সূরা 'আবাসা ১ থেকে ১৬ আয়াত

Print
Category: ওহীর আলো
Published Date Written by আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

সূরা ‘আবাসা
মক্কায় অবতীর্ণ- পবিত্র কুরআনের সূরার ক্রমিক নং- ৮০।


শানে নযুল ও সংক্ষিপ্ত আলোচ্য বিষয়ঃ এই সূরার প্রথম আয়াতে ‘আবাসা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং এই শব্দটিকেই এই সূরার নাম হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীসের গবেষকগণ এই সূরার অবতীর্ণকাল সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, এ সূরা মক্কায় দাওয়াতী কাজের সূচনা লগ্নে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভ করার পরে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালিত করার জন্য তখন তিনি মানুষের ভেতরে দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন। তাঁর দাওয়াতে বেশ কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলো। কিন্তু যাঁরা ইসলাম কবুল করলেন, তাদের মধ্যে হাতে গোনা সমাজের প্রভাবশালী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব দু'একজন ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সমাজের সাধারণ শ্রেণীই ছিল সর্বাধিক এবং সমাজে তাদের তেমন কোন প্রভাব ছিল না।


এ কথা সর্বজন বিদিত যে, যে সমাজে আল্লাহর রাসূল ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সে সমাজ ও পরিবেশ ছিল ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা কোনক্রমেই ইসলামী আদর্শ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সুতরাং ইসলামের বিপরীতমুখী সে সমাজের সাধারণ মানুষদের মধ্যে যারাই ইসলাম কবুল করেছিল, প্রথম দিকে তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার হলো। সে সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তির ধারণা ছিল, ইসলাম তেমন একটা প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে না এবং অচিরেই তা হারিয়ে যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি যখন তাদের চিন্তার বিপরীত দেখলো, তখন তারা ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপরে শারীরিক নির্যাতন শুরু করলো। তৎকালীন সমাজের নেতৃবৃন্দ তাদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে লাগলো।


অনুসারীগণ নির্যাতিত হচ্ছে দেখে রাহমাতুল্লিল আলামীন অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়লেন। ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং অনুসারীদের নিরাপত্তা দেয়া এ দুটো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে তিনি প্রচেষ্টা শুরু করলেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি চিন্তা করলেন, সমাজের প্রভাবশালী লোকজন ইসলাম কবুল করলে গোটা সমাজে এর বিরাট প্রভাব পড়বে এবং এ কারণে ইসলাম যেমন দ্রুত প্রসার লাভ করবে তেমনি যারা ইসলাম গ্রহণ করছে তারা নিরাপত্তা লাভ করবে। এই লক্ষ্য অর্জনের আশায় আল্লাহর রাসূল তৎকালীন সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। মনে বড় আশা যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করতো, তাহলে আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার পথ সুগম হতো।
আল্লাহর রাসূল এই আশায় কুরাইশ নেতা আবু জেহেল, রাবিয়ার দুই পুত্র উতবা, শাইবা, উমাইয়া ইবনে খালফ, ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা এবং আল্লাহর রাসূলের আপন চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব প্রমুখ নেতৃবৃন্দের কাছে এক মজলিসে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে গিয়ে এদের সাথে গভীর মনোনিবেশ সহকারে কথা বলছিলেন। তাঁর মনে বড় আশা, এসব নেতৃবৃন্দ ইসলাম কবুল করলে বর্তমানে মক্কায় ইসলামের যে দুর্দিন অতিবাহত হচ্ছে, যে কঠিন অবস্থার মোকাবেলা তাঁকে ও ইসলাম গ্রহণকারীদের করতে হচ্ছে, এই চরম অবস্থার অবসান ঘটবে। দ্বীনি আন্দোলনকে তার মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছানোর জন্য বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে এই বাতিল নেতৃবৃন্দ তাদের ধন-সম্পদ এবং সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, শক্তি-ক্ষমতা ও দাপট দিয়ে দ্বীনি আন্দোলনের গতি পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, প্রবল বাধা সৃষ্টি করে সমাজের সাধারণ জনগণকে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নিমজ্জিত রেখেছে, অপরদিকে এমন ধরনের ষড়যন্ত্রের জাল তারা বিছিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলামী আদর্শ যেন কোনক্রমেই তার স্বরূপে বিকশিত হতে না পারে।


কোন মানুষের পক্ষে ইসলাম সম্পর্কে প্রকাশে বা গোপনে ইসলামের কথা বলার সুযোগ না হয়, ইসলামের প্রচার ও প্রসারের গতি যেন রুদ্ধ হয়ে পড়ে। মক্কার ইসলাম বিরোধী এসব নেতৃবৃন্দ মক্কার বাইরে প্রভাব বিস্তার করে তাদের পরিচিতজন, আত্মীয়-স্বজন এবং ঘনিষ্ঠজনেদরকে সতর্ক দিয়েছিল, তারা যেন কোনক্রমেই দ্বীনি আন্দোলনের সংস্পর্শে না আসে আর এ ব্যাপারে তারা গোত্রীয় সংহতিকে ব্যবহার করেছিল। কারণ তৎকালীন আরবে গোত্রীয় বন্ধন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সত্য হোক আর মিথ্যা হোক, ন্যায় হোক আর অন্যায় হোক, বিষয়টি স্বগোত্রের হলে যে কোন মূল্যে বা যে কোন অবস্থায় তার প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা দিতেই হবে আর এটাই ছিল আরব সমাজের অন্যতম নীতি।


এই প্রতিকুল পরিস্থিতিতে আল্লাহর রাসূল মক্কার নেতৃবৃন্দকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, তিনি অত্যন্ত আগ্রহ ও ব্যগ্রতা সহকারে তাদের সামনে ইসলামের সুমহান আদর্শ উপস্থাপন করছিলেন। ঠিক সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একজন দরিদ্র ও অন্ধ ব্যক্তি রাসূলের ব্যস্ততা ও ব্যগ্রতার মাঝেই অত্যন্ত আন্তরিকতা ও আগ্রহের সাথে নিজের অন্তরের অবস্থা প্রকাশ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যে জ্ঞান দান করেছেন তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিন।'


বর্তমান মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল কোন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন এবং তিনি কতটা ব্যস্ত আর এই ব্যস্ততাও তাঁর নিজের কোন স্বার্থে নয় এসব কথা যে ঐ অন্ধ ব্যক্তির একেবারে অজানা ছিল, তা নয়। অবস্থায় রাসূলকে বার বার ডেকে কিছু বলতে চাওয়ায় রাসূলের বাক্যালাপে বাধার সৃষ্টি হচ্ছিলো। কথার মাঝে কথা বলায় তাঁর কথার ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলো এবং তাঁর কথার গুরুত্ব ও গাম্ভীর্যতা হালকা হয়ে যাচ্ছিলো। এ জন্য আল্লাহর রাসূল অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তাঁর মনের এই অসন্তুষ্টি তাঁর পবিত্র চেহারা মোবারকে রেখাপাত করেছিল-স্বভাবতই সে দৃশ্য সেই অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর হয়নি, কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মনের ও চেহারার অবস্থা দেখলেন।


ইতিহাসে সেই অন্ধ ও দরিদ্র ব্যক্তির এভাবে পরিচিতি দেয়া হয়েছে যে, তিনি ইবনে উম্মে মাকতুম নামে পরিচিত ছিলেন। সাবিকুনাল আউয়ালিন অর্থাৎ প্রথমে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। নবুওয়াতের প্রথম যুগেই তিনি ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছিলেন। বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমের প্রকৃত নাম ছিল আমর অথবা আব্দুল্লাহ অথবা হাছিন। কিন্তু তিনি আপন মায়ের উপাধি সংযোগে ইবনে উম্মে মাকতুম নামেই পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল কায়েস ইবনে যায়েদাহ্ এবং মায়ের নাম ছিল আতিকা। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরার আপন মামা ছিলেন। এই সম্পর্কে হযরত উম্মে মাকতুম ছিলেন হযরত খাদিজাতুল কুবরার আপন মামাত ভাই। আবার কোন বর্ণনায় দেখা যায় যে, তিনি ছিলেন হযরত খাদিজাতুল কুবরার ফুফাত ভাই। যাই হোক, তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূলের পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। আল্লাহর রাসূলের এই অন্ধ সাহাবী সূরা আবাসা অবতীর্ণ হবার পূর্বে না পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ বিরাজমান। তবে সমস্ত ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, তিনি সাবিকুনাল আউয়ালিন তথা প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন-এতে কোন দ্বিমত নেই।


তবে সূরা আবাসা অবতীর্ণ হবার পূর্বে অথবা পরে যখনই তিনি ইসলাম কবুল করুন না কেন, যে প্রেক্ষাপটে তিনি সূরা আবাসা অবতীর্ণ হয়েছে, সে সময়ে যে তাঁর মন ইসলামের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট ছিল এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোন অবকাশ নেই। কারণ তাঁর মন ইসলামী আদর্শের জন্য এতটাই ব্যগ্র হয়েছিল যে, তিনি রাসূলের চরম ব্যস্ততা উপেক্ষা করে বারবার তাঁকে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করছিলেন। ইতিহাসের যেসব সূত্রে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তার কোনটিতে বলা হয়েছে এই সময়ে তিনি ইসলামের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে দরবারের রেসালাতে আগমন করেছিলেন। তিরমিজী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে হযরত উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেন, হযরত উম্মে মাকতুম এসে আল্লাহর রাসূলকে বলেছিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহি আরশিদ্নি' অর্থাৎ হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সত্য ও সঠিক পথ দেখিয়ে দিন।


ইবনে জারীর উল্লেখ করেছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন-তিনি রাসূলের কাছে কুরআনের একটি আয়াতের মর্ম জানতে এসে বলেছিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহি আল্লামানি মিম্মা আল্লামাকাল্লাহ্' অর্থাৎ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যে জ্ঞান দিয়েছেন তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিন।' সুতরাং গবেষকদের এসব বর্ণনা থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ সময়ে ইবনে মাকতুম তাওহীদ, রেসালাত ও আখিরাতের প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই সত্য পথ লাভের একমাত্র মাধ্যম বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি এ সময়ে পার্থিব কোন স্বার্থের কারণে এসে আল্লাহর রাসূলের ব্যস্ততার মাঝেই কথা বলে রাসূলের কথার ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন করেননি, বরং তিনি হেদায়াত লাভ ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই এমনটি করেছিলেন। আর এ সময়ে রাসূল যাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করছিলেন, ইতিহাসে তাদের নামের যে তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে করে দেখা যায় যে, তাদের মধ্যে একমাত্র রাসূলের আপন চাচা ব্যতীত অন্য সকলেই ছিল ইসলামী আন্দোলনের মারাত্মক শত্রু।


এ কথাও ইতিহাস থেকে জানা যাচ্ছে যে, এই ঘটনা যে সময়ে সংঘটিত হয়েছিল, সে সময় পর্যন্ত ইসলামের ঐসব শত্রুদের সাথে আল্লাহর রাসূলের সম্পর্কের তেমন অবনতি ঘটেনি, যতটা অবনতি ঘটলে তাদের সাথে সামাজিক মেলমেশার পথরুদ্ধ হয়ে যায়। ইতিহাসের এসব দিক সামনে রাখলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই সূরা ইসলামী আন্দোলনের শিশু অবস্থায় এবং মক্কায় প্রাথমিক দিকে অবতীর্ণ হয়েছিল, এতে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না।


এ সূরা যেভাবে শুরু হয়েছে তা পাঠ করলে যেন মনে হয়, একজন দরিদ্র ও জন্মান্ধ কিন্তু সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তির তুলনায় আল্লাহর রাসূল তৎকালীন সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, এটা স্বয়ং আল্লাহর অপছন্দ হলো এবং তিনি এ কারণে তাঁর রাসূলকে সাবধান করছেন। কিন্তু প্রকৃত বিষয় শুধু এটা নয়, মহান আল্লাহর কাছে এবং তাঁর ফেরেশ্তাদের কাছে কোন শ্রেণীর মানুষের সম্মান ও মর্যাদা সর্বাধিক, ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র কোন শ্রেণীর নাগরিকদেরকে অধিক সম্মান ও মর্যদা প্রদান করবে, এই বিষয়টিই আলোচ্য সূরায় মানব জাতিকে অবগত করা হয়েছে।


মানুষদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হলেন আল্লাহর নবী ও রাসূলগণ। আবার নবী রাসূলদের মধ্যে মহান আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হলেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।


তাঁকে মহান আল্লাহ তা‘আলা এত অধিক সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন যে, অন্য কোন নবীর যেখানে পৌঁছানোর সৌভাগ্য হয়নি অর্থাৎ আল্লাহর আরশে সেখানে তাঁকে ডেকে নিয়ে সম্মানীত করা হয়েছে। সেখানে কোন ধরনের মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলেছেন। সমস্ত নবী-রাসূলদেরকে নাম ধরে আহ্বান করা হয়েছে, কিন্তু তাঁকে কখনো ‘হে মুহাম্মাদ' বলে আহ্বান করা হয়নি বরং আহ্বান করা হয়েছে, নবী, রাসূল বা অন্যান্য গুণবাচক শব্দের মাধ্যমে। কদাচিৎ তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর কোন অপছন্দনীয় কাজ সংঘটিত হলে আল্লাহ তাঁকে এভাবে ধমক দিয়ে বলেননি যে, ‘কেন তুমি এ কাজ করলে?' বরং বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন, কেন তুমি এমনটি করলে?'


যেমন সূরা তওবার ৪৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু সংখ্যক মানুষ তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার জন্য অজুহাত পেশ করলো আর আল্লাহর রাসূল তা মেনে নিয়ে তাদেরকে অব্যাহতি দিলেন। বিষয়টি আল্লাহ পছন্দ করলেন না এবং সাথে সাথে তাঁর প্রিয় রাসূলকে ধমকও দিলেন না, যেমন করে কোন মনিব তার অধিনস্থকে ধমক দেয়। রাসূলের কাছে কৈফিয়তও চাইলেন না, বরং মমতা আর পরম স্নেহবিজড়িত ভাষায় বললেন, ‘আ‘ফাল্লা-হু ‘আনকা’ অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, কেন আপনি তাদেরকে অব্যাহতি দিলেন?


অর্থাৎ এমন ভদ্রোচিত ভঙ্গিতে করুণা বিগলিত শব্দসমূহের মাধ্যমে তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর অপছন্দনীয় বিষয়টি অবগত করলেন, যে কোন পাঠকই তা পাঠ করার সাথে সাথেই অনুভব করতে সক্ষম হবে যে, রাসূলের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ রাসূলের জানার পূর্বেই ক্ষমা করে দিয়ে তারপর তাঁকে অবগত করা হচ্ছে যে, আপনার দ্বারা যে কাজটি সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল আমার অপছন্দনীয়। ঠিক আলোচ্য সূরাটির শুরুটাও সেই ভঙ্গিতেই উপস্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সে ভ্রুকুঞ্চিত করলো, মুখ ফিরিয়ে নিলো। কারণ তাঁর সামনে একজন অন্ধ ব্যক্তি এসে হাজির হলো।’


অর্থাৎ কথাটি এমনভাবে পরিবেশিত হয়নি যে, নবী লোকটিকে দেখে ভ্রুকুঞ্চিত করলো এবং অনাগ্রহের সাথে মুখ ফিরিয়ে নিলো।' এভাবে যদি বলা হতো তাহলে সরাসরি নবীকে অভিযুক্ত করে সম্বোধন করা হতো। কিন্তু তা না করে তৃতীয় ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে যে পদ্ধতিতে বলা হয়, ঠিক তেমনিভাবে বলা হয়েছে। সরাসরি বললে নবীর মনে একটা বেদনা সৃষ্টি হতো পারতো, মহান আল্লাহ এটা পছন্দ করেননি যে, তাঁর নবী অন্তরে বেদনা অনুভব করুক। এ জন্য অসন্তুষ্টি ও তিরস্কারের যাবতীয় ভাষা ও প্রকাশ ভঙ্গি এড়িয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় তাঁর অপছন্দের বিষয়টি নবীর কাছে এভাবে প্রকাশ করেছেন যে, হে নবী! আপনি অবগত রয়েছেন কি, হয়ত সেই অন্ধ ব্যক্তি আপনার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে তা নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করে আমার নৈকট্য লাভ করবে এবং সেটা তার জন্য কল্যাণকর হতো।


যে ব্যক্তি কল্যাণ লাভ করার উদগ্র কামনা নিয়ে আপনার কাছে এলো, অথচ কি আশ্চর্য আপনি তার প্রতি অমনোযোগী রইলেন! যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের কালিমা দূর করে সেখানে মহাসত্যের আলো প্রজ্জ্বলিত করতে চরম আগ্রহী হয়ে আপনার কাছে ছুটে এলো তার দৃষ্টিশক্তি নেই, অথচ সে পথ হাত্ড়ে অতিকষ্টে আপনার কাছে পৌঁছেছিল সত্যের আলোয় আলোকিত হবার উদগ্র কামনা নিয়ে, তার প্রতি আপনি গুরুত্ব না দিয়ে গুরুত্ব দিলেন ঐসব লোকদের প্রতি, যারা ইসলামী আন্দোলনের চরম দুশমন! যারা মুখের ফুঁ দিয়ে আমার দ্বীনের প্রদীপ নির্বাপিত করার লক্ষ্যে সাম্ভাব্য যাবতীয় পথ অনুসন্ধান করে, তাদের প্রতি আপনি আগ্রহ পোষণ করলেন, আর এই লোকগুলোর কারণেই আপনি ঐ লোকটির প্রতি অনাগ্রহী হলেন, যে লোকটি মহাসত্যের পেয়ালা পান করার জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল?


যারা আপনার দাওয়াত কবুল করতে আগ্রহী নয়, দৃষ্টি থাকার পরেও যাদের চোখে মহাসত্য উদ্ভাসিত হয় না, অন্তর যাদের কালিমা লিপ্ত, পৃথিবীর জীবনকেই যারা একমাত্র সত্য বলে বিবেচনা করে, যাদের কাছে পবিত্রতার কোন গুরুত্ব নেই, অপবিত্রতার মধ্যে ডুবে থাকতে যারা আগ্রহী, তারা যদি আপনার আহ্বানে সাড়া না দেয়, এতে আপনার ক্ষতি কি? তাদের অপরাধের কারণে তো আপনাকে অভিযুক্ত করা হবে না। আপনার কর্তব্য ছিল মহাসত্য তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া, আপনি আপনার কর্তব্য পালন করেছেন, এখন তাদেরকে সেই অবস্থার ওপরে ছেড়ে দিন, যে অবস্থায় তারা রয়েছে। ঐসব ব্যক্তি ইসলাম কবুল করলে এবং তাদের কারণে ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত হবে, এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ আমার দ্বীন কারো মুখাপেক্ষী নয়, আমি এমন আলো আপনার প্রতি প্রেরণ করেছি, সে আলো নিজের পথ নিজেই করে নেবে। আপনি শুধু আপনার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব আমার নির্দেশিত পথে পালন করে যান। আমার দ্বীনের প্রতি কেউ সমর্থন করুক আর না-ই করুক, এতে আমার দ্বীনের সম্মান ও মর্যাদার কোন হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না।


এ সূরায় ঐ লোকদের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশিত হয়েছে, যারা নিজেদেরকে সমাজ ও দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করে, নিজেদেরকে এলিট শ্রেণী মনে করে। ধন-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত আর প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষদেরকে যারা মানুষ হিসাবে মর্যাদা দেয় না, তাদেরকে যাবতীয় অধিকার বঞ্চিত বলে ধারণা করে, অহঙ্কারের আবরণে যাদের দৃষ্টি অন্ধ, সত্য যাদের দৃষ্টিগোচর হয় না, এসব লোকদের প্রতি চরম ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ এই শ্রেণীর লোকেরাই সমাজ-দেশে তাদের কামনার সাথে সামঞ্জস্যশীল সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রসার ঘটায় এবং মহাসত্যের প্রচার-প্রসারে বাধার সৃষ্টি করে। এ কথা চিরসত্য যে, সমাজের উঁচু শ্রেণীর লোকজন যে আদর্শ অনুসরণ করে, সমাজের নীচু শ্রেণীর মধ্যে তা এমনিতেই প্রসার লাভ করে থাকে। আর জন্যই যারা নতুন কোন আদর্শ প্রচার করে, তারা এ প্রচেষ্টা চালায় যে, সমাজের প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী লোকজন এই নতুন আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হোক, তাহলে এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।


আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তৎকালীন সমাজের উঁচু শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে চিন্তা করতেন, ঐ লোকগুলো যদি কুরআন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হতো, তাহলে আল্লাহর দ্বীন অতি সহজেই বিজয়ী হতো। ইসলাম প্রচারের শুরুতে তিনি যে কর্ম পদ্ধতি অনুসরণ করতেন, তার সবটুকুই নিবেদিত ছিল আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। এর ভেতরে এমন কোন দিক ছিল না, যার মাধ্যমে সমাজের সাধারণ শ্রেণীর লোকদের প্রতি সামান্যতম অবহেলা প্রদর্শন করা হতো। তবুও আন্দোলনের শুরুতে কর্মনীতি ও পদ্ধতির মধ্যে যেটুকু দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল, সেই দুর্বলতার প্রতি এই সূরায় অঙ্গুলী সংকেত করে তা দূর করা হয়েছে। সমাজের উঁচু শ্রেণীর লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হচ্ছিলো, যেখানে ব্যক্তি স্বার্থের নাম-গন্ধও ছিল না, সেখানে একজন দরিদ্র আর অন্ধ লোকের প্রতি অমনোযোগ প্রকাশ পেলো, এটাও দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত করে তা দূর করে দেয়া হলো।


কারণ এ কথা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়া হলো, মহান আল্লাহর কাছে ঐ ব্যক্তিই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে ব্যক্তি সত্যানুসন্ধিৎসু এবং মহাসত্যের আদর্শ অনুসারে নিজের জীবন পরিচালিত করে। সে ব্যক্তি অন্ধ বা দৃষ্টিমান হোক অথবা ধনী বা গরীব হোক, এতে তার ইসলাম প্রদত্ত মর্যাদার কোন তারতম্য হবে না। দ্বীনি আন্দোলন তাদের কাছেই ইসলামের দাওয়াত পেশ করবে, যারা সত্য গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। হতে পারে সে ব্যক্তি সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন, অক্ষম-দুর্বল, হতদরিদ্র। আর যারা বড় বড় ডিগ্রী অর্জন করেছে, অতুল বৈভবের অধিকারী, অর্থের পাহাড় গড়ে তার উচ্চ শিখরে বসে রয়েছে, সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে যারা অতুলনীয় কিন্তু সত্য বিমুখ, তার প্রতিপালক মহান আল্লাহকে চেনা ও জানার সামান্যতম আগ্রহ অন্তরে নেই, ইসলামকে মৌলবাদ, সেকেলে, মধ্যযুগীয় বলে উপহাস করে, মহান আল্লাহর মাছির একটা তুচ্ছ পাখার যে গুরুত্ব রয়েছে, এসব লোকদের তা নেই। দ্বীনি আন্দোলনের দৃষ্টিতে এসব লোকদের কোনই গুরুত্ব নেই।


আবু জেহেল, রাবিয়ার দুই পুত্র উতবা, শাইবা, উমাইয়া ইবনে খাল্ফ, ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা প্রমুখদের অঢেল ধন-সম্পদ ছিল, কারো দেহে কোন ত্রুটি ছিল না, দৈহিক সৌন্দর্য ছিল, প্রখর দৃষ্টিশক্তি ছিল। সমাজে তারা উঁচু শ্রেণী হিসাবে সম্মান-মর্যাদা ভোগ করতো। তাদের ইশারায় বিশাল বাহিনী যে কোন যুদ্ধ ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সব দিক দিয়েই তারা পূর্ণ ছিল ছিল না কেবল সত্যকে দেখার মতো স্বচ্ছ দৃষ্টিশক্তি আর মহাসত্যকে গ্রহণ করার মতো সত্যানুসন্ধিৎসু মন-মস্তিষ্ক। আর জন্মান্ধ ইবনে মাকতুম! তৎকালীন সমাজের উঁচু শ্রেণীর তুলনায় তাঁর কিছু না থাকলেও এমন সম্পদ তাঁর ছিল, যার মাধ্যমে তিনি মহাসত্য গ্রহণ করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে চিরদিনে জন্য অতুলনীয় সম্মান আর মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন।


ইতিহাস কথা বলে, পারস্যের বাতিল শক্তি যখন ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকী হয়ে দেখা দিল তখন দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পারস্য শক্তিকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী পারস্য সীমান্তে প্রেরণ করলেন। এই বাহিনীতে আল্লাহর রাসূলের জন্মান্ধ সাহাবী হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু শামিল ছিলেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর পতাকা রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে বলেছিলেন, ‘হয় ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখবো আর না হয় শাহাদাত বরণ করবো।’


তিন দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হলো। পারস্যে ইসলামের বিজয় কেতন স্বগৌরবে উড়তে থাকলো। যুদ্ধের ময়দানে শহীদদের লাশ দাফন করার সময় দেখা গেল, ইবনে মাকতুমের দেহ রক্ত রঞ্জিত। ইসলাম বিরোধী শক্তির তরবারীর আঘাতে তার গোটা দেহ ক্ষত-বিক্ষত। শাহাদাতের শারাবান তহুরা তিনি পান করেছেন, দেহ স্পন্দনহীন কিন্তু ইসলামের পতাকা তিনি রক্তাক্ত বুকে আঁক্ড়ে ধরে আছেন। তাওহীদের পতাকা বুকে জড়িয়েই তিনি শাহাদাতের অমীয় সূধা পান করেছেন। মাতৃগর্ভ থেকে এই সুন্দর শ্যামল বসুন্ধরায় তিনি দৃষ্টিশক্তি নিয়ে আসতে পারেননি। সক্ষম হননি তিনি প্রকৃতির অপরূপ মনোমুগ্ধকর হৃদয়গ্রাহী চিত্তাকর্ষক নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করতে। বঞ্চিত ছিলেন তিনি পূর্ণিমার পূর্ণ শশধরের উজ্জ্বল কিরণচ্ছটা দর্শনে। তিমিরাবৃত যামীনির ভ্রমর কৃষ্ণ সূচিভেদ্য আরণ ভেদ করে তরুণ তপন উদিত হয়ে তার কিরণচ্ছটা দুর্বঘাসে পতিত শিশির বিন্দুগুলোকে কিভাবে মুক্তার মতই ঝলমলিয়ে তোলে এ দৃশ্য প্রাণভরে অবলোকন করার পার্থিব সৌভাগ্য যদিও তাঁর হয়নি। কিন্তু তিনি এমন এক আলোর সন্ধান লাভ করেছিলেন, যে আলো তাঁর অন্ধ দৃষ্টিকে পদ্মলোচনে পরিণত করেছিল।


আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অবদান তাঁর হৃদয় পদ্মলোচনের প্রভাময় আলোকচ্ছটা শুভ্র মেঘমালা অতিক্রম করে ঐ দূর নীলিমা ভেদ করে এমন এক জান্নাতী জগতে পৌঁছেছিল, যেখান থেকে তিনি লাভ করেছিলেন মহাসত্যের সন্ধান। পৃথিবীর ক্ষয়িষ্ণু সৌন্দর্য দর্শনে তিনি বঞ্চিত থাকলেও ইসলামের অন্তর্নিহিত অপরূপ চিরস্থায়ী সৌন্দর্য রাশি তিনি প্রাণভরে দর্শন করেছেন। এ কারণেই আল্লাহর পথে প্রাণ দেয়ায় অন্ধত্ব তাঁর জন্য কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। অন্তরের সুতীক্ষ্ম দৃষ্টিশক্তি দিয়ে শাহাদাতের জান্নাতী মাধুরীময় রূপের দ্যুতি তাঁকে জিহাদের উত্তপ্ত ময়দানে পথপ্রদর্শন করেছে। পার্থিব যাবতীয় সমস্যাকে যারা গুরুত্বহীন মনে করে শুধুমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দিয়ে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করা। সুতরাং যেসব অহঙ্ককারী দাম্ভিক ব্যক্তিরা মনে করে যে, দ্বীনি আন্দোলন তাদের সাহায্য-সহযোগিতার ওপরে নির্ভরশীল, এই আন্দোলন তাদের মুখাপেক্ষী, তারা শামিল না হলে বা সাহায্য সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নিলে এই আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়বে, ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে তাদের কাছে সাহায্যের জন্য যাওয়া ইসলামকে অপমান করার শামিল।

 

 

سورة عبس

 

بِسْمِ اللَّـهِ الرَّ‌حْمَـٰنِ الرَّ‌حِيمِ

 

 

 

عَبَسَ وَتَوَلَّىٰ ﴿١﴾ أَن جَاءَهُ الْأَعْمَىٰ ﴿٢﴾ وَمَا يُدْرِ‌يكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّىٰ ﴿٣﴾ أَوْ يَذَّكَّرُ‌ فَتَنفَعَهُ الذِّكْرَ‌ىٰ ﴿٤﴾ أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَىٰ ﴿٥﴾ فَأَنتَ لَهُ تَصَدَّىٰ ﴿٦﴾ وَمَا عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّىٰ ﴿٧﴾ وَأَمَّا مَن جَاءَكَ يَسْعَىٰ ﴿٨﴾ وَهُوَ يَخْشَىٰ ﴿٩﴾ فَأَنتَ عَنْهُ تَلَهَّىٰ ﴿١٠﴾ كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَ‌ةٌ ﴿١١﴾ فَمَن شَاءَ ذَكَرَ‌هُ ﴿١٢﴾ فِي صُحُفٍ مُّكَرَّ‌مَةٍ ﴿١٣﴾ مَّرْ‌فُوعَةٍ مُّطَهَّرَ‌ةٍ ﴿١٤﴾ بِأَيْدِي سَفَرَ‌ةٍ ﴿١٥﴾ كِرَ‌امٍ بَرَ‌رَ‌ةٍ ﴿١٦﴾


বাংলা অনুবাদঃ
পরম করুণাময় আল্লাহ তা‘আলার নামে
(১) সে (নবী) ভ্রুকুঞ্চিত করলো, (বিরক্ত হয়ে) মুখ ফিরিয়ে নিলো, (২) এ জন্যে যে, তাঁর সামনে একজন অন্ধ ব্যক্তি এসে হাজির হলো। (৩) তুমি কি জানতে হয়তো সে ব্যক্তিটি নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতো। (৪) (কিংবা) সে এটা স্মরণ করতো এবং তা তার জন্যে হয়তো উপকারীও (প্রমাণীত) হতো। (৫) (অপরদিকে) যে ব্যক্তিটি (হেদায়াতের প্রতি) বেপরোয়াভাব দেখালো, (৬) তুমি তার প্রতিই (বেশী) মনোযোগ প্রদান করলে! (৭) (অথচ) তোমার ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি যে, তুমি তাকে শুধরে দেবে। (৮) যে ব্যক্তিটি (পরিশুদ্ধির জন্যে) তোমার কাছে দৌড়ে আসলো, (৯) যে ব্যক্তিটি আল্লাহকে ভয় করলো, (১০) তুমি তার থেকেই বিরক্ত হলে! (১১) দেখো, এ (কুরআন) হচ্ছে একটি উপদেশ, (১২) যে চাইবে সেই এটি স্মরণ করবে। (১৩) যা সম্মানিত পুস্তকসমূহে (সংরক্ষিত) আছে, (১৪) উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন ও সমধিক পবিত্র। (১৫) এটি সংরক্ষিত (আছে) মর্যাদাবান লোকদের হাতে, (১৬) (তারা) মহান ও পুত চরিত্র সম্পন্ন।


আয়াতসমূহের ব্যাখ্যাঃ
আলোচ্য সূরার ১ থেকে ১০ নম্বর আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানার জন্য এই সূরার ‘শানে নযুল ও সংক্ষিপ্ত আলোচ্য বিষয়' ভালোভাবে পাঠ করতে হবে। মক্কার ভাগ্য-নির্ধারক বলে যারা নিজেদেরকে মনে করতো এসব নেতৃবৃন্দের কাছে আল্লাহর রাসূল ইসলামের দাওয়াত পেশ করছেন। তাঁর মনে বড় আশা, এসব লোকজন যদি আল্লাহর দ্বীনের পতাকা তলে সমবেত হয়, তাহলে মহাসত্য বিজয়ী হবার পথ সুগম হয়ে যাবে এবং আল্লাহর যমীন র্শিক মুক্ত হবে। সাধারণ মানুষ নিজেদেরকে সমস্ত কিছুর গোলামী থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর গোলামী করবে। এই আশা আল্লাহর রাসূল মনে মনে পোষণ করছেন এবং এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ব্যস্ত রয়েছেন। এমন সময় তাঁর কাছে অন্ধ এবং দরিদ্র ব্যক্তি হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এসে বারবার তাঁর কাছে দ্বীনকে জানার জন্য প্রশ্ন করছেন। এতে করে রাসূলের আলোচনার ধারা ব্যহত হচ্ছে।


এই আগন্তুক যেহেতু রাসূলের সহধর্মিনীর সম্পর্কে ভাই ছিলেন এবং সেই সূত্রে তিনি আল্লাহর রাসূলেরও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হতেন। সেই চরম ব্যস্ততার মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল হয়ত এ কথাও মনে করে থাকতে পারেন যে, তিনি যেহেতু পরিবারের একজন সেহেতু তাঁর প্রশ্নের জবাব পরে দিলেও চলবে। আর উপস্থিত নেতৃবৃন্দ সবাইকে একত্রে পাওয়াও সব সময় সম্ভব হয় না। এখন এদেরকে যখন একত্রে পাওয়া গিয়েছে, অতএব সময়ের সদ্ব্যবহার করে নেয়া উচিত। পরে ঐ ব্যক্তি যা জানতে আগ্রহী, তা তাকে জানানো যাবে। এই চিন্তা করেও আল্লাহর রাসূল সে মুহূর্তে হয়তো তাঁর প্রশ্নের প্রতি মনোযোগ দেননি।


অথবা এমনও হতে পারে যে, সে মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল মনে করেছিলেন, এ সময়ে যে লোকগুলোকে আমি আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি, তাদের মধ্য থেকে একজন লোকও যদি আমার দাওয়াতে ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হয়, তাহলে দাওয়াতী কার্যক্রমে গতি সঞ্চার হবে এবং মক্কার মজলুম মুসলমানরা নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে। আর ইবনে মাকতুম একজন অন্ধ ও দরিদ্র ব্যক্তি, সমাজে তাঁর তেমন কোন প্রভাব-প্রতিপত্তি নেই। তাঁর এই অক্ষমতা আর দুর্বলতার কারণেই তিনি দ্বীনি আন্দোলনে ততটা অবদান রাখতে সক্ষম হবেন না, যতটা এই নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে কোন একজন রাখতে সক্ষম। সুতরাং এ সময়ে ঐ অন্ধ ব্যক্তির তুলনায় এই লোকগুলোর সাথে আলোচনার ধারাবাহিকতা অব্যহত রাখা প্রয়োজন। এই চিন্তা করেও হয়ত তিনি সেই মুহূর্তে ঐ অন্ধ ব্যক্তির প্রশ্নের জবাব দান থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন।


কিন্তু রাসূলের এই আচরণ মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হলো না। সূরা আ'বাসা অবতীর্ণ করে তিনি রাসূলকে জানিয়ে দিলেন, ঐ অন্ধ লোকটির সাথে তাঁর আচরণ গ্রহণীয় নয়। সেই সাথে এ কথাও স্পষ্ট করে দেয়া হলো যে, সাধারণ মানুষ যদি কোন ব্যক্তিকে একেবারে তুচ্ছ মনে করে, আর সে ব্যক্তি সত্যানুসন্ধিৎসু হয়, কুফরীর অন্ধকার পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসার জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে, আল্লাহর বিধান অনুসারে জীবন পরিচালিত করার জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে, সেই ব্যক্তিই যথার্থ মর্যাদাবান। এই ধরনের ব্যক্তিদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। আর যারা নিজেদেরকে সমাজের উঁচুস্তরের লোক বলে ধারণা করে এবং সত্যের প্রতি বিমুখ হয়, এমন ধরনের লোকদের আল্লাহর কাছে কোনই গুরুত্ব নেই। ঐ ব্যক্তিই মহান আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত, যে ব্যক্তি কুরআনের রঙে রঙিন হবার জন্য সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে দু'বাহু বাড়িয়ে এগিয়ে আসে, আল্লাহকে যে ব্যক্তি সর্বাধিক ভয় করে, তার মর্যাদা সবচেয়ে বেশী। মহান আল্লাহ এই বিষয়টি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী মূলনীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন।


ঐ অন্ধ ব্যক্তি রাসূলের কাছ থেকে সে মুহূর্তে তাঁর প্রশ্নের জবাব না পেয়ে বাড়িতে চলে গেলেন। অপরদিকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত জিবরাঈল আলাইহিস্ সালামের মাধ্যমে সূরা আ'বাসা অবতীর্ণ করলেন। জিবারঈল আমীন সূরা আ'বাসা আবৃত্তি করছেন, আল্লাহর রাসূল নীরবে আবৃত্তি শুনছেন। স্বয়ং আল্লাহ তাঁর কুরআন রাসূলের স্মৃতির পাতায় লিপিবদ্ধ করছেন। হযরত জিবরাঈল যখন এই সূরার ১০ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছালেন, তখন দেখা গেলো রাসূলের চেহারা মোবারকে অস্থিরতার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অহী গ্রহণ করেই তিনি দ্রুত চলে গেলেন হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমের বাড়িতে। আল্লাহর নবী তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে এসে নিজের পবিত্র চাদর মোবারক নিজ হাতে বিছিয়ে দিয়ে অত্যন্ত সম্মান আর শ্রদ্ধার সাথে বসালেন।


এভাবে করে তাঁর আসন দরবারে রেসালাতে চিরস্থায়ী হয়ে গেলো। আল্লাহর রাসূল তাঁর এই অন্ধ সাহাবীকে অন্যান্য সাহাবীদেরকে দেখিয়ে বলতেন, ‘এই ব্যক্তিকে তোমরা মারহাবা বলো, কেননা তাঁর কারণেই স্বয়ং আল্লাহ আমাকে উপদেশ দিয়েছেন।' শুধু রাসূলই নয়, রাসূলের গোটা পরিবার এবং অন্যান্য সাহাবীদের কাছে সেই অন্ধ সাহাবীর সম্মান ও মর্যাদা বেড়ে গেলো। রাসূল তাঁকে দেখলেই তাঁর প্রয়োজনের কথা জানতে চাইতেন, তিনি তাঁর প্রয়োজনের কথা বললেই আল্লাহর রাসূল তা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করতেন। তিনি নবীর বাড়িতে এলেই উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা মধু আর লেবু দিয়ে তাঁর মেহমানদারী করতেন। স্বয়ং রাসূল তাঁকে হযরত বিলালের সাথে মুয়াজ্জিনুর রাসূল নির্বাচিত করলেন। রমজান মাসে তাঁরই আযান শুনে লোকজন আহার ত্যাগ করতেন। আল্লাহর রাসূল মদীনার বাইরে গমন করলে মদীনায় তাঁর স্থলে একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করে যেতেন। হযরত ইবনে মাকতুমকে স্বয়ং রাসূল মদীনার বাইরে যাবার সময় নিজের স্থলাভিষিক্ত ও নামাজের ইমাম নিয়োগ করে যেতেন। হাফিজ ইবনে আব্দুল বার বলেন, এভাবে তাঁকে আল্লাহর রাসূল তেরবার তাঁরই প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন। হযরত ওমরের শাসনামলে তাঁর জন্য উপযুক্ত বৃত্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং অন্ধত্বের কারণে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন খাদেম পেয়েছিলেন।


সমাজের অক্ষম, দুর্বল আর গুরুত্বহীন ব্যক্তি যদি সত্য গ্রহণ করার জন্য উন্মুখ হয় এবং সত্য প্রচারকারী যদি তার প্রতি কোন গুরুত্ব দিল না এ কারণে যে, তার মত দুর্বল ব্যক্তি কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হলে আন্দোলনের তেমন লাভ-ক্ষতি নেই। অপরদিকে সমাজের উঁচু তলার ব্যক্তিবর্গ যারা সত্য বিমুখ, তাদের একজনকেও যদি দ্বীনি আন্দোলনে শামিল করা যায় তাহলে আন্দোলনে গতি সঞ্চার হবে এটা মনে করে তার পেছনে অযথা সময় ব্যয় করতে থাকা কোনক্রমেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।


এ সূরার ১১ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলে দেয়া হলো যে, এটা কোনক্রমেই ঠিক নয়। কক্ষণই এমন করা ঠিক নয়। যারা আল্লাহ, রাসূল, পরকাল সমস্ত কিছু ভুলে এই পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে লিপ্ত রয়েছে, মৃত্যুর পরে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির বিষয়টিকে যারা গুরুত্বহীন ও অসম্ভব বলে মনে করে, তাদের প্রতি ঐ লোকগুলোর তুলনায় অধিক গুরুত্ব দেয়া যাবে না, যারা সত্য গ্রহণে ব্যকুল। ইসলাম এমন কোন ঠুনকো আদর্শের নাম নয় যে, যারা তা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়, তাদের দরজায় ভিখারীর মতো দ্বীনি আন্দোলন গিয়ে দন্ডায়মান হবে। আর আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কর্মী যারা অকাতরে আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ বিলিয়ে দিচ্ছে, সময় কোরবান করছে, প্রয়োজনে নিজের প্রিয় প্রাণটাও দিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশী। সুতরাং এসব সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ দুনিয়া পুজারিদের সামনে গিয়ে ইসলামী আদর্শ গ্রহণ করানোর জন্য ধর্ণা দিতে থাকবে, এটাও ঠিক নয়।


বিষয়টি এমনও  নয় যে, তারা ইসলামের দাওয়াত পায়নি। ইসলামের দাওয়াত তারা পেয়েছে। চোখের সামনে কুরআন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আÍনিবেদিত লোকদের সর্বোন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতি দেখছে, অন্য লোকদের তুলনায় দ্বীনি আন্দোলনের লোকদের উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখছে। তারপরও তারা দ্বীনি আন্দোলনের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করছে, পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতিকেই প্রাধান্য দিয়ে তা অনুসরণ করছে।


তারপর ১২ থেকে ১৬ নং আয়াতসমূহে বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কুরআন হচ্ছে একটি উপদেশ এবং যে আগ্রহী হবে, সে ব্যক্তি এই কুরআন থেকে হেদায়াত লাভ করবে। এটা সম্মানিত পুস্তকে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এবং পবিত্র। এটা সংরক্ষিত থাকে মর্যাদাবান লোকদের হাতে এবং সেসব লোক মহান ও পুতঃ চরিত্র সম্পন্ন। এই কুরআন মানুষকে সত্য পথপ্রদর্শন করার জন্য যথেষ্ট। মানুষের জীবনে যা কিছু প্রয়োজন তা এই কিতাবে পরিবেশন করা হয়েছে। এই কিতাবকে বুঝার জন্য সহজ করা হয়েছে। কোন ধরনের বাতুলতা এই কিতাবকে স্পর্শ করতে সক্ষম নয়। সমস্ত দিক থেকে এই কিতাব পবিত্র।

(বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফসীরে সাঈদী-সূরা ফাতিহার ‘আল কুরআন পরিচিতি’ শিরোণাম থেকে ‘মদীনায় অবতীর্ণ সূরা সমূহের বৈশিষ্ট্য’ শিরোণাম পর্যন্ত দেখুন।)


সুতরাং এমন ধরনের একটি মহান কিতাব সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় সত্য পথপ্রদর্শন করার লক্ষ্যে সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকার পরও যারা সত্য গ্রহণ করতে অনাগ্রহী, অবহেলা প্রদর্শন করে, সময় ক্ষেপণ করে, দ্বীনি আন্দোলনের কর্মীদেরকে কথা বলার সময় দিতে গড়িমসি করে, তাদেরকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে কেন বার বার যেতে হবে? প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেছে অথবা কোন কারণে তার নাম দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতির আসন সে দখল করেছে, সরকারের উচ্চপদে আসীন রয়েছে, প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে, এসব কারণে অহঙ্কারে মত্ত হয়ে ইসলামকে ‘অনগ্রসর আদর্শ’ দ্বীনি আন্দোলনকে ‘মৌলবাদীদের দল’ বলে সত্যকে উপেক্ষা করছে, কুরআন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সামান্য একটু সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে এরা মনে করে এদের প্রতি এক বিরাট করুণা করেছি।


মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কিতাবের আদর্শ প্রতিষ্ঠাকামী দল এদের মুখাপেক্ষী নয় বরং তারাই আল্লাহর কিতাবের মুখাপেক্ষী। তারা যদি নিজেদের কল্যাণ কামনা করে, পৃথিবীর বুকে নিজেদের সমাজ ও দেশকে কল্যাণমুখী করতে চায়, নিজেদের সন্তান-সন্তুতি, আত্মীয়-স্বজন সর্বোপরি দেশের জনগণের কল্যাণ কামনা করে, তাদেরকে নিরাপদ দেখতে চায়, সর্বস্তরে শান্তি ও স্বস্তি চায়, পরকালে কল্যাণ চায় তাহলে তারাই ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে দ্বীনি আন্দোলনে শামিল হবে। সুতরাং চোখের সামনে সত্য উদ্ভাসিত হতে দেখেও যারা সত্য গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না, তাদের পেছনে অযথা ছুটাছুটি করে মূল্যবান সময় নষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই। এক ব্যক্তি আল্লাহর কুরআনের আদর্শ গ্রহণ করতে অনিহা প্রকাশ করছে আর দ্বীনি আন্দোলনের লোকজন কুরআনের আদর্শ নিয়ে তার দরজায় করাঘাত করছে। আল্লাহর কুরআন এমন কোন ঠুনকো মর্যাদার জিনিস নয় যে, এভাবে তাকে অপমান করা হবে। সামনে এমন এক সময় আসবে যখন কুরআনের প্রতি অবহেলাকারীর দল সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে, আল্লাহর আযাবে তারা গ্রেফতার হয়ে পড়বে।

(ক্রমশ...)


লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes