হেতু

Print
Category: গল্প কাহিনী
Published Date Written by আতাউর রহমান সিকদার

হেতু

-আতাউর রহমান সিকদার


শীতের সকাল। কুয়াশাকে তাড়িয়ে সূর্য যেন তার আদুরে পৃথিবীকে উমের পরশ বুলাচ্ছে অতি যত্নে। আল-আছী নদীও যেন অতি আয়েশ করেই উপভোগ করছে সে উম। বক আর মাছরাঙা পাখীও এর থেকে বাদ নয়। কতক আবার ঠোঁটে মাছ নিয়ে উড়ে যাচ্ছে দিগন্তে। পাড়ার কিশোর যুবকেরা ছোট ছোট জাল নিয়ে মাছ ধরছে নদীতে। স্রোতের তোড়ে না’উরাগুলোও অন্যান্য সময়ের চাইতে একটু দ্রুত ঘুরছে এখন। প্রায় ১২ থেকে ১৫ ফুট ব্যসের কাঠের তৈরী এসব না’উরার একদিকে স্রোতের পানি ঢুকছে অতঃপর অন্যদিক দিয়ে সে পানি পড়ছে গিয়ে বিপরীত দিকের নালায়। নদীর দু’পাশে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলী জমি। শা’ইর আর গমক্ষেতে সবে শীষ মেলা শুরু করেছে। বাতাসের সাথে যেন মিতালী পাতিয়েছে সে শীষ। একবার এদিকে হেলছে, আরেকবার ওদিকে।

এসবই মুগ্ধ চোখে দাঁড়িয়ে দেখছে হামাদ আল জাদি। এ দৃশ্য অবশ্য তার কাছে এ-ই প্রথম নয়। গত শীত মৌসুমে যখন সে আইমানের সাথে দেখা করতে যায় তখন এ রাস্তা ধরেই গিয়েছিল। তখন অবশ্য দু’পাশের মাঠ ফসলী জমিতে পরিপূর্ণ ছিল। শা’ইর আর গমের শীষে যেন ঢাকা ছিল দিগন্ত বিস্তৃত গোটা মাঠ। এখন ফাঁকা ফাঁকা কেন কে জানে!

: আসসালামু আলাইকুম।
: ওয়া আলাইকুমুস সালাম। মুখ ঘুরিয়ে সালামের জবাব দিল হামাদ।
: জনাব, আপনি কি কোথাও সফর করছেন?
: জি হাঁ, আমি দিমাশক থেকে এসেছি। যাব মাশতা আল হেলুতে।
: আমি আম্মার আল এশমাউয়ি। হিমস এরই বাসিন্দা। এখান থেকে সোজা নদীর ঐপারে আমাদের বাড়ী। নদীতে মাছ ধরছিলাম, আপনাকে ঘোড়া নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে এদিকে এসেছি।
: আপনার আগমনে খুবই খুশী হলাম। দৃশ্যটা অতীব মনোহর। ঘোড়াটারও বিশ্রামের প্রয়োজন। তাই একটু দাঁড়ালাম। ছোটবেলায় এ নদীর অনেক গল্প আমরা শুনেছি। না’উরাগুলোর ঘুর্ণনের দৃশ্যও চমৎকার।
: হাঁ, এ নদী দুনিয়ার তামাম নদীর বিপরীত। এটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়। বোধকরি এজন্যেই আমাদের পুর্বপুরুষগণ এর নাম রেখেছেন নাহর আল আছী। পানি অবশ্য অন্যান্য নদীর মতই মিষ্টি। শুধু হিমসবাসীদেরই নয়, গোটা শামদেশের প্রায় অর্ধেকটা এলাকাকে শষ্যশ্যামল করে রেখেছে এ নদী।
: না’উরার কথা বলছেন, এগুলো শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, কাজেরও। এরই মাধ্যমে গোটা হিমসবাসীর চাষবাসের কাজ চলছে। না’উরার সাথে ঐযে খালগুলো দেখছেন, এগুলোর কোন কোনটার বিস্তৃতি প্রায় মাইল তিনেক এর মত। কিন্তু হায়! কৃষিতে উৎপাদনের যে জোয়ার এসেছিল মহান শাসক উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে। এখন তাতে ভাটা পড়েছে। আগের সেই আল্লাহভীরু এবং কর্তব্যপরায়ণ মুহাফিয, ওমদাও এখন আর নেই। মহান সেই শাসকের ইন্তেকালের পর পরই এসেছেন নতুন মুহাফিয, নতুন ওমদা। তাদের কর্মচারীদের কাছে ঘুষ ছাড়া কীটনাশক পাওয়া যায়না। নদীর বেশকিছু না’উরার মেরামতের দরকার। উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে না’উরা কর্মচারীগণ একদিন পর পর এসে এগুলো দেখে যেতেন। আর এখনকার কর্মচারীদেরকে ঘুষ না দিয়ে মেরামতের কথাই বলা যায়না। এ কারণে বেশকিছু না’উরাও বন্ধ হয়ে আছে। তাই গরীব কৃষকেরা বাধ্য হয়েই চাষবাস ছেড়ে দিয়েছেন। মাফ করবেন, কি বোকা আমি, শুধু নিজেদের কথাই বলে যাচ্ছি। আপনার মেহমানদারীর কথা ভুলেই গেছি। চলুন আমাদের বাড়ী। আতিথ্য দিয়ে আমাদেরকে সম্মানিত করুন।
: কিন্তু . . .
: আরে কোন কিন্তু নয়। আপনি চলুন, আমার দাদু আপনাকে দেখলে খুবই খুশী হবেন।
: আপনারা ক’ভাই বোন?
: আমরা দু’ভাই এক বোন। আমি দ্বিতীয়। বড় ভাই পিতার সাথে আমাদের কৃষি খামার দেখাশুনা করছেন। আমি হাদিস ও ফিকাহ পড়ছি আল হামাতে। আচ্ছা, চলুন এবার তাহলে। ঐ যে কাঠের সাঁকোটা দেখছেন, ওটি পার হয়ে আমাদের যেতে হবে। আপনি ঘোড়ায় চড়ে বসুন, আমি আপনার আগে আগে হাঁটছি।
: না, না। চলুন দু’জনেই হেঁটে যাই। ঘোড়াটারও বিশ্রাম হবে।
: মাশা’আল্লাহ্ আপনার ঘোড়া দ্রুতগামীই বলতে হবে, অল্পক্ষণের মধ্যেই দিমাশক থেকে হিমস্ এ এসে গেছেন।
: জী, ফজর আদায় করেই আমি ঘোড়া ছুটিয়েছি। পথে এক বুড়িমার ঘটনায় বিলম্ব না হলে হয়ত এতক্ষণে আরও অনেক দূর চলে যেতাম, আপনার সাথে দেখাই হতোনা।
: বুড়ীমার ঘটনাটা কি?
: তার বাড়ী ওয়াদী আল আছীতে। রীফ যাচ্ছেন মেয়ে জামাই বাড়ীতে। পথে রাত হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে তাঁবু টানিয়ে মাল সামান পাশে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। চোর এসে মূল্যবান সবকিছু নিয়ে গেছে।
: তারপর?
: সকালে প্রহরী প্রধানের কাছে নালিশ করবেন। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে। কেউ সাহস পাচ্ছেনা প্রহরী প্রধানকে জাগাতে। অগ্যতা আমিই এ কাজ করলাম। তিনি তো রেগে আগুন। দায়িত্ব, কর্তব্য, পরকালের ভয় ইত্যাদি অনেক কিছু বলে রাগ প্রশমিত করলাম।
: তারপর?
: প্রহরী প্রধান চুরির ঘটনা শুনে বুড়ীকে বললেন,
: বুড়ী মা! কেন আপনি মূল্যবান মালসামানা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন, আপনার তো উচিত ছিলো জেগে থাকা। বুড়ী বললেন,
: বাপু, আমার তো ধারণা ছিল, তোমরা জেগে আছ।
: বড় মজার কাহিনীতো!
: মজার ঠিক নয়, এটি আমাদের জন্যে শিক্ষণীয়।
: হাঁ, তা ঠিক। শেষটাতে কি হলো?
: কিছুই না। বুড়ী চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন।
: আহা! মানুষ মনে করে এখনো বুঝি উমার ইবনু আবদিল আযীযের শাসন চলছে।

আম্মারদের বাড়ী। বাড়ীর চারদিকে লেবু আর বর্তুকালের গাছ। বর্তুকাল গাছগুলোর ডালপালা নুয়ে আছে বর্তুকালের ভারে। লেবু গাছে সবে ফুল ধরা শুরু করেছে। বাড়ীর দক্ষিণ দিকে লম্বা লম্বি ভাবে অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ শসা ক্ষেত। উঠোন ঝাড় দিচ্ছিল বার চৌদ্দ বছরের এক কিশোরী, অচেনা মানুষ দেখে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। খবর দিল বোধ হয়, শশ্রুমন্ডিত সৌম্য চেহারার হাস্যমুখ এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন বাড়ীর ভেতর থেকে।
: আসসালামু আলাইকুম। হামাদই সালাম দিল প্রথমে।
: ওয়া আলাইকুমুস সালাম। হাসিমুখে জওয়াব দিলেন বৃদ্ধ।
: দাদু, ইনি আমাদের মেহমান। দিমাশক থেকে এসেছেন। বলেই পিতামহের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল আম্মার।
: তাই নাকি? কি সৌভাগ্য আমার। মৃত্যুর আগে দিমাশক এর কারুর সাথে আবার দেখা হবে, এ আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
আবেগের আতিশয্যে হামাদের কপালে চুমু খাইলেন বৃদ্ধ।
: এসো বাবা, রোদ বাড়ছে। চলো ঘরে গিয়ে বসি।
সামনা সামনি বড় বড় দু’টো ঘর। সামনেরটির এক অংশে বড়সড় বৈঠকখানা। মেহমানদের থাকার ব্যবস্থাও রযেছে এক অংশে। মেঝেতে খেজুরপাতার চাটাই। একপাশে কাঠের তৈরী বেশ কয়েকটি কুরসি। বৃদ্ধের ব্যক্তিত্বপৃর্ণ চেহারা আর বাড়ীতে এ ধরনের অতিথিশালা দেখে মনে হচ্ছে এ লোক সাধারন কেউ নয়।একরাশ প্রশ্ন হামাদের মনে উঁকি ঝুঁকি মারছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বর্তুকালের রস আর শা’ইরের তৈরী সুস্বাদু পিঠা নিয়ে হাজির হলো আম্মার।
বৃদ্ধের চেহারায় এখনো লেগে আছে সেই প্রীতি মাখানো হাসি। বললেন বাবা,
: তোমার চেহারা বলছে তুমি হুকুমাতের কোন লোক নও। কোনও সাধারণ ঘরের সন্তান বলেও তোমাকে মনে হচ্ছেনা কি তোমার পরিচয়?
মৃদু হেসে হামাদ বললো,
: জী, আপনি ঠিকই ধারনা করেছেন। হুকুমাতের সাথে আমার কোন সংস্রব নেই। আমার নাম হামাদ বাশীর আল জাদি। দিমাশকে ইতিহাস বিষয়ে আমি পড়াশুনা করছি। পিতা খলিফা উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে ওয়াদী আল আছী'র মুহাফিয ছিলেন। মহান সেই খলীফার ইনতেকালের পর নতুন খলীফা আমার পিতাকে অব্যাহতি দিয়ে তার এক নিকটাত্মীয়কে সে পদে নিয়োগ দান করে।
: এখন তোমার পিতা কোথায়?
: দিমাশক্ এর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। তবে শীঘ্রই হয়তো অবসর নেবেন। বয়স বেড়েছে।
হামাদ লক্ষ্য করল, বৃদ্ধের চক্ষুদ্বয় ক্রমেই সিক্ত হয়ে উঠছে। কান্নাভেজা কন্ঠে সুধালেন,
: তুমি যাচ্ছিলে কোথায়?
: শাইখ আইমান আব্দুল কারিমের সাথে দেখা করতে। তিনি আমার বাবার বন্ধু এবং একসময়ে আমার শিক্ষক ছিলেন। ওয়াদি আল আছী'র প্রধান কাযী ছিলেন তিনি। নিয়োগ দিয়েছিলেন উমার ইবনু আবদিল আযিয। উমার রাহিমাহুল্লাহর ইনতেকালের পর তিনিও এক বিরাট পরীক্ষার সম্মুখীন হন। নতুন খলীফার এক নিকট আত্মীয়ের সাথে এক বিধবার জমি নিয়ে বিরোধ বাধে। বিচারে খলীফার আত্মীয়টি অপরাধী সাব্যস্ত হলে কাযী তাকে গ্রেফতার করিয়ে মাহকামায় এনে বেঁধে রাখেন। খলীফার কাছে এ খবর পৌঁছালে তৎক্ষনাৎ তিনি কাযীকে ডাকিয়ে এ কাজের জন্য তিরস্কার করেন এবং তার আত্মীয়ের পক্ষে রায় দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু শাইখ আইমান ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে তাই সে নির্দেশ মানতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। ফল স্বরূপ এর তিনদিনের মধ্যেই শাইখ আইমানকে চাকুরীচ্যুত করা হয়। এরপরই তিনি দূরে মাশতা আল হেলুতে চলে যান। গতবছর আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আজও সে উদ্দেশ্যেই এ পথে আসা। তবে অন্য একটা বিষয়ে।
: কি সে বিষয়?
: উমার ইবনু আবদিল আযিযের ইনতেকালের দেড় বছরের মাথায় দুর্ভিক্ষ কেন দেখা দিল, কেনই বা চুরি, ডাকাতি এভাবে বেড়ে গেল তার হেতু খুঁজে দেখতে আমরা ক’জন ছাত্র বের হয়েছি। বলা যায়, এটা আমাদের শিক্ষা সফর। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করে জমা দিতে হবে শিক্ষকের কাছে। 
: আল্লাহ তোমাদেরকে তাওফিক দান করুন। দোয়া করি তোমাদের মধ্য থেকে আরও একজন উমার যেন আল্লাহ আবার পয়দা করেন।
একটু থেমে বৃদ্ধ তার পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন,
: আমার নাম সালেম ত’আন। লোকেরা শাইখ সালেম বলে। খুব সম্ভব তোমার বাবাকে আমি উমার ইবনু আবদিল আযিয রাহিমাহুল্লাহর কোন মাজলিসে বা পরামর্শসভায় দেখেছি। শাইখ আইমানের ঘটনাটাও লোকমুখে আমি শুনেছি। কিন্তু বর্তমানে তিনি মাশতা আল হেলুতে দিনযাপন করছেন তা জানতাম না। আল্লাহর কি মহিমা! তোমার সাথে দেখা হয়ে কতইনা ভাল হল। আমার যদি দীর্ঘ সফরের শক্তি থাকত, তাহলে আজই আমি তোমার সাথে শাইখ আইমানের কাছে যেতাম।
বৃদ্ধ এবার উমার ইবন আবদিল আযিযের প্রসঙ্গ তুললেন, বললেন,
: উমার রাহিমাহুল্লাহর মুত্যুর তিন-চারদিন আগে আমি তাকে দেখতে যাই। শীর্ণ দেহটা পড়ে আছে বিছানায়। তার এক আত্বীয় উমারের স্ত্রীকে বললেনঃ ফাতিমা, কত লোক আমিরুল মু’মিনিনকে দেখতে আসে, বিছানাটা পুরানো, ফাটাও অগণিত, এটাকি পাল্টিয়ে দিতে পারোনা? স্ত্রী ফাতিমা অতিকষ্টে কান্না সামলে বললেনঃ আমাদের ঘরে যে এই বিছানাটা ছাড়া আর কোন বিছানা নেই, কোত্থেকে দেব?
এটুকু বলে বৃদ্ধ এবার হু হু করে কাঁদা আরম্ভ করলেন। হামাদের দু'চোখ বেয়েও অবিরল ধারায় অশ্রু ঝরছে। পেছনে বৃদ্ধের বড় ছেলে ইমাদও এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখেও অশ্রু। অনেকক্ষণ সকলেই নির্বাক। অশ্রু মুছে ইমাদ বলল,
: বাবা, মেহমানের খাবার তৈরী। আমরা সকলে একসাথেই খাবো চলো।

হামাদ, শাইখ সালেম, আম্মার এবং শাইখ সালেমের বড় ছেলে ইমাদ একসাথে খেতে বসেছেন, শাইখ সালেম কয়েক লোকমা মাত্র মুখে দিয়েছেন। হঠাৎ কারুর যেন আহাজারী শোনা গেল।
: শাইখ সালেম, শাইখ সালেম আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেল - - - বলতে বলতে এক বৃদ্ধা শাইখ সালেমের বৈঠকখানার দিকে এগিয়ে এলেন, সাথে ৭/৮ বছরের একটি ছেলে।
: কি হয়েছে দাদী? ইমাদ সুধাল।
: আমার নাতী শাইমা তার খালার বাড়ী রীফে গিয়েছিল গত কাল। ডাকাত সরদার মুনাজজিদ তাকে অপহরণ করেছে।
: বলেন কি? চোখ কপালে তুলে সকলে চাইলেন বৃদ্ধার দিকে।
শাইখ সালেম ক্রোধে খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু অসহায়ের মত ধপাস করে আবার বসে পড়লেন। চেয়াল দু’টো তার শক্ত হয়ে উঠেছে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আবার তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং অস্থিরভাবে পায়চারী করতে লাগলেন।
বড় ছেলে ইমাদ পিতাকে লক্ষ্য করে বলল,
: বাবা, আপনি শান্ত হোন, আমরা অসহায়। শুনেছি রীফের নতুন মুহাফিয প্রবৃত্তি পুজারী এক যালেম। তার যারা অধীনস্ত তাদেরকে ঘুষ দিলে হয়না এমন কোন কাজই নেই। ডাকাত সরদার মুনাজজিদ গ্রেফতার হয়েছিল, মুহাফিযের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বড় ধরনের ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় আমরা কি করতে পারি?
শাইখ সালেম সবই শুনলেন। বিমুঢ়ের মত কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন, অতঃপর বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন,
: সুহাইলের মা, আল্লাহকে ডাক আর ধৈর্য্য ধারণ কর। দেখি আমরা কতটুকু কি করতে পারি। বাবা, তুমি খেতে থাক, আমি আসছি।
হামাদকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেই বৃদ্ধাকে সাথে নিয়ে তার বাড়ীর দিকে গেলেন শাইখ সালেম।
হামাদও হতবিহবল। চুরি, রাহাজানি, দেশজুড়ে অশান্তি ইত্যাদির কারন খুঁজতে সে বের হয়েছিল, কিন্তু এত করুণভাবে এসবের মুখোমুখী সে হবে; ভাবতে পারেনি। অধিকার বঞ্চিত নিপিড়ীত মানুষগুলো যেন তাকেই খুঁজে ফিরছে আর বলছে, নিজ চোখেই দেখো আর লিখো তোমার তথ্যনামায়।
আর কি যাওয়ার দরকার আছে শাইখ আইমানের কাছে? অনেক তথ্যইতো ইতিমধ্যে সংগৃহিত হয়ে গেছে, ভাবছে হামাদ। কিন্তু . . . তা কি ঠিক হবে? বাবা প্রথমেই শাইখ আইমানের কুশল জানতে চাইবেন।

শাইখ আইমানকে দেখার জন্যে তারও মনটা কাঁদছে। যদি মাশতা আল হেলুতে যেতেই হয় তাহলে এখনই রওয়ানা করা দরকার। সকলের নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছে হামাদ। পথ এগিয়ে দিতে আম্মার আসছে তার সাথে। কথাপ্রসঙ্গে সে সুধাল,
: ভাইজান, দিমাশক্ থেকে অনেকটা পথতো সফর করলেন, আপনার তথ্য, মানে দেশজুড়ে এই যে অশান্তি আর অরাজকতা, তার কারণ কি কিছু অনুধাবন করতে পারলেন?
প্রশ্ন শুনে কি যেন ভাবল হামাদ, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
: জি, অনেক কিছুই পেয়েছি।
: কি পেলেন?
: অসৎ আর আল্লাহদ্রোহী নেতৃত্বই এসবের মূল হেতু।
: আর কিছু?
: ঐ জাতির চাইতে বড় দুঃখী আর কেউ নেই যাদের নেতা হচ্ছে নৈতিকতাহীন আল্লাহবিমুখ লোকেরা।
সুর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে অনেক আগে। দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়েছে হামাদ। একদিকে এক বৃদ্ধার আহাজারী, অপরদিকে অশ্রুর এক দরিয়া যেন পেছনে রেখে সামনে এগুচ্ছে সে। যে দরিয়ায় বয়ে চলেছে হাজারো ইয়াতীমের চোখের পানি। যাদের অভিভাবক ছিলেন উমার নামের এক মহান মানুষ। একদিনের দুপুর নয়, যেন একযুগ সে কাটিয়ে এসেছে শাইখ সালেমের ঘরে। ফিরবার পথে আবারও ওখানে যাত্রা বিরতি করতে বারবার অনুরোধ জানিয়েছে শাইখ সালেম এবং তার পরিবারের লোকেরা। কে জানে হয়তোবা আবার সেখানে যাবার প্রয়োজন হতেও পারে। কিন্তু কে এই শাইখ সালেম? তার সম্পর্কে তো তেমন কিছুই জানা হলোনা।

মাগরিরের আগেই মাশতা আল হেলুতে পৌছে গেছে হামাদ। বড় যাইতুন বাগানটি দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। বাগানের পর একটি বড় জলাশয়। জলাশয়ের পরেই সেই গ্রাম। ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল হামাদ। জলাশয়ের পাড় ধরে সোজা উত্তর দিকে কিছু পথ গেলে দশ বারোটি বাড়ীর পরেই শাইখ আইমানের ঘর। গতবারে এভাবেই সে গিয়েছিল।
: মারহাবা! দূর থেকে আসছেন বুঝি? কোন খিদমাত কি লাগবে? হামাদকে দেখে সুধাল এক পথিক।
: না, না, ধন্যবাদ। খানিক ইতস্ততঃ করে ঘোড়ায় বসেই হামাদ চাইল লোকটির দিকে। শাইখ আইমানের কথা কি তাকে জিজ্ঞেস করবে নাকি? . . . .না, থাক। শাসকের বিরাগভাজন এক কাযী। প্রশ্ন করে আবার কোন বিপদ ডেকে আনে কে জানে, তার চেয়ে বরং একা একা খুজে বের করাই উত্তম।

মাছ চাষের উদ্দেশ্যে এখানে এসেই একটি পুকুর খনন করিয়েছিলেন শাইখ আইমান। পুকুরের উত্তর পাড়েই তার বাড়ী। তিনি যদি তার বাড়ীর কোন পরিবর্তন না করে থাকেন তাহলে সহজেই পাওয়ার কথা। এক, দুই করে কয়েকটি বাড়ী পেরিয়েই উৎফুল্ল হয়ে উঠল হামাদ। ঐতো শাইখ আইমানের পুকুর। হুবহু গতবারের মতই আছে। কিন্তু ঘরদোরের এমন অবস্থা কেন? কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে বলে মনে হচ্ছে। তাহলে তারা কি এখান থেকে চলে গেলেন? . . .
উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল হামাদ। না, কোন মানুষ নেই।
পুকুরের বিপরীত দিকে কোদাল হাতে এক যুবককে দেখা যাচ্ছে, জমিতে কি যেন করছে। তাকে সুধাবে নাকি? ভাবছে হামাদ।
যুবকটি বোধ হয় হামাদকে দেখতে পেয়েছে। কোদাল রেখে সে নিজেই এল। যুবকের সুন্দর চেহারায় বিষন্নতা ও ভীতির ছাপ।
: আসসালামু আলাইকুম। যুবকই সালাম দিল প্রথমে।
: ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
: মাফ করবেন, কাউকে খোঁজ করছেন কি?
: জি, হাঁ। এটা কি শাইখ আইমানের বাড়ী নয়?
: হাঁ, কিন্তু . . . .
: কিন্তু কি? . . .  তারা কি আর এখন এখানে থাকেননা?
যুবক প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল হামাদের দিকে। অতঃপর কাঁপা কন্ঠে বলল,
: মাফ করবেন, আপনি কোত্থেকে এসেছেন? কোন খবরই কি আপনার জানা নেই?
: কি ঘটনা খুলে বলুনতো? উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করল হামাদ।
যুবকের চোখে অশ্রু টলমল করছে। নিজেকে সংবরণ করে বলল,
: সে তো প্রায় মাস ছয়েক আগের কথা। শাইখ আইমান তার পরিবার নিয়ে ঐ ঘরটাতে ঘুমিয়েছিলেন। তার দু’কিশোর ছেলে এ ঘরটিতে। হঠাৎ মধ্যরাতে ডাকাত পড়ার মতো ৪/৫ জন লোক শাইখ আইমানের ঘরে ঢুকে। শাইখ আইমানকে বের করে নেয়ার পূর্বে তারা তার দু'ছেলের এবং তার স্ত্রীর মুখে কাপড় বেঁধে রাখে।
হামাদ লক্ষ্য করল, শাইখ আইমানের কাহিনী বলতে গিয়ে ক্রমেই যুবকের দুচোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠছে। কান্না রোধ করে যুবক বলে চলল,
: প্রথমেই এক ব্যক্তি শাইখের মুখে থুথু নিক্ষেপ করে। শাইখ নিজের মুখ থেকে থুথু মুছতে মুছতে তাকে শান্ত স্বরে বললেনঃ তুমি কে ভাই? আমার জানামতে আমিতো তোমার কখনো কোন ক্ষতি করিনি। আমার দ্বারা যদি তোমার উপর কোন যুলুম হয়েই থাকে তাহলে তুমি আমার মুখে আরও থুথ নিক্ষেপ করে এর প্রতিশোধ নিয়ে নাও।
এটুকু বলে বাকরুদ্ধ হয়ে এল যেন যুবকের। কান্নার গমকে তার কথা হারিয়ে গেল। দু'চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু ঝরছে। হামাদও কাঁদছে। অশ্রু যেন বাঁধ মানছেনা কারুরই।
অনেক কষ্টে যুবক বাকী কাহিনী সমাপ্ত করল। শাইখ আইমানকে বেঁধে পুকুরের ঐদিকটায় নিয়ে উপুর্যপুরি ২/৩ জনে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। শাইখের দেহ নিথর হয়ে গেলে হাত পা বেঁধে পুকুরে ফেলে তারা চলে যায়।
শাইখের স্ত্রী কিভাবে যেন নিজের মুখ থেকে কাপড় বের করে ফেলেন এবং ডাক-চিৎকার শুরু করেন। চিৎকার শুনেই আমরা ঘটনা আঁচ করতে পেরেছিলাম যে, দুঃখজনক কিছু একটা ঘটেছে। তাদেরকে বন্ধন মুক্ত করে শাইখ আইমানকে পুকুরে খুঁজে পাই কিন্তু ততক্ষণে তিনি আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন।
কান্না রোধ করে শাইখ আইমানের পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করল হামাদ।
: শাইখের পরিবার এ ঘটনার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই এখান থেকে চলে যান। পুকুরটি আমাদেরই এক প্রতিবেশী কিনে নিয়েছেন। বাড়ীটিও বিক্রির অপেক্ষায় আছে। দেখুন, আপনাকে বসতে বলব, তাও ভুলে গেছি। আসুন আমাদের বাড়ী আসুন।
: আমাকে যে অনেক দুর যেতে হবে ভাই। আচ্ছা চলুন আপনাদের মসজিদে মাগরিবটা আদায় করি।
মাগরিব পড়েই গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বিদায় নিল হামাদ। যুবকটি সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু হামাদ বারণ করল। তাছাড়া এখন সে সময়ও নেই। বিদায় নিয়েই ঘোড়ায় চেপে বসল হামাদ। : রাতে যেতে পারবেন? জি, চাঁদনীতো আছে, অসুবিধা হবেনা।
হাত নেড়ে সকলকে বিদায় জানিয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল হামাদ। হৃদয় তার চৌচির হয়ে যাচ্ছে। অশ্রুও বাঁধ মানছেনা। দুঃখ, বেদনায় নিজেকেই প্রশ্ন করল সে হামাদ, আর কত তথ্য সংগ্রহ করবে তুমি? কতটা কাঁদার শক্তি তোমার আছে?
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। কিছুদূর আসার পর তার চৈতন্য হলো, অন্যমনস্ক হয়ে কোথায় চলেছে হামাদ? দিমাশকে ফিরে যাওয়া আজ রাতে আর সম্ভব নয়। হিমসেই যেতে হবে। কিন্তু হিমস্ এর পথ কি এটা? না এ পথে সে আসেনি। তাহলে? হিমস্ যেতে হলে পেছনে ফিরে বাম দিকের রাস্তা ধরতে হবে। অগ্যতা তাই করল সে। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করছে হামাদ। একটি প্রশ্ন বার বার মনে উঁকি দিচ্ছে, খলীফার সেই আত্মীয়; যাকে শাইখ আইমান কাযী থাকা কালে ধরে এনে বেঁধে রেখেছিলেন সে-ই এ হত্যাকান্ড করেছে কি? সম্ভাবনা শতভাগ। সে নাকি কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে সাথে সাথেই শাইখ আইমানকে শাসিয়েছিল। হামাদের মস্তিষ্কে হাজারো জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খাচ্ছে। এসময়ে একটা অঘটন ঘটল। একটা নালা পার হতে গিয়ে দু’টো কাঠের মধ্যে পা আটকে গেল ঘোড়ার। হামাদ বেখেয়াল থাকায় সেও হুমড়ি খেয়ে পড়ল নীচে এবং মাথা গিয়ে লাগলো নীচে বিছিয়ে রাখা গাছের একটি গুড়িতে। এক অশ্রু না শুকাতেই যদি আরেক দুঃখ আসে তাহলে নাকি মানুষ বোবা হয়ে যায়, জান ছেড়ে দেয়। হামাদও ঠিক ঐরকম হয়ে গেল। উঠে দাঁড়াবার শক্তিটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। শিশুর মত সে কাঁদতে লাগল।
ঘোড়াটা ঐভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ এভাবে কেটে গেছে খেয়াল নেই তার। দু'জন লোকের মৃদু কথোপকথন শুনতে পাচ্ছে সে। ঘোড়াটাকে তারা ধরে উঠাচ্ছে। আরও একটি কন্ঠ তার কানে এলো, গম্ভীর এবং আবেগ মাখানো সে কন্ঠ। অন্ধকারে লোকটিকে সে দেখতে পাচ্ছেনা কিন্তু স্পষ্ট সে কথাগুলো,
: উঠো যুবক! উঠো! এখনই ভেঙে পড়োনা, দেখছোনা অন্ধকার কিভাবে ছেয়ে আসছে চারদিকে।

সমাপ্ত


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -আতাউর রহমান সিকদার

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes