জিজ্ঞাসা ও জবাব: ৬৪ থেকে ৬৮

Print
Category: জিজ্ঞাসা ও জবাব
Published Date Written by ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

জিজ্ঞাসা ও জবাব

জবাব দিচ্ছেন- ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া


প্রশ্ন ৬৪: আমরা দেখি কিছু লোক অযু করার সময় পা না ধুয়ে মোজার উপর দিয়ে ভিজা হাত টেনে নিয়ে অযুর কাজ সম্পন্ন করে। জিজ্ঞাসা করলে বলে, মাসেহ করছে। এরূপ মাসেহ্ করলে মাসেহ্-এর হক আদায় হবে কি? বা অযু হবে নাকি? এছাড়াও কেউ অযু করার পর মোজা পরেছে এবং প্রথম বার অযু যাওয়ার পর মাসেহ্ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই প্রথম মাসেহই তার জন্য পরবর্তী ২৪ ঘন্টা(মুকীম) বা ৭২ ঘন্টা (মুসাফির)-এর জন্য যথেষ্ট হবে? না কি প্রতিবার অযূ চলে যাওয়ার পর অন্যান্য অঙ্গসমূহ ধোয়ার সাথে সাথে মোজায়ও মাসেহ্ করতে হবে? সর্বোপরি মাসেহ-এর সিঠিক নিয়ম জানতে চাই।

উত্তর: মোজার উপর মাসেহ করার বিষয়টি সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। তবে শর্ত হচ্ছে,
* অযু থাকা অবস্থায় মোজাটি পরিধান করতে হবে।
* আর মোজাটি শক্ত ও শরীর দেখা যায় না এরকম পুরো বা মোটা কাপড়ের হতে হবে।
* প্রতি অযুর সময়ই তাকে মোজার উপর মাসেহ করতে হবে।
* আর মাসেহ এর ব্যাপারে নিয়মই হচ্ছে মোজার উপরিভাগে পায়ের পাতার সামনের অংশের উপরে ভেজা হাত বুলিয়ে নেওয়া। এভাবে মাসেহ করলে অযু বিশুদ্ধ হবে। তবে মুসাফির এ মাসেহ করার সুযোগ পাবেন তিন দিন তিন রাত্রি। আর মুকীম পাবেন একদিন একরাত্রি।

কিন্তু কখন থেকে মাসেহ শুরু হবে? এ ব্যাপারে তিনটি মত রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী ও আহমদের প্রসিদ্ধ মতে, মাসেহ এর সময় শুরু হবে মোজা পরিধান করার পর প্রথমবার অযু যাওয়ার পর থেকে (তখন থেকে মুকীমের জন্য একদিন একরাত্রি, আর মুসাফিরের জন্য তিন দিন, তিন রাত্রি)।
ইমাম আবু সাওর, আওযা‘য়ী ও ইমাম আহমদের অপর মতে, মাসেহ  এর সময় গণনা শুরু হবে প্রথম মাসেহ এর পর থেকে। (সুতরাং কারও অযু চলে যাওয়ার পর প্রথমবার যখন তিনি অযু করবেন ও মাসেহ করবেন তখন থেকে মুকীমের জন্য একদিন একরাত্রি, আর মুসাফিরের জন্য তিন দিন, তিন রাত্রি)
হাসান বসরী রহ. মনে করেন, মোজা পরিধান করার পর থেকেই এ সময় গণনা শুরু হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মতটিই বেশি বিশুদ্ধ। কারণ উমর রা. থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। যা মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাতে বর্ণিত হয়েছে।

প্রশ্ন ৬৫: সন্তানকে তার স্ত্রীর থেকে দূরে রাখা বা স্ত্রী যাতে পিতামাতার বিরুদ্ধে তার স্বামীকে অনুগত রাখতে না পারে সেজন্য পিতামাতা যদি কুফরী ঝাড়ফুঁককারীর আশ্রয় নেয় এবং তদবীর করে, তাহলে ইসলামী পদ্ধতিতে তার চিকিৎসা কি? আর এক্ষেত্রে পিতামাতাকে কুফরী থেকে বাঁচাতে সন্তানের করণীয় কি? দয়া করে জানাবেন।

উত্তর: স্বাভাবিক অবস্থায় কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে তার মা থেকে দূরে রাখার বিষয়টি কোনোমতেই অনুমোদনযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য কারণ ব্যতীত মা থেকে সন্তানকে পৃথক করার চেষ্টা করা বড় অপরাধ। যেখানে সহীহ হাদীসে মা পাখি থেকে সন্তান পাখিকে আলাদা করার ব্যাপারে কঠোরতা এসেছে সেখানে মানুষের বিষয়টি কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এমনকি কোনো কারণে পিতা-মাতা পৃথক হয়ে গেলেও সন্তানকে লালন-পালন ও দুধ পালনের ব্যাপারে মায়ের আগ্রহ বেশি প্রাধান্য পাবে।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত থাকার বিষয়টি স্বাভাবিক। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদাভাব ঘর সংসার সাজাবে এটাই স্বাভাবিক ইসলামী নিয়ম। এ ব্যাপারে কোনো তদ্বির করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ তৈরী করা হারাম। তবে মিল-মহব্বতের বিষয়টি পরস্পর উত্তম ব্যবহার ও আল্লাহর দেওয়া দান হিসেবেই ঘটে থাকে। এর জন্য স্ত্রী বা স্বামীর পক্ষ থেকে আল্লাহ বা তার কালামে অসীলায় সেগুলোর দ্বারা দো‘আ বা ঝাঁড়-ফুক নেওয়াও জায়েয। কিন্তু অন্য কারও কাছ থেকে তদ্বির বা তাবিজ জাতীয় কিছু ব্যবহার করা জায়েয নেই। এমনকি হাদীসে এটাকে ‘তিওয়ালা’ (অনুরাগ বা বিরাগ সৃষ্টিকারী তাবিজ) বলা হয়েছে এবং সেটাকে শির্ক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
কোনো পিতা-মাতা যদি এ জাতীয় কোনো তাবিজ বা তদ্বির করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি করেন তবে তা হবে কুফরি ও শির্ক। পিতা-মাতাকে বিষয়টির সঠিক বিধান জানিয়ে সাবধান করা সন্তানের দায়িত্ব।
কেউ যদি মনে করে যে সে এ ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে বা পড়েছে, তবে তার জন্য উচিত হবে শরীয়ত অনুমোদিত পদ্ধতিতে সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা করা, যেমন সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস, কাফেরূন, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারাহ ইত্যাদি নিয়মিত পাঠ করা। আশা করি এভাবে সে জিন ও মানব শয়তানদের খারাপ কারসাজি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।

প্রশ্ন ৬৬: ইমামতী কি কোন পদ? নামাযের ইমামতীর আবেদন করা, মুখে বলা বা মনে মনে ইমামতীর আকাংখা করা কি অপরাধ? কাউকে অস্থায়ী বা স্থায়ী ইমাম বানাতে হলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কি কি গুণাবলী থাকা জরুরী? জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।

উত্তর: হ্যাঁ, ইমামতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নামাজের ইমামতির আবেদন করা, মুখে বলা বা মনে মনে ইমামতির আকাংখা করার বিষয়টিতে কয়েক প্রকার:
* যদি দেখা যায় যে, সমাজে সে সবচেয়ে বেশি যোগ্য, অন্যদের নামায সংক্রান্ত তেমন মাসআলা জানা নেই বা অন্যদের কেরাত বিশুদ্ধ নেই, তখন ইমামতির আবেদন করা, মুখে বলা, বা মনে মনে ইমামতির আকাংখা করা ওয়াজিব বা একান্ত কর্তব্য হয়ে যায়।
* আর যদি সমাজে অনেক যোগ্য লোক থাকে, কিন্তু সে তাদের মধ্যে বেশি ভালো হয়, তবে তখন ইমামতির আবেদন করা, মুখে বলা, বা মনে মনে ইমামতির আকাংখা করা মুস্তাহাব বা জায়েয।
* আর যেখানে সুনির্দিষ্ট লোকের ইমামতির কথা শরীয়ত বলে দিয়েছে যেমন কারও বাড়িতে মেহমান হওয়ার পর মেজবানের কেরাআত শুদ্ধ হওয়ার পরও নিজের পক্ষ থেকে সেখানে ইমামতি করার জন্য আকাংখা করা মাকরূহ হবে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যক্তির কর্তৃত্বে অপর ব্যক্তির ইমামতি করতে নিষেধ করেছেন।
* আর যদি সমাজে সে অযোগ্য লোক হয়, নামাযের মাসআলা সম্পর্কে তার তেমন জ্ঞান না থাকে, বা কেরাআত বিশুদ্ধ না হয়, তখন ইমামতির আবেদন করা, মুখে বলা, বা মনে মনে ইমামতির আকাংখা করা হারাম হবে।
* আর যদি নাম প্রকাশের জন্য অথবা কেবল দুনিয়া লাভের জন্য ইমামতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা হয় তবে তাও হারাম হবে।

প্রশ্ন ৬৭: বর্তমান যুগের প্রযুক্তি অনেক অগ্রসর, অগ্রসরমান এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বহু প্রোগ্রাম বা সফ্টওয়্যার আমরা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে পেয়ে থাকি। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতেই মূল মালিকের স্বত্ত্ব জুড়ে দেয়া থাকে যে, তা অবশ্যই কিনে ব্যবহার করতে হবে। অথচ সব ধরনের সফ্টওয়্যার কেনা বিভিন্ন কারণে আমাদের নাগালের বাইরে। আবার কিছু কিছু কেনার ব্যবস্থা থাকলেও একদিকে উচ্চমূল্য এবং অন্যদিকে বিনামূল্যে বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়ার কারণে হয়ে উঠে না। এসব ক্ষেত্রে সবদিক বিবেচনায় আমাদের করণীয় জানাবেন।

উত্তর: যে সকল সফটওয়ার বাজারে যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কেবল সফটওয়ারের মূল মালিক থেকে সরাসরি অনুমতি থাকলে, অথবা সফটওয়ারের মালিকের প্রচ্ছন্ন অনুমতি বোঝা গেলেই কেবল সেটা ব্যবহার করা বৈধ হবে।
তবে যদি সেই সফটওয়ারটি তৈরী করার ক্ষেত্রে সেটার মালিক নিজে অন্যদের অধিকার হরণ করে তা তৈরী করেছেন, তবে সে সেটার মূল মালিক বলে বিবেচিত হবেন না। যেমন তাফসীর ইবন কাসীর এর মালিক ইমাম ইবন কাসির। কেউ সেটার মালিকানা দাবী করে সফটওয়ার তৈরী করলেই সে সেটার মূল মালিক হয়ে যাবে না, বড় জোর সে সেটার সফটওয়ার তৈরী বাবদ যে খরচ হয়েছে সেটার বিনিময়ে তা বিলি করতে পারে।
আর যদি কেউ সফটওয়ার তৈরী করার পর সেটা বিক্রি করার ব্যবস্থাও না রাখে, আর এটা অত্যাবশ্যক পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে যায়, অথবা যদি কাফেররা তাদের সফটওয়ারের স্বত্ব প্রদান না করে মুসলিমদেরকে রাষ্ট্রিয়ভাবে দুর্বল করতে চায় তবে তাদের সেটা সংগ্রহ করা মুসলিমদের কর্তব্য হয়ে যায় এবং সেটা তখন যুদ্ধ-সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মুসলিমরা তাদের সামগ্রিক স্বার্থে সেটা করায়ত্ব করতে পারবে।
মোটকথা, কেনার ব্যবস্থা থাকলে কারও হক অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা যাবে না।

প্রশ্ন ৬৮: শবে বরাত কি? কুরআন-সুন্নাহয় এর দলীল আছে কি? থাকলে জানাবেন এবং না থাকলে এর উৎপত্তি কবে, কোথায় ও কিভাবে হয়েছে? আর এটি পালনে ও বর্জনে আমাদের উপকারিতা এবং অপকারিতাগুলো জানাবেন।

উত্তর: শবে বরাত শব্দটি ফার্সী শব্দ। আরবী অনুবাদ করলে হয়, লাইলাতুল কদর। সুতরাং শবে বরাত বলতে লাইলাতুল কদরকেই বোঝানো হবে, কুরআনুল কারীমের সূরা আল-কাদর যার বর্ণনা রয়েছে, আবার সূরা আদ-দুখানেও সে লাইলাতুল কাদর এর কথাই ‘লাইলা মুবারাকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর বিভিন্ন হাদীসে তা রমযানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাত্রিগুলোকে নির্দেশ করে।
আমাদের দেশে প্রচলিত শা‘বানের ১৪ তারিখের রাত্রিকে শবে বরাত বলার কোনো দলীল কুরআন বা সুন্নায় নেই। এমনকি এ রাত্রিকে কোনো দুর্বল হাদীসেও শবে বরাত বলা হয় নি।
তবে শা‘বানের ১৪ তারিখের রাত্রির ব্যাপারে বেশ কিছু দুর্বল বা সাধারণ হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো দ্বারা এটাকে শবে বরাত বা ভাগ্য-রজনী বলা কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই।
সুতরাং আমরা এ রাত্রিটিকে শবে বরাত বা ভাগ্য রজনী বলবো না, এ রাত্রিতে কোনো ভাগ্য নির্ধারিত হয় না। বার্ষিক তাকদীর নির্ধারিত হয় লাইলাতুল কাদর এর রাত্রিতে।
শবে বরাত পালন করা বিদ‘আত ও গোনাহের কাজ। এর সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এর কারণে লাইলাতুল কদরকে মানুষ যথাযথ সম্মান করছে না।
এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানার জন্য আমার লেখা প্রবন্ধ “শবে বরাত ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা” ইসলাম হাউজ থেকে ডাউনলোড করে দেখে নিতে পারেন।


~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~

জীবন যতদিন আছে, জিজ্ঞাসাও ততদিন থাকবে। যত জিজ্ঞাসা আছে, তত জবাবও আছে। তবে জিজ্ঞাসা করতে হবে জ্ঞানীদের নিকট। জ্ঞানী তথা আলেম নির্বাচনই আপনার কৃতিত্ব। কুরআন ও সুন্নার বিশুদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী সত্যপন্থী আলেম আপনাকে সত্যের পথে নিয়ে যাবে। আপনার জীবনের যে কোন জিজ্ঞাসা আজই পাঠিয়ে দিন "নির্মাণ" বরাবর।
আপনার জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, পি এইচ ডি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মদীনা মুনাওয়ারা। সহকারী অধ্যাপক ও ফিকাহ্ বিভাগের চেয়ারম্যান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
জিজ্ঞাসা পাঠাবার ঠিকানা: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.
~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~

শায়খের অন্যান্য জবাবগুলো জানতে অনুসরণ করুন: জবাব দিচ্ছেন: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes