কেমন ছিলেন ইমাম হাসান আলবান্নার সহধর্মিনী?(শেষ পর্ব)

Print
Category: সীরাত জীবনী
Published Date Written by ড. মোঃ আব্দুস্ সালাম আযাদী

(নভেম্বর ২০১২, ১৪তম সংখ্যার পর...)

মেয়ে ওয়াফা ছিলেন প্রখ্যাত স্কলার সাঈদ রামাদানের স্ত্রী, অধুনা কালের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবীদ প্রফেসর ডঃ তারিক রমাদানের আম্মা। তিনি ছিলেন অনেক উচ্চ শিক্ষিতা। ডঃ সানা ছিলেন মিশরের প্রখ্যাত কুল্লিয়াতুল বানাতের প্রফেসর। আরেক মেয়ে হালাহ ছিলেন মেডিক্যাল ডক্টর এবং কলেজ অব মেডিসিনের প্রফেসর। ছোট মেয়ে জন্মগ্রহন করেন স্বামী হাসান আলবান্নার শাহাদাতের পর। তার শ্বশুর মেয়ের নাম রাখলেন দিমা ইস্তিশহাদ (শাহাদাতের রক্ত)। কিন্তু নাম রেজিস্ট্রেশান করতে গেলে অফিসার এই নাম দেবেন না বলে দিলেন। অনেক জোরাজুরির পর শুধু ইস্তিশহাদ রেখে দিমা বাদ দিল অফিসার। এই মেয়ে বিজনেস স্টাডীজে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হয়ে ছিলেন। তাকে ‘রজা’ বলেও ডাকা হত। আরেক মেয়ে সাফা ইমাম জীবিত থাকতেই ইন্তেকাল করেছেন। এই বাচ্চাদের উচ্চ শিক্ষায় উন্নিত করতে লাতীফাকে দারুন কষ্ট করতে হয়েছে। অর্থের অভাব, সুযোগের অভাব, হাসান আলবান্নার স্ত্রী হওয়ার চাপ তার জীবন কে খুব সংগ্রামের মুখোমুখি করেছে। কিন্তু এক জান্নাতি রমনীর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ দেখিয়ে তিনি আমাদের জন্য হয়ে রইলেন এক পূত পবিত্র রোল মডেল।

বাচ্চাদের লালন পালনে তার দৃষ্টিভংগি ছিল অনুসরন করার মত। তিনি বাচ্চাদের আদেশ নিষেধের ক্ষেত্রে তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে কনভিন্সড করাটাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতেন। ডঃ সানা বলেনঃ “আমরা বড় হতে যেয়ে কোন রূঢ় আচরনের মুখোমুখি হইনি কখনো, বরং ভালোবাসা, দয়া ও করুনা দ্বারাই আমরা সিক্ত হতাম সব সময়। খুব সুন্দর সুন্দর নামে আম্মা আমাদের ডাকতেন”। তিনি সন্তানদেরকে আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন। সাথে করে আত্মীয় স্বজনদের বাসায় নিয়ে যেতেন, তাদের কেও এনে আদর যত্ন করতেন, ফলে সন্তানদের মধ্যে একটা ‘সবাইকে নিয়ে গড়ে উঠার’ প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে। তিনি প্রতিটি সন্তানের জন্য আলাদা এক ফাইল সংরক্ষন করতেন। প্রতিটি ফাইলে জন্ম নিবন্ধন, মেডিক্যাল হিস্ট্রী, প্রতিটি ক্লাশ উত্তীর্ণের সনদ, নাম্বারপত্র ও রিপোর্ট ইত্যাদি তারিখ সহ সংরক্ষন করে রাখতেন।

তিনি সন্তানদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিতেন। বড় মেয়ে ওয়াফা ছিল তার প্রাইভেট সেক্রেটারি। ঘরগুছানো, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, মেহমানদের সেবা, মা বাবাকে সাহায্য করা এইসবই ছিল রুটিন বাঁধা। সবাইকে সমান ভাবে কাজ বন্টন করে দিতেন। কাজের মেয়েকে কখনো নিজের মেয়ের বাইরে মনে করতেন না। ফলে তার বাসায় কাজ করতে আসার জন্য মেয়েদের লাইন লাগানো ছিল। তাদের জামা কাপড়, থাকার যায়গা, চাল চলন সবগুলোই হত আপন মেয়েদের মতই। ওয়াফাকে তিনি অতিরিক্ত একটা দ্বায়িত্ব দিতেন, তাহলো বাসার কাজের মেয়েদেরকে শিক্ষিত করা। তাদের কে প্রয়োজনীয় সূরা মুখস্ত করানো, ইসলামের অত্যাবশ্যক বিষয় সমূহের জ্ঞান দেয়া, এবং লেখা লেখি করতে শেখান সবই তিনি করাতেন। সমস্ত সন্তানদের তিনি ইখওয়ানের মূলধারার সাথে কাজ করতে বলতেন। ফলে প্রথম থেকেই তারা আন্দোলনের বাইরে থাকা পছন্দ করেনি কেউ।

শুধু হাসান আলবান্নার সহধর্মিনী হওয়ার জন্য না, তিনি বিয়ের আগ থেকেই ছিলেন একজন দা’য়ীয়াহ ইলাল্লাহ। ফলে স্বামীর জীবনের সাথে একাত্ম হতে তার কোন বেগই পেতে হয়নি। বিয়ের কয়েক মাস পরেই ইমাম কায়রোতে চলে এলেন। বাবা মা, আত্মীয় স্বজনের মায়া ছেড়ে লাতীফাও চলে এলেন কায়রোতে। শুরু হল ঘর সংসার গুছানোর পাশাপাশি দ্বীনের দা’ওয়াতের কাজ। হাসান আলবান্না কেই বলা যায় গেল শতাব্দীর প্রথম মুজাদ্দিদ যিনি মহিলাদের কে সঠিক মর্যাদা দিয়ে তাদের ইসলাম প্রচারের সহায়ক শক্তি হিসেবে গন্য করেছেন। তার ‘রিসালাতুল মার’আহ আল মুসলিমাহ’ পুস্তিকায় মহিলাদের কে সাংগঠনিক কাজে লাগিয়ে তাদের দিয়ে মুসলিম সমাজের বিরাট একটা অংশ কে কাজে লাগিয়েছেন। বিশেষ করে বিয়ে করার পর তিনি এই দিকটা আরো সুন্দর করার সুযোগ পেয়েছিলেন। নিজের স্ত্রীকে বানায়ে দিলেন কেন্দ্রীয় দ্বায়িত্বশীলা। ১৯৩৩ সনের ২৬ এপ্রিলেই ইখওয়ানের মহিলা শাখার পয়লা উদ্বোধন হয়। দ্বায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি অনেক সুন্দর ভাবে ইখওয়ানের মহিলা শাখা কে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়ে ছিলেন। সাথে পেয়েছিলেন যায়নাব আলাগাযযালী, লাবীবাহ আহমাদ, ফাতিমাহ আব্দুল হাদী, নাঈমাহ আলহুদায়বি ও আ’মাল আল’আশ্মাওয়ির মত জ্ঞানবতী, শিক্ষিতা এবং আত্মোৎসর্গী কিছু বোন, যাদের ত্যাগ ও কুরবানী এবং দ্বীনের জন্য অত্যাচার সহ্য করার ধরণ দেখে মহিলা সাহাবীদের জীবন চোখের সামনে ভেসে উঠতো।

মুর্শিদে ‘আম এর স্ত্রী হওয়ার কারণে তাকে নিজ দ্বায়িত্বের উপরে আরো অনেক ঝামেলা দেখতে হত। সংগঠনের ভাই বোনদের বিয়ে, সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ের ফায়সালা, কোন অযাচিত অনাকাংক্ষিত ঘটনার সমাধান এই সব তাকেই করতে হত। ডঃ সানা আলবান্না বলেনঃ “আমার আম্মা সব সময় নিজের বা পরিবারের চেয়ে সংগঠনের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন। তার পরেও আমাদের দেখাশুনা করা, সারাদিন পর নানা ব্যস্ততা থেকে ফিরে আসা আব্বার খিদমাৎ করা ইত্যাদীতে কোন সময় তার নির্ধারিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটতোনা। আব্বা যখন কায়রোতে ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় অফিস ভাড়া নিলেন, আম্মার কাছে ঘরের কিছু ফার্নিচার চাইলেন। খুবই সামান্য ফার্নিচার ছিল আমাদের বাসায়, এর পরো আম্মা তার ভাল ভাল জিনিষ গুলো অফিসের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। দেখলাম আমাদের বাসার কার্পেট, কার্টেইন, লাইব্রেরীর নামী দামী বই এবং আলমিরা ও ভাল ভাল চেয়ার একেবারেই উধাও হয়ে গেল। সেদিন আম্মার মন ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ভাল। আমরা তা দেখে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

আম্মার কাছে ইখওয়ানের ভাই বোনদের পারিবারিক ঝামেলা মিটানোর জন্য প্রায় লোক জন আসত। আম্মা তাদেরকে নিজের ছেলে ‘বুনায়্যা’ বা নিজের মেয়ে ‘বুনাইয়্যাতী’ বলে সম্বোধন করতেন। আমি গভীর ভাবে লক্ষ্য করতাম তিনি এক সংগে শাশুড়ী বা মায়ের ভূমিকা পালন করতেন। তার কথায় ও বিচারে সবাই খুশি হয়ে কখনো আনন্দে অশ্রু ঝরিয়ে, কখনো হাসতে হাসতে চলে যেত। আর আম্মা কেমন এক সুন্দর হাসি দিয়ে বলতেনঃ যাক, শয়তান শেষ পর্যন্ত কাবু হয়ে গেল। ওদের সংসারে ভাংগন ধরাতে পারলো না”।

ডঃ সানা’ আরো বলেনঃ “আম্মা ইখওয়ান পরিবারের সুখে দুঃখে সমভাগী থাকতেন। কারো ঘরে কোন আনন্দের কিছু হলে আম্মাও সে সাথে আনন্দিত থাকতেন, কারো ঘরে শোকের মাতম হলে, তা ছড়িয়ে পড়তো আমাদের ঘরেও”।কারো বিপদ হলে প্রথমে স্বামীর কাছে হাত পাততেন, কিছু পেলেন তো ভাল, না পেলে বন্ধুদের বা আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা পয়সা উঠাতেন। ১৯৪৮ সনে যখন ইখওয়ানীদের বিরুদ্ধে ধর পাকড় শুরু হয়ে গেল তিনি সাধ্যমত জেল হাজতে বন্দীদের পরিবারের সাহায্যে পাগলপারা হয়ে যেতেন। ঐ সময় থেকে তিন বেলা খেতেন না তিনি। সকালে সামান্য কিছু মুখে দিতেন। দুপুরে একটা রুটি ও সামান্য কিছু ব্যঞ্জন তিনি খেতেন। রাতে তার পেটে পড়তো বড় এক গ্লাসের সম্পূর্ণ পানিটাই। তার দেখাদেখি সন্তানদের মধ্যেও এলো পরিবর্তন। ইমাম আলবান্না এ দৃশ্য দেখে খুবই খুশী হলেন। তিনি পরিবারের সবার মত নিয়ে তার যৎসামান্য বেতনের একভাগ সংসারে ব্যয় করা শুরু করলেন, একভাগ দিতে লাগলেন দাওয়াতী কাজ চালাতে, বাকী একভাগ বন্টন করতে থাকলেন বিপদে পড়া আত্মীয় স্বজন ও আটকে পড়া ইখওয়ান নেতৃবৃন্দের পরিবার গুলোতে।

আল্লাহর পরীক্ষা লাতীফার ভাগ্যে কম ছিল না। ১৯৪৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী তে হঠাৎ করে ইমাম হাসান আলবান্না কে শহীদ করা হলো। সরকারের দাম্ভিকতা তখন এমন আকারে ছিল যে, এমন মুজাদ্দিদ কে মেরে ফেলতে সরকার কোন রাখঢাক রাখেনি। যে গাড়ী করে আতাতায়ী এসে ইমাম কে গুলি করে মেরেছিল তা ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নামে ভাড়া করা; যে পাষন্ড তাকে মেরেছিলে, কায়রোর রাস্তায় রাস্তায় সে সদম্ভে তা প্রচার করেছে। ইউটিউব লিংক: http://www.youtube.com/watch?v=r39Nz5WKsXI

ইমামের শরীর দিয়ে রক্ত চুয়ে চুয়ে ঝরে পড়ছে। তাকে শেষ বারের জন্য চিকিৎসেবার দাবীতে ইখওয়ান নেতাদের হৃদয় ভাঙ্গা কান্নার জবাবে সরকার একজন ডাক্তার কেও তার রক্ত ঝরা বন্ধ করতে অনুমতি দেয়নি। একজন ডাক্তার জোর করে চিকিৎসা করতে চাইলে তাকেও মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হল। এমন কি ইমাম যখন শাহাদাৎ বরণ করলেন সরকার তার প্রকাশ্য জানাযার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিল। সকালে খুব ভোরে হাসান আলবান্নার আব্বা আহমাদ আসসাআতী ধরলেন লাশের খাটিয়ার একপাশ, আর স্ত্রী লাতীফা ও দুই জন মেয়ে ধরলেন আর দুই পাশ। এভাবে শায়খ আহমাদের ইমামতিতে কয়েকজন মহিলার ইক্তিদায় জানাযার শেষে চিরজনমের মত সমাহিত হলেন শতাব্দীর সবচেয়ে ভালো মানুষ টি। সরকারী ঘোষণায় বলা হলো পরিবারের কেউ হাসান আলবান্নার কবর যিয়ারাত করতে পারবেনা। ওখানে কেউ গেলেই তাকে এরেস্ট করা হবে। লাতীফার জীবনে শুরু হলো এমন এক কষ্টের অধ্যায়, যে অধ্যায় আর কোন মহিলার জীবনে এসেছে বলে মনে করতে পারছিনা।

এতগুলো বাচ্চার লালন পালনের দ্বায়িত্ব, কোথায় পাবেন টাকা কড়ি? কে দেবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে? ইখওয়ানের প্রথম সারির নেতারা জেলে, যারাই এই পরিবার কে স্বেচ্ছায় হেল্প করতে আসে তার মাথার উপর নেমে আসে সরকারের খড়্গ। চাইলেও তাই কোন হেল্প করতে পারেনা কেউ। বৃদ্ধ শশুরকেও কষ্টে রেখে সরকার মরণের মুখোমুখি করে ফেলতে চাইলো। এমন কি পরিবারের সবাইকে গৃহ বন্দী করে রাখলো কয়েক বছর। বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার সময় পুলিশ থাকত পেছনে পেছনে; স্কুলের শিক্ষকদের বলা ছিল ওরা যেন কোন স্বাধীনতা না ভোগ করতে পারে; মাকে বলা হল কোথায় কোথায় তিনি যাবেন তা যেন আগে থেকে বলে সরকারী অনুমতি নেয়া হয়, ফলে তার উপর সরকারী চোখ রাখা সম্ভব হবে। তাদের টেলিফোন লাইন কেটে দেয়া হল; দুনিয়ার কারো সাথে যেন যোগাযোগ করা সম্ভব না হয়।

ইমাম হাসান আলবান্না পরিবার নিয়ে যে ঘরে ভাড়া থাকতেন তা ছিল মোটামুটি ভাবে চলার মত। তিনি ২১৬ ক্বিরশ (দুই গিনী ১৬ পয়সা বাংলাদেশী মুদ্রায় মনে হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা) করে মাসিক ভাড়া দিতেন। শাহাদাতের পর লাতীফা পরিবার নিয়ে ঐ ঘরেই কোন মতে থাকতে লাগলেন। সরকারের চোখে এটাও ছিল আরেক অপরাধ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই মর্মে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হল যে, হাসান আল বান্নার ভাড়া বাড়িটা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম, এখানে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে থাকা খুবই ঝুঁকি পূর্ণ। কাজেই প্রজ্ঞাপন পাওয়ার একসপ্তাহের মধ্যেই বাসা ছেড়ে দিতে হবে তাদের। এবং সরকারের বেঁধে দেয়া সীমানার মধ্যেই একটা বাসায় থাকতে হবে। বাধ্য হয়ে ওই এলাকায় বাসা খুঁজতে লাগলেন লাতীফা। সে সময়ের সব চেয়ে কম দামে একটা বাসা তিনি পেলেন যার ভাড়া ছিল দশ গিনী। আগের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি ভাড়া গুণতে হেব তাকে। কোন আয় নেই, দেখার মত কোন লোক নেই এমন এক পরিবারের জন্য এটা যে কত বড় বিপদ তা আল্লাহ ছাড়া কেউ সেদিন বুঝতে পারেন নি। আর পারেননি বলেই আল্লাহ এই পরিবার কে শেষ হতে দেননি মনে হয়। লাতীফা নিজকে মোমবাতির মত জ্বলে জ্বলে সন্তানদের আলোকিত করতে লাগলেন। প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজ তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। ফলে কিছু কিছু কাজ তাকে গোপনেই করতে হত।

রাজতন্ত্রের শেষ শিখাটি নিভে যাওয়ার পরে বিপ্লবী সরকারের হাতেও ইখওয়ান মার খেতে শুরু করলো। যে জামাল আব্দুন নাসের কে ইখওয়ান ভালো মনে করে রাজার বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে সাহায্য করেছিল, এখন তারই হাত ইখওয়ানের রক্তে রঞ্জিত হতে লাগলো। তদকালীন মুরশিদে ‘আম আব্দুল কাদির আওদার ভাই ডঃ আব্দুল মালিক আওদাহ কে জামাল সরকার ফাঁসি দেয়। আব্দুল কাদির ভায়ের শেষ ইচ্ছাটাকে লাতীফার কাছে একটা চিঠির মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। সেখানে লেখা ছিলঃ মুহতারামাহ, ডঃ আব্দুল মালিকের শেষ ইচ্ছা ছিল তাকে যেন ইমাম হাসান আলবান্নার পাশে কবরস্ত করা হয়। আমার অনুরোধ তার শেষ ইচ্ছাটা আপনি পূরণ করেন”। লাতীফাহ জানতেন এতে তার পরিবারে আবার কত বড় বিপদ আসতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি স্বামীর কবরের পাশে ডঃ আব্দুল মালিকের লাশ দাফন করার অনুমতি দেন। এর জন্য তার উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার।

এর মধ্যে ছেলে মেয়েদের মানুষ করতে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন। ছেলে আহমাদ আইনে উচ্চ শিক্ষা নিলেন। হয়ত আশা করছিলেন ছেলের হাতে সংসার তুলে দিয়ে তিনি একবারে দুনিয়ার দ্বায়িত্ব মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদাতে নিরত হবেন। কিন্তু জীবন সায়াহ্নের সেই আশাটাও তার মরীচীকার মত হারায়ে গেল। আহমাদ ১৯৪৬ সাল থেকেই ইখওয়ানের সাথে জড়িত। ইউটিউব লিংক: http://www.youtube.com/watch?v=mX2zWc2AsZ4&feature=related

আব্বা শহীদ হওয়ার পর থেকে অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্যেও তিনি সংগঠনের বড় বড় দ্বায়িত্ব পালন করেছে। যার ফলোশ্রুতিতে ১৯৬৫ সালে সরকার তাকে বিনা কারনে আটক করে। বৃদ্ধ মা লাতীফার তখন খুব খারাপ অবস্থা। দেখার মত তার পাশে কেউ ছিল না। মানবিক কারন দেখিয়ে তিনি সরকারের কাছে ছেলেকে মুক্ত করে দেয়ার আবেদন করেন। এদিকে আহমাদ সায়ফের বিরুদ্ধে সরকার কোন মামলা দায়ের করতে পারেনি। ফলে মায়ের মানবিক সাহায্যের খাতিরে তাকে জেল থেকে মুক্ত করে দেয়া হয় বটে কিন্তু তাকে গৃহবন্দী হিসাবে রাখা হয়। এর পরে আসতে থাকে একের পর এক বিপদ। তিনিও ধর্যের পারাকাষ্ঠা দেখাতে থাকলেন। জামাল সরকারের সমস্ত রাগ ছিল হাসান আলবান্নার সাথে সম্পর্ক যুক্ত সবার উপর। ফলে তার পরিবারের উপর অত্যাচারের সাথে সাথে লাতীফার পরিবারেও হাত তুললো সরকার। তার ছেলে মেয়েদের মত আপন ভাই বোনদের কেও সরকার আটক করলো বিনা অপরাধে। বহুদিন থেকে অসুখে ভুগছিলেন তিনি। এর মধ্যে ছেলেকে আটক করার জন্য সরকার মরিয়া হয়ে পড়েছে। কারন ইখওয়ানের মধ্যে তার গ্রহনযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বি। আর সাধারণের মাঝে তার জনপ্রিয়তা ছিল খুবই ঈর্ষণীয়। তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিশর আইনজীবি সমিতি। তার জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে সরকার তার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া শুরু করে দেয়। এই অবস্থায় হয়ত শোকের ব্যথা সইতে না পেরে অথবা আল্লাহ আরেক শোক থেকে রক্ষা করতে তাকে ১৯৬৮ সালেই তাঁর কাছে উঠিয়ে নিলেন। প্রায় অর্ধ শতাব্দি ধরে লাতীফা আলসূলী (র) ইসলামের পথে খিদমাত করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি শেষ অসিয়্যাতে ছেলে আহমাদ কে মরণের পর স্বামীর পায়ের কাছে কবরস্ত করার অনুরোধ করে যান। তার শেষ আশা পূরণ করতে দ্বিধা করেননি একমাত্র ছেলে আহমাদ। তবে যেদিন তিনি কবরস্ত হন তার ক’দিনের মধ্যেই আহমাদ কে সরকার জেলে পুরে, এবং এক কল্পিত অপরাধে তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়।

আরো বিস্তারিত জানতে পড়ুন:

১। মাহমুদ আব্দুল হালিম, আহদাস সানা'আত আলতারীখ
২। যায়নাব আবূ গানীমাহ, হাসান আলবান্না: মিনাল মীলাদ ইলাল ইসতিশহাদ
৩। মুহাম্মাদ আব্দুল হাকীম খায়াল, আখাওয়াত মুসলিমা্ত
৪। আববাস সীসী, ক্বাফিলাতুল ইখওয়ানিল মুসলিমিন
৫। মুহাম্মাদ আলসারাওয়ী, আলইখওয়ান আলমুসলিমূন: মিহনাহ ১৯৬৫


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -ড. মোঃ আব্দুস্ সালাম আযাদী

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes