করবে না। যদি শেখ কোন ভুল করেন, তবে তার সমর্থনে অজুহাত খুঁজো ও শেখকে সম্মান করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। যদি শেখের কিছু দরকার থাকে, অবশ্যই তুমি প্রথম এগিয়ে গিয়ে তার দরকার পূরণে চেষ্টা করবে। তার সামনে বা তাকে ঘিরে যারা থাকে, শেখের আসরে বসে তাদের মনোযোগ তোমার দিকে আকর্ষণের চেষ্টা করবে না। শেখের কাপড় ধরে টানবে না।

শেখ যদি খুব ক্লান্ত থাকেন, তবে কোনকিছুর জন্য জোর করবে না। এটা মনে করবে না যে তুমি তার বন্ধু। শেখ হচ্ছেন তাল গাছের মতো- যা থেকে কোনকিছু পরার অপেক্ষায় তুমি থাকবে।

আলী রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু যা উপদেশ দিয়েছেন, তা প্রয়োজনের চেয়েও যথেষ্ট। তাই নম্রতা ও শান্তভাব– এই দু’টি বৈশিষ্ট্য জ্ঞান চর্চার আসরের যে ছাত্র তার থাকতে হবে এবং আদব সম্পর্কে জানা তার জন্য অপরিহার্য।

সালাফরা জ্ঞানের আসরকে অত্যন্ত সম্মান করতেন ও এমনভাবে সেখানে বসতেন ঠিক যেন পাখি বসে আছে। আবু বকর বিন আল আম্বারী বলেন, পাখির মতো বসা কথাটির দু’টি ব্যাখ্যা হতে পারে। একটি হলো তারা স্থির হয়ে আসরে বসে থাকতেন, দৃষ্টি নত রাখতেন আর পাখিরা স্থির নয় এমন জায়গা ছাড়া বসে না। যে মানুষ খুব শান্ত, নম্র-তার সম্পর্কে বলা হয়-এই ধীর-স্থির ভাবের জন্য পাখি এসে তার মাথায় বসতে পারে।

দ্বিতীয় মানে হলো, হযরত সোলায়মান বিন দাউদ আলাইহিস সালাম বাতাসকে বলতেন- আমাদের বহন করে নিয়ে চলো ও পাখিকে বলতেন, ছায়া দাও। বায়ু তাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত আর পাখিরা ছায়া দিতো। তার সাথীরা শ্রদ্ধায় দৃষ্টি নত রাখতো ও একদম স্থির বসে থাকতো। তিনি কিছু জানতে না চাওয়া পর্যন্ত তারা কোন কথা বলতো না।

তাই জ্ঞানী ব্যক্তির সামনে কেউ যদি একদম ধীর–স্থির হয়ে বসে থাকে, তবে তাকে নবী সুলায়মান আলাইহিস সালামের সাথীদের সাথে তুলনা করা হয়।

আহমেদ বিন মিনান আল কাততান বলেন: আবদুর রহমান বিন মাহদীর আসরে কেউ কথা বলতো না, পেন্সিল ধার করতো না বা হাসতো না। যদি তিনি দেখতেন কেউ কথা বলছে বা পেন্সিল ধার দিচ্ছে, তাহলে তিনি উঠে জুতা পরে চলে যেতেন (বর্ণনায় আল খাতিব রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।

ওয়াকী ও তার ছাত্ররা এমনভাবে জ্ঞানের আসরে থাকতেন যেন তারা ইবাদতে আছেন। যদি এমন কিছু ঘটতো যাতে তিনি বিরক্ত হতেন, তাহলে জুতা পায়ে দিয়ে তিনি বাসায় চলে যেতেন।

ইবনে নুমায়ের যদি দেখতেন কেউ আসরে বসে পেন্সিলে ধার দিচ্ছে, তাহলে রাগে তার মুখের রং বদলে যেত ও তিনি ক্লাশ ছেড়ে চলে যেতেন (বর্ণনায় আবদুর রহমান বিন উমর)।

একজন ছাত্র আবদুর রহমান বিন মাহদীর আসরে হেসে উঠে। তিনি প্রশ্ন করেন, কে হেসেছে? সবাই আঙুল তুলে তাকে দেখিয়ে দেয়। তিনি তাকে ধমক দিয়ে বললেন, তুমি জ্ঞানের সন্ধান করছো আর হাসছো? আমি তোমাদের কাউকে এক মাস পড়াবো না।

জ্ঞানের ছাত্র হিসাবে একজন তার শেখের সাথে সর্বোচ্চ ভাল ব্যবহার করবে। সে এভাবে শেখের সাথে কথা বলবে না- কে এটা বলেছে বা কেন এটা নয় বা আপনি কিভাবে এটা জানেন ইত্যাদি।

ছাত্র যদি শেখকে কিছু মনে করিয়ে দিতে চায় যা তিনি আগে বলেছিলেন, তাহলে এভাবে বলবে না যে আপনিই এটা বলেছিলেন বা আমি শুনেছি এটা এমন বা অমুক বলেছে এটা এই হবে। এ নিয়ে কথা বলার আগে সে জেনে নেবে এই বিষয়ে শেখের মনোভাব কী। অন্যরা শেখের মতামত নিয়ে কী বলেছে, সে নিয়ে কথা বলার ব্যপারে এটাই হলো প্রকৃত আদব। এছাড়াও ছাত্র তার শিক্ষকের সাথে এই ভাষায় কথা বলবে না যে, ব্যপার কী বা আপনি বুঝেছেন তো বা আপনি কি জানেন ইত্যাদি।

অন্যরা যদি তার শেখ সম্পর্কে খারাপ কিছু বলে থাকে যেটা তিনি জানেন না, তাহলে সরাসরি এভাবে বলবে না যে অমুক আপনার সম্পর্কে এই কথা বলেছে। বলতে হলে এভাবে বলা যেতে পারে যে, অমুক বলেছে কারো মধ্যে সদগুণ না থাকলে সে রহমত থেকে দূরে থাকে ইত্যাদি।

শেখ হয়তো এমন কোন ফতোয়া বা কাহিনী বা কবিতা বললেন, যা সে আগে থেকেই জানতো। তবুও সে এমন মনোযোগ দেখাবে যে সে এটা জানতে পেরে খুশী ও মনোযোগের সাথে সে তা শুনবে এবং এমন ভাব দেখাবে যেন শেখের কাছ থেকেই প্রথম সে এটি শুনলো। সে শেখের সামনে নিজের জ্ঞান জাহির করার জন্য শেখের আগে আগে কোন কিছু নিয়ে মন্তব্য করা, কোন বিষয়ের ব্যাখ্যা করা বা কারো প্রশ্নের জবাবে কিছু বলা- এসব করবে না।

সে কথার মাঝখানে শেখকে থামাবে না ও শেখের কথার মাঝখানে কিছু বলে উঠবে না। শেখ যদি আসরে বসে তার সাথে বা অন্য কারো সাথে কথা বলতে থাকেন, তাহলে সে অন্য কারো সাথে ঐ সময় কথা বলবে না।

যদি সে শেখকে কোন বই এগিয়ে দেয়, তবে এমনভাবে দেবে যাতে শেখ সহজেই বইটা ধরে খুলতে পারেন। যদি ছাত্রের জানা থাকে ঠিক কী বিষয়টি শেখ বইতে দেখতে চাচ্ছেন, তাহলে সে পাতা খুলে তারপর বইটি শেখের হাতে দেবে ও বিষয়টি পাতার কোন জায়গায় তা শেখকে দেখিয়ে দেবে। বইটি সে শেখের সামনে ছুড়ে মারবে না।

যদি সে রাতে শেখের সাথে হাঁটতে বের হয়, তবে সে শেখের সামনে থাকবে। বেশী ভীড় বা অন্য কোন যথাযথ কারণ না থাকলে সে দিনের বেলা শেখের পিছনে থাকবে। যদি বিদেশে বা বিপদজনক এলাকায় তারা থাকে, তবে শেখের সামান্য সামনে থাকবে। সে সাবধান থাকবে যেন শেখের কাপড়ে নোংরা-ময়লা না লাগে। যদি খুব ভীড়ের মধ্যে হাঁটতে হয়, তবে সে শেখকে হাত দিয়ে ঘিরে রাখবে সামনে বা পিছন থেকে। যদি সে শেখের সামনে হাঁটে, তবে একটু পরপর পিছনে তাকিয়ে দেখবে। যদি শুধু তারা দু’জন হাঁটা অবস্থায় থাকে ও শেখ তার সাথে কথা বলেন, তাহলে সে অবশ্যই শেখের ডানে, কেউ বলেন বামে থাকবে ও মুখ তার দিকে ফিরিয়ে রাখবে।

যদি পথে কারো সাথে দেখা হয়, তবে সে তাদের কাছে শেখের পরিচয় জানাবে। কোন কারণ ছাড়া সে শেখের ঠিক পাশাপাশি হাঁটবে না। শেখের একদম গাঁ ঘেষে সে থাকবে না। শেখের গায়ে বা পায়ে ধাক্কা লাগাবে না বা শেখের কাপড়ে যেন ময়লা না লাগিয়ে ফেলে- এসব বিষয়ে সে সচেতন থাকবে।

গরমকাল হলে শেখকে সে ছায়ায় বসাবে; শীতের রোদে বসতে হলে এমনভাবে বসাবে যেন শেখের ঠিক মুখের উপর রোদ না পড়ে। শেখ যদি কারো সাথে কথা বলতে থাকেন, তবে সে দু’জনের খুব কাছে আসবে না, তাদের কথা শোনার চেষ্টা করবে না বা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। যদি তারা ডাকেন আলাপে অংশ নিতে, তাহলে সে তাদের ডানে বা বামে থাকবে- মাঝখানে আসবে না।

যদি কখনো সে শেখকে রাস্তায় দেখতে পায়, তাহলে সে প্রথমে সালাম জানাবার উদ্যোগ নেবে - শেখের দিকে সে তাকাবে, কাছে যাবে ও সালাম দেবে। সে দূর থেকে শেখের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে না। কোনকিছু নিয়ে কথা হলে সে সুন্দরভাবে শেখের উপদেশ মতো চলবে। যদি শেখ কোন ভুল উপদেশ দেন, তাহলে শেখকে এভাবে বলবে না যে- আপনি ভুল বলেছেন বা এই মতটা তেমন জোরালো না। বরং সুন্দরভাবে এভাবে বলবে, মনে করা হয় এই বিষয়ে এরকমটি সবচেয়ে ঠিক। সে এটা বলবে না- আমি মনে করি এটা ঠিক ইত্যাদি।


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখিকার আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -জাবীন হামিদ

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes