জ্ঞানের দৈন্যতা: সীমালংঘনের আরেক হেতু

Print
Category: প্রবন্ধ নিবন্ধ
Published Date Written by আতাউর রহমান সিকদার

জ্ঞানের দৈন্যতা: সীমালংঘনের আরেক হেতু


এ বিশ্বজাহানের ব্যবস্থাপনা, সৃষ্টি রহস্য এবং এর অন্তর্নিহিত কাযকারন একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরই জ্ঞানের অধীন, অন্য কোন সৃষ্টি তার এ জ্ঞানসীমায় প্রবেশ করতে পারেনা। তিনি তার এ সৃষ্টিজগতে কালের আবর্তনসহ যা কিছুই করেন একান্ত অলক্ষে, অগোচরে এবং লুকায়িত থেকেই তা করেন, নিজে মাটিতে নেমে এসে দেখা দিয়ে করেননা। অপরদিকে তিনি মানুষকে প্রদান করেছেন পথ বেছে নেয়ার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। অর্থাত যেমন খুশী তেমন চলার এক অবাধ স্বাধীনতা। ইচ্ছা করলে সে আল্লাহর আনুগত্যের অধীনে জীবনযাপন করতে পারে আবার ইচ্ছা করলে অবাধ্যতার মধ্যেও কাল কাটাতে পারে। বিশ্বব্যবস্থাপনায় আল্লাহর এ নিয়ম এবং জিন ও ইনসান জাতিকে পরীক্ষা করার এ পদ্ধতিই আল্লাহতে অবিশ্বাসী ব্যক্তিদেরকে ভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করেছে। অতঃপর এ ভ্রান্তি, একগুয়েমী এবং হটকারীতা তার আকল ও জ্ঞানের দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে। হয়তো একারনেই সে ভাবে, মানুষ এখানে কোনও অতিপ্রাকৃতিক শক্তির মুখাপেক্ষী নয়। চিন্তা ও কর্মের জগতে সবাই এখানে স্বাধীন এবং কেউ কারোর নিকট জওয়াবদিহী করতেও বাধ্য নয়। সে আরও দেখতে পায় যে, এখানে সবত্র মানুষেরই কর্তৃত্ব, মানুষেরই অবাধ রাজত্ব। যার শক্তি ও ক্ষমতা যত বেশী পৃথিবীকে সে তত বেশী তার মত করে ভোগ করছে, যার সম্পদের আধিক্য রয়েছে সে তার এ সম্পদ দিয়ে আরও সম্পদ কুক্ষিগত করছে কেউ তাকে বাধা দিচ্ছেনা বা দিতে সক্ষম হচ্ছেনা। সে আরও দেথে যে, এখানে একটু শক্তি প্রয়োগ করলে বা কিছু কলা কৌশল অবলম্বন করলেই নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা হাতের মুঠোয় আনা যায়, উচ্চতর কোন অথরিটি বা অতি প্রাকৃতিক কোন শক্তি (Super natural power) তাকে বাধা দিতে আসেনা  কিংবা কোন শাস্তি বিধানও করেনা। 
এসব দেখে সে ভাবে এ পৃথিবীটা পরিচালিত হচ্ছে বস্তুর নিয়মে। বস্তু ভিন্ন এ বিশ্ব চরাচরে দ্বীতিয় কিছু নেই। এ আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটছে তা সবই প্রকৃতির খেয়াল কিংবা খেলা, ভিন্ন কিছু নয়।  এখানে ইশ্বর বা গড, কিংবা আল্লাহ, রাসূল, জান্নাত, জাহান্নাম যার কথা একদল মানুষের মুখ থেকে শোনা যায়, কল্পনাজাত বানানো গল্প মাত্র, আসলে এসবের কোন অস্তিত্ব নেই। শুধু তাই নয়, এটুকু ভেবেই সে বসে থাকেনা, কখনো কখনো আর একধাপ সামনে অগ্রসর হয়ে সে চিন্তা করে, আমি নিজেই কেন ইশ্বরের সে আসনটা দখল করছিনা।

আল্লাহর নাবী ইলিয়াস আলাইহিস সালাম যখন বাল দেবতার পুজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে মানুষকে আহবান জানাতে শুরু করেন তখন সামারিয়ার ইসরাইলী রাজা আখিআব তার মুশরিক স্ত্রীর প্ররোচনায় ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে হ্ত্যা করার পরিকল্পনা আটে। ফলে ইলিয়াস আলাইহিস সালাম সিনাই উপদ্বীপের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন (১ রাজাবলী, ১৭ অধ্যায়, ১-১০ শ্লোক এবং তাফহীমুল কুরআন সূরা আল বাকারা ৬১ আয়াতের তাফসীর)।
এতে আখিআব এর স্বেচ্ছাচারিতা আরও বেড়ে যায় এবং বলতে থাকে যে, এখানে রব বলতে কিছু নেই আর তিনি কোন নাবীও পাঠাননা।
 
ইয়াহইয়া আলাইহিস্ সালাম যখন ইয়াহুদী শাসক হিরোডিয়াসের যুলুম, অত্যাচার ও ব্যাভিচারের প্রতিবাদ জানালেন তখন তাকে প্রথমে কারারুদ্ধ করা হয় অতঃপর হিরোডিয়াস তার প্রেমিকার নির্দেশানুসারে ইয়াহইয়াহ আলাইহিস সালাম এর শিরচ্ছেদ করে এবং কর্তিত মস্তক একটি থালায় করে প্রেমিকাকে উপহার দেয়। (মার্ক, ৬ অধ্যায়, ১৭-২৯ শ্লোক এবং তাফহীমুল কুরআন– সূরা আল বাকারা ৬১ আয়াতের তাফসীর)
আল্লাহর নাবীকে হত্যা করার পরও যখন হিরোডিয়াসকে আল্লাহ সাথে সাথে পাকড়াও করলেননা তখন তার উদ্বত্য আরও বেড়ে গেল এবং দর্পভরে সবাইকে বলতে লাগলো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, রব, পরকাল, হিসাব নিকাশ এসব কুসংস্কার ‌ছাড়া আর কিছু নয়।

এক আল্লাহর উপর ঈমান আনার অপরাধে ফিরআউন তার মহলের প্রধান দাররক্ষীর স্ত্রীকে কারারুদ্ব করে। ইবনু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) তার তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেন:
"মহলের প্রধান দাররক্ষীর স্ত্রী একদা ফিরআউনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ চিরুণীটি তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে যায়। তখন বেখেয়াল তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে-
: কাফিররা ধ্বংস হোক। ফিরআউন কন্যা কথাটি শুনে অবাক হয়ে তাকে সুধাল-
: তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে মান? উত্তরে তিনি বললেন-
: হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং অন্যান্য সকলের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ্।
ফিরআউন কন্যা এতে ক্রোধান্বিত হয়ে দাররক্ষীর স্ত্রীকে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত করে এবং পিতাকে খবর বলে দেয়। ফিরআউন মহিলাটিকে তৎক্ষনাত তলব করে জিজ্ঞেস করলো-
: তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে মান? মহিলা নির্ভীক স্বরে জওয়াব দিলেন-
: হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হচ্ছেন আল্লাহ্। আমি তাঁরই ইবাদাত করি। জওয়াব শুনে ফিরআউন ক্রদ্ধ হয়ে নির্দেশ দিল-
: একে চিৎ করে শুইয়ে তার হাতে পায়ে পেড়েক মার অতঃপর সাপ ছেড়ে দাও এবং এ অবস্থাতেই তাকে রাখ যতক্ষণ না আমাকে সে মাবুদ বলে স্বীকার করে। দিন কয়েক যাবার পর ফিরআউন তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করল-
: এখনো কি তোমার চিন্তার কোন পরিবর্তন হয়নি? মহিলাটি পূর্বের ন্যায়ই তেজোদী্প্ত কন্ঠে ঘোষণা করলেন-
: তোমার, আমার এবং সকলের রব হচ্ছেন আল্লাহ্। ফিরআউন বলল-
: আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখনই তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করছি। মহিলা জওয়াব দিলেন-
: তোমার যা ইচ্ছা তাই কর। ছেলেকে আনা হল এবং মায়ের সামনেই তাকে হ্ত্যা করা হল। ছেলেটির রূহ বের হবার প্রাক্কালে তার মাকে উদ্দেশ্য করে সে বললো-
: মা তুমি তোমার ঈমানের উপর দৃঢ় থাক এবং সন্তুষ্ট হও, কারণ তুমিই হকের পথে আছ। আল্লাহ্ তোমার জন্য অতি বড়ো পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন"। (তাফসীর ইবনু কাসির, পৃ:৫৭৯-৫৮০)

তাফসীরসমূহে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফিরআউন ঈমান আনয়নকারী ঐ মহিলার চোখের সামনে তার সকল সন্তানকে একের পর এক হত্যা করে। সবশেষে মহিলাটিকেও হত্যা করা হয়। এত বড় পাপ কর্মের পরও যখন ফিরআউনের কিছুই হলনা তখন তার উদ্ধত্য, অহংকার দ্বিগুণ বেড়ে গেল।

শুধুমাত্র আল্লাহর উপর ঈমান আনার অপরাধে ফিরআউন তার স্ত্রী আছিয়া (আলাইহাস সালাম) কে কষ্টের পর কষ্ট, নির্যাতনের পর নির্যাতন করে শহীদ করে দেয়। তাফসীর সমূহে বর্ণিত হয়েছে: “ফিরআউন তার লোকজনকে বললো: সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোজ করে নিয়ে আস। তাকে চিৎ করে শুইয়ে দাও এবং জিজ্ঞেস কর: তুমি কি তোমার এ আকিদা হতে বিরত হতে রাজী? যদি বিরত হয় তাহলে ভাল কথা। সে আমার স্ত্রী। তাকে মযাদা সহকারে আমার নিকট ফিরিয়ে আনবে। আর যদি বিরত না হয় তাহলে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে। আছিয়া (আলাইহাস সালাম) এর হাত পা বেঁধে তাকে চিৎ করে শোয়ানো হল, ফিরআউনকে রব স্বীকার করানোর হাজারো চেষ্টা করা হলো কিন্তু তিনি তার ঈমান থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্যুত হলেননা। লোকেরা পাথর এনে তার উপর নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলো, এসময় আছিয়া (আলাইহাস্ সালাম) আকাশের দিকে চাইলেন এবং বললেন: হে আমার রব, আমার জন্য তোমার নিকট জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দাও। আমাকে ফিরআউন ও তার কর্ম থেকে রক্ষা কর এবং যালিম কাওমের হাত থেকে বাঁচাও (আত্-তাহরীম: ১১)। আল্লাহ্ আছিয়া (আলাইহাস্ সালাম)-এর দোয়া কবূল করলেন, জান্নাত তাকে দেখানো হল। ঐ সময়েই তার রূহ বেরিয়ে যায়” (তাফসীর ইবনু কাসির ৫৭৮-৫৮০) (তাফসীর আল জালালাইন, আরবী পৃ: ৫৬১)।
এখানেই শেষ নয়, যাদু প্রদর্শনী করতে গিয়ে অদৃশ্য এক শক্তির অস্তিত্ব যখন যাদুকররা অনুভব করল, তাদের সামনে যখন এ সত্য দীবালোকের মত উদ্ভাসিত হয়ে উঠল যে, মূসা (আ:) কোন যাদুকর নন বরং আল্লাহর প্রেরিত নাবী তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল। এ অবস্থা দর্শনে ফিরআউন রাগে, আক্রোশে ফেটে পড়লো, বললো: “আমার অনুমতি দেবার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয়ই এটা কোন গোপন চক্রান্ত ছিল। তোমরা এ রাজধানীতে বসে এ চক্রান্ত এঁটেছো এর মালিকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে। বেশ এখন এর পরিণাম তোমরা জানতে পারবে। তোমাদের হাত, পা আমি কেটে ফেলব বিপরীত দিক থেকে অতঃপর তোমাদের সবাইকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করবো” (সূরা আল আরাফ ১২৩-১২৪)।
ফিরআউন তাই করল। যাদুকরদের হাত পা কেটে অতঃপর তাদেরকে হত্যা করা হল। বহাল তবিয়তে এত কিছু সমাপ্ত করার পরও যখন কোন শাস্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর এলোনা। তখন সে তার পারিষদকে লক্ষ্য করে বললো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, মূসা যে রবের কথা বলে আসলেই তার কোন অস্তিত্ব নেই। যদি থাকতো তাহলে সে এ নওমুসলিম যাদুকরদেরকে রক্ষা করতো না? কিংবা আমাকে পাকড়াও করা হতো না?

এভাবে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি কালে আপন আপন প্রভুত্ব ও দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে মানুষ সীমালংঘন করেছে, আবার কখনোবা তাদের ভ্রান্ত চিন্তা ও দর্শন তাদেরকে প্রকৃত সত্য অনুধাবনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছে। ইতিহাস স্বাক্ষী, শেষ নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারীদের সাথেও একই আচরণ করা হয়েছে যেমনটা করা হয়েছে তার পূর্ববর্তীদের সাথে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ওহী নাযিলের পর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বামীকে নিয়ে গেলেন তাওরাতের বিশিষ্ট আলিম ওয়ারাকা ইবনু নাওফিলের কাছে। সব শুনে ওয়ারাকা বললেন: “ইনিতো সেই নামুস (অহী বহনকারী মালাইকা); যাকে আল্লাহ্ মূসার (আ:) নিকট পাঠাতেন। হায়! যদি আমি আপনার নবুয়াতের যামানায় শক্ত সামর্থ্য যুবক থাকতাম। হায়! যদি আমি তখন জীবিত থাকতাম যখন আপনার কাওম আপনাকে বের করে দেবে। অবাক হয়ে রাসূল সা: বললেন: এরা কি আমাকে বের করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন: হ্যা, কখনোই এমনটি হয়নি যে, যা নিয়ে আপনি এসেছেন অন্যরাও তা নিয়ে এসেছে আর তাদের সাথে শত্রুতা করা হয়নি। আমি যদি আপনার সেই সময়টাতে বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই আপনাকে সকল শক্তি দিয়ে সাহায্য করব” (বুখারী, মুসলিম)।

নবুয়াতের দায়িত্ব পালনার্থে এক আল্লাহর দিকে যখন তিনি মানুষকে আহবান জানানো শুরু করলেন, তখন এ ভ্রান্ত চিন্তার অনুসারী মানুষগুলো বলা শুরু করল যে, আমাদের মত মানুষ আবার নাবী হয় কি করে: “তারা বলে, এ কেমন রাসূল, যে খাবার খায় এবং হাটে বাজারে ঘুরে বেড়ায়? তার সাথে তো একজন মালাইকা থাকা প্রয়োজন ছিল যে কিনা তাকে অস্বীকারকারীদের ভয় দেখাতে পারতো” (সূরা আল-ফুরকান: ৭)।


وَقَالَ الْمَلَأُ مِن قَوْمِهِ الَّذِينَ كَفَرُ‌وا وَكَذَّبُوا بِلِقَاءِ الْآخِرَ‌ةِ وَأَتْرَ‌فْنَاهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا مَا هَـٰذَا إِلَّا بَشَرٌ‌ مِّثْلُكُمْ يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُونَ مِنْهُ وَيَشْرَ‌بُ مِمَّا تَشْرَ‌بُونَ ﴿٣٣﴾

“তার কাওমের সরদার ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা যারা আখিরাতকে অস্বীকার করতো এবং যাদেরকে আমি ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দান করেছিলাম, বললো: এ ব্যক্তি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়, তোমরা যা কিছু খাও তাই সে খায়, তোমরা যা কিছু পান কর তাই সে পান করে” (সূরা আল-মু’মিনূন: ৩৩)।

আবার কখনোবা বলেছে: আমাদের জন্য আকাশ থেকে কোন লিখন নিয়ে এসো বা স্বয়ং আল্লাহকে এনে দেখাও‌, তাহলে বিশ্বাস করব যে তুমি নাবী:


يَسْأَلُكَ أَهْلُ الْكِتَابِ أَن تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ كِتَابًا مِّنَ السَّمَاءِ ۚ فَقَدْ سَأَلُوا مُوسَىٰ أَكْبَرَ‌ مِن ذَٰلِكَ فَقَالُوا أَرِ‌نَا اللَّـهَ جَهْرَ‌ةً ..... ﴿١٥٣﴾

“এই আহলু কিতাবরা যদি আজ তোমার কাছে আকাশ থেকে কোন লিখন অবতীর্ণ করার দাবী করে থাকে তাহলে আশ্চযের কিছু নেই কারন ইতিপুবে তারা এর চাইতেও বড় ধৃষ্টতাপুর্ণ দাবী মূসার কাছে করেছিল, তারা তাকে বলেছিল: আল্লাহকে প্রকাশ্যে আমাদের দেখিয়ে দাও .....” (সূরা আন্-নিসা: ১৫৩)।
কেউ কেউ পিতৃপুরুষের ধর্ম বিশ্বাসের দোহাই দিয়েছে:


وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَىٰ مَا أَنزَلَ اللَّـهُ وَإِلَى الرَّ‌سُولِ قَالُوا حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۚ...... ﴿١٠٤﴾

“আর তাদেরকে যখন বলা হয় এসো সেই বিধানের দিকে যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, এসো রাসূলের দিকে। তখন তারা বলে বাপ দাদাদেরকে যে পথে পেয়েছি সে পথই আমাদের জন্য যথেষ্ট”(সূরা আল-মায়িদা: ১০৪)।

আবার কখনোবা বলেছে:
“তারা বলে আমরা তোমার কথা কখনোই বিশ্বাস করবোনা, যতক্ষণ না তুমি ভুমি বিদির্ণ করে আমাদের জন্য একটি ঝরণাধারা প্রবাহিত করবে অথবা তোমার জন্য খেজুর ও আংগুরের একটি বাগান হবে এবং তুমি তার মধ্যে নদী নালা প্রবাহিত করে দেবে অথবা তুমি আকাশ ভেংগে টুকরো টুকরো করে আমাদের উপর ফেলে দাও যেমনটা তুমি হুমকি দিচ্ছ অথবা মালাইকাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে এসো অথবা তোমার জন্য সোনার একটি ঘর তৈরী হবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে এবং তোমার আরোহণ করার কথাও আমরা বিশ্বাস করবোনা যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি একটি লিখিত পত্র আনবে যা আমরা পড়বো...” (সূরা আল-ইসরা: ৯০-৯৩)।

এসব আবদার কিংবা শর্তারোপ করেই তারা থেমে থাকেনি, যখন তারা দেখলো যে, লাত, মানাত আর হোবাল এর ভয় দেখিয়ে নি:স্ব নিপেড়িত যেসকল মানুষের উপর এতকাল তারা প্রভুত্ব খাটিয়েছে, যেসকল সহায় সম্বলহীন মানুষগুলোকে দিয়ে চলতো রমরমা দাস ব্যবসা, সুদের যোয়ালে যাদেরকে আটকে রেখে সম্পদের পাহাড় গড়তো, তারা দলে দলে গিয়ে শামিল হচ্ছে এ নতুন দ্বীনে এবং অন্যদিকে প্রস্ফুটিত এক নতুন প্রভাতের সুসংবাদও যখন শোনাচ্ছিলেন এ দ্বীনের বাহক তখন তারা এ দ্বীন ও এর বাহকসহ সকলকে চিরতরে নি:শ্চিহ্ন করতে এগিয়ে এল। শুরু হল নিযাতন। সে নিযাতনের ঘটনাগুলো এতই বেদনাবিধুর ও হ্রদয়বিদারক যে মানুষের ‌ভাষা তা প্রকাশ করতে পারেনা।
কখনো নাবী (সা:) ও অনুসারীদেরকে অবরোধ করে রাখা হয়েছে দীর্ঘ সময়ব্যাপী, এসময় ক্ষুধা নিবারনে গাছের পাতা হতো তাদের খাবার, আর দূর থেকে শোনা যেত পিপাসার্ত, ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্নার আওয়াজ। অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানালে কাফিররা বলতো: যদি মুহাম্মাদ সত্য নাবী হয়ে থাকে তাহলে আকাশ থেকে তার নিকট খাবার নাযিল হবে কিংবা যমিন ফুঁড়ে বের হবে।
কাউকে জলন্ত অংগারের উপর শুইয়ে বুকের উপর ভারী পাথর রেখে দেয়া হতো অতঃপর শরীরের রক্ত অংগারের সে আগুনকে নিভিয়ে দিতো। কাউকে প্রচণ্ড রৌদ্রে তপ্ত বালুর উপর বুকে ভারী পাথর রেখে দিনের পর দিন শুইয়ে রাখা হয়েছে। প্রাণ বাচাতে অনেকে হিজরত করছেন। কাউকে নির্যাতন করতে করতে শহীদ করে দেয়া হয়েছে। কারোর এমন অবস্থা হয়েছে যে, প্রহারের কারণে উভয় নাকে ও মুখে রক্ত জমাট বেঁধে শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। এত নৃশংসতা, নিপিড়ন করেও যখন কাফিরদের কিছুই হতোনা, কোন শাস্তিই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে পাকড়াও করতোনা তখন তাদের নাফরমানী ও স্বেচ্ছাচারিতা আরও বেড়ে যেতো। এক বছর নয়, দু’বছর নয়, এভাবে পার হয়েছে দীর্ঘ তের বছর। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে মাক্কা থেকে হিজরত করেন রাসূল (সা)।

এভাবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি কার্যকর হতে বিলম্ব ঘটায় এসকল অতি জ্ঞানী (?) লোকগুলো ধরে নিয়েছে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আল্লাহ্ বলতে কেউ কোথাও নেই বরং এ বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে প্রাকৃতিক নিয়মে।
কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের এজাতীয় সকল ভ্রান্ত চিন্তার অসারতা, সীমালংঘনকারীদের পরিণাম ইত্যাদি সকল কিছু কুরআন কারিমে বর্ণনা করছেন এক এক করে:
কখনো এ বিশ্বব্যবস্থাপনার নিগুঢ় তত্ব এবং যালিমদেরকে স্বল্পকালের অবকাশ প্রদানের অন্তর্নিহিত রহস্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করা হয়েছে, বলা হয়েছে:
“আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘন ও নাফরমানীর কারনে সাথে সাথে পাকড়াও করতেন তাহলে ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী কোন জীবেরই অস্তিত্ব থাকতোনা, কিন্তু তিনি সবাইকে একটা নির্দিষ্ট সময় পযন্ত অবকাশ দেন। অতঃপর যখন সেই সময়টি এসে যায় তখন তা থেকে এক মুহূর্তও আগ-পিছ হয়না” (সূরা আন্-নাহল: ৬১)।

আবার কখনো পরীক্ষার অনিবাযতা ও অপরিহাযতা তুলে ধরা হয়েছে: 
“মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, আমরা ঈমান এনেছি শুধু একথাটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে আর পরীক্ষা করা হবেনা। অথচ আমি এদের পূর্ববর্তীদের সবাইকে পরীক্ষা করে নিয়েছি, আল্লাহ অবশ্যই দেখবেন কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যুক” (সূরা আল-আনকাবুত: ২-৩)।
“প্রত্যেকটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে, আর আমি ভাল এবং মন্দ উভয় অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদেরকে পরীক্ষা করছি” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৫)।

কখনো অতীত হয়ে যাওয়া ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছ, বলা হয়েছে যে, দ্বীন প্রতিষ্ঠার এ পথ ফুল বিছানো নয। এ পথে অতীতে যারা গত হয়েছে তারা ঈমান আনার পর দু'দন্ডের জন্য নিশ্চিন্তে আরামে বসে থাকতে পারেনি, মুসিবাতের পাহাড় তাদের উপর পতিত হয়েছে।
“তোমরা  কি মনে করেছো, এমনিতেই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে? অথচ তোমাদের আগে যারা ঈমান এনেছিল তাদের উপর যা কিছু নেমে এসেছিল এখনও তোমাদের উপর সেসব নেমে আসেনি। তাদের উপর নেমে এসেছিল কষ্ট-ক্লেশ ও বিপদ-মুসিবত, তাদেরকে প্রকম্পিত করা হয়েছিল। এমনকি সমকালীন রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা চীৎকার করে বলে উঠেছিল, আল্লাহর যে সাহায্যের ওয়াদা করা হয়েছে তা কোথায়?..” (সূরা আল-বাকারা: ২১৪)।

আল্লাহর আযাব না আসায় সীমালংঘনকারীরা বলতো, আর কত মিথ্যামিথ্যি আযাবের ভয় দেখাবে? আচ্ছা, সত্যই যদি তুমি নাবী হয়ে থাক তাহলে সে আযাব নিয়ে আসছোনা কেন? তারা ঠাট্রা করতো, আর বলতো, তোমার রবের পক্ষ থেকে আযাবের অপেক্ষায় আমরা বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছি। জওয়াবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হতো যে মানুষের প্রতি দয়া ও করূনা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আল্লাহ যতটা দ্রুতগামী হন, তাদের সাজা দেবার ও পাপ কাজ করার দরুন তাদেরকে পাকড়াও করার ব্যাপারে ততটা ত্বরিৎ গতি অবলম্বন করেন না। তোমাদের চ্যালেঞ্জ শুনে এবং তোমাদের বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা দেখে সংগে সংগেই আযাবও পাঠিয়ে দেবেন এটা আল্লাহর নিয়ম নয়। মানুষ যতই অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ করুক না কেন, এ অপরাধে তাদেরকে পাকড়াও করার আগে তিনি তাদেরকে সংশোধিত হবার যথেষ্ট সুযোগ দেন। একের পর এক সতর্ক বাণী পাঠান এবং রশি ঢিলে করে ছেড়ে দেন। অবশেষে যখন সুবিধা ও অবকাশ শেষ সীমায় উপনীত হয়, তখনই কর্মফলের নীতি বলবত হয়।
“তারা আযাবের জন্য তাড়াহুড়ো করছে অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভংগ করবেন না। কিন্তু তোমার রবের কাছের একটি দিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান হয়” (সূরা আল-হাজ্জ: ৪৭)।
“আল্লাহ যদি  লোকদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার ব্যাপারে অতটাই তাড়াহুড়া করতেন যতটা দুনিয়ার ভালো চাওয়ার ব্যাপারে তারা তাড়াহুড়া করে থাকে, তাহলে তাদের কাজ করার অবকাশ কবেই খতম করে দেয়া হতো (কিন্তু আমার নিয়ম এটা নয়) তাই যারা আমার সাথে সাক্ষাৎ করার আশা পোষণ করে না তাদেরকে আমি তাদের অবাধ্যতার মধ্যে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দেই” (সূরা ইউনুস: ১১) (তাফহীমুল কুরআন)।

কোথাও অতীত হয়ে যাওয়া যালিমদের পরিণামের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে:
“কতই জনপদ ছিল দূরাচার, আমি প্রথমে তাদেরকে অবকাশ দিয়েছি তারপর পাকড়াও করেছি” (সূরা আল-হাজ্জ: ৪৮)।
“আর তোমার রব যখন কোন অত্যাচারী জনপদকে পাকড়াও করেন তখন তার পাকড়াও এমনি ধরণের হয়। প্রকৃতপক্ষে তার পাকড়াও বড়ই কঠিন ও শক্ত হয়ে থাকে” (সূরা হুদ: ১০২)।
“আল্লাহ এদের রশি দীর্ঘায়িত বা ঢিল দিয়ে যাচ্ছেন এবং তারা নিজেদের আল্লাহদ্রোহীতার মধ্যে অন্ধের মতো পথ হাতড়ে মরছে” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৫)।

এভাবে, একের পর এক ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, একদিকে প্রবৃত্তির দাসত্ব, সম্পদের মোহ, ভোগের উন্মাদনা, ক্ষমতা ও নেতৃত্বস্পৃহা এবং অন্যদিকে এ সৃষ্টিজগত সম্পর্কে অনুমান নির্ভর দৃষ্টিভংগি ও মতবাদই মানুষকে স্বেচ্ছাচারী ও সীমালংঘন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, নিক্ষেপ করেছে আল্লাহ নাফরমানীর চুড়ান্ত পংকে। অথচ, সত্য উদঘাটনের অন্তর নিয়ে যদি তারা তাদের বুদ্ধি বিবেককে কাজে লাগাত তাহলে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ ছিল তাদের কতই না নিকটে। আর কতই না সুন্দর হত এ পৃথিবী।
...সমাপ্ত...


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -আতাউর রহমান সিকদার

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes