ইসলাম ও সৎকাজ শেষ পর্ব

Print
Category: প্রবন্ধ নিবন্ধ
Published Date Written by মোঃ ইকবাল হোসেন

ইসলাম ও সৎকাজ

-মোঃ ইকবাল হোসেন


(সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭তম সংখ্যার পর...)

দাওয়াত

দাওয়াত আরবী শব্দ। এর অর্থ ডাকা, আহবান করা। পারিভাষিক অর্থে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি তথায় ইসলামী জীবন বিধানের দিকে আহবান করাকে দাওয়াত বলে।

আমরা জানি নবী ও রাসূলদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীন ইসলাম এসেছে যুগে যুগে। আর তাঁরা দাওয়াতের মাধ্যম সমাজের মানুষের তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ দাওয়াত এমন একটি মাধ্যম যা ইসলামকে ছড়িয়ে দেবার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটির চর্চা বন্ধ হয়ে গেলে দ্বীন ইসলামের সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যাবে।

দাওয়াত হলো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের দিকে আহবান। সূরা আরাফে এসেছে-
“আমি নূহকে তার কওমের নিকট পাঠিয়েছিলাম। সে তার কওমকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার জাতির লোকেরা আল্লাহর দাসত্ব কর আল্লাহ্ ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই।” (সূরা আরাফ-৫৯)

আবার একই সূরার ৭৩নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“এবং ছামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই ছালেহ্ কে পাঠিয়েছিলাম। সে তার দেশবাসীকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কওমের লোকেরা তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কবুল কর। তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।” (সূরা আরাফ-৭৩)

আবার সুরা মায়েদায় এসেছে-
“হে রাসূল! তোমার রবের তরফ থেকে তোমার প্রতি যা কিছু নাযিল করা হয়েছে, তা লোকদের পর্যন্ত পৌছিয়ে দাও। তুমি যদি উহা না করো, তবে উহা পৌঁছিয়ে দেয়ার হক তুমি আদায় করলে না।” (সূরা মায়েদা-৬৭)

দাওয়াতের এ দায়িত্ব শুধু নবী রাসূলদের নয়, আমাদেরও এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। সূরা হা-মীম-জিসদাহতে আল্লাহ্ বলেছেন-
“আর সেই ব্যক্তির কথা অপেক্ষা অধিক ভাল কথা আর কার হতে পারে? যে আল্লাহর দিকে ডাকে, নেক আমল করে এবং বলে আমি মুসলমান।” (সূরা হা-মীম-সিজদাহ-৩৩)

আবার সূরা আলে ইমরানে ঘোষণা করা হয়েছে-
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানব জাতিকে কল্যাণের পথে আহবান জানাবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে বাঁধা দেবে তারাই সফলকাম।” (সূরা আলে ইমরান-১০৪)

বুখারী শরিফে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
“আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, একটি আয়াত হলেও তা আমার পক্ষ থেকে প্রচার কর। আর বনী ইসরাইল সম্পর্কে আলোচনা কর। তাতে কোন দোষ নেই। যে ব্যক্তি আমার প্রতি ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা আরোপ করে, তার নিজ চিরস্থায়ী ঠিকানা জাহান্নামে সন্ধান করা উচিত।” (বুখারী)

অন্য একটি হাদীসে এসেছে-
“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলা সেই ব্যক্তির মুখ উজ্জ্বল করুণ, যে আমার কোন হাদীস শুনেছে এবং যেভাবে শুনেছে সেভাবেই তা অপরের নিকট পৌঁছেয়েছে কেননা অনেক সময় যাকে পৌঁছানো হয, সে ব্যক্তি শ্রোতা অপেক্ষা অধিক রক্ষণাবেক্ষণকারী বা জ্ঞানী হয়ে থাকে।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

দাওয়াতী কাজ ব্যক্তিগত পরিসরে করা যায়, কিন্তু আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকে সামষ্টিক সৎকাজের অধ্যায়ে আলোচনা করছি। কারণ ইসলামের সম্প্রসারণের জন্য, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক ভাবে একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একই পদ্ধতিতে দাওয়াতী কাজ করা। একজন মুমিনের জীবনে দাওয়াতী কাজ হবে অপরিহার্য কর্ম। সে নিজে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর গোলামী করবে এবং তার চারপাশের মানুষদের আহবান করবে আল্লাহর দাসত্বের দিকে। কিন্তু ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করতে গেলে প্রথমেই সংঘবদ্ধ হতে হবে এবং এরপরেই সামষ্টিক ভাবে দাওয়াতী কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আমরা রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের দিকে দৃষ্টি পাত করলেই দেখতে পাব। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াত পাওয়ার পরই নবী করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতে আত্মনিয়োগ করেন। যারা দাওয়াত গ্রহণ করে তাদের সংঘবদ্ধ করেন এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে দাওয়াত প্রদানের জন্য যোগ্য করে তোলেন। এরপর সামষ্টিক দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময় আমরা নিম্নে দাওয়াতের কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা করার চেষ্টা করব।

১। সূরা নাহল এর ১২৫ নং আয়াতে আল্লাহ্ রব্বুল আলামিন বলেছেন-
“হে নবী! তোমার রবের পথের দিকে দাওয়াত দাও হিকমত ও নসীহতের সাহায্যে। আর লোকদের সাথে পরস্পর বিতর্ক করো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। তোমার রবই অধিক অবগত আছেন কে তাঁর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে, আর কে সঠিক পথে আছে।” (সূরা নাহল-১২৫)

উল্লেখিত আয়াতটিতে দাওয়াতী কাজের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ক. দাওয়াত দিতে হবে হিকমত সহকারে।
হিকমতের অর্থ প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা। দাওয়াতী কাজ চোখ বন্ধ করে নির্বোধের মত করলে চলবে না। বরং প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে যাকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে মন-মানুষিকতা, জ্ঞান, যোগ্যতা ও অবস্থার প্রতি নজর রেখে এবং সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে হবে। একই ভাবে সবাইকে বিবেচনা করা যাবে না। বরং হেকিম বা ডাক্তার যে ভাবে আগে রোগীর রোগ নির্ণয় করেন এবং এরপর সে রোগের ঔষধ দেন, আমাদেরও দাওয়াতী কাজে এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। যে কোন ব্যক্তি বা দলের মুখোমুখি হলে প্রথমে তার রোগ নির্ণয় করতে হবে তারপর এমন যুক্তি প্রমাণের সাহায্যে তার রোগ নিরসণের চেষ্ঠা করতে হবে যা তার মস্তিষ্কের গভীরে প্রবেশ করে তার রোগের শিকড় উপড়ে ফেলতে পারে।

খ. দাওয়াত দিতে হবে সদুপদেশ সহকারে।
-সদুপদেশের দু’টি অর্থ হতে পারে।

এক. যাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে তাকে শুধুমাত্র যুক্তি প্রমাণের সাহায্যে তৃপ্ত করে দিয়ে ক্ষান্ত হলে চলবে না বরং তার আবেগ-অনুভূতির প্রতিও আবেদন জানাতে হবে। দুষ্কৃতি ও ভ্রষ্টতাকে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে বাতিল করলে হবে না বরং সেগুলোর অশুভ পরিণতির ভয় দেখাতে হবে।
ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ ও সৎকাজ আত্মনিয়োগ যে ন্যায় সংগত ও মহৎগুণ তা কেবল যৌক্তিক ভাবে প্রমাণই করবে না বরং সেগুলোর প্রতি আকর্ষণও সৃষ্টি করতে হবে।

দুই. উপদেশ এমনভাবে দিতে হবে যাতে আন্তরিকতা ও মঙ্গলকামনা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যাকে উপদেশ দান করা হচ্ছে সে যেন একথা মনে না করে যে, উপদেশদাতা তাকে তাচ্ছিল্য করছে এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির স্বাদ নিচ্ছে। বরং সে অনুভব করবে উপদেশদাতার মনে তার সংশোধনের প্রবল আকাংখা রয়েছে এবং আসলে সে তার ভাল চায়।

গ. বিতর্ক হবে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে।
দাওয়াতী কাজ করতে গেলে যে বিতর্কের সূচনা হয় তাকে নিছক বিতর্ক বা বুদ্ধির লড়াই মনে করলে চলবে না। এ আলোচনায় পেচিয়ে কথা বলা, মিথ্যে দোষারোপ ও কঠিন বাক্যবানে বিদ্ধ করার প্রবণতা যেন না থাকে। প্রতিপক্ষকে চুপ করিয়ে দিয়ে নিজের গলাবাজী করে যেতে থাকা এর উদ্দেশ্য হবে না। বরং এ বিতর্ক আলোচনায় মধুর বাক্য ব্যবহার করতে হবে। উন্নত পর্যায়ের ভদ্র আচরণ করতে হবে। যুক্তি প্রমাণ হতে হবে ন্যায়সংগত ও হৃদয় স্পর্শী। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে তার মনে যেন জিদ, একগুয়েমী সৃষ্টি হবার অবকাশ না দেখা দেয়। সোজাসুজি তাকে কথা বোঝাবার চেষ্ঠা করতে হবে, কটুতর্কে লিপ্ত হওয়া যাবে না।

২। সূরা শূরার ১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে- তুমি এখন সে দ্বীনের দিকে দাওয়াত দাও। আর তোমাকে যেমন হুকুম দেয়া হয়েছে তার উপর মজবুতীর সাথে থাক, কিন্তু এ লোকদের ইচ্ছা-বাসনা অনুসরণ করো না। (সূরা শূরা-১৫)
উক্ত আয়াতটিতে দাওয়াতী কাজের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তা হলো দাওয়াতের বিষয়বস্তু হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সঠিক দ্বীন এবং কোন ভাবেই এ দ্বীনের মধ্যে পরিবর্তন বা হ্রাস-বৃদ্ধি করা যাবে না। নিজে সেই নির্ধারিত বিধানের উপর অবিচল থাকতে হবে এবং প্রশান্ত চিত্তে এ বিধানের দিকে দাওয়াত দিতে হবে। কারো ইচ্ছা-বাসনাকে প্রশ্চয় দিতে গিয়ে বা অন্য কোন কারণে সঠিক নিয়ম নীতির পরিবর্তন করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই।

৩। আল-আদাবুল মুফবদ নামক হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীসে এসেছে-
“হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দ্বীন ইসলাম শিক্ষা দাও এবং লোকদের পক্ষে তা সহজসাধ্য করে দাও। আর যখন তোমার মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার হবে, তখন চুপচাপ হয়ে থাক।”
উল্লেখিত হাদীসে দাওয়াতী কাজের আরো দুটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে-

ক. দ্বীন ইসলামকে সহজ সাধ্য করে দেয়া।
অর্থাৎ ইসলামী আদর্শকে এমন ভয়ানক ও দুঃসাধ্য বিধানরুপে লোকদের নিকট পেশ করা যাবে না, যা শুনলে লোকেরা মনে করতে বাধ্য হয় যে, এটি কোন বাস্তব ও কর্মোপযোগী বিধান নয়। কেননা, কোন জীবন বিধান যদি কঠিন ও দুঃসাধ্য মনে হয়, তবে তা গ্রহণ করার জন্য লোকদের মনে কোন আগ্রহ ও উৎসাহ জাগ্রত হয় না, বরং লোকের মন তা হতে বিমুখ হয়ে যায়। কিন্তু সহজ সাধ্য করার সময় একথাও মনে রাখতে হবে যে তা যেন আল্লাহর দ্বীনের সীমারেখা সমূহকে অতিক্রম না করে।

খ. যখন ক্রোধ বা রাগ হবে তখন চুপ করে থাকতে হবে।
ইসলাম আদর্শ প্রচারের জন্য বহু মানুষের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ সময় ইসলামের বিপরীত কাজ হতে দেখে এবং লোকদের মধ্য হতে কারো আক্রমণ মূলক সমালোচনা বা কটু কথা শুনে অথবা অবহেলা দেখে বাগান্বিত হওয়া অস্বাভাবিক বা অসম্ভব নয়। কিন্তু রাগান্বিত হওয়ার ফলে যদি অবাঞ্চিত কিছু ঘটে যায়, যদি তিক্ততার সৃষ্টি হয তবে দাওয়াতী কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। এ জন্য নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলে চুপ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

৪। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস এরকম-
“শাকীক রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু লোকদেরকে প্রতি বৃহস্পতিবার ওয়াজ ও নসীহত করতেন। একজন লোক তাকে বলল, হে আবূ আব্দুর রহমান, আমার মনে ঐকান্তিক বাসনা এই যে, আপনি প্রতিদিনই এরূপ নসীহত করুণ। তিনি বললেন যে, এটি হতে আমাকে কেবল এই জিনিসই বিরত রাখে যে, তোমরা নসীহত শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে যাও এই আশংকায় আমি তোমাদের প্রতি সেরূপ দৃষ্টি রাখি যেমন নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিরক্ত হওয়ার ভয়ে আমাদের প্রতি খেয়াল রাখতেন।” (বুখারী ও মুসলিম)

এ হাদীসটিতে ইসলাম প্রচার তথা দাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। ইসলামকে একটি বাস্তব জীবনাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সর্ব প্রথম কিছু সংখ্যক লোকদের মন-মগজে একে দৃঢ়মূল করে দিতে হবে এবং ক্রমিক প্রচারের স্বাভাবিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। কিছু কিছু করে, পেশ করতে হবে এবং তা লোকদের মনে দৃঢ়মূল হতে পারে সেজন্য অবসর দিতে হবে। নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইসলাম শিক্ষাদানের নিয়ম এমন ছিল যে, তিনি একদিন ইসলাম সম্পর্কে বলতেন এবং একসপ্তাহের জন্য তাদের ছেড়ে দিতেন, আবার এক সপ্তাহ পর লোকদের একত্রিত করে নসিহত করতেন।

জিহাদ

সামষ্টিক কাজগুলোর ধারাবাহিক আলোচনায় এবার আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক কাজ জিহাদ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব। জিহাদ শব্দটি আরবী ‘জুহুদন’ শব্দ হতে উদ্ভূত। যার আভিধানিক অর্থ হলো কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করা বা চরম প্রচেষ্ঠা। পারিভাষিক অর্থ হলো আল্লাহর বাণী বা আল্লাহ্ প্রদত্ত দ্বীনকে সমাজে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সর্বাত্বক প্রচেষ্ঠা অর্থাৎ ইকামাতে দ্বীনের দ্বায়িত্ব পালন করার জন্য যে প্রচেষ্ঠা, সংগ্রাম করতে হয় তাই জিহাদ।

জিহাদের কথা আল্ কুরআন এবং হাদীসে বহুবার এসেছে। যেমন সূরা আনকাবূতে বলা হয়েছে-
“যে ব্যক্তি জিহাদ করবে সে নিজের ভালর জন্যই করবে। আল্লাহ্ অবশ্যই বিশ্ববাসীদের প্রতি মুখাপেক্ষিতাহীন।” (সূরা আনকাবূত-৬)

আবার সূরা বাকারায় এ ইবাদাতের ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে-
“জিহাদ তোমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে, আর তা তোমাদের অসহ্য মনে হচ্ছে, কোন জিনিস তোমাদের অসহ্য মনে হলো, অথচ তাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। পক্ষান্তরে এটাও হতে পারে যে, কোন জিনিস তোমাদের ভাল লাগল, অথচ তাই তোমাদের জন্য খারাপ। প্রকৃত ব্যাপার তো আল্লাহই জানেন তোমরা জান না।” (সূরা বাকারাহ-২১৬)

আরো অধিক কঠোর বাণী এসেছে হাদীসে-
“হযরত আবু হুরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদে শরীক হল না, কিংবা জিহাদ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনাও করল না; আর এ অবস্থায়-ই সে মারা গেল, সে যেন মুনাফেকের মৃত্যুবরণ করল।” (মুসলিম)

জিহাদ কেবল বাধ্যতামূলক ইবাদতই নয়, বরং এটি অন্যান্য ইবাদতের মধ্যেও উত্তম ইবাদত। এর মর্যাদা অনেক বেশি। যেমনটি বলা হয়েছে-
“আল্লাহর নিকট তো সেই লোকদেরই অতি বড় মর্যাদা যারা তার পথে নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়েছে, নিজেদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে, তারাই সফল কাম।” (তওবা-২০)

“হযরত আবু যার গিফারী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর নবী! কোন আমলটি (আল্লাহর নিকট) সবচেয়ে উত্তম? হুজুরসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর উপর ঈমান আনা এবং তার পথে জিহাদ করা।” (বুখারী ও মুসলিম)

আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় মুয়ায ইবনে জাবাল বর্ণিত একটি হাদীসে-
“হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, একদা নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূল সূত্র, তার স্তম্ভ এবং সর্বোচ্চ চূড়ার সন্ধান দেব না? আমি বললাম হ্যাঁ অবশ্যই আপনি তা দেবেন। তখন হুজুরসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দ্বীনের মূল হলো ইসলাম, খুটি হলো নামায এবং তার সর্বোচ্চ চূড়া হলো জিহাদ।” (আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

জিহাদের উদ্দেশ্য হতে হবে অন্যান্য ইবাদাতের মতই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, পাশাপাশি এর মাধ্যমে অন্যায়ের মূলোৎপাটন করা। বীরত্ব প্রকাশ বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে জিহাদ করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

“হযরত আবু মূসা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। কোন এক ব্যক্তি গনীমতের অর্থাৎ যুদ্ধ লব্ধ অর্থের জন্য এক ব্যক্তি খ্যাতি বা প্রসিদ্ধির জন্য এবং এক ব্যক্তি তার বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করছে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য লড়াই করে, সেই আল্লাহর পথে জিহাদ করছে।” (বুখারী)

জিহাদের মাধ্যমে হবে মু’মিনের জান ও মাল। মু’মিন তার জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।
“হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার কথা বলব না, যা তোমাদেরকে ভয়াবহ শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারে? তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের উপর ঈমান আনবে এবং আল্লাহর রাহে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করবে, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা অনুধাবন করতে পারো।” (সূরা ছফ-১০,১১)

জিহাদের বিনিময়ে জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। জিহাদই হলো পরকালীন জীবনের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রি করে দেয়া।
“প্রকৃত কথা এই যে, মহান আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনের জান-মাল জান্নাতের বিনিময়ে খরীদ করে নিয়েছে, এখন তাদের কাজ হবে তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, সে জিহাদে তারা যেমন মরবে, তেমন মারবেও।” (সূরা তওবা-১১১)

“আল্লাহর পথে লড়াই করা কর্তব্য সেসব লোকেরই যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রি করে দেয়। যারা আল্লাহর পথে লড়াই করবে ও নিহত হবে, কিংবা বিজয়ী হবে, তাকে আমি অবশ্যই বিরাট প্রতিফল দান করব।” (সূরা নিসা-৭৪)

হাদীসেও জিহাদের বিনিময়ে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে-
“হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। নবী করিমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মুসলিম ব্যক্তি উটের দুধ দোহনের সমপরিমাণ সময় (অল্প সময়) আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।” (তিরমিযী)

জিহাদের প্রতিপক্ষ হবে ত্বগুত, যারা মানুষদেরকে আল্লাহর গোলামী থেকে বিরত রাখার চেষ্ঠায় লিপ্ত। ইতিপূর্বে আমরা ত্বগুতের স্বরূপ শ্রেণী বিভাগ সহ আলোচনা করেছি। সূরা নিসায় বলা হয়েছে-
“যারা ঈমানের পথ গ্রহণ করেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরী পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। এতএব তোমরা শয়তানের সঙ্গী সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, নিঃসন্দেহে শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দূর্বল।” (সূরা নিসা-৭৬)

জিহাদ চলবে যতক্ষণ না ত্বগুত পন্থিরা ফিতনা থেকে বিরত না হয় এবং ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন না হয়। সূরা আনফালের ৩৯নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“হে ঈমানদার লোকেরা কাফেরদের সাথে লড়াই কর, যেন শেষ পর্যন্ত ফেতনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরি ভাবে আল্লাহরই জন্য হয়ে যায়। পরে তারা যদি ফেতনা হতে বিরত থাকে তবে তাদের আমল আল্লাহ্ দেখবেন।” (সূরা আনফাল-৩৯)

উল্লেখিত আলোচনায় অত্যন্ত সংক্ষেপে ইসলামী জিহাদের সকল স্তর উত্তমরূপে প্রকাশ করা হয়েছে। এ আলোচনায় দ্বীনী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও সুদূর প্রসারী ফলাফলের আভাস পাওয়া যায়। বিষয়টি গভীর মনোযোগ সহকারে পর্যালোচনার দাবী রাখে। এখানে আমরা কয়েকটি বিষয়ে ইঙ্গিত করছি মাত্র।

জিহাদের প্রথম বৈশিষ্ট্যঃ দ্বীনে হকের প্রথম বৈশিষ্ট্যময় সৌন্দর্য এই যে, এ একটি বাস্তবমুখী বিধান। এ দ্বীনের আন্দোলন মানুষকে সকল পারিপার্শ্বিক অবস্থায়ই নিজের দিকে টেনে নেয় এবং অবস্থার সাথে যেসব উপায়-উপকরণ সামঞ্জস্যশীল তাই আন্দোলনের কাজে ব্যবহার করে। ইসলামী আন্দোলনের সূচনাতেই বাতিল সমাজের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রচলিত সমাজের চিন্তাধারা ও আকীদা-বিশ্বাস জাহেলিয়াতেরই প্রভাবাধীন থাকে। জাহেলিয়াতের ভিত্তিতেই ঐ সমাজ ব্যবস্থার কাঠামো গড়ে উঠে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় জাহেলিয়াত সমাজের উপর সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। কাজেই ইসলামী আন্দোলন পরিচালনার জন্যে জাহেলিয়াতের প্রতিষ্ঠিত শক্তির তুলনায় সমপরিমাণ উপায়-উপকরণ অপরিহার্য। তাই ইসলাম তাবলীগ ও প্রচারের মাধ্যমে চিন্তাধারা ও আকীদা-বিশ্বাসের সংশোধন করে। প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনের জন্যে পার্থিব শক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে জিহাদ পরিচালনা করে। কারণ, ঐ জাহেলিয়াত পরিচালিত সমাজ আকীদা ও চিন্তার বিশুদ্ধকরণ কাজে বাধা প্রদান করে।
পার্থিব উপকরণ ও বিভ্রান্তিকর কর্মসূচী অবলম্বন করে মানুষকে জাহিলী সমাজের প্রতি অনুগত থাকার জন্যে বাধ্য করে। আর এর ফলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর পরিবর্তে মানুষেরই নিকট মাথা নত করে বাস করা ছাড়া সমাজের আর কোনই উপায় থাকে না। তাই ইসলামী আন্দোলন পার্থিব শক্তিপুষ্ট জাহেলিয়াতের সূলোচ্ছেদ করার অভিযানে শুধুমাত্র দাওয়াত ও তাবলীগকেই যথেষ্ট বিবেচনা করতে পারে না। আবার জোর জবরদস্তি করে মানুষের আকীদা-বিশ্বাস পরিবর্তন করা ইসলামী আদর্শের নীতি নয়। এ দ্বীনের আন্দোলন পরিচালনায় উপরোক্ত উভয় পদ্ধতিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয় পন্থাই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। কারণ, মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর বন্দেগীতে নিয়োগ করাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য।

জিহাদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যঃ ইসলামের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এটা একটা বাস্তবমুখী আন্দোলন। এ আন্দোলন ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় এবং প্রত্যেকটি ধাপে তার চাহিদা মুতাবিক উপকরণ সংগ্রহ করে নেয় ও পরবর্তী ধাপের জন্যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। বাস্তব সমস্যাবলীকে নিছক উত্তম নীতি মালার সাহায্যে প্রতিরোধ করার কোন অবাস্তব ব্যবস্থা এ দ্বীনে নেই এবং এ আদর্শ আন্দোলনের বিভিন্ন স্তরে উদ্ভূত সমস্যাবলীর সমাধানের কিছু অপরিবর্তনীয় ছককাটা পন্থার উপরও নির্ভর করে না। যারা ইসলামী জিহাদের আলোচনা বিষয়টির প্রতি মনোযোগ প্রদান করেন না। বরং তাঁরা ইসলামী আন্দোলনকে যেসব স্তর অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হয়, সে স্তরগুলোও বুঝে উঠতে পারেন না। অতি স্বাভাবিকভাবেই আন্দোলনের কোন্ স্তরে কোন্ কুরআনী আয়াত কি তাৎপর্য নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল, তা-ও উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই তারা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে জিহাদের আলোচনায় প্রবৃত্ত হন এবং আন্দোলনের বিভিন্ন স্তরগুলোর জগাখিচুড়ি বানিয়ে জিহাদের আসল রূপটিকে বিকৃত করে ফেলেন এবং বিভিন্ন সময়ে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতগুলো থেকে কতত সাধারণ নীতিমালা আবিষ্কার করেন। অথচ ঐ আয়াতগুলোতে নিজেদের খাহেশ মুতাবিক নীতিমালা আবিষ্কারের কোনই অবকাশ নেই। তাঁরা কুরআনের প্রতিটি আয়াতকেই দ্বীনের শেষ সীমা বিবেচনা করেন। এ শ্রেণীর চিন্তা যারা করেন তারা বর্তমানে নাম সর্বস্ব মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ করে নৈরাশ্যব্যঞ্জক পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপে পরাজিত মনোভাবেরই ফলশ্র”তি স্বরূপ উল্লেখিত ভূমিকা গ্রহণ করেন।

পরাজিত মনোবৃত্তির বশবর্তী হয়েই তারা বলেন- “ইসলাম শুধু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি দান করে।” চরম দুঃখের বিষয় এই যে, তাঁরা জিহাদের উপরোক্ত ব্যাখ্যা দিয়ে দ্বীনের মহাকল্যাণ সাধন করেছেন বলে বিশ্বাস করেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, জিহাদের অপব্যাখ্যা করে তাঁরা দ্বীনের বৈশিষ্ট্যই পরিত্যাগ করেছেন। দ্বীনকে তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করাই এ ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য। এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করার পর ইসলাম তাগুতী শক্তির ক্ষমতা মিটিয়ে দিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে লা-শরীক আল্লাহর বন্দেগীতে নিয়োজিত করার লক্ষ্য হারিয়ে ফেফে। অবশ্য ইসলাম জোর-জবরদস্তি করে আকীদা-বিশ্বাস পরিবর্তন করতে বলে না। বরং সে মানুষকে স্বাধীনভাবে জীবন-পথ নির্বাচনের সুযোগ দান করে। এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির অত্যাচার থেকে জনগণকে মুক্ত করার জন্যে ঐ শাসন ক্ষমতার উচ্ছেদ সাধন করে। তারপরও তাকে জিযিয়া কর দান করে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত বাসিন্দা হয়ে বাস করার সুযোগ দান করে। এর ফলে স্বাধীনভাবে ইসলামী সতবাদ গ্রহণের পথে বলপূর্বক বাধাদানকারী সকল শক্তি অপসারিত হয়। এবং জনগণ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে নিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ লাভ করে।

জিহাদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যঃ এ দ্বীনের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, কঠোর সংগ্রামের ভিতর দিয়ে ক্রম অগ্রসরমান দ্বীনি আন্দোলন কোন অবস্থায়ই তার মূল লক্ষ্য থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুত হয় না। আল্লাহর নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই যখন যে স্তরে আত্মীয়-স্বজন, কুরাইশ বংশ অথবা সারা বিশ্ববাসীকে সম্বোধন করে আহবান করেছেন তখন মূল লক্ষ্যের দিকেই তাদেরকে ডেকেছেন। সকল অবস্থায় তিনি একই বাণী প্রচার করেছের। অর্থাৎ তিনি সকলকেই এক আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার ও প্রভুত্বের অপরাপর মিথ্যা দাবীদারদের বিরুদ্ধে ঘোষণার আহবান জানান। এ বিষয়ে কোন আপোষ বা নমনীয়তার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। এ উদ্দেশ্য নিদ্ধির জন্যে একটি পরিকল্পনা মুতাবিক আন্দোলন অগ্রসর হয় এবং তা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। প্রতিটি স্তরেই প্রয়োজন মুতাবিক উপায়-উপকরণ ব্যবহারের প্রয়োজনীতা দেখা দেয়। একথা আমরা উপরেই উল্লেখ করেছি।

জিহাদের চতুর্থ বৈশিষ্ট্যঃ চতুর্থ বৈশিষ্ট হলো এই যে, ইসলাম মুসলিম উম্মাতের সাথে অন্যান্য অমুসলিমদের সম্পর্ক রক্ষায় স্থায়ী বিধান দান করেছে।

উপরের জাদুল মায়াদ প্রন্থের উদ্ধৃতি থেকেই তা জানা গেছে। এ বিধানের মূলকথা হলো এই যে, ইসলাম (আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য মেনে নেয়া) একটি সার্বিক মহাসত্য এবং তা গ্রহণ করা অপরিহার্য ও সমগ্র মানব সমাজের জন্যে বাধ্যতামূলক। যারা ইসলাম গ্রহণে অপারগ বা অনিচ্ছুক তাদের কর্তব্য হচ্ছে ইসলামের সাথে আপোষমূল মনোভাব গ্রহণ করা এবং ইসলামের বাণী প্রচার ও তার সম্প্রসারণের পথে রাজনৈতিক বা অন্য কোন শক্তির সাহায্য নিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা। প্রতিটি মানুষের জন্যে চাপমুক্ত পরিবেশে ইসলাম গ্রহণ করা বা না করার নিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ দরকার। যদি ইসলাম গ্রহণ করতে কেহ আগ্রহান্বিত হয় তাহলে ইসলাম বিরোধী মহল সে ব্যক্তির বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ অথবা তাকে ইসলাম গ্রহণে কোন প্রকার বাধা প্রদান করবে না। যদি কেহ বাধা প্রদান করে তাহলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা ইসলামের কর্তব্য এবং বাধা প্রদানকারীর মৃত্যুবরণ অথবা বশ্যতা স্বীকার না করা পর্যন্ত এ লড়াই বিরামহীন গতিতে চলবে।

দুর্বল ও পরাজিত মনোভাবাপন্ন লেখকগণ ইসলামী জিহাদ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে যখন তাদের দৃষ্টিভংগী অনুসারে ইসলামের দেহ থেকে জিহাদের ‘কলঙ্ক’ মোচনের প্রয়াস পান, তখন তারা দু’টো বিষয়কে অযথা মিশ্রিত করে ফেলেন। প্রথন বিষয়টি হচ্ছে জোরজবরদস্তি ইসলাম গ্রহণ করতে কোন মানুষকে বাধ্য না করা। পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ্ তাআলা, لا إكره في الدين (দ্বীন গ্রহণে কোন জবরদস্তি নেই) ঘোষণার ভিতর দিয়ে স্পষ্ট ভাষায়ই এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ইসলাম ঐ সকল রাজনৈতিক ও পার্থিব শক্তির মূলোচ্ছেদ করার নির্দেশ দেয়, যেসব শক্তি মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় এবং আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণে মানুষকে বাধা প্রদান করে নিজেদের গোলাম বানিয়ে নেয়। এ দুটো মূলনীতি সম্পূর্ণ পৃথক। তাদের মধ্যে কোথাও গোঁজামির নেই অথবা অপরের বিরোধীও নয়। কিন্তু দুর্বল মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ পরাজয় বরণকারী পরাভূত চিন্তাধারার দরুন এ উভয় বিষয়কে মিশ্রিত করে ইসলামী জিহাদকে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায়। অথচ ইসলামী জিহাদ হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির লড়াই। আধুনিক যুগে প্রচলিত যুদ্ধ-বিগ্রহের সাথে তার কোন সামঞ্জস্য নেই। যুদ্ধের শর্তাবলী অথবা বাহ্যিক আকৃতি-প্রকৃতি কোন ক্ষেত্রেই ইসলামী জিহাদের প্রকৃতি, দুনিয়ায় তার ভূমিকা, আল্লাহ্ তাআলা এ দ্বীনের যেসব মহান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এবং যে লক্ষ্য অর্জনের জন্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রিসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করে তাঁকে সকল রাসূলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন; সেগুলোর ভিতরই ইসলামী জিহাদের শর্তাবলী খুঁজে পাওয়া যাবে।

সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ
সমামষ্টিক কাজের ধারাবাহিক আলোচনায় আমরা সর্বশেষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ নিয়ে আলোচনার চেষ্ঠা করব। প্রথমেই মনে রাখতে হবে এটি দাওয়াতী কাজ নয়। দাওয়াতী কাজে মানুষকে নসীহত করা হয়, বুঝিয়ে আল্লাহর পথে আহবান করা হয়। কিন্তু সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ হলো ভালকাজ করতে বাধ্য করা, খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন-
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানব জাতিকে কল্যাণের পথে আহবান জানাবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজের বাঁধা দেবে, তারাই সফল কাম।”

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে একটা সামষ্টিক শক্তি বা রাষ্টীয় শক্তি ছাড়া এই কাজটি কিছুতেই পুরোপুরি করতে পারা যাবে না। আর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ছাড়া ইকামাতে দ্বীনের কাজও সম্পন্ন হবে না। আমরা যদি এ ফরজ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখি তাহলে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যেমন তিরমিযী শরীফের এক হাদীসে এসেছে-
“হযরত হোযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত। নবী করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ কনেছেন। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, যার নিয়ন্ত্রণে আমার জীবন। অবশ্যই তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ হতে লোককে বিরত রাখবে। নতুবা তোমাদের উপর শীঘ্রই আল্লাহর আযাব নাযিল হবে। অতঃপর তোমরা ( তা হতে মুক্তির জন্য) দোয়া করতে থাকবে কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না।” (তিরমিযী)

সার কথা হলো সামষ্টিক কাজের চূড়ান্ত পর্যায় হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ। প্রথমেই সৎলোকদেরকে সংঘবদ্ধ হতে হবে, এর পর ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে সামষ্টিক ভাবে কাজ শুরু করতে হবে। সামষ্টিক ভাবে দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজের লোকদের ধারণা পরিবর্তন করে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষদের মধ্যে আল্লাহর গোলামীর যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে। এ ভাবে অগ্রসর হলে ইসলাম সম্প্রসারিত হবে এবং ত্বগুতের সাথে সংঘাত সৃষ্টি হবে। এ পর্যায়ে প্রয়োজন হবে জিহাদের। আর এ জন্যই সামাষ্টিক ভাবে আমাদের টিকে থাকার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে। পর্যাপ্ত সামষ্টিক শক্তি অর্জিত হলে সৎকাজের আদেশ ও অৎকাজের নিষেধ করতে হবে এবং সাথে সাথে সরকারী ব্যবস্থার পরিবর্তনের চেষ্ঠা করতে হবে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে।

কেবল মাত্র রাষ্টীয় শক্তির মাধ্যমে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পুরোপুরি ভাবে করা সম্ভব। আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে রাষ্টীয় শক্তি ইসলাম বিরোধী হলে দ্বীন প্রতিষ্ঠা কোন ভাবেই সম্ভব নয়।

এখন যদি আমরা বইটির আলোচ্য বিষয়গুলো ধারাবাহিক ভাবে মনে করার চেষ্ঠা করি তাহলে দেখব-

  • প্রথমেই প্রয়োজন ইসলাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা।
  • এর পর প্রয়োজন জেনে-বুঝো ইমান আনায়ন যাতে মজবুত বৈশিষ্ট্য গুলো বিদ্যমান থাকবে।
  • ঈমানের পরেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে, তার ঘোষিত পুরষ্কার পেতে হলে সৎকর্ম করতে হবে।
  • সৎকাজের শুরুতেই প্রয়োজন ব্যক্তিগত সৎকাজগুলো করার মাধ্যমে নিজেকে ব্যক্তিগত ভাবে সৎমানুষ তৈরি করা।
  • ব্যক্তিগত সৎকাজের অভ্যাস আমাদের মধ্যে আল্লাহভীতি সহ যে গুণাবলী বা যোগ্যতা সৃষ্টি করে তা নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের জন্য সামষ্টিক ভাবে মাঠে নামতে হবে।
  • এরপর নিষ্ঠার সাথে সামষ্টিক ইবাদাত গুলো ব্যক্তিগত সৎকাজের সাথে সাথে পালন করতে হবে।

এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় যদি আমরা সৎকাজ করে যেতে পারি তাহলে আশা করা যায় আমরা সৎকর্মশীল হতে পারব এবং আল্লাহ্ ঘোষিত পুরষ্কারের অধীকারী হতে পারব।

সমাপ্ত

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes