বোধশক্তিহীনতার দিনগুলো কি আবার ফিরে এসেছে?

Print
Category: সম্পাদকীয়
Published Date Written by সম্পাদক

বোধশক্তিহীনতার দিনগুলো কি আবার ফিরে এসেছে?


ইসলামের ইতিহাসে জাতিগতভাবে বোধ শক্তি হারানোর ঘটনা প্রথম ঘটে তাতারীদের আক্রমণের সময়। এ সম্পর্কে জানা যায় যে, জনপদের পর জনপদ যখন তাতারীদের নির্বিচার ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞে ধ্বংস হতে লাগলো, তখন সাধারণভাবে মুসলমানগণ যেন অনেকটা বোধশক্তিহীনের মত হয়ে যায়। কোথাও কোথাও এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, একজন তাতারী কিছুসংখ্যক মুসলমানকে আটক করে হত্যা করার জন্য। কিন্তু তার কাছে তরবারী নেই। সে মুসলমানদের দলটিকে অপেক্ষমান রেখে বলে যে, সে বাজারে যাবে, বাজার থেকে তরবারী কিনে এনে তাদেরকে হত্যা করবে -এই বলে সে বাজারে চলে গেল। আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, মুসলমানদের সেই দল ঠিক সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকলো। সেখান থেকে চলে যাওয়ার কথা তারা ভাবতেও পারলো না।

তাতারীদের উত্থানের বহু বছর পর যখন মুসলিম বিশ্ব শান্ত হয়ে আসলো, তখন আলেম-ওলামাগণ এ বিষয়টিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। সেদিকে না গিয়ে ঐতিহাসিক এই বোধশক্তি হারানোর অবস্থাটি বর্তমানে খুঁজে দেখা আমাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমানের ইসলামী দুনিয়ায় মুসলিম হত্যা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে যে, মুসলমানগণ নিজেরাও এতে খুব একটা হতবাক হন না যতটা হতবাক হন মুসলিম হত্যাকারী কোন কাফের সৈনিকের নিহত হবার সংবাদ শুনে। একদিকে প্রকাশ্যে মার্কিন চালকবিহীন বিমানের হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে মুসলিম নামধারীরা নিজেদেরকে ক্রমাগত কারণে-অকারণে গণহত্যা চালিয়ে যাওয়া, সর্বোপরি গ্রেফতারের নামে অপহরণ ও গোপনে হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা দেখে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোও হতবাক। সেখানে মুসলিম বিশ্ব অনেকটা গা-সওয়া নির্বিকার। প্রসঙ্গ দেশে দেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নয়।

মুসলিম বিশ্বাসে মৃত্যু খুব বড় কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ব্যক্তির মৃত্যুকালীন সময়ের বিশ্বাস, অবস্থা ও কারণ।

এসব গুরুত্ববহ বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা ব্যক্তির নিজের সাথে সম্পৃক্ত শুধু নয়; বরং একটি অদৃশ্য শিকলে বাঁধা এসব বিষয়সমূহ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, কৃষ্টি, কালচার, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, রাজনীতি, সমরনীতি ইত্যাদি সকল দিক ও বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত। আর সেই সাথে এসব সম্পৃক্ততার কর্ণধারবৃন্দের সাথেও ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একটি ঘটনার জন্য শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিই দায়ী নন; বরং ব্যক্তির এ ঘটনা সংঘটনের পেছনে পর্যায়ক্রমিকভাবে যারাই যেভাবে জড়িত ছিল দীর্ঘদিন ধরে, তারা সকলেই এর জন্য নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্বের কারণে অংশিদারিত্বের হারে দায়ী।

বর্তমান সময়ের মুসলিম বিশ্বের জাতিগত বোধশক্তিহীনতার প্রকট রূপ দেখা যাচ্ছে অপবাদের ক্ষেত্রে। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো মুসলিম বিশ্বের গলিত সোনার প্রতি নযর দিয়েছিল একদা। তারপর তা হস্তগত করার লক্ষ্যে আশ্রয় নেয় নানা কুটকৌশলের। তন্মধ্যে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র ব্যবহার করে যার নাম "অপবাদ"। যেহেতু অপবাদ এমন এক অস্ত্র যা মানুষের মনে বিষের মত ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেজন্য পদ্ধতি ও সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে শক্তিশালী মিডিয়াগুলো। বিশ্ব-মিডিয়া পাড়ার শক্তিশালী মিডিয়া হিসেবে যখন মুসলমানদের কোন মিডিয়াই ছিল না, তখন শুরু হলো অপবাদের ঝড়। 'মুসলমানগণ মৌলবাদী!', 'ইসলাম জঙ্গীবাদ!', 'মুসলিমরা সন্ত্রাসী!', 'ইসলাম নারীদেরকে বন্দি করে রেখেছে হিজাবের মাধ্যমে!', 'ইসলাম সেকেলে, পুরোনো, মধ্যযুগীয়!' ইত্যাদি। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়া এবং সমকালীন ইন্টারনেট মিডিয়া সমভাবে এসব অপপ্রচার এমন মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে প্রচার শুরু করে যে, অমুসলিমদের পাশাপাশি মুসলিমরাও ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। গোয়েবলসের সেই নীতিকে অমুসলিম বিশ্ব ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমিক ভাবে কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে।

মুসলমানগণ প্রথম ইসলামকে জঙ্গীবাদ শুনে কিছুটা থমকে গিয়েছে, তারপর অপবাদ দেয়া সেসব মিডিয়া তাদের সামনে কিছু প্রমাণ পেশ করেছে। যা তারা বিভিন্ন সত্য ঘটনাকে কিছুটা হলুদ সাংবাদিকতার রঙ মিশিয়ে এমন কায়দায় উপস্থাপন করেছে যে, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ ও স্বল্প শিক্ষিত মুসলমানগণ তাদেরই জীবন পদ্ধতি ইসলামের বিরুদ্ধে বলা এসব কথাকে ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। আজকের অবস্থা তো এমন হয়েছে যে, মুসলমানগণ দেশে দেশে যেন ইসলাম সম্পর্কে বধির ও অন্ধ হয়ে গেছে। মুসলিম নামধারী কাফেরদের এজেন্টদের দ্বারা তাদেরই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে খোদ ধর্মশিক্ষা বইয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপবাদ যুক্ত করে তাদেরই পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিচ্ছে। অথচ এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে যথাযথ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। হত্যাযজ্ঞের মতই গা-সওয়া একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শির্ক নির্মূলের যে ধর্মশিক্ষা গ্রন্থ, সেখানেই শির্কের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে অত্যন্ত সুকৌশলে অথচ মুসলমানগণ বিষয়টিকে যাচ্ছেতাই তুচ্ছজ্ঞান করে বসে আছে। একে অন্ধত্ব কিংবা বধিরত্ব না বলে আর কি বলা যায়? বরং হত্যাযজ্ঞের চেয়ে বহুগুণ বেশি বিধ্বংসী বিষয় মুসলমানদের জন্য এটি যা তাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টিই ধ্বংস করে দেবে।

হাঁ, যে যুগে তাতারীরা ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মুসলমানদের বোধশক্তিকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। সে যুগেও ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মত উচ্চপর্যায়ের বোধশক্তি সম্পন্ন  মুসলমানগণ বর্তমান ছিলেন। বর্তমানেও আছেন। কিন্তু ইবনে তাইমিয়াদের সংখ্যা খুব নগণ্য। আহ্বান এই যে, এসব নগণ্য সংখ্যকের উচিত তদ্রূপ পদক্ষেপ নেয়া, যেরূপ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন একদা ইমাম ইবনে তাইমিয়া। তাতারদের বিরুদ্ধে ইমামের প্রতিটি পদক্ষেপকে সামনে এনে এ যুগের তাতার 'ইয়াহূদী-খৃষ্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ-নাস্তিক-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী-জাতীয়তাবাদী'দের সম্মিলিত জোট-যারা ইসলামের বিরুদ্ধে একত্র হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে-তাদেরকে রুখে দেয়ার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরব থাকার দিনগুলো শেষ হয়ে গেছে। কণ্ঠে আগুন ঝরানোর দিন এসে গেছে। ঘুমন্ত জাতিকে জাগানোর দিন এসে গেছে। এসে গেছে বধিরতা আর অন্ধত্বের দিন গোছানোর মৌসুম। নির্মাণ হোক সে সাধনার, সে প্রচেষ্টার একটি সর্বোত্তম মাধ্যম।


এ বিভাগের আরো লেখা পড়তে অনুসরণ করুন: সম্পাদকীয়

.
By Joomla 1.6 Templates and Simple WP Themes