উপমহাদেশের অতীত রাজনীতির খণ্ড চিত্র//১

Print
Category: ইতিহাস ঐতিহ্য
Published Date Written by এ.কে.এম. নাজির আহমদ

উপমহাদেশের অতীত রাজনীতির খণ্ড চিত্র
-এ.কে.এম. নাজির আহমদ



প্রারম্ভিক কথা

অতীত কথা বলে। মনের কান দিয়ে শুনতে হয় তার কথা। অতীত সম্পর্কে সম্যক অবগতি বর্তমান অবস্থার সঠিক মূল্যায়নের মূল্যবান উপকরণ। অতীত থেকে বর্তমানে পৌঁছতে আমাদেরকে কতোগুলো বাধার পাহাড় অতিক্রম করতে হয়েছে, কোথায় কোথায় আমরা হোঁচট খেয়েছি, কিভাবে আবার উঠে দাঁড়িয়েছি- সেইসব বিষয়ে পরিচ্ছন্ন ধারণা থাকলেই তো অমাদের বর্তমান অবস্থানের প্রাসংগিকতা হৃদয়ংগম করা সম্ভব। আর অতীত ও বর্তমানের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণই আমাদের হাতে তুলে দিতে পারে আগামী দিনের পথ চলার সঠিক দিকনির্দেশিকা।
আমরা, এই উপমহাদেশের মুসলিমরা, রাজনীতির দীর্ঘ ও পিচ্ছিল পথ অতিক্রম করে সামনে এগিয়েছি। পথপরিক্রমার বাঁকে বাঁকে আমরা অনেক শিক্ষা পেয়েছি। সেই শিক্ষাগুলো ভুলে গেলে পথের দিশা হারিয়ে ফেলে আমরা মুখ থুবড়ে পড়বো দুর্গতির গহবরে। অতীতের কিছু কথা আমাদের কিছুতেই ভুলে যাওয়া সমীচীন নয়। স্মৃতিতে ধরে রাখার লক্ষ্যে ন্যূনতম কিছু কথা, কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি আমার এই ক্ষুদ্র পুস্তিকায়। সম্মানিত পাঠকপাঠিকাদের দু‘আ চাই। আর চাই আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের অপার অনুগ্রহ।
-এ. কে. এম. নাজির আহমদ

দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে মুসলিম শাসন

ক) দিল্লীতে মুসলিম শাসন

  • আফগানিস্তানের হিরাত ও গজনীর মধ্যবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত ছিলো ঘুররাজ্য।
  • গজনীর সুলতান মাহমুদ ঘুররাজ্য দখল করেছিলেন। পরবর্তীকালে ঘুর বংশীয়রা আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঘুর রাজ্য উদ্ধার করে। আরো পরে গজনী রাজ্যও তাদের দখলে আসে।
  • ঘুর রাজ্যের অধিপতি গিয়াসুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরীর ভাই শিহাবুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরী উত্তর ভারতের শক্তিশালী রাজ্য দিল্লী-আজমীর  অধিকারের জন্য অগ্রসর হন।
  • খৃস্টীয় ১১৯১ সনে থানেশ্বরের চৌদ্দ মাইল দূরে তরাইন নামক যুদ্ধক্ষেত্রে দিল্লী-আজমীর রাজ্যের চৌহান বংশীয় রাজা পৃথ্বিরাজের নিকট পরাজিত হয়ে তিনি দেশে ফিরে যান।
  • খৃস্ট্রীয় ১১৯২ সনে শিহাবুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরী আরো শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়ে আবার আসেন উত্তর ভারতে। তরাইন প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধ হয়।
  • রাজা পৃথ্বিরাজ পরাজিত এবং নিহত হন।
  • আজমীরে মুসলিম শাসন কায়েম হয়।
  • শিহাবুদ্দীন মুহাম্মাদ ঘুরী কুত্বুদ্দীন আইবেককে আজমীরের গভর্ণর নিযুক্ত করে গজনী ফিরে যান।
  • খৃস্টীয় ১১৯৩ সনে কুত্বুদ্দীন আইবেক দিল্লী জয় করেন।

অতপর তিনি গোয়ালিয়র, আন্হিলওয়ার, কনৌজ প্রভৃতি রাজ্য জয় করে মুসলিম শাসন কায়েম করেন।
কালক্রমে দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র মুসলিম শাসন কায়েম হয়।

  • খৃস্টীয় ১১৯৩ সন থেকে ১৮৫৭  সন পর্যন্ত ৬৬৪ বছর দিল্লীতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো।


খ) গৌড় রাজ্যে মুসলিম শাসন

  • উত্তর বঙ্গ, পশ্চিম বঙ্গের উত্তরাংশ এবং বিহারের দক্ষিণাংশ নিয়ে গঠিত ছিলো গৌড় রাজ্য।
  • খৃস্টীয় ১২০৩ সনে ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মাদ বাখতিয়ার খালজী গৌড় রাজ্য জয় করেন।

    গৌড় রাজ্যের রাজা লক্ষণ সেন মুসলিম সৈন্যদের মুকাবিলা করার সাহস করেননি।
    তিনি পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

  • মুসলিম শাসিত গৌড়রাজ্য ‘লাখনৌতি’ নামে আখ্যায়িত হয়। কালক্রমে তা বিশাল রাজ্যে পরিণত হয়।
  • পরবর্তী কালে, লাখনৌতি রাজ্য ‘বাঙালা’ নামে পরিচিত হয়।
  • ‘বাঙালা’ নামটিই পরিবর্তিত হয়ে ‘বাংলা’ হয়।
  • খৃস্টীয় ১২০৩ সন থেকে ১৭৫৭ সন পর্যন্ত ৫৫৪ বছর বাঙালায় বা বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো।


গ) দিল্লীর শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন
কালক্রমে দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার ভার দুর্বল শাসকদের হাতে পড়ে। এই সুযোগে বিভিন্ন ‘শুবা’-র শুবাদারগণ (গভর্ণরগণ) স্বাধীন হয়ে যান।
ফলে উপমহাদেশে অনেকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র অস্তিত্ব লাভ করে।


দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে ইংরেজশাসন

  • ১৭৫৭ সনে পলাশী প্রান্তরে বাংলা-বিহার-উড়িশার নাযিম সিরাজুদ্দৌলাহ খানের পরাজয়।

১২০৩ সনে ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মাদ বাখতিয়ার খালজী বাঙালায় বা বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। এই শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো পাঁচশত চুয়ান্ন বছর। অতপর ১৭৫৭ সনে পলাশী প্রান্তরে বাংলা-বিহার-উড়িশার নাযিম সিরাজুদ্দৌলা খান ইংলিস ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পেনীর অধিনায়ক রবার্ট ক্লাইভের মুখোমুখি হন। প্রধান সেনাপতিসহ বেশ কয়েকজন সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতার ফলে যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলা খান পরাজিত হন। বাংলা-বিহার-উড়িশায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজ শাসন।

  • ১৭৭৩ সনে ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে অযোধ্যার নওয়াব সুজাউদ্দৌলাহর ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ চুক্তি স্বাক্ষর স্বাধীন অযোধ্যার নওয়াব সুজাউদ্দৌলাহ ইংলিস ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পেনীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অযোধ্যার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে ইংরেজগণ। এমনকি নওয়াবের দেশীয় সৈন্যদের সেনাপতিত্বও তুলে দেওয়া হয় একজন ইংরেজ অফিসারের হাতে। এইভাবে অযোধ্যায় কার্যত: প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজ শাসন।
  • ১৭৯৮ সনে হায়দারাবাদের নিযাম কর্তৃক ইংরেজদের সাথে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ চুক্তি স্বাক্ষর।

১৭৯৮ সনে স্বাধীন হায়দারাবাদের নিযাম মীর কামারুদ্দীন নিযামুল মুলক ইংলিস ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পেনীর সাথে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এইভাবে হায়দারাবাদেও কার্যত: প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজ শাসন।

  • ১৭৯৯ সনে মহীশূরের স্বাধীন শাসক ফাতেহ আলী টিপু সুলতানের পরাজয়‍।

মহীশূরের শাসক হায়দার আলী ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। তিনি ইংরেজদের সাথে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
ইংরেজরা সুকৌশলে মহারাষ্ট্রের হিন্দু মারাঠাশক্তি ও হায়দারাবাদের নিযামকে তাদের সাথে নিতে সক্ষম হয়।
তিন শক্তি মিলে হায়দার আলীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে থাকে।
হায়দার আলী বীর বিক্রমে তাদের মুকাবিলা করে চলছিলেন।
১৭৮২ সনে হায়দার আলী মৃত্যুবরণ করেন।
মহীশূরের মসনদে বসেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র ফাতেহ আলী টিপু সুলতান।
তিনিও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়ে যেতে থাকেন।
গভর্ণর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলীর শাসনকালে ১৭৯৯ সনে মহীশূরের রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তম রণাংগনে টিপু সুলতান শহীদ হন। ফলে মহীশূরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজ শাসন।

  • ১৮০১ সনে পাঞ্জাবে একটি শক্তিশালী শিখরাষ্ট্র গঠন

পাঞ্জাবে ছিলো অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্য। ১৮০১ সনে রণজিৎ সিং খণ্ড রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী শিখরাষ্ট্র গঠন করেন। তিনি ক্রমশ তাঁর রাজ্য সীমা বাড়াতে থাকেন। উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমান নাম খাইবার-পাখতুনখোয়া) বিরাট অংশ এবং কাশমিরও তাঁর রাজ্যভুক্ত হয়। লাদাখ পর্যন্ত তাঁর রাজ্যসীমা বর্ধিত হয়। তাঁর রাজ্যের রাজধানী ছিলো লাহোর। দ্বিতীয় রাজধানী ছিলো পেশাওয়ার। শিখ সৈন্যরা পার্শ্ববর্তী মুসলিম জনপদগুলোতে হামলা চালাতো, লুণ্ঠন করতো ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতো। দারুণ অস্বস্তিতে বসবাস করতো মুসলিমগণ। উল্লেখ্য, রনজিৎ সিং ইংরেজদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন।

  • ১৮৩১ সনে বালাকোটে ইসলামী মুজাহিদদের পরাজয় 

দিল্লীর শাহ আবদুর রহীমের সন্তান ছিলেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবী।
আব্বার তত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করে তিনি আলকুরআন ও আস্ সুন্নাহর জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন একজন উঁচু মাপের ইসলামী চিন্তাবিদ। আব্বার মৃত্যুর পর তিনি রহীমিয়া মাদ্রাসার প্রধান হন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সাথে সাথে তিনি বহু সংখ্যক জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করেন। দারসুল কুরআন ও দারসুল হাদীছের মাধ্যমে একদল মুত্তাকী ও মুহসিন ব্যক্তি গড়ে তোলার প্রয়াস চালাতে থাকেন।
১৭৬২ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁর সুযোগ্য ছেলে শাহ আবদুল আযিয দেহলবী।
১৮১৮ সনে শাহ আবদুল আযিয দেহলবী তাঁর আব্বার চিন্তাধারাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার অভিপ্রায়ে গঠন করেন ‘তারিকা মুহাম্মাদিয়া’ নামে একটি সংগঠন। তিনিও একদল খাঁটি ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনে ব্রতী হন।
শাহ আবদুল আযিয দেহলবী ঘোষণা করেন যে ইংরেজদের অধীনে ভারত দারুল হারবে পরিণত হয়ে গেছে, অতএব একে মুক্ত করার জন্য জিহাদ প্রয়োজন।
১৮২৩ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। ‘তারিকা মুহাম্মাদিয়া’র নেতৃত্ব অর্পিত হয় সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীর হাতে। তিনি উপমহাদেশের সর্বত্র সফর করে সংগঠন গড়ে তোলেন এবং তাঁর ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিদেরকে ওয়াকিফহাল করে তুলতে থাকেন।
অতপর তিনি বেলুচিস্তান হয়ে আফগানিস্তান পৌঁছেন। সেখান থেকে গিরিপথ ধরে পৌঁছেন উত্তরপশ্চিম সীমান্ত (খাইবার-পাখতুনখোয়া) প্রদেশে।
১৮২৭ সনের ১১ই জানুয়ারি সীমান্ত প্রদেশের (খাইবার-পাখতুনখোয়া) ‘সামাহ’ নামক স্থানে সমবেত আলিম, পাঠান সরদার ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীকে আমীরুল মুমিনীন নির্বাচিত করেন।
সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামী শারীয়াহ কার্যকর করার কাজে হাত দেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য গড়ে তোলেন একটি মুজাহিদ বাহিনী।
রণজিৎ সিং নব প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র ইসলামী রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেননি। ফলে সীমান্তে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী তাঁর মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন রণাংগনে শিখদের মুকাবিলা করে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
একদিকে তিনি যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন শিখ সৈন্যদের বিরুদ্ধে। অপরদিকে ইয়ার মুহাম্মাদ খান, খাদি খান, পায়েন্দা খান, সুলতান মুহাম্মাদ খান, ফাতেহ খান, জবরদস্ত খান প্রমুখ বিশ্বাসঘাতক পাঠান সরদারকে মুকাবিলা করে চলছিলেন।
১৮৩০ সনে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী শিখসেনাদেরকে পরাজিত করে বিজয়ী বেশে পেশাওয়ার প্রবেশ করেন। কিন্তু যেইসব পাঠান সরদার ইসলামী শারীয়াহ মেনে নিতে পারেনি তারা নানা ধরনের চক্রান্ত চালাচ্ছিলো তাঁর বিরুদ্ধে।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী কুনহার নদীর তীরবর্তী কাগান উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বালাকোট নামক স্থানে এসে ছাউনী ফেলেন। এটি ছিলো ১৮৩১ সনের এপ্রিলের শেষ ভাগের ঘটনা।
শিখ রাষ্ট্রপ্রধান রণজিৎ সিং ইংরেজ অফিসার ও পেশাওয়ারে অবস্থিত তাঁর মিত্রদের সহযোগিতা নিয়েও সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী ও তাঁর সৈন্যদেরকে নির্মূল করতে পারছিলেন না।
অবশেষে তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ সেনাপতি শের সিংকে ইসলামী মুজাহিদদের বিরুদ্ধে পাঠান। সংগে পাঠান সরদার আত্তার সিং, সরদার শ্যাম সিং, সরদার প্রতাপ সিং, রতন সিং, সাধু সিং, সরদার ওয়াজির সিং, গুরমুখ সিং লাহনা, লাখমির সিং, মাহান সিং প্রমুখ সেনাপতিকে।
এক সর্বাত্মক যুদ্ধের বিশাল আয়োজন নিয়ে শিখ সেনারা এগিয়ে আসে। তারা কুনহার নদীর পূর্বতীরে অবস্থান গ্রহণ করে।
সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী শাহ মুহাম্মাদ ইসমাঈল (ইনি ছিলেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবীর অন্যতম পুত্র শাহ আবদুল গনি দেহলবীর একমাত্র ছেলে।), মোল্লা লাল মুহাম্মাদ, ওয়ালী মুহাম্মাদ, নাসির খান ও হাবীবুল্লাহ খানের সেনাপতিত্বে ছোট ছোট সেনাদল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করেন।
১৮৩১ সনের ৬ই মে শিখ সৈন্যরা কুনহার নদী অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।
তারা বালাকোট ও মাটিকোটের মধ্যবর্তী সমতল স্থানে এসে পৌঁছে। মুসলিম মুজাহিদগণ প্রান্তরে এগিয়ে গিয়ে তাদের গতিরোধ করে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়।
প্রথমে ইসলামী ফৌজ বিজয়ী হয়। কিন্তু যুদ্ধের এক পর্বে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী আহত হন ও শত্র“দের হাতে পড়েন। তাঁর দেহ থেকে মাথা ছিন্ন করে নেওয়া হয়। রণাংগনে তাঁকে দেখতে না পেয়ে মুসলিম বাহিনী হতোদ্যম হয়ে পড়ে। তদুপরি সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীর সুযোগ্য সেনাপতি শাহ মুহাম্মাদ ইসমাঈলও যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।
যুদ্ধে বহু মুজাহিদ প্রাণ হারান। শদীদদের মধ্যে বাংলাদেশেরও পাঁচ ব্যক্তি ছিলেন। এই পাঁচ জনের একজন ছিলেন নোয়াখালির মাও. ইমামুদ্দিনের ভাই আলিমুদ্দিন।
প্রধান সেনাপতি শের সিং তাঁর সেনাবাহিনীর কয়েকজন মুসলিম সৈনিককে দিয়ে কুনহার নদীর তীরে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীর লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেন। শের সিং পরদিন লাহোর চলে যান।
মাহান সিং ও লাখমির সিং কয়েক ব্যক্তিকে টাকার বিনিময়ে হায়ার করে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীর লাশ কবর থেকে তুলে টুকরো টুকরো করে কুনহার নদীতে নিক্ষেপ করার ব্যবস্থা করেন।
‘গেজেটিয়ার অব পেশাওয়ার ১৮৮৩-৮৪’ উল্লেখ করে যে নদীর স্রোতের তোড়ে তাঁর দেহের কিছু অংশ নদীর কিনারায় উঠে আসে এবং অংশগুলো পল্লীকোট (চধষষরশড়ঃ) নামক স্থানে দাফন করা হয়।
বালাকোট প্রান্তরে জিহাদে অংশ গ্রহণকারী পূর্ববাংলার মুজাহিদদের মধ্যে যাঁরা জীবিত থেকে দেশে ফিরেছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাও. ইমামুদ্দিন (হাজীপুর, নোয়াখালি), সূফী নূর মুহাম্মাদ নিজামপুরী (মলিয়াশ, মিরসরাই, চট্টগ্রাম) এবং মাও. আবদুল হাকিম সিদ্দিকী (চুনতি)।
(মাও. মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেযজী হুজুর)- এর দাদা মাও. আকরামুদ্দিন মিয়াজী (লক্ষীপুর) ছিলেন মাও. ইমামুদ্দিনের শিষ্য ও খালীফা।)

  • ১৮৩১ সনে নারকেলবেড়িয়ার বাঁশের কেল্লার পতন

(১৭৮২ সনে সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার চাঁদপুর নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।)
১৮২৩ সনে সাইয়েদ নিসার আলী হাজে যান। সেখানে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীর সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁর আলোচনা শুনে সাইয়েদ নিসার আলী বিপুলভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হন।
১৮২৭ সনে তিনি দেশে ফিরেন।
(উপমহাদেশে ব্যাপক সফরের এক পর্যায়ে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবী কলকাতা আসেন। কলকাতায় শামসুন্নিসা খানমের বাড়িতে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলবীর সাথে একটি মিটিংয়ে মিলিত হন মাও. আবদুল বারী খান (মাও. আকরাম খাঁর পিতা), মাও. মুহাম্মাদ হুসাইন, হাজী শারীয়াতুল্লাহ, সুফী খোদাদাদ সিদ্দিকী, আলী জৌনপুরী, সাইয়েদ নিসার আলী এবং মাও. ইমামুদ্দিন। এই মিটিংয়ে ভবিষ্যত করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।)
এই মিটিংয়ের পর গ্রামে ফিরে সাইয়েদ নিসার আলী ইসলামের আসল রূপ মুসলিমদের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস চালাতে থাকেন।
নদীয়া, ২৪ পরগনা ও পার্শ্ববর্তী বি¯তৃত এলাকার বহু লোক তাঁর অনুসারী হয়।
তিনি সরফরাজপুর গ্রামের প্রাচীন শাহী মাসজিদ পুনঃনির্মাণ করেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাবলীগ ও দা‘ওয়াতের কাজ করতে থাকেন।
পুরহা-র জমিদার কৃষ্ণদেব রায়, গোবরডাংগার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, তারাগুনিয়ার জমিদার রাজনারায়ণ, নাগপুরের জমিদার গৌরীপ্রসাদ চৌধুরী এবং গোবরাগোবিন্দপুরের জমিদার দেবনাথ রায় মুসলিমদেরকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। তাঁরা বিভিন্ন নামে ট্যাকস আরোপ করে মুসলিমদের ওপর যুল্ম করতেন।
তিতুমীর হিন্দু জমিদারদের আরোপিত মাসজিদ নির্মাণের ওপর ট্যাক্স, দাড়ি রাখার ওপর ট্যাক্স ইত্যাদি বিভিন্ন যুলমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন।
তাঁর ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়। তাঁদের ওপর বারবার সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
সরফরাজপুর থেকে সরে এসে তিনি নারকেলবেড়িয়া নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন।
জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের লোকেরা এসে মুসলিমদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। তাদের মূল্যবান দ্রব্যাদি লুন্ঠন করে নেয়।
বারবার হামলার শিকার হচ্ছিলো মুসলিমগণ।
হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে হাজার হাজার বাঁশ সংগ্রহ করে তিতুমীর নারকেলবেড়িয়ায় একটি কেল্লা গড়ে তোলেন।
১৮৩১ সনের ১৯শে নভেম্বর।
কৃষ্ণদেব রায় ইংরেজদেরকে তাঁর সাথে নিতে সক্ষম হন।
জমিদারের লোকদের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পেনীর কর্ণেল স্টুয়ার্ট একশত ঘোড় সওয়ার, তিনশত পদাতিক সৈন্য ও দুইটি কামানসহ এগিয়ে আসেন। ইংরেজদের কামান গর্জে উঠে। ভেংগে পড়ে  নারকেলবেড়িয়ার বাঁশের কেল্লা। শহীদ হন তিতুমীর ও আরো অনেকে।
(ক্রমশ...)


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: এ.কে.এম. নাজির আহমদ

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes