শিউলী

Print
Category: গল্প কাহিনী
Published Date Written by আতাউর রহমান সিকদার

ষোলতে পা দিয়েছে শিউলী। ঢাকার ধানমন্ডীতে বাহাউদ্দীন সাহেবের বাসায় শিউলী যখন কাজের মেয়ে হিসেবে আসে তখন তার বয়স আট। এখন ষোল। এ সাত বছর একনাগাড়ে সে বাহউদ্দীন সাহেবের বাসায় কাজ করেছে। আপন মা অথবা ভাই-বোন কেউ না থাকায় বাড়ী যাওয়ার আগ্রহ সে কখনো দেখায়নি। আর কদাপি আগ্রহ হলেও সৎ মায়ের নিগ্রহের কথা মনে করে সে আগ্রহে ভাটা পড়েছে। মা হারা শিশুদের নাকি যে কোন একটা অবলম্বনের ব্যবস্থা আল্লাহ করে দেন। এখানে আসার পর বাহাউদ্দীন সাহেবের মেয়ে মাহমুদাই ছিল তার সে অবলম্বন। মাহমুদা তখন ক্লাস এইটে পড়ে। অন্যদের সাথে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক থাকলেও মাহমুদার সাথে ছিল বন্ধুত্বের। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু হলেও মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় বাহাউদ্দীন সাহেব বা তার স্ত্রী শায়লা বানুর ছিলনা। কেন ছিলনা সে বর্ণনায় পরে আসছি।


শিউলী সাধারণ এক কাজের মেয়ে ছাড়া এ বাড়ীতে আর কিছু নয়- এটা বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে বুঝলেও আজ তা মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করছে। সকাল থেকেই দু’গাল বেয়ে তার অবিরল ধারায় অশ্রু ঝরছে। প্রায় ৮ মাস ধরে শিউলীর মশারিটা ছিঁড়ে আছে। সে ছেঁড়া অংশ দিয়ে মশা ঢোকে। শীতের সময়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে থাকা যায়, মশা তখন কামড়াতে পারেনা। কিন্তু গরমের দিনেতো আর কাঁথা গায়ে দেয়া যায়না। তাই একটা মশারী কিনে দেয়ার আবেদন জানিয়েছিল সে। মাহমুদা তাকে গত ইদের সময় নিজের হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে বোরখা কিনে দিয়েছে। এর আগের ঈদে দিয়েছে জুতা। তাই মাহমুদার কাছে আবার মশারির আবদার জানাতে কুন্ঠিত হচ্ছিল সে। বেগমসাহেবা মশারীর কথা শুনেই তেলেবেগুনে যেন জ্বলে উঠলেন, দুচোখ কপালে তুলে বললেন,

: মশারী!! কেন, তোর বেতনের টাকা থেকে কিনতে পারিসনা।

বাহাউদ্দীন সাহেব ড্রইং রুমে বসে কি একটা বই পড়ছিলেন, শায়লা বানু সেখানে গিয়ে শ্লেষের সাথে বললেন,

: শিউলী এখন মশারিও চায়। তোমাকে কত করে বললাম এরচেয়ে কাজের জন্যে একজন ছুটা মেয়েলোক রাখ। শিউলীকে মাসে মাসে আড়াইশ টাকা দিতে হচ্ছে, খাওয়াতো হিসাবই করিনা। ছুটা মেয়েলোক রাখলে খাওয়ার খরচটাতো বাঁচবে। বার বার উপকারের কথা বল, ওর বাপের উপকারের প্রতিদানতো দেয়া হয়ে গেছে। সাত বছর ধরে থাকছে, আর কত!

বাহাউদ্দীন সাহেব সব শুনে শুধু স্ত্রীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। বিশেষ করে শেষের কথাটায় তিনি খানিক ধাক্কা খেলেন। একসময় বাহাউদ্দীন সাহেব ভাবতেন, বাড়ী, গাড়ী আর সামাজিক প্রতিপত্তির মধ্যেই জীবনের সফলতা। সফলতার সেই ঘাটে জীবন নামক তরীটিকে ভিড়ানোর জন্যে দিন রাত বৈঠা চালাতেন। বাহাউদ্দীন সাহেব ছিলেন মাঝি আর শায়লা বানু সখের আরোহিনী। শায়লা বানু সেই তরীতে বসে অপ্সরী সেজে তাকে পথ দেখাতো। সে অনেক আগের কথা। এখন অবশ্য বাহাউদ্দীন সাহেব সে তরীতে প্রায়ই একা থাকেন। শায়লা বানুর এখন আর সেই তরীতে বসতে ভাল লাগেনা। কারণ দু’জনের চিন্তা-চেতনা এখন দু’টি ভিন্ন পথে মোড় নিয়েছে। বাহাউদ্দীন সাহেব ভাবেন, জীবনের সফলতা বাড়ী, গাড়ী আর সামাজিক প্রতিপত্তিতে নয়; বরং আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয়ের মধ্যে। যে যত ভাল পাথেয় সে জীবনের জন্যে সঞ্চয় করতে পেরেছে সে তত সফলতা অর্জন করেছে। আরও একটি বিষয় তার কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে, তা হচ্ছে, মানুষের যাবতীয় শক্তি, ক্ষমতা ও ইচ্ছা অন্য এক অদৃশ্য সত্তার নিয়ন্ত্রণাধীন। সে সত্তাকে আমরা স্বীকার করি বা না করি, তাতে সেই সত্তার কিছু যায় আসেনা। ক্ষণস্থায়ী স্বাধীনতা ও ক্ষমতা পেয়ে সেই মহাশক্তিধর সত্তাকে ভুলে যাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

এ পরিবর্তনের অবশ্য বেশ কিছু কারণও আছে। এর মধ্যে প্রধান একটি হচ্ছে তার জীবনে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা, অতঃপর এর সাথে যুক্ত হয় তার একমাত্র কন্যা মাহমুদা। যার অনুপম চরিত্র মাধুর্য চুম্বকের মত তাকে কাছে টেনেছে। যে কিনা তার উন্নত নৈতিক গুণাবলী দিয়ে প্রমাণ করেছে সভ্যতা আর আদর্শের সংঘাতের এ ক্রান্তিলগ্নে প্রকৃত কল্যাণ ঠিক এ পথটিতেই আছে।

বোধকরি সে পরিবর্তনের কারণেই আজ এক নিঃস্ব বালিকার রিযিক কর্তনের কথায় তার হৃদয় ব্যথাকাতর হয়ে উঠল এবং তার মন চলে গেল আট বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি দিনে।

রমনাভবনের নিজস্ব টেইলারিং শপ থেকে রিক্সায় করে ঢাকা ভার্সিটির সামনে দিয়ে আসছিলেন তিনি। ঢাকা শহরে বাহাউদ্দীন সাহেবের জন্ম হলেও এ এলাকায় তিনি খুব একটা আসতেননা। এমনকি ঢাকা সিটি কলেজে পড়ার সময়েও না। একটি বেপরোয়া পাবলিক বাস পলাশী ষ্টাফ কোয়ার্টারের সামনে এক স্কুল ছাত্রকে চাপা দিলে জনতা ক্রদ্ধ হয়ে ঐ রাস্তায় বেরিক্যাড ও ভাংচুর শুরু করে, তাই বাধ্য হয়ে বাহাউদ্দীন সাহেব বিকল্প হিসেবে ভার্সিটির সামনের রাস্তা বেছে নেন। তখন বিকেল ৫টা কি সাড়ে ৫টা বাজে। ঐদিন কোন ক্লাস না থাকায় ভার্সিটি এলাকা ছিল নিঝুম। একটা বিরাট অংকের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দু’টি গ্রুপের মধ্যে তখন সংঘর্ষ চলছিল। দু’গ্রুপের সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটির কতিপয় ছাত্র। দু’দলের কাছেই অত্যাধুনিক পিস্তল। একদল আর্টস বিল্ডিং এর বারান্দায়, অপরদল অপরাজেয় বাংলার আড়ালে। রিক্সাওয়ালা বা বাহাউদ্দীন কেউই জানতেননা একথা। তাদের রিক্সা আর্টস বিল্ডিং এর সামনে আসা মাত্র সাঁ করে একটি গুলি এসে লাগে বাহাউদ্দীন সাহেবের হাতের কব্জিতে। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া দরকার অথচ একটা গাড়ীও ঐ এলাকায় নেই, তাই বাধ্য হয়ে রিক্সাওয়ালা নিজেই বাহাউদ্দীন সাহেবের হাত তার গামছা দিয়ে বেঁধে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। হাতের কব্জিতে গুলি লাগায় রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছিলনা। মেডিকেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। ডাক্তার বললেন, রক্ত দিতে হবে এক্ষুনি। রক্ত কোথায় মিলবে, রিক্সাওয়ালা হন্যে হয়ে ঘুরছে। টেলিফোন করে রক্ত সংগ্রহ করবে সে অবস্থাও নেই। মোবাইল ফোনের ব্যবহারও তখন ততটা চালু হয়নি, যেমন এখন। তাছাড়া বাহাউদ্দীন সাহেবও অজ্ঞান। তার কাছ থেকে যে নাম্বার নিয়ে তার পরিবারকে জানাবে, সে সুযোগও নেই। অগ্যতা রিক্সাওয়ালা নিজেই ডাক্তারকে বললো,

: ডাক্তার সাহেব আপনি আমার কাছ থেকেই রক্ত নেন। আমিই রক্ত দেব।

ডাক্তার বললেন,

: রক্ত দেব বললেইতো আর দেয়া যায়না। গ্রুপতো মিলতে হবে।

: দেখেননা মিলে কিনা?

আল্লাহর কি মহিমা! রিক্সাওয়ালা আর বাহাউদ্দীন সাহেবের রক্তের গ্রুপ ছিল এক।

বাহাউদ্দীন সাহেব সুস্থ হয়ে রিক্সাওয়ালাকে নিজের বাসায় ডাকিয়ে একদিন বললেন,

: সোহরাব মিয়া! তোমার উসিলাতেই আমি গুলি খেয়েও বেঁচে গেছি। তোমার ঋণ শোধ হবার নয়।

সোহরাব মিয়া কাচু মাচু হয়ে হেসে বললো,

: লজ্জা দিয়েননা স্যার। এইডা আর এমন কি করছি।

বাহাউদ্দীন কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে আবার বললেন,

: সোহরাব মিয়া! আমি কি তোমার কোন উপকার করতে পারি? মানে, তোমার কি কিছু চাইবার আছে?

সোহরাব পুর্বের মতই হেসে বললো,

: আমি কোনো প্রতিদান চাইনা স্যার।

: প্রতিদানের ব্যাপার ঠিক নয়, তোমার কোন উপকার আমাকে দিয়ে হলে একটু তৃপ্তি পেতাম।

সোহরাব মাথা নীচু করে ভাবছে, তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কলিজার টুকরা শিউলীর ছবি। শিউলীকে কি সায়েবের বাসায় দেবে? সায়েবকে তো বালাই মনে অয়। বলবে নাকি শিউলীর কথা?

: কি ভাবছো সোহরাব?

সোহরাব এবার আমতা আমতা করে বললো,

: স্যার . . আমার একডা মা মরা মাইয়ার কথা কইতে চাইছিলাম . . .

: নিঃসংকোচে বল।

: ওর মাডা মারা যায় ৩ বছর বয়সের সোময়। সৎ মার লগে থাহে এহন। খালি নাকি কান্দে। আমিও মনডায় শান্তি পাইনা। পেডের ধান্ধায় ত ঢাহাই থাহা লাগে আমার বেশী। তাই কইছিলাম যদি আপনাগো কোনো কামের লোক . .

বাহাউদ্দীন সাহেব যেন বুঝলেন, সোহরাব কি বলতে চায়। তাই সুধালেন,

: তোমার মেয়ের বয়স কত?

: এহন ৮ বছর স্যার।

: ঠিক আছে, আমার বাসায় নিয়ে আস।

সেই থেকে শিউলী বাহাউদ্দীন সাহেবের বাসায় আছে। এক গরীব রিক্সাওয়ালার উপকারের প্রতিদান দিতে চেয়েছিলেন বাহাউদ্দীন। কিন্তু হিসাব নিকাশ করলে দেখা যাবে, উপকারের কোনই প্রতিদান দেয়া হয়নি। কারণ শিউলীর এ বাড়ীতে আগমন ঘটে এক কাজের মেয়ে হিসেবে। কাজের বিনিময়েই সে সাত বছর এখানে থেকেছে।

আজ স্ত্রীর কথায় ঠিক হতভম্ভ না হলেও কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লেন। শিউলী এখানে থাকলে এবং মাসে মাসে আড়াইশ টাকা নিলে বাহাউদ্দীন সাহেবের সংসারের খরচ বেড়ে যাবে এবং অতঃপর সকলকে কষ্ট করতে হবে ব্যাপার এমন নয়। কিন্তু একথা শায়লা বানুকে বোঝানোর সাধ্য কারোর নেই। মনুষ্যত্ববোধ, উদারতা এসব বাক্য শায়লা বানু বেশ ভাল বোঝেন; অন্যের বোঝানোর কোন প্রয়োজন নেই।

বাহাউদ্দীন সাহেব শায়লা বানুর কথার কোন জওয়াব না দেয়ায় ঠমক মেরে তিনি ড্রইং রুম ছেড়ে উঠে চলে গেলেন।

শায়লাবানুর কথাগুলো শিউলীও শুনেছে। শোনার পর থেকেই কেন জানি মায়ের কথা মনে পড়ছে শিউলীর। প্রতিবাদের বদলে অভাগীনি এ কিশোরী কেবলই নিজের দুঃখের কথা স্মরণ করে কেঁদে চলেছে। রয়ে রয়ে ভেতরটা হু হু করে উঠছে আর দু’চোখ ছাপিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে।

শিউলী এখানে মেহমান হিসাবে থাকেনা; বরং ভোর ৬ টা থেকে রাত ৮ টা ৯ টা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে খাটার বিনিময়েই তার খাওয়া-থাকা মিলছে। ২/৩ বার ঘর মোছা, ৩ বার বাসকোসন ধোয়া, কাপড় কাচা, তরকারী কাটা, দোকানে যাওয়া ইত্যাদি সব কাজ সে-ই করে।

ইদানিং প্রায়ই মুখ তেতো লাগে শিউলীর। রাতে জ্বর এলে কি মুখ তেতো লাগে? সারাদিন খাটুনির পর রাতে সে ভালভাবে ঘুমাতে পারেনা, এজন্যেই কি তার জ্বর আসে? কে জানে।

: শিউলী!

: জী আপা।

: আজ বিকেল পাঁচটায় আমাদের বাসায় একটা দাওয়াতী বৈঠক হবে। তুই আগে ভাগেই চা তৈরী করে ফ্ল্যাক্সে ভরে রাখিস্। আর হাঁ, মশারীর জন্যে চিন্তা করিসনা, দেখি আমরা কয়েকজন দ্বীনি বোন মিলে তোকে একটা মশারী কিনে দিতে পারি কিনা। ঠিক আছে? মশারী দিয়ে মশা ঢোকে একথা আমাকে আগে বলিসনি কেন? বলেই শিউলীর মাথায় খানিক হাত বুলাল মাহমুদা।

: খুশীতে উচ্ছসিত হয়ে উঠল শিউলী। মাহমুদা আপা কাছে এলেই সকল ব্যাথা বেদনা যেন তিরোহিত হয়ে যায় তার। তার এখন দৃঢ প্রত্যয় জন্মেছে, কুরআন-হাদিসের চর্চা যারা করে তারাই উত্তম মানুষ। নইলে একই ঘরে দু’জনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এমন বিপরীতমুখী হবে কেন। কোথায় বেগমসাহেবা শায়লা বানু আর কোথায় তার মাহমুদা আপা।

 

বিকেল ৫ টায়ই আলোচনা সভা শুরু হয়েছে। মাহমুদার ৬/৭ জন বান্ধবী ছাড়াও উপস্থিত হয়েছেন তাদের ৩ জন প্রতিবেশী। কিন্তু এ সভায় বাড়ীওয়ালী শায়লা বানু নেই। মেয়ে মাহমুদা তাকে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি বলেছেন,

: তোরা কর। আমার কাজ আছে।

অবশ্য এধরনের বৈঠক এটাই তাদের বাসায় প্রথম নয়। দীর্ঘ ৬/৭ মাস ধরেই মাসে একবার করে এখানে আলোচনা সভা হচ্ছে। কোনদিন কুরআন থেকে দারস্ থাকে আবার কোনদিন নবী রাসূলদের ইতিহাস বা তাদের সাহাবীদের জীবনকথা নিয়ে আলোচনা। প্রত্যেকটি বৈঠকেই মাহমুদা তার আম্মাকে বসতে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে তিনি আসেননা। বৈঠক বন্ধও করতে পারেননা, কারণ বাহাউদ্দীন সাহেবের কড়া নির্দেশ, তার যতদিন হায়াত থাকবে ইসলামী দাওয়াতী কাজের জন্যে এ মহল্লার বৈঠকগুলো তার বাড়ীতেই হবে।

বাহাউদ্দীন সাহেবও স্ত্রীর মন পরিবর্তনের জন্য কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। অতঃপর এই বলে মনকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, হেদায়াত আল্লাহর একটি বিশেষ অনুগ্রহ। অহংকারী এবং অপরের অধিকার বিনষ্টকারীদেরকে আল্লাহ্ এ অনুগ্রহ দান করেননা। নইলে কোথায় সালমান আল ফারেসী (রাঃ) বিলাদ আল ফারেস থেকে মক্কায় এসে রাসূলের (সঃ) ঘনিষ্ট সাহাবীদের একজন হয়ে গেলেন অথচ ঘরের পাশে থেকে আবু জাহল, আবু লাহাবদের ঈমানের সৌভাগ্য হলোনা।

 

শিউলীও দরজার পাশে এক কোনায় বসে গেছে। তবে ভয়ে ভয়ে। কারণ, বেগমসাহেবার এটা পছন্দ নয়। কাজের মেয়ের আবার আলোচনা সভা কি।

একদিনতো তিনি মেয়ে মাহমুদাকে ডাকিয়ে বলেই দিয়েছেন,

: দেখ মাহমুদা, তোর লাই পেয়ে না আবার ঘাড়ে চড়ে বসে। ঘরের কাজ কিন্তু আমি করতে পারবনা।

আলোচনা সভার মাঝামাঝি পর্যায়ে বিরতির সময় সকলের পরিচয় হচ্ছে, মাহমুদা শিউলীকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলল,

: ও হচ্ছে শিউলী বেগম, আমাদের এক দ্বীনি বোন। মাশাআল্লাহ খুবই মেধাবী। একবার যা শুনে তা মুখস্ত হয়ে যায় . . .। এসময় হঠাৎ ভেতর থেকে শিউলীর ডাক পড়ল,

: শিউলী, শিউলী!

শিউলী দৌড়ে ভেতরে যেতেই শায়লা বানু আদেশের সুরে বললেন,

: আগামী পরশু আমাদের বাসায় মেহমান আসবে। নেকরা ভিজিয়ে ঘরের জানালাগুলো মোছ, কালকে সময় পাবিনা। বিছানার চাদর, জানালার পর্দা এগুলো সব ধুতে হবে কাল।

 

মেহমানরা সকলে দুপুরের আগেই এসেছেন। নারায়নগঞ্জ থেকে এসেছেন শায়লা বানুর বড় বোন তার ছেলে বাদলকে নিয়ে। বাদল নারায়নগঞ্জে একটা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ২য় বর্ষে পড়ে। কল্যাণপুর থেকে এসেছেন বাহাউদ্দীন সাহেবের ছোট ভাই তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে। দিন গড়িয়ে এখন রাত। খাওয়া দাওয়া শেষ করে প্রায় সকলেই শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খালি দু’টি রুম থাকায় দু’পরিবারের জন্য দু’রুমে শোবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

শিউলী আগে মাহমুদার রুমের মেঝেতে বিছানা করে ঘুমাত। আজ সে সুযোগ না থাকায় রান্নাঘরে বিছানা পেতে শুয়েছে সে।

গভীর রাত। ক্লান্ত শিউলী শুয়েছিল সবার শেষে। ঘুমের মধ্যেই শিউলীর মনে হল, কে যেন তার মুখে কাপড় গুজে দিচ্ছে। শ্রান্ত শিউলী আবার হারিয়ে যাচ্ছে ঘুমের অতল তলে। খানিক পর আবার সে অনুভব করল একই স্পর্শ। অতি ধীরে এবং সন্তোপর্ণে কে যেন তার মুখ হা করিয়ে কাপড়ের কুন্ডলী ঢুকাতে চাইছে। এবার ঘুম ভেংগে গেল শিউলীর। ঘুম ভেংগে গেছে দেখে আগন্তকের হাত দুটি চলে গেল শিউলীর দু’চোখের উপরে। কাপড় দিয়ে এবার সে শিউলীর চোখ বেধে ফেলতে চাইছে। কিন্তু ততক্ষণে ষোড়শী শিউলীও বিপদ বুঝতে পেরেছে। তার পা দু’টি বাঁকিয়ে আগন্তুকের তলপেট বরাবর লাথি মেরে উঠে দাঁড়িয়েই লাইট অন করে দিল সে। দেয়ালের কোথায় কি আছে তা সব মুখস্ত থাকায় দ্রুতই এ কাজটা করতে সক্ষম হল শিউলী। লাইটের আলোতে সে দেখল, দৌড়ে চলে যাচ্ছে বাদল।

অস্ফুটে শিউলীর মুখ থেকে মৃদু চিৎকার বেরিয়ে এল,

: আপা! মাহমুদা আপা। অলৌকিক বললেও বোধকরি অত্যুক্তি হবেনা। মাহমুদাও একটিমাত্র ডাকেই ঘুম থেকে জেগে উঠল এবং রান্নাঘরে আলো দেখে এদিকেই দৌড় দিল সে। এক্ষণে এক অবাক কাজ করে বসল শিউলী। বেএখতিয়ার সে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাহমুদার বুকে, আর হু হু করে কাঁদতে লাগল। ইতোমধ্যে মাহমুদার রুম থেকে তার দুই ফুফাত বোনও রান্নাঘরে এসে হাজির হয়েছে। মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মাহমুদা সকলকে অবাক করে দিয়ে শিউলীকে বুকের সাথে আগলে ধরে পরম স্নেহে তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। যেন এক মা তার কোনও দুঃখীনি মেয়েকে আদর আর মমতা দিয়ে দুঃখ লাঘব করার চেষ্টা করছে।

: কি হয়েছিল শিউলী? ধীরে ধীরে সুধাল মাহমুদা।

চারিদিক চেয়ে ভয়ে ভয়ে শিউলী বলল,

: বাদল ভাই আমার কাছে এসেছিল।

শোনামাত্র কঠিন হয়ে উঠল মাহমুদা। চোয়াল দু’টো তার শক্ত হয়ে উঠেছে। নারীর সতীত্বের মর্ম বুঝি নারীই বোঝে। তাই ঘৃণা, ক্রোধে সে কাঁপতে লাগল। সে ভুলে গেল বাদল তার খালাত ভাই। বাদল নামটা শুনে মাহমুদার দুই ফুফাত বোনও অস্ফুটে ছিঃ ছিঃ করতে লাগল। বাদলের মা সেখানে ছিলেননা, শায়লাবানুও না। বোধকরি ঘুমে।

এতরাতে বাবাকে কষ্ট দেয়াও মাহমুদা সমীচিন মনে করলনা। হয়তো সবাইকে ডাকিয়ে ঘুম ভাঙ্গানো যাবে কিন্তু তাতে কাজ কিছু হবেনা। তাই খানিক ভেবে সে শিউলীকে বললো,

: কাঁদিসনা শিউলী, আয় আমার রুমেই ঘুমাবি।

 

সকাল হলে বিদ্যুতগতিতে সকলের কানে পৌঁছে গেল রাতের ঘটনা। মাহমুদার আর বলার প্রয়োজন হয়নি। বাদল সেই যে কাকডাকা ভোরে উধাও হয়েছে আর কোন দেখা নেই। সে এ বাড়ীতে আর কোনদিন আসবেনা এটা পরিস্কার। শায়লা বানু সমস্ত শুনে বাদলের বিরুদ্ধে কিচ্ছু বললেননা। বাহাউদ্দীন সাহেবের নিকট গিয়ে শুধু শিউলীর ব্যাপারে বললেন,

: আবারো বলি যার মেয়ে তার নিকট পাঠিয়ে দাও। তারা মেয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিক। সেই ছোট্টটি তো আর নেই। কখন কি অঘটন ঘটে।

বাহাউদ্দীন সাহেব চমকে উঠে স্ত্রীর দিকে চাইলেন শুধু। এবারও সরাসরি কোন জওয়াব দিলেননা। তিনি জানেন জওয়াব দিলে শায়লা বানু ঘরকে কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ছাড়বে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে কলিজার টুকরা সন্তান মাহমুদার উপর। আসলে তিনি মনে মনে শিউলীর জন্যে একটি পাত্র খোঁজ করছিলেন। ভাল পাত্র পাওয়া গেলে, হোক সে দিনমুজুর বা শ্রমিক, বিয়ে দিয়ে দেবেন এটাই ছিল তার পরিকল্পনা। তাই পঁয়তাল্লিশোর্ধ এই প্রৌঢ় নীচের দিকে চেয়ে শুধু মনে মনে বললেন,

: শায়লা বানু, আল্লাহ তোমাকে হেদায়াত দান করুন।

 

প্রায় সপ্তাহ দুই পরের ঘটনা। বাহাউদ্দীন সাহেব একমাত্র মামার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গ্রামের বাড়ী কুমিল্লা গিয়েছেন। সাথে মাহমুদা। শায়লা বানু যাননি।

তিনিও যদি যান তাহলে বাড়ীতে কে থাকবে! বাহাউদ্দীনও পীড়াপীড়ি করেননি। বাড়ীতে শায়লা বানু এবং শিউলী। শিউলী একবার তার মাহমুদা আপার কানে কানে যাওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল। শায়লা বানু শুনে এক ধমকে বসিয়ে দিয়েছেন।

বাহাউদ্দীন সাহেবের ফিরতে একদিন লেগে যাবে। হয়তো আগামীকাল সন্ধ্যা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছাতে পারেন। শায়লা বানুর মাথায় কি বুদ্ধি এলো কে জানে, সোহরাব মিয়াকে তিনি টেলিফোনে আসতে খবর দিলেন। বাড্ডার একটা মেসে সে থাকতো। ফোন পেয়ে নিজের রিক্সা নিয়েই চলে এল সোহরাব। ঢাকা শহরে তার মেয়ে ছাড়া আপন আর কেউ নেই। একবার সায়েদাবাদ মোড়ে ট্রাকের নীচে পড়তে গিয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় সোহরাব। কেউই জানেনা আগামীকালের জীবনখাতায় তার জন্যে কি লিখা আছে...., কুরআনের এ কথাটি সে সেদিন মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করেছে। আরও একটা জিনিস তার মমতাবুভুক্ষু পিতৃহৃদয়ে উঁকি দিয়ে গিয়েছে। তা হচ্ছে, যদি সে ঢাকা শহরেই হঠাৎ করে মারা যায়, তাহলে তার জন্য কে কাঁদবে? উত্তর থেকে দক্ষিণ, পুর্ব থেকে পশ্চিম মন তার হন্যে হয়ে খুঁজে খুঁজে মাত্র একজনকে পেয়েছে, যে কিনা তার জন্য কাঁদবে যদি সে মারা যায়। সে আর কেউ নয় তার কলিজার টুকরা শিউলী। এরপর থেকে তার মন চাইত প্রতিদিনই মেয়েকে দেখতে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার চোখের সামনে ভেসে উঠত বেগমসাহেবার রুদ্রমুর্তি। প্রত্যহ এলে বেগমসাহেবা খুশী হবেননা, এটা সে জানত।

 

বাবার আসার খবর পেয়ে দৌড়ে গিয়ে সালাম জানিয়ে এল শিউলী। আগে কদমবুসি করত। কিন্তু মাহমুদা বারণ করায় এখন তা সে করেনা। মাহমুদা বলেছে, কদমবুসি করার চেয়ে “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্” বলা শতগুণে উত্তম। কারণ এ সালামের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর দয়া ও রাহমাত কামনা করে। আল্লাহও এতে খুশী হন। তাছাড়া আল্লাহর রাহমাত বিনে বান্দারতো কোন গতি নেই, তা সে আল্লাহকে মানুক বা না-ই মানুক। তাছাড়া কদমবুসি ইসলামী আদর্শ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী একটা প্রথা। যাতে কল্যাণের লেশমাত্র নেই। কেন আমরা সালামের মত কল্যাণময় প্রথা বাদ দিয়ে হাস্যকর একটা রেওয়াজ নিয়ে পড়ে থাকব . . . মাহমুদা যা-ই বলে খুব ভাল লাগে শিউলীর। যেন এসব তারই মনের কথা।

শায়লা বানু সোহরাব মিয়াকে ড্রইং রুমে বসিয়ে শিউলীকে বললেন,

: শিউলী, তোর বাবার জন্যে সেমাই আর চা তৈরী কর।

শিউলীর বাবা এলে তার জন্যে কখনো সেমাই তৈরী হয়না। বেগম সাহেবার আজ এ অভূতপুর্ব আচরণে অবাক হল সে।

চা, নাস্তা পরিবেশনের পর শায়লা বানু গায়ে আঁচল টেনে দিয়ে ড্রইং রুমে প্রবেশ করলেন। বাহাউদ্দীন সাহেব বাসায় থাকলে এ মহিলা কোনদিন সোহরাব মিয়ার সামনে যান না। আজ বাধা নেই তাই স্বয়ং মহাকর্ত্রীর ন্যায় ড্রইং রুমের বড় চেয়ারে গিয়ে বসলেন। সোহরাব মিয়ার দিকে আপাদমস্তক চেয়ে বললেন,

: সোহরাব মিয়া! তোমার মেয়েতো বড় হল। বিয়ে-শাদী দেবেনা?

এ হেন প্রশ্নের জন্যে সোহরাব প্রস্তু ছিলনা। তাই জবাব দিতে গিয়ে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,

: জী, মানে চিন্তা তো করি। আইজ কাইল ভাল পাত্র পাওয়াডাওতো কষ্টের ব্যাপার। তা, ভাবীজান আপনারা কি কোন পাত্র টাত্র . . . . ।

: না, আমরা কোন পাত্র পাইনি। সোহরাবের কথা শেষ না হতেই সোজা সুজি জওয়াব দিয়ে দিলেন শায়লা বানু।

যেন একটা শক খেল সোহরাব। শায়লা বানুর কোন কথা বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সে। ভেতরটা তার টিপ টিপ করছে। পিপাসায়ও যেন গলা শুকিয়ে আসছে। পানির জগ সামনেই ছিল। গ্লাসে পানি ঢেলে ঢক ঢক করে পুরো এক গ্লাস পানি পান করল সে।

যে অন্তর দয়া ও মমতাশূন্য, মানুষের অসহায়ত্ব নাকি তাকে কখনোই বিচলিত করেনা। শায়লা বানুকেও করলনা। রিক্সাওয়ালা সোহরাবের করুণ ও কিংকর্তব্যবিমুঢ় চেহারা শায়লা বানুর সিদ্ধান্তে কোন পরিবর্তন আনতে পারলনা। সোহরাবের চোখে চোখ রেখে শায়লা বানু বললেন,

: মানে আমরা চাই, তুমি এবার তোমার মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। সাত বছর ধরেতো আমরা তাকে লালন-পালন করলাম।

সোহরাবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। মাথাটা তার ঘুরছে। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করল সে। দিনমজুর হলেও আত্মসম্মানবোধ তার ছিল এবং দুনিয়া-সংসারের রীতি-নীতি সম্পর্কেও মোটেই অনভিজ্ঞ ছিলনা। বাহাউদ্দীন সাহেবরা তার আপন কেউ নন, শিউলীকে যদি তারা রাখতে না চান তাহলে করার কিছু নেই। তাই ব্যাথাভরা সুরে বলল,

: ঠিক আছে ভাবীজান। রিজিগের মালিকতো আল্লাহ্। একটু থেমে আবার বললো,

: ভাইজানরে যে দেখতাছিনা?

: দেশে উনার মামা মারা গেছেন। তাই মাহমুদাকে নিয়ে এখন কুমিল্লাতে আছেন। ফিরতে দেরী হবে। উনার মনের অবস্থা এখন ভাল নয়, এসব ব্যাপারে তাকে বিরক্ত না করলেই ভাল করবে।

এটুকু বলে সেদিনকার রাতের ঘটনাও সংক্ষেপে সোহরাবকে শুনিয়ে দিলেন শায়লা বানু। সে কাহিনী শুনে যেন ভীত হয়ে পড়ল সোহরাব। আর কোন চিন্তা না করে এবার বললো,

: তাইলে আইজকাই শিউলীরে লইয়া যাই কি কন? আইজ সন্ধ্যায়ই একটা ষ্টীমার আছে বরিশালের।

শায়লা বানু দ্রুত জওয়াব দিলেন,

: হ্যাঁ, নিতে পারো।

: মা শিউলী! দরজার দিকে তাকিয়ে শিউলীকে ডাক দিল সোহরাব।

: শিউলী, এদিকে আয়...

শায়লা বানুও তাকে ডাকলেন। শিউলী দরজার পাশেই ছিল। বেশীরভাগ কথাই সে শুনেছে। এখানে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের বিনিময়েই তার থাকা-খাওয়া মিলছে; এর উপর বেগমসাহেবার নিগ্রহ। কিন্তু এখান থেকে চলে যেতে হবে... এ খবরে অপ্রস্তুত হয়ে গেছে শিউলী। ভেতরটা তার উথাল পাথাল করছে। একবার মন তার চলে যাচ্ছে বরিশালে, ছবির মত এক এক করে ভেসে উঠছে ছোটবেলার সেসব চিত্র... সৎ মা তার নিজের সন্তানদের পাতে মাছ তুলে দিচ্ছে, তার পাতে এসেছে শুধু ঝোল। সে তা ই খাচ্ছে। সৎ মা সাবান মাখিয়ে গোসল করাচ্ছে তার আপন সন্তানদেরকে কিন্তু তাকে কেউ গোসল করিয়ে দিচ্ছেনা। সে সাবান চাইছে সৎ মায়ের কাছে, মা বলছে সাবান নেই, এমনি গোসল করে আয়। প্রতিদিনই ছাগল দুইয়ে দুধ জ্বাল দেয়া সে দেখে, কিন্তু দুধ সে কোনদিনও খেতে পায়না। মাঝে মধ্যে সে তার সৎ ভাইদেরকে দুধের সর খেতে দেখে। একদিন তার গোসল করে আসতে দেরী হয়, সৎ মা বললেন,

: আইজ ভাত শেষ হইয়া গেছে শিউলী রাইতে খাইছ . . . ইত্যাদি ইত্যাদি।

আবার তার মন ছুটে আসছে বাহাউদ্দীন সাহেবের ধানমন্ডির এ বাড়ীতে। যেখানে রয়েছে তার প্রিয় মাহমুদা আপা। বেগমসাহেবা শিউলীর জন্য বরাদ্দ করে দিচ্ছে দু’টুকরা গোশত, মাহমুদা নিজের থেকে তার বাটিতে এনে দিচ্ছে আরও একটি টুকরা। সারাদিন কাজের পরও বেগমসাহেবা তাকে বার বার দোকানে পাঠাচ্ছে, এটা দেখে মাহমুদা তার আম্মাকে বলছে,

: আম্মা, অধীনস্তদের প্রতি রহমদিল হও তাহলে আল্লাহও তোমাকে রহম করবেন।

বেগমসাহেবা তাকে এক গাটরি কাপড় দিয়েছে ধোয়ার জন্য, তা দেখে মমতাময়ী মাহমুদা নিজের কাপড় নিজেই ধুয়ে নিচ্ছে . . . ইত্যাদি ইত্যাদি।

সবশেষে মন তার বাহাউদ্দীন সাহেবের বাসায় এসেই ঠেকল। মন বলল,

: শিউলী তুমি এ বাড়ীতেই থাক।

 

শিউলীর কোন সাড়া না পেয়ে শায়লা বানু ড্রইং রুম থেকে বাইরে এসে বললেন,

: শিউলী, তোর বাবা কি বলে শোন।

: এদিকে আয় মা।

: বাবা, আমি সবই শুনেছি। এখন আপনি কি বলেন? পিতাকে সুধাল শিউলী।

: মা, এনারা যদি আর তোরে রাখপার না চায়, তাইলে ত জোর কইরা থাকপার পারবিনা। তুই রেডি হ। আমি গাড়িডা গেরেজে রাইখা আহি।

: পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল শিউলীর। মাথা তার ঘুরছে।

অবশেষে এভাবেই কি বিদায় নিতে হবে শিউলীকে? হৃদয়তন্ত্রী যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে তার।

কি জানি কি মনে করে, রান্নাঘরে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল সে। বোধকরি হৃদয়ের তোলপাড় কিংবা অশ্রু ঢাকতে চাইছে।

এদিকে অনেকক্ষণ পর্যন্ত শিউলীর কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে শায়লা বানু শিউলীকে হাঁক দিলেন। বললেন, : তোর বাবা বলল, একটু পরেই তোকে নিতে আসবে, তুই রেডী হচ্ছিসনা কেন?

কথাগুলো শিউলীর ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়কে যেন ভেঙ্গে চুরমার করে দিল। করুণ চোখে শুধু একবার সে চাইল তার গৃহকর্ত্রীর দিকে। হঠাৎ কি যেন হল তার, দাঁতে দাঁত চেপে কান্না রোধ করে কাপড় চোপড় গোছানো শুরু করল সে। বোধকরি তীব্র অভিমান তার সত্তার মধ্যে এবার শক্তি সঞ্চয় করল।

এক হাতে অশ্রু মুছছে আর অন্য হাতে নিজের কাপড়-চোপড় গোছাচ্ছে সে। সোহরাব মিয়াও তাড়াতাড়িই ফিরে এসেছে। যাবার সময় শিউলীকে জিজ্ঞেস করল,

: বিবিসাবরে কইছস?

শিউলীর অভিমান তখনো কাটেনি, কথা বলবে কি।

সোহরাব আবারও বলল,

: যা, বিবিসাবরে কইয়া আয়। ইহজীবনে আর দেখা যদি না অয়।

পিতৃআদেশ পালন করতে তার ম্যাডামের সামনে গিয়ে দাঁড়াল শিউলী। ’আম্মা’ বলে ডাকার বদলে ম্যাডাম বলে ডাকার নির্দেশ ছিল সেই প্রথম থেকে। কিন্তু সরলা এ কিশোরী, যার ভেতরে-বাইরে এক, ম্যাডাম শব্দ তার মুখ দিয়ে আজ এলনা। তাই কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,

: চলি আম্মা, আসসালামু আলাইকুম।

শায়লা বানু জবাবে বললেন,

: ওয়ালেকুম স্লাম। বাপকে নিয়ে পরে একদিন বেড়াতে আসিছ, কেমন!

 

বরিশালগামী দোতলা ষ্টীমার। দোতলার পাটাতনের এক কোণে একটা ২য় শ্রেনীর কেবিনের পাশে চাদর বিছিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসেছে সোহরাব মিয়া। ষ্টীমার ঘাট ছেড়ে এসেছে বিকাল সাড়ে পাঁচটায়। এখন প্রায় রাত ৮ টা বাজে। শিউলী বোরখা পড়ে এসেছে। মাহমুদা তাকে বোরখা কিনে দেয়ার পর কখনো সে সালোয়ার কামিজ পড়ে বাইরে যায়নি। সোহরাব মিয়ার কাছে অনেক কিছুই অবাক লাগছে... মেয়ে তার, পরপুরুষের সাথে কথা বলেনা, ঠোঁটে লিপষ্টিক দেয়না, বোরখা ছাড়া বাইরে বের হয়না . . .।

মনটা তার গর্বে ফুলেও উঠেছে।

 

যাত্রীদের বেশীর ভাগই শুয়ে পড়েছেন। সোহরাব মিয়া কেবিনের দেয়ালে ঠেশ দিয়ে বসে আছে। সামনে শিউলী। কোলাহল, মানুষজনের উঠানামা, ব্যস্ততা ইত্যাদির কারণে এতক্ষণ স্বাভাবিকই ছিল শিউলী। কিন্তু এখন আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে সে। ষ্টীমার এখন মাঝ নদীতে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। শিউলী চেয়ে আছে একদৃষ্টে, দূরে... বহু দূরে। বর্ষার পানি যেমন কচু পাতায় জমা হয়ে একসময় ভার সইতে না পেরে টুপ করে ঝরে পড়ে মাটিতে, শিউলীর চোখ থেকেও বোধ করি তার অজান্তেই, তেমনি দু’ফোঁটা পানি ঝরে পড়ল তার কোলের উপর। নদীর পানিগুলো আবছা অন্ধকারেও চিক চিক করছে, শিউলীর কাছে মনে হচ্ছে যেন তারই অশ্রু দিয়েই তৈরী হয়েছে এ নদী। সোহরাব মিয়াও অন্যমনস্ক। তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এখন হাজারো চিন্তা। শিউলীর মা মারা যাবার পর দু’টি শিশু সন্তানসহ ফুলবানুকে বিয়ে করে সোহরাব। এরপর তার ঔরসেও এসেছে একটি ছেলে। শিউলীকে নিয়ে এখন তার পরিবারের সদস্য সংখা ৫ জন। রুযী নিয়ে খুব একটা চিন্তা সোহরাব করেনা। তার এখন প্রধান চিন্তা বিবাহযোগ্যা শিউলীকে নিয়ে। এখন তাকে যদি বলা হয়, তোমার সামনে দু’টি পথ- হয় তোমার নিজের জীবন অথবা তোমার কলিজার টুকরা সন্তান শিউলীর সুখ। কোনটি তুমি নেবে? সোহরাব মিয়া নির্দ্বিধায় বলতে পারে, শেষেরটিকেই সে বেছে নেবে। সে তার সব হারাতে রাজি কিন্তু শিউলীর দুঃখ সে সইতে পারবেনা।

: চা গরম, এ্যাই গরম চা- ফেরিওয়ালার হাঁকে চিন্তায় ছেদ পড়ল সোহরাবের।

: চা খাবিরে মা? সোহরাব মিয়া সুধাল মেয়েকে।

: না , বাবা। তুমি এক কাপ খাও।

 

ষ্টীমার মুন্সীগঞ্জ ছেড়েছে অনেকক্ষণ হল। এরপর চাঁদপুর, অতঃপর বরিশাল। রাতের নিস্তব্দতা ছাড়িয়ে শুধু ভেসে আসছে ষ্টীমারের চাকার ঝুপ ঝাপ শব্দ। মনে হচ্ছে একদল অচেতন প্রাণীকে নিয়ে সাগরবক্ষে ভেসে চলেছে এ শকটযান। ক্লান্তিতে একবার হাই তুলল সোহরাব মিয়া।

: তুমি ঘুমাও বাবা। বলল শিউলী।

: তুই কি জেগেই থাকবি?

: এত পুরুষমানুষের সামনে আমি শুতে পারবনা বাবা। আর একটি ঘাটের পরেইতো বরিশাল তাইনা?

: হ্যাঁ, মা।

 

শিউলী ঢাকা থেকে ফিরে এসেছে আজ চার দিন হলো। সে একেবারেই ফিরে এসেছে, একথা সোহরাব কাউকে এ পর্যন্ত বলেনি। ফুলবানুকেও না। শিউলীও কাউকে নিজেরে দুঃখের কাহিনী বলেনি। ফুলবানু ধারণা করছিল,

: শিউলী বেড়াতে এসেছে, ক’দিন পরই হয়তো আবার ঢাকায় ফিরে যাবে। কিন্তু আজ হঠাৎ করে সোহরাব মিয়ার কি একটা কথায় শিউলীর ব্যাপারটি প্রকাশ হয়ে পড়ায় প্রমাদ গুনলো ফুলবানু। স্বামী সোহরাব মিয়া মাস দুই পর পর এসে কিছু টাকা ফুলবানুর হাতে রাখতে দিত, আর বলত,

: এইগুলা শিউলীর চাকুরীর টাকা, তার আমানত। খরচ কইরোনা।

সে টাকা এ পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে দেড় হাজার হয়েছে। ফুলবানুর মনে হঠাৎ কি বুদ্ধির উদয় হল কে জানে। শিউলীর একেবারে ফিরে আসার খবর শুনামাত্র গোপনে সে টাকাগুলো ছেলে আব্দুল জলিলের মাধ্যমে বাপের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিল। এ চারদিন শিউলীর থাকা খাওয়ার কোন ব্যাঘাত হয়নি। আদরও যথারীতি পেয়ে আসছিল। কিন্তু আজ ব্যতয় ঘটল। তার সৎভাই-বোনদের সাথে একত্রে বসে খাওয়ার জন্যে আজ দুপুরে শিউলীকে আর ডাকা হলোনা। শিউলী ভাবল হয়তো খাবার কম, সকলের সংকুলান হবেনা তাই তাকে ডাকা হয়নি। ঠিক আছে রাতে খাওয়া যাবে। সোহরাব মিয়া বাড়ীতে ছিলনা, রাতে ফিরে শিউলীকে নিয়ে খেতে চাইল। ক্ষুধায় শিউলী কাহিল হয়ে পড়েছিল কিন্তু ধৈর্যে ছিল অনঢ় তাই মৃদু হেসে বলল,

: বাবা তুমি আগে খাও। আমি পরে খেয়ে নেব না হয়। সোহরাব বলল,

: নারে মা, তুই ব, আমার লগেই ব।

অগ্যতা শিউলী বাবার সাথে খেতে বসল তবে বসার আগে তার স্বভাবসুলভ ভদ্রতা ও উদারতার সৌজন্যে যা সে মাহমুদার নিকট থেকে শিখেছে... সৎমাকে বলল,

: মা, আপনিও একসাথে বসে পড়ুন।

 

শিউলী শুদ্ধ ভাষা ছাড়া কথা বলতে পারেনা, এর কারণ তার ভাষার হাতে খড়ি এবং পটুতা সবই হয়েছে এমন এক পরিবেশে যারা শুদ্ধ ছাড়া বলতেননা। তাই শিউলীর বরিশালে আসার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত যখনই সে শিউলীর কথা শুনেছে, কখনো ফিক করে হেসে দিয়েছে, কখনোবা তম্ময় হয়ে চেয়ে থেকেছে। এখন ফুলবানু হাসলোওনা, তার দিকে চাইলোওনা, শুধু নীচের দিকে মাথা রেখে বলল,

: তুমি খাও, আমি বাদে খাইমু।

তবে ফুলবানু যে আজ চিন্তিত এটা সোহরাব মিয়া বা শিউলী কারুরই দৃষ্টি এড়ালো না। কিন্তু চিন্তার কোন কারণ খুঁজে না পেয়ে সেদিকে তারা আমল দিলনা।

খেতে খেতে শিউলীর দিকে চেয়ে সোহরাব বলল,

: শহরে গেছিলাম, তর লাউগ্যা একডা চাকরীর খোঁজে। নতুন একডা গার্মেন্টস অইছে। হেইয়ানো গিয়া খেয়াল অইলো, আরে তুইত সেলাই কাম জানসনা।

: বাবা, বরিশাল টাউনে কোথাও সেলাই কাজ শেখা যায়না?। সুধাল শিউলী।

: সেলাই কামত কত জায়গায়ই হিখন যায়। কাইল যামু, দেহি কদ্দুর কি করন যায়।

 

সোহরাব মিয়া একটা সেলাই প্রশিক্ষন কেন্দ্র দেখে এসেছে। কিন্তু তা এত দূরে যে শিউলীর যেতে আসতেই দৈনিক দু’ঘন্টা হাঁটতে হবে। তাছাড়া শিউলীকে একা এত দূরে যেতে দিতেও সোহরাব রাজি নয়। তাই কাছাকাছি কেউ সেলাই কাজ শেখায় কিনা ৩ দিন ধরে তা অনুসন্ধান করছে সোহরাব। ঐদিকে তারও ঢাকায় ফিরে যাওয়া দরকার। মালিককে সে বলে এসেছে, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সে ফিরে আসবে। বেশী দেরী করলে রিক্সা অন্য কাউকে দিয়ে দেবে।

শিউলী এসেছে আজ ৮ দিন পার হতে চললো। এখন সে দু’বেলা খাবার পায়। দুপুরে খেলে রাতে পায়না। রাতে পেলে সকালে নাস্তা মেলেনা। শিউলী কুধারণা করতে শিখেনি। সে ধরে নিয়েছে, যে ভাত রান্না হয় তা হয়তো পরিমাণে কম তাই শুধু ছোটদেরকে দেয়া হচ্ছে। প্রথম ৪ দিন মাহমুদার কথা তার মনে আসেনি, হয়তো ব্যস্ততার কারণে। কিন্তু এখন মনে পড়ছে। ছোট্ট শিশু হঠাৎ মাকে দেখতে না পেলে যেমন তার অন্তর উথাল পাথাল করতে থাকে, অতঃপর তা প্রকাশ করে কান্নার মাধ্যমে। শিউলীর অবস্থা ঠিক ঐরকম হল। রয়ে রয়ে কেবলই এখন তার মাহমুদা আপার স্নেহ আদরের কথা মনে পড়ছে আর অন্তরে বইছে ঝড়।

এখন নামাজে দাঁড়ালেই তার মন চলে যায় সেই ঘরে, যেখানে দু’জন একসাথে নামাজ আদায় করত। সে দাঁড়াত তার মাহমুদা আপার ডানে। অশ্রু তার বাঁধ মানেনা তখন।

 

আজ ঢাকায় যাচ্ছে সোহরাব মিয়া। চাকুরী বজায় রাখতে হলে তাকে যেতেই হবে। ইস্তফা দিলেও একবার যেতে হবে। শিউলীর জন্য এপর্যন্ত সে কিছুই করতে পারেনি। তাই মনে মনে সে পরিকল্পনা করেছে আবার ঢাকায়ই নিয়ে যাবে সে শিউলীকে। সেখানে রেখে সে তাকে সেলাই কাজ শিখাবে। সেলাইটা শিখতে পারলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। বিয়ে হলেও লাগবে।

শিউলী বাবাকে বিদায় দিতে গিয়ে একবার তার মাহমুদা আপার নামটা উচ্চারণ করতে গিয়েও থেমে গেল। সোহরাব মিয়া তার এই ইয়াতীম কন্যার হৃদয়াবেগ বুঝল কিনা বুঝা গেলনা। সুধাল,

: কিছু কইবিরে মা? কাঁপা স্বরে শিউলী বলল,

: না বাবা, তুমি শিগগীরই ফিরে এসো।

যতক্ষণ পর্যন্ত না বাবা চোখের আড়াল হলো ততক্ষন উঠোনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে শিউলী চেয়ে রইল তার গমন পথের দিকে।

 

: আপু, মায় আপনেরে বোলায়।

মাগরিবের নামাজান্তে বসে মোনাজাত করছিলো শিউলী। সৎবোন ছোট্ট বিলকিসের ডাকে পেছন ফিরে চাইল সে।

: মায় আপনেরে বোলায়।

: আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আসছি।

শিউলীর মনে একরাশ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কি কারণে মা তাকে ডাকতে পারেন? গতকাল তিনি বলেছিলেন সাজু নামে এক যুবক নাকি তাকে গার্মেন্টসে চাকুরীর কথা বলেছে। নতুন বাজারে বড় একটি টেইলারিং দোকানে কাটিং মাষ্টারের হেলপার হিসাবে চাকুরী। মা যেভাবে তার চাকুরীর জন্যে উঠে পড়ে লেগেছেন, এমতাবস্থায় হয় শীঘ্রই তাকে কোন চাকুরীতে ঢুকতে হবে নয়তো এখান থেকে চলে যেতে হবে। অবস্থা তাই বলছে। গত পরশু মা তাকে বলছিলেন,

: কিছু একডা রোজগার করন লাগব গো শিউলী। চাইরডা মুখ। তর বাপের আয় ত তুই জানস।

মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল শিউলী।

ফুলবানু কুপি জ্বালাচ্ছিল। শিউলীকে দেখে কোনরূপ ভূমিকা না করেই বলল,

: সাজু কইছে, চাকরীডা নেয়নের লাইগ্যা নাকি লাইন পইরা গেছে। তর মতডা ত জানাইলিনা। কি . . ? যাবি?

বাহাউদ্দীন সাহেবের বাসায় শায়লা বানু কোন অবিচার করলে মাহমুদা তাকে আশ্রয় দিত কিন্তু এখন সে অবলম্বনও নেই। শিউলী বোধকরি এই প্রথম অনুভব করল, এ ইহজগতে এখন আপন বলতে তার কেউ নেই। চোখ ফেটে তার পানি আসতে চাইল। কান্না রোধ করে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,

: আমি বাবার জন্যে অপেক্ষা করতে চেয়েছিলাম মা।

: তর বাপে কহন আহে কেডা জানে। চাকরী কি তর বাপের লাইগ্যা বইয়া থাকব?

: কিন্তু আমার যে ভয় লাগে মা। কান্নাভেজা কন্ঠে অনুনয় জানাল শিউলী।

: ভয়ের কি আছে। সাজু আমাগো গেরামের লোক। তরে হেয় মাষ্টারের লগে পরিচয় করাইয়া দিয়া আইবো। পরেত তুই একলাই যাবি। নতুন রাস্তার মোড় গেলেই রিক্সা।

: ঠিক আছে মা। তাকে আসতে বলো।

: সাজুকে তার মা চেনে, সে এ গ্রামেরই ছেলে শুধু এই পরিচয়ে শিউলী যাচ্ছে তার সাথে। শিউলী বোরখা পরে এসেছে। রাস্তায় বের হয়েই শিউলী সাজুকে বলল,

: আপনি আগে আগে চলুন ভাই, আমি আপনার পেছনে হাঁটব।

: ঠিক আছে বোন। কোনো অসুবিধা নাই।

সাজুর উত্তর শুনে শিউলী যেন মনে মনে ভরসাই পেল। নতুন রাস্তার মোড়ে গিয়ে সাজু বলল,

: চলেন এইখান থেইকা আমরা রিক্সায় যামু। শিউলী সাথে সাথে বলল,

: না, না। আমি হেঁটে যাব।

পরপুরুষের সাথে এক রিক্সায় যাওয়া মানে শয়তানকে সাথে নেওয়া... কথা ক’টি বলতে গিয়েও থেমে গেল শিউলী। মনে মনে ভাবল, এত কথার কি দরকার।

 

প্রায় দু’মাইল হাঁটার পর নতুন বাজার টেইলারিং শপে এসে পৌঁছল শিউলী ও সাজু। সাজানো গোছানো বড় টেইলারিং শপ। ভেতরে দু’পাশে দেয়াল জুড়ে সার্ট, পেন্ট এবং সালোয়ার কামিজ টানানো। বোধকরি মহিলা কাষ্টমার আকৃষ্ট করার জন্যে মহিলা হেলপার রাখতে চায় মাষ্টার। দোকানে আরও দু’জন লোক বসে আছে। বয়স তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। খানিক ইন্টারভিউ নেয়ার পর মাষ্টার বুঝলেন, শিউলী খুবই ভাল মেয়ে কিন্তু টেইলারিং শপ চালানোর জন্য যে যোগ্যতার দরকার তা এ কিশোরীর নেই। তাই তিনি শিউলীকে নিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। টেইলারিং শপে বসা লোক দু’টো তৎক্ষণাৎ বাইরে একটু দূরে গিয়ে কি যেন পরস্পর কথোপকথন করল। শিউলী তখনো টেইলারিং শপের ভেতরে বসা। একটু পর লোক দু’টো সাজুকে ডেকে নিয়ে গেল। প্রায় মিনিট পনের পর সাজু ফিরে এসে টেইলার মাষ্টারকে বলল,

: দেরী অইয়া গেল মাষ্টার সাব কিছু মনে কইরেননা। আইচ্ছা আমরা তাইলে যাই। তয় আমি আপনের লাইগ্যা হেলপার দেখতাছি। আর দুইডা দিন আমারে সময় দেন।

বাইরে এসে শিউলীর একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে সাজু বলল,

: বোন, আরও একটা দোকান আছে হেইহানেও নাকি লোক লাগব। চল দেইখা আহি। বলে শিউলীর কোন মতামতের অপেক্ষা না করেই সাজু হাঁটা শুরু করল। শিউলী কি করবে ভেবে পেলনা। নিরুপায় হয়ে আস্তে আস্তে সাজুর গমন পথের দিকে হাঁটতে লাগল সেও। তিনটি গলি পেরিয়ে একটি টেইলারিং শপের একবারে দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে সাজু বলল,

: আস বোন।

শিউলী দেখল এটাও একটি টেইলারীং শপ। দ্ধিধাগ্রস্থ হলেও সাহসে ভর করে দোকানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল সে। ভেতরে একজন মাত্র লোক বসা। তবে পেছন দিকে হার্ডবোর্ডের আরও একটি দরজা। মনে হচ্ছে একই ঘরে দু’টো পার্টিশন। সাজু সে দরজার কাছে গিয়ে বলল,

: এদিকে আস বোন, মাষ্টার এখানে ভেতরে।

শিউলী বিন্দুমাত্র না ভেবে সেই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। বোধকরি পুর্ব থেকেই ভেতরে লুকিয়ে ছিল আরও দু’জন লোক। শিউলী ঢোকামাত্র তারা বিদ্যুৎগতিতে তার মুখে কাপড় পেঁচিয়ে ধরল। ৩ জন বলিষ্ঠ পুরুষের সাথে শিউলী একা আর কতক্ষণ পারে। দোকানের শোরুমে বসে থাকা লোকটিও ততক্ষণে বড় দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে এদের সাথে মিলিত হলো। এবার ৪ জন একত্রে এ দুঃখিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

 

এর পরের ঘটনা বড়ই বেদনাবিধূর। কলমে তা প্রকাশ করা যায়না।

সংক্ষেপে এইঃ লোকগুলোর মনে যখন সন্দেহ হল যে, শিউলী এর প্রতিশোধ নেবে বা ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়বে তখন তারা গলাটিপে তাকে হত্যা করে ফেলল।

 

শিউলীর এ মর্মান্তিক মৃত্যুর পর পিতা সোহরাব মিয়া এবং ওদিকে ঢাকায় বাহাউদ্দীন সাহেব ও মাহমুদা কি করেছিলেন তা আমরা জানিনা। জানার খোঁজ করার মত মনের অবস্থা বা শক্তিও আর আমাদের অবশিষ্ট নেই। তবে বিদায় বেলায় পাঠকের কাছে একটা মিনতি, এমনি শিউলী যদি কারুর ঘরে থাকে, নিরাশ্রয় যেন না করেন।

সমাপ্ত


যোগাযোগ: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

লেখকের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: -আতাউর রহমান সিকদার

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes